২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অবৈধ সংযোগ

  • এক শ্রেণীর কর্মকর্তা কর্মচারীর যোগসাজশে গ্যাস নিয়ে প্রভাবশালীরা হাতিয়ে নিচ্ছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা;###;সংযোগপ্রতি ৩ হাজার থেকে এক লাখ টাকা ;###;অভিযানে পাইপ লাইন অপসারণের পর ফের বসানো হচ্ছে ;###;মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেই ;###;ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী জেলা-গুলোতেই বেশি হচ্ছে এ কাজ

রশিদ মামুন ॥ প্রতিনিয়ত বাড়ছে অবৈধ গ্যাসের সংযোগ। তিতাস গ্যাসের একশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে স্থানীয় প্রভাবশালী কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিপুল অংকের অর্থের বিনিময়ে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, এসব সংযোগ থেকে বিলের নামে তারা বখরা আদায় করছে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে সরিয়ে ফেলা পাইপলাইন ফের বসিয়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেয়া হচ্ছে। যেখানেই গ্যাসের পাইপলাইন রয়েছে সেখানেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অবৈধ সংযোগ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকা এবং পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে অবৈধ গ্যাস সংযোগের হার সবচেয়ে বেশি। ক্ষেত্রবিশেষ গ্রামের পর গ্রামের মানুষ অবৈধভাবে শুধু সংযোগই নিচ্ছেন না, উচ্চচাপের গ্যাসের মূল সঞ্চালন লাইন ছিদ্র করে নিজেরাই নির্মাণ করছেন বিতরণ লাইন। নিম্নমানের পাইপ এবং যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে গড়ে ওঠা এসব সরবরাহ লাইন বিস্ফোরিত হয়ে ঘটতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় দালালচক্র, ঠিকাদার থেকে শুরু করে গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তা কর্মচারীরা বিতরণ লাইন নির্মাণ করে সংযোগ দেয়ার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। সংযোগ প্রতি ৩০ হাজার থেকে নেয়া হচ্ছে এক লাখ টাকা পর্যন্ত। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে এর পরিমাণ দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত হয়। এছাড়াও বিল বাবদ প্রতিমাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হওয়ার বদলে যাচ্ছে প্রভাবশালীদের পকেটে।

তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানি সূত্র বলছে, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ থেকে এখন পর্যন্ত পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে ২৮০ কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন অপসারণ করা হয়েছে। কিন্তু এই পাইপলাইন আবারও বসানো হচ্ছে কিনা, এ ধরনের কোন মনিটরিং ব্যবস্থা নেই তাদের। ফলে সরিয়ে ফেলা পাইপলাইন ফের বসানো হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে তিতাস কিছুই জানে না। এসব অবৈধ লাইন ঢাকা এবং আশপাশের সকল জেলাতেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এখনও এমন শত শত কিলোমিটার পাইপলাইন রয়েছে, যার খবরই রাখে না বিতরণ কোম্পানি।

তিতাসের একজন সংশ্লিষ্ট কর্তকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিষ্ঠানের নজরদারির অভাব রয়েছে। কর্মকর্তা কর্মচারীরা মাঠপর্যায়ে এসব বিষয় একেবারেই দেখভাল করে না। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায় থেকেও তাদের এ বিষয়ে খুব বেশি চাপ দেয়া হয় না। যে যার মতো করে শতশত কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করে রাষ্ট্রীয় গ্যাস বেচাকেনা করছে।

বিষয়টির আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, সকল গ্যাস বিতরণ কোম্পানিই লাভে চলছে। অবৈধভাবে লাখ লাখ গ্রাহক গ্যাস ব্যবহার করলে সিস্টেম লসে লোকসান হওয়ার কথা। কিন্তু উল্টো কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর প্রফিট গেইন (মুনাফা) করছে। অর্থাৎ কোম্পানিগুলো যে পরিমাণ গ্যাস বিক্রির জন্য পেট্রোবাংলার কাছ থেকে নিচ্ছে তার বিপরীতে বিল তুলছে বেশি পরিমাণ গ্যাসের জন্য। অর্থাৎ কোথাও না কোথাও এক ধরনের ফাঁকিবাজির মাধ্যমে এরা প্রকৃত গ্রাহককে ঠকাচ্ছে। কিন্তু এই অতিরিক্ত গ্যাস কোথায় পেল, তা নিয়ে কোন প্রশ্নও তুলছে না দায়িত্বশীল সংস্থাÑ দাবিদার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন বিদ্যুত বিতরণ কোম্পানির সিস্টেম লস যদি গ্রাহকের চুরি হয় তাহলে গ্যাসের প্রফিট গেইন গ্যাস বিতরণ কোম্পানির চুরি।

অন্যদিকে দেখা যায়, সব গ্যাস বিতরণ কোম্পানিই বিপুল পরিমাণ লাভে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে পেট্রোবাংলার কাছ থেকে ক্রয় করা গ্যাসের দাম অপেক্ষা গ্রাহকের কাছে বিক্রয় মূল্যের পার্থক্য বেশি হওয়াতে লাভ বজায় থাকছে। এতে কোম্পানির পরিচালন ব্যয় অর্থাৎ কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, আনুষঙ্গিক সকল খরচ মিটিয়ে কোম্পানির তহবিল দিনের পর দিন ফুলে ফেঁপে উঠছে। হাজার হাজার কোটি টাকার লাভের অর্থ কোম্পানির তহবিলে অলস পড়ে আছে। এতে কোম্পানি পরিচালনায় তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেহেতু কোম্পানি কোন দিক থেকেই লোকসান করছে না, তাই অনৈতিক গ্যাস ব্যবহার ঠেকিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় মনযোগ নেই রাষ্ট্রীয় বিতরণ কোম্পানির।

রাজধানী ঢাকায় অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারীদের সুযোগ দিলে তারা নিজেদের বৈধ গ্রাহক করে নেন। কিন্তু সরকার নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যেসব এলাকায় পাইপলাইন নেই সেখানে আবাসিক গ্রাহকদের সংযোগ দেয়ার জন্য আর নতুন করে পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে না। মূলত এ সুযোগটিই নিচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তারা নিজেরাই বিতরণ কোম্পানির বদলে গ্যাস সংযোগ দিচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকার মধ্যে কেরানীগঞ্জ এবং কামরাঙ্গীরচরে বেশি অবৈধ সংযোগ রয়েছে। এখানে শুধু বাসাবাড়িতেই নয় সংযোগ রয়েছে শিল্প কারখানায়ও। সরকারী দলের স্থানীয় কর্মীরাই এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। তিতাসের একশ্রেণীর কর্মকর্তা কর্মচারীকে ম্যানেজ করে বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে বিক্রির সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা কবির উদ্দিন বলেন, যারা এসব কাজ করে তারা বেশ ক্ষমতাশালী। এরা সংযোগ দেয়ার জন্য যেমন টাকা নেয় তেমনি মাসিক বিল আদায়ের লোকও আছে। ভয়ে এদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে চায় না। তিতাসের কর্মচারী আর ঠিকাদারদের যোগসাজশেই বছরের পর বছর কামরাঙ্গীরচরে এই গ্যাস বাণিজ্য চলে আসছে। যেহেতু বৈধপন্থায় কারখানার জন্য গ্যাস পাওয়া দুষ্কর, তাই অবৈধ পন্থাকেই বেছে নিচ্ছে অনেকে।

ঢাকার আশপাশে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ ও টঙ্গী থানা এলাকার প্রায় সব এলাকাতেই প্রচুর অবৈধ সংযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জেলার শ্রীপুরে অবৈধ সংযোগের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক বেশি। এছাড়াও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকার কোনাবাড়ি, আমবাগ, নতুনবাজার এবং কালিয়াকৈরের মৌচাক, সফিপুর এলাকায়ও ব্যাপক অবৈধ সংযোগ রয়েছে।

কুমিল্লার জেলার দাউদকান্দি, মুরাদনগর, বুড়িচং, দেবিদ্বার, আদর্শ সদর, চৌদ্দগ্রাম, সদর দক্ষিণসহ বিভিন্ন উপজেলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজদের যোগসাজশে চুটিয়ে চলছে গ্যাস বাণিজ্য। তিতাসের নারায়ণগঞ্জ জোনের আওতায় ১৯টি পয়েন্টে অবৈধ গ্যাসলাইন চিহ্নিত করা হয়েছে। এদের মধ্যে কদমতলী, আইলপাড়া, মৌচাক, মিজমিজি, গোদনাইল ধনকুন্ডা, মধুগড়, মিশনপাড়া, শান্তিনগর, নয়াপাড়ায় অবৈধ গ্যাসলাইন সংযোগ দিয়ে একটি সিন্ডিকেট চক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রতিটি অবৈধ গ্যাসলাইন সংযোগ বাবদ নিরীহ লোকজনের কাছ থেকে দূরত্ব ভেদে ৩০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে। আর সাভারের আশুলিয়া এলাকার বেশিরভাগই অবৈধ গ্রাহক।

গাজীপুর থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিনিধি মোস্তাফিজুর রহমান টিটো জানান, জেলার জয়দেবপুর, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ ও টঙ্গী থানা এলাকার প্রায় সব এলাকায় অসংখ্য অবৈধ সংযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জেলার শ্রীপুরে অবৈধ সংযোগের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। এছাড়াও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকার কোনাবাড়ি, আমবাগ, নতুনবাজার এবং কালিয়াকৈরের মৌচাক, সফিপুর এলাকায়ও অবৈধভাবে গ্যাস পুড়ছে ঘরে ঘরে। শ্রীপুর উপজেলা গাজীপুর জেলায় হলেও এ উপজেলার একাংশ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোং লিঃ’র গাজীপুর আঞ্চলিক বিপণন ডিভিশনের জয়দেবপুর জোনাল অফিস নিয়ন্ত্রণ করে। অপর অংশের নিয়ন্ত্রণ করে ময়মনসিংহ ডিভিশন। দুই ডিভিশনের সীমান্ত এলাকা হওয়ার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে স্থানীয় অসাধু চক্রের সদস্যরা। গাজীপুর জেলার টঙ্গী, জয়দেবপুর ও কালিয়াকৈরের চন্দ্রায় জোনাল মার্কেটিং (জোনাল বিপণন) অফিস রয়েছে।

শ্রীপুরের ১নং সিএ্যান্ডবি এলাকার শওকত, ফজলু মিয়া, মোশারফসহ একাধিক গ্রামবাসী জানান, অবৈধ সংযোগের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এবং কিছুসংখ্যক ঠিকাদার ও তাদের লোকজন। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট অফিসের কিছু কর্মচারী, পুলিশের সদস্য। তারা এসব অবৈধ সংযোগ দেয়া প্রতিচুলা থেকে নির্ধারিত হারে টাকা উঠিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিচ্ছে। কেউ টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশে হয়রানি করা হয়। হয়রানির ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করছে না।

তিতাস সূত্র জানায়, বার বার তাগিদ দেয়ার পরও গত আট মাসেও মোবাইল কোর্ট দেয়নি গাজীপুর জেলা প্রশাসন বা গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য প্রতিমাসে জেলা প্রশাসন,উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তাকে একাধিকবার চিঠি দিয়েও কোন ফল পাওয়া যাচ্ছে না। অবৈধভাবে স্থাপিত বিতরণ লাইন উচ্ছেদের বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোং লিঃ, পেট্রোবংলা, বিদ্যুত, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং গাজীপুর জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে চিঠি চালাচালি করেও কোন ফায়দা হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাঝেমধ্যে অবৈধ লাইন উচ্ছেদ করা হলেও পরক্ষণেই তা স্থাপন করছে চক্রটি।

নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনলেই অবৈধ সংযোগ হ্রাস পাবে বলে মন্তব্য করেছেন গাজীপুর জোনাল মার্কেটিং অফিসের ম্যানেজার প্রকৌশলী এএম সাইফুল ইসলাম।

কুমিল্লা থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিনিধি মীর শাহ আলম জানান, কুমিল্লায় চলছে অবৈধ গ্যাস সংযোগের মহোৎসব। এসব গ্যাস সংযোগের সঙ্গে একশ্রেণীর দালালচক্র ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সংযোগের মাধ্যমে দালালচক্র লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তবে মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করে নামমাত্র জরিমানা আদায় করা হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে দুর্নীতিবাজরা। এতে গ্রামীণ এলাকার অসংখ্য মানুষ প্রতারিত হচ্ছে।

জানা যায়, জেলার দাউদকান্দি, মুরাদনগর, বুড়িচং, দেবিদ্বার, আদর্শ সদর, চৌদ্দগ্রাম, সদর দক্ষিণসহ বিভিন্ন উপজেলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজ যোগসাজশে গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে অতিসহজে গ্যাস সংযোগ পাইয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিসংযোগে ৫০ হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে প্রকাশ্যে তড়িঘড়ি করে অবৈধভাবে গ্যাস লাইন স্থাপন ও সংযোগ দেয়া হচ্ছে। দাউদকান্দি থানার ওসি আবদুস ছালাম জানান, এ উপজেলায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে কমপক্ষে দেড় শ’ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস লাইনের পাইপসহ গ্যাস সংযোগের মেশিন, গাড়ি আটক করা হয়েছে। তিনি জানান, এ কাজে জড়িত থাকার দায়ে ৭/৮জনকে অর্থদ- করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার কদমতলী, ইলিয়টগঞ্জ, বারাগাঁও, কৃষ্ণপুর, হাসানপুর, নন্দনপুর, দৌলতী এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য অবৈধ সংযোগ রয়েছে। এদিকে জেলার মুরাদনগর উপজেলার ধামঘর, করিমপুর, নগরপাড়, ছালিয়াকান্দি, গকুলনগর, ত্রিশ গ্রামসহ অর্ধশতাধিক গ্রাম ও বোড়ারচর থেকে জাহাপুর পর্যন্ত ৩০ হাজার ফুট, ভুবনঘর থেকে দরিকান্দি হয়ে দুলারামপুর পর্যন্ত ১১ হাজার ফুট পাইপলাইন নির্মাণ কাজ করা হয়। স্থানীয়রা জানায়, উপজেলার ধামঘর গ্রামে ২ শতাধিক গ্রাহক থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে রাতের আঁধারে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোঃ লিঃ’র (বিজিডিসিএল) নিজস্ব পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে প্রায় ৩ হাজার ফুট গ্যাস লাইন সংযোগের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে, কুমিল্লা সেনানিবাসসংলগ্ন সাহেবনগর এলাকা থেকে সম্প্রতি ৬৬৮টি অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, বিজিডিসিএল কার্যালয়ের কতক কর্মচারীর যোগসাজশে দালালচক্র ওই এলাকার বাসিন্দার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ প্রদান করে। এছাড়া বুড়িচং উপজেলার নিমসারসহ জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে বহু অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণসহ লাইন অপসারণ করা হলেও সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিপরায়নদের মুখোশ উন্মোচনের ভয়ে এসব বিষয়ে থানায় সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের হয় না বলে সূত্র জানায়।

নারায়ণগঞ্জ থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিনিধি খলিলুর রহমান জানান, তিতাসের সোনারগাঁ বিভাগের অধীনে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার, সোনারগাঁও, বন্দর ও মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা এলাকা।

সোনারগাঁও বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আব্দুর সবুর জানান, ৫টি উপজেলায় কমবেশি ২৩১ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস লাইন চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ৬/৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৪০টি জিডি করা হয়েছে। আমরা পূর্বেও উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু আবারও চক্রটি গ্যাস লাইন সংযোগ দিচ্ছে। শীঘ্রই আবারও উচ্ছেদ চালানো হবে। সোনারগাঁওয়ের বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের ২০ গ্রামে কয়েক হাজার নতুন সংযোগ দেয়ার কথা বলে স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের খংসারদী, উলুকান্দি, মামলতপুর, দাউদেরগাঁও, মোবারকপুর, নগরজোয়ার, রায়পুর, বাগেরপাড়া, খামারগাঁও, ছনপাড়া, পঞ্চবটি, দীঘিচাঁনপুর, টেকপাড়াসহ প্রায় ২০ গ্রামে নতুন করে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়া থামছে না।

তিতাসের নারায়ণগঞ্জ জোনের আওতায় ১৯টি পয়েন্টে অবৈধ গ্যাস লাইন চিহ্নিত করা হয়েছে। এদের মধ্যে কদমতলী, আইলপাড়া, মৌচাক, মিজমিজি, গোদনাইল, ধনকু-া, মধুগড়, মিশনপাড়া, শান্তিনগর, নয়াপাড়া, বার্মাস্ট্যান্ড অবৈধ গ্যাস লাইন সংযোগ দিয়ে একটি সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

তিতাসের নারায়ণগঞ্জ জোনের ব্যবস্থাপক জাফারুল আলম জানায়, ১৯টি পয়েন্টে ৩০ হাজার ফুট অর্থাৎ ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ অবৈধ গ্যাস লাইন সংযোগ চিহ্নিত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করে সাত কিলোমিটার পাইপলাইন অপসারণ ও ধ্বংস করা হয়েছে। ৮০০ মিটার পাইপ জব্দ করা হয়েছে। শীঘ্রই আবারও অবৈধ গ্যাস লাইন উচ্ছেদ করা হবে। তিনি জানান, ১, ২, ৩ ও ৪ ইঞ্চি ডায়া পাইপ দিয়ে অবৈধ গ্যাস লাইন টানা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ ইঞ্চি ডায়া পাইপ দিয়ে সব চেয়ে বেশি অবৈধ লাইন টানা হয়েছে।

সাভার থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিনিধি সৌমিত্র মানব জানান, অভিযানের পর অভিযান চালিয়ে থামানো যাচ্ছে না সাভারের অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারীদের। গত দুই থেকে তিন মাসে আশুলিয়াতে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে। এসময় তিতাস গ্যাসের অবৈধ পাইপলাইন অপসারণ করা হয়েছে। তবে সেভাবে কাউকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। আশুলিয়া থানাধীন রাঙ্গামাটিয়া মধ্যপাড়া এলাকায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে তিতাস। সাভার তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন ও ট্রান্সমিশন কোম্পানির প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানান, স্থানীয় পুুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় আশুলিয়ার রাঙ্গামাটিয়া মধ্যপাড়া এলাকায় প্রায় ৪শ’ মিটার গ্যাসের পাইপ মাটির নিচে থেকে উত্তোলন ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ সংযোগ দিয়ে প্রায় ২৫০ বাড়িতে অবৈধ গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছিল। বছরখানেক ধরে তিতাস গ্যাসের অবৈধ সংযোগ নেয়ার মহোৎসব চলে আসছিল শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায়।

বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি মোঃ তাজুল ইসলাম অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশজুড়ে যেভাবে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেয়া হচ্ছে তাতে দেশে কোন গবর্নেন্স আছে বলে মনে হয় না। গ্যাস খাতে অরাজকতা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, এভাবে চলতে পারে না। অবৈধ সংযোগ যেকোন মূল্যে বন্ধ করতে হবে।