২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী

  • ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী

বৈশ্বিক রাষ্ট্রসমূহের সম্পর্কের পারদ বিভিন্ন সময়ে ওঠানামা করে। এটা স্বাভাবিক। এর পেছনে ভূ-রাজনৈতিক কৌশল কাজ করে থাকে। বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কখনও উষ্ণতার ছোঁয়া পেয়েছে, আবার কখনও শীতল হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকার সব সময়ে সমঅংশীদারিত্বের ভিত্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে সচেষ্ট। কিছুদিন ধরে এই সর্ম্পকে কিছুটা ভাটার টান থাকলেও, মার্শিয়া স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হয়ে আসার পর দুদেশের মধ্যে নতুন করে সুসম্পর্ক গড়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

আমাদের মুক্তিসংগ্রামের সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করে। কিন্তু দেশটির জনগণ, শিল্প-সাহিত্য জগতের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব এবং কয়েকজন প্রভাবশালী আইন প্রণেতাও দুঃসময়ে আমাদের মানুষজনের পাশে ছিলেন, বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের এই ভূমিকার কথা বাংলাদেশের জনগণ কৃতজ্ঞতা চিত্তে স্মরণ করে থাকে। মুক্তিযুদ্ধ শেষে নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত হলে, ১৯৭২ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় যুক্তরাষ্ট্র। হেরাল্ড জার্নাল, সাময়িকীর ৯ এপ্রিল ১৯৭২ সংখ্যায় জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের লেখা চিঠিতে দেখা যায় যে, দুদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই উপমহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলা আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেএকটি উদার গণতান্ত্রিক দেশ। সে হিসেবে অন্যদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তারা নাক গলাতে ইচ্ছুক নয়।

সন্দেহ নেই, ভৌগোলিক ভূ-রাজনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক সম্পর্কের কারণে দুদেশের মধ্যকার সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বকীয়তা নিয়ে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পিস কোর দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভাল কাজ করেছিল। স্বাধীনতার পূর্বকাল থেকেই এ অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সাহায্য ইউএসএইডের মাধ্যমে মূলত এসেছে। স্বাধীনতার পরবর্তীকালে ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাস থেকে আবার আর্থিক সাহায্য ও অনুদান বাংলাদেশে আসতে থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য বৈদেশিক সাহায্য টাইড এইড হয়েছে। টাইড এইড হলে তার একটি বিশাল অংশের রাষ্ট্রের কাজে না লেগে দেশ থেকে চলে যায়। তারপরেও যে সাহায্যে তারা করেছে, তা দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরিতে অনেক সহায়তা করেছে।

১৯৭২ থেকে শুরু করে ১৯৯০-এর দশকের প্রথমার্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে মূলত বাণিজ্য এবং রেমিটেন্সের মধ্যে সম্পর্কিত ছিল। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে মধ্যম এসে দুদেশের মধ্যকার সম্পর্ক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০০১ সালে সাইক্লোনের সময় ও ২০০৭ সালে সিডর ও আইলার সময় মার্কিন মেরিন সেনাদের সি এ্যাঞ্জেল ওয়ান এবং সি এ্যাঞ্জেল টু বাংলাদেশী সেনাদের সঙ্গে মিলে কাজ করেছেন মানবিক সহায়তার কার্যক্রমে। ওদিকে অরবিস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশে চক্ষু চিকিৎসায় সহায়তা দিয়েছে। দুদেশের সম্পর্কে অগ্রগতিতে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, ২০১২ সালে তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরকালে দুদেশের মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট সম্পাদিত হয়। জন কেরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর সম্পর্ক আরও ভাল হয়।

ডিওফ্রেপিয়াট্ট (২০১২) অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, গত বিশ বছর ধরে বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মডারেট ও সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ৫-৬ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। দেশটির কয়েক মিলিয়ন লোক দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ এখন চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাকা অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহের জন্য দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। পিয়াট্টের বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যম-িত। আনন্দের বিষয় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে নি¤œ আয়ের রাষ্ট্র থেকে মধ্য আয়ের রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। জাতিসংঘের স্বীকৃতি প্রয়োজন।

গত ছয় বছরে এদেশে মানব উন্নয়ন সূচকে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে। এদেশে মোট জাতীয় সম্পদের গড় প্রবৃদ্ধির হার গত পাঁচ বছর ৬.১% থেকে ৬.৫% এর মধ্যে। কড সুভাস খাশিলা ২০১২ সালে মন্তব্য করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায় ভূ-কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সহযোগী হিসেবে এ অঞ্চলে বাংলাদেশকে চায়। তবে যারা জ্বালাও পোড়াও করে বিদেশ কংগ্রেসম্যানদের স্বাক্ষর জাল করার মতো অপরাধ করে, তাদের পক্ষে নিশ্চয়ই মার্কিন প্রশাসন কখনও থাকতে পারে না।

দীর্ঘ আলোচনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘ট্রেড এ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন ফোরাম এ্যাগ্রিমেন্ট (টিকফা) স্বাক্ষরিত হয়, যা চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। ইতোমধ্যে টিকফার কয়েকটি বৈঠকও হয়ে গেছে। যদিও টিকফায় ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে, তবে জিএসপি নিয়ে প্রথম বৈঠকে আলোচনা করা সম্ভব হয়নি। টিকফা চুক্তিতে ট্রান্সপারেন্সির কথা বলা হয়েছে।

এদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের পরিমাণ হচ্ছে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। এদিকে জ্বালানি, বিদ্যুতসহ অন্যান্য খাতে মার্কিন বিনিয়োগ আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের উন্নতমানের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ধিত শাখা বাংলাদেশে খুলতে পারে। আবার চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখাতে পারেন। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র সক্ষমতা অর্জনে আমাদের সহায়তা করতে পারে, যা এদেশের মানুষের সামাজিক স্বস্তি অর্জনে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হবে। আসলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করতে পারে। ব্লু ইকোনমিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ভূমিকা রয়েছে।

বর্তমানে এদেশে আমেরিকান চেম্বারের ২৫০ সদস্যের মধ্যে ৫০টি কোম্পানি ব্যবসা করছে। প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষভাবে ৫০০ এর মতো আমেরিকান ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এদেশে ব্যবসা করছে। বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, স্বাস্থ্য ক্লাব, হিসাব নিরীক্ষা, ব্যক্তিগত সহায়তাকারী পণ্য, কাঁচসহ বাংলাদেশে আমেরিকান পণ্যের চাহিদা রয়েছে। কারগিলের মাধ্যমে কৃষিজাত পণ্য এদেশে এসে থাকে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে গুণগতমান সম্পন্ন ওষুধ রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে। এটি কাজে লাগাতে পারলে এদেশের লাভ হবে।

সারণী থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ১৮৮৫ সালে মোট বাণিজ্যে উদ্ধৃত্ত ছিল। তবে ১৯৮৯ থেকে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ঘাটতি অবস্থায় ছিল। লক্ষণীয়, জিএসপি ফ্যাসিলিটিজ বন্ধ করার পরও বাংলাদেশ থেকে রফতানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি, ২০১৪ সালে যে পরিমাণ রফতানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হয়েছে, তা ২০০৯ সালে তিনগুণের কাছাকাছি। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বিকাশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু বর্তমানে গড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করতে হলে ১৫.৬১% ডিউটি প্রদান করতে হয়। অথচ ভিয়েতনাম ৮.৩৮%, ইন্দোনেশিয়া ৬.৩৬%, জার্মানি ১.১৬%, ভারত ২.২৯, তুরস্ক ৩.৫৩%, চীন ৩%, হংকং ১.২৫% দিচ্ছে। এ উচ্চ হারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক শিল্প প্রবেশ করে প্রতিযোগিতার অহেতুক বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ।

২০১৪ সালের ২ এপ্রিল তৃতীয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনায় উভয় দেশের ডিফেন্সের সম্পর্ক নিয়ে আলোকপাত এবং শান্তি উন্নয়ন এই অঞ্চলের জন্য গুরুত্বারোপ করা হয়। এতে মেরিটাইম সিকিউরিটি বৃদ্ধি, জঙ্গীবাদ দমন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শান্তিরক্ষা, আইনের প্রয়োগ, নন প্রলিপেরেশান, যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ ও বিনিময় এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনা করা হয়। বস্তুত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা আমাদের যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভূ-রাজনৈতিক কারণে তাদেরও আমাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা প্রয়োজন। ডিউটি আরোপের ক্ষেত্রে নমনীয়তা গ্রহণ করলে তা এদেশের পোশাক খাতের অগ্রগতি যেমন বেগবান করবে, তেমনি এ খাতে কর্মরত ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিকের ভাগ্য উন্নয়ন সহায়তা করবে। বিজিএমইএ ২০২১ সাল নাগাদ ৫০ বিলিয়ন পোশাকজাত দ্রব্য বিদেশে রফতানি করতে চায়। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদার মনোভাব প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভৌত অবকাঠামো বিনির্মাণ, কাঠামো নির্মাণ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা,অভিবাসী সমস্যা এবং সামুদ্রিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে পারে। জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে দেয়া, অভিবাসী সমস্যার সমাধান এবং মানব পাচার রোধে সহায়তা করে বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ক্রমিক বিবর্তনে আরও কার্যকর হবে, বন্ধন হবে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ ও ভ্রাতৃত্বসুলভ, এমনটাই প্রত্যাশা।

লেখক : ম্যাক্রো ও ইকোনমিস্ট। প্রফেসর, ব্যবসা প্রশাসন ও অর্থনীতি অনুষদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

ঊসধরষ:ঢ়রঢ়ঁষনফ@মসধরষ.পড়স