১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হামজা ব্রিগেডকে অর্থ দেয়ার কথা স্বীকার তিন আইনজীবীর

হামজা ব্রিগেডকে অর্থ দেয়ার কথা স্বীকার তিন আইনজীবীর
  • সোনালী, ডাচ-বাংলা ও এক্সিম ব্যাংকে জঙ্গী নেতা ডনের তিন এ্যাকাউন্টে তারা জমা দেন ১ কোটি ৮ লাখ টাকা

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম/ জোবাইর চৌধুরী, বাঁশখালী ॥ জঙ্গী অর্থায়নের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত সুপ্রীমকোর্টের তিন আইনজীবী রিমান্ড শেষে রবিবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। গ্রেফতারকৃত ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, এ্যাডভোকেট হাসানুজ্জামান লিটন ও এ্যাডভোকেট মাহফুজ চৌধুরী বাপনকে রিমান্ডের চারদিনের মাথায় দুপুরে বাঁশখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাজ্জাদ হোসেনের আদালতে সোপর্দ করা হয়। পরে ম্যাজিস্ট্রেটের খাস কামরায় এ তিন আইনজীবীর কাছ থেকে পৃথক পৃথকভাবে একে একে টানা প্রায় তিন ঘণ্টা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী লিপিবদ্ধ করা হয়।

তিন আইনজীবীই জবাবন্দীতে জানিয়েছেন, জঙ্গী সংগঠন হামজা ব্রিগেড নেতা গ্রেফতারকৃত মনিরুজ্জামান ডনের পৃথক তিনটি ব্যাংকের এ্যাকাউন্টে তাদের পক্ষ থেকে ১ কোটি ৮ লাখ টাকা বিভিন্ন সময়ে প্রদান করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক এবং বেসরকারী ডাচ বাংলা ও এক্সিম ব্যাংক। এত বিপুল পরিমাণ অর্থ এ আইনজীবীগণ কোত্থা থেকে সংগ্রহ করেছেন এবং কেন এ জঙ্গী সংগঠন নেতার এ্যাকাউন্টে দিয়েছেন সে নিয়ে জবানবন্দীতে তারা কি বলেছে তা র‌্যাব, সরকারী কৌঁসুলি ও আদালতের কোন সূত্রই সুস্পষ্টভাবে না বললেও ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা তার জবানবন্দীতে বলেছেন, মক্কেল থেকে গৃহীত অর্থ তিনি ফেরত প্রদান করেছেন। এর আগে জঙ্গীপনায় জড়িত তা তার জানা ছিল না। তবে র‌্যাব শুরু থেকে যে জঙ্গীপনায় অর্থায়নের জন্য এ তিন আইনজীবী হামজা ব্রিগেড নেতা মনিরুজ্জামান ডনের এ্যাকাউন্টে এ তিন আইনজীবীর মাধ্যমে প্রদান করা হয়েছে সে বক্তব্যে অটল রয়েছে। উল্লেখ্য, জঙ্গী সংগঠন হামজা ব্রিগেড নিয়ে র‌্যাব সেভেনের তদন্তে যে ১ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা অর্থায়নের সন্ধান মিলেছে তাতে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা দু’দফায় ২৫ ও ২৭ লাখ টাকা হারে দিয়েছেন। এছাড়া এ্যাডভোকেট হাসানুজ্জামান লিটন ৩১ লাখ ও এ্যাডভোকেট মাহফুজ চৌধুরী বাপন দিয়েছেন ২৫ লাখ টাকা। অবশিষ্ট টাকা যাদের মাধ্যমে প্রদান করা হয়েছে তা নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে র‌্যাব।

গত মঙ্গলবার ঢাকার ধানম-ি এলাকা থেকে সুপ্রীমকোর্টের এই তিন আইনজীবীকে চট্টগ্রাম র‌্যাব সেভেনের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে গ্রেফতারের পর প্রথমে চট্টগ্রামস্থ র‌্যাব সেভেনের সদর দফতরে নিয়ে আসা হয়। বুধবার তাদের বাঁশখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতে সোপর্দ করা হয়। র‌্যাবের আবেদনে বাঁশখালীর সাধনপুর লটমনি পাহাড়ের গহীন অরণ্যে শহীদ হামজা ব্রিগেডের অস্ত্র প্রশিক্ষণের যে আস্তানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভারি অস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্যাদি উদ্ধার করা হয় সে ঘটনায় এই তিন আইনজীবীকে শ্যোন এ্যারেস্ট দেখানো হয় এবং দশ দিনের রিমান্ড প্রার্থনা করা হলে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

আদালতে এ তিন আইনজীবীকে সোপর্দ করার পর তাদের পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবীগণ জামিন প্রার্থনা করলে আদালত তা নাকচ করে দেন। তিন আইনজীবীর জবানবন্দী প্রদান শেষে সরকার পক্ষে অতিরিক্ত পিপি এ্যাডভোকেট বিকাশ রঞ্জন ধর সাংবাদিকদের জানান, জঙ্গী অর্থায়নে ব্যারিস্টার শাকিলা ও তার দুই সহকারী কার্যবিধির ১৬১ ধারায় র‌্যাবের কাছে প্রদত্ত জবানবন্দীতে জঙ্গী নেতা মনিরুজ্জামান ডনের পৃথক পৃথক ব্যাংক এ্যাকাউন্টে অর্থ প্রদানের কথা স্বীকার করেছেন। হামজা ব্রিগেড নেতা মনিরুজ্জামান ডনের তিনটি ব্যাংক এ্যাকাউন্টে পৃথক পৃথকভাবে ১ কোটি ৮ লাখ টাকা কয়েক দফায় জমাদানের বিষয়টি স্বীকার করে জবানবন্দী দিয়েছেন। তবে তারা বিষয়টি জঙ্গীপনায় অর্থায়ন বলে স্বীকার করেনি। সরকার পক্ষের এ কৌঁসুলি আরও জানান, এ ঘটনায় আসামিরা সরাসরি জঙ্গী অর্থায়নে যে জড়িত তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এছাড়া একটি মহল দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বিনষ্ট করতে দেশী-বিদেশী অর্থায়নে জঙ্গীবাদকে উস্কে দিচ্ছে। সুপ্রীমকোর্টের তিন আইনজীবীর এ ধরনের সম্পৃক্ততা উদ্বেগজনক। তিনি নিশ্চিত করে বলেন, বিভিন্ন ব্যাংকের এ্যাকাউন্টে শহীদ হামজা ব্রিগেডের অন্যতম নেতা মনিরুজ্জামান ডনের মাধ্যমে এ তিন আইনজীবীসহ আরও অনেকে জঙ্গী অর্থায়নের কাজে লিপ্ত রয়েছে। এ ব্যাপারে তিন আইনজীবীর পক্ষে নিয়োজিত এ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার জানিয়েছেন, হামজা ব্রিগেডের গ্রেফতারকৃত ২৮ জনের মামলা সংক্রান্তে ওই অর্থ গ্রহণ করেছিলেন ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা। পরে হামজা ব্রিগেড নেতা মনিরুজ্জামান ডনের তিনটি পৃথক এ্যাকাউন্টে উক্ত ১ কোটি ৮ লাখ টাকা ফেরত হিসেবে জমা দেয়া হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের অপর আইনজীবী কফিল উদ্দিন জানিয়েছেন, মামলা চালানোর দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা যখন জানতে পারেন যে, যাদের জামিনসহ মামলা পরিচালনার দায়িত্ব তিনি নিয়েছেন তারা সকলেই জঙ্গী হিসেবে র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েছে। তখনই তিনি উক্ত টাকা মনিরুজ্জামানের এ্যাকাউন্টে ফেরত দিয়েছেন। র‌্যাব এ ঘটনাকে জঙ্গী অর্থায়নের কর্মকা- বলে চালিয়ে দিচ্ছে। বাস্তবে তা সত্য নয়। এছাড়া আসামি পক্ষের আইনজীবীগণ আরও বলেছেন, তাদের মক্কেল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। র‌্যাব জোরপূর্বক জবানবন্দী দিতে বাধ্য করেছে। জবানবন্দী গ্রহণের সময় আদালত প্রাঙ্গণ ও ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ের সামনে পুলিশের কড়া নজরদারি এবং আসামিদের র‌্যাব পাহারায় গাড়িতে বসিয়ে রেখে পযায়ক্রমে ম্যাজিস্ট্রেটের খাস কামরায় প্রেরণের বিষয়টি আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আদালত তিন আইনজীবীর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করলেও তারা আইনী লড়াই চালিয়ে যাবেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

অপরদিকে পৃথক পৃথক বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মূলত আরও কয়েকটি ব্যাংকে এ তিন আইনজীবীর মতো বিভিন্ন মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ জঙ্গীপনার কাজে ব্যবহারের জন্য প্রদান করা হয়েছে। যে অভিযোগ নিয়ে র‌্যাবের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এসব সূত্রের অনেকেই বলছেন, অর্থায়নের টাকার পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা। আবার কেউ বলছেন দেড় কোটি টাকা। শাকিলা ফারজানা গ্রহণ করেছিলেন দেড় কোটি টাকা। উক্ত টাকা থেকে খরচ বাদ দিয়ে ১ কোটি ৮ লাখ টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে। এ ফেরতের বিষয়টি মানতে নারাজ র‌্যাব। তাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে তা হচ্ছে এ প্রক্রিয়ায় বিভিন্নভাবে দেশে জঙ্গীপনায় অর্থায়ন হচ্ছে। আর এ অর্থ আসছে বিদেশ থেকে বিভিন্ন চ্যানেলে। ইতোমধ্যে ব্যাংকে জমাকৃত এ অর্থের সঙ্গে দুবাইয়ের নাগরিক আল্লামা লিবদি নামের ধনাঢ্য এক ব্যক্তির নাম এসেছে। তার ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় চ্যানেলে খোঁজ নিচ্ছে র‌্যাবের তদন্ত দল।

এদিকে শহীদ হামজা ব্রিগেডের পক্ষে হাটহাজারী এলাকার আল মাদ্রাসাতুল আবু বকর মাদ্রাসায় অভিযান চালিয়ে জঙ্গীপনার কাজে উদ্বুদ্ধকরণের যেসব তথ্য-উপাত্ত র‌্যাবের অভিযানে উদঘাটিত হয় সে সংক্রান্তে দায়েরকৃত মামলায় এ তিন আইনজীবীকে রবিবার চট্টগ্রাম আদালতে শ্যোন এ্যারেস্টের আবেদন জানানোর পর আদালত তা মঞ্জুর করেছে।