২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘ক্রসফায়ার’ আতঙ্ক গা-ঢাকা দিচ্ছে দুর্ধর্ষ ক্যাডাররা

  • আন্ডারওয়ার্ল্ডে তোলপাড়

শংকর কুমার দে ॥ গা-ঢাকা দিতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলের সশস্ত্র কর্মী-ক্যাডার, শীর্ষ সন্ত্রাসী, জঙ্গীগোষ্ঠীর ওয়ান্ডেড আসামি, দুর্ধর্ষ ও দাগী অপরাধীরা। গত এক সপ্তাহে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাগুলোতে ভয়ভীতি, আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ডে। ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের হাত থেকে প্রাণে বাঁচার জন্য সীমান্ত পথে পাড়ি জমাচ্ছে ও আন্ডারগ্রাউন্ডে (আত্মগোপনে) চলে যাচ্ছে তালিকাভুক্ত দুর্ধর্ষ শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা। গত এক সপ্তাহে রাজধানীর হাজারীবাগ, মাগুরা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, কুমিল্লায় পুলিশ ও র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে শুধু সরকারী দল ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের পাঁচজন ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার ঘটনায় রাজধানীসহ আন্ডারওয়ার্ল্ডে এখন তোলপাড় শুরু হয়েছে। শাসক দলের সহযোগী সংগঠনের সশস্ত্র কর্মী-ক্যাডার ও সন্ত্রাসীরা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় সরকারী দলের বাইরে রাজনৈতিক অঙ্গনের বিরোধী দলের সশস্ত্র কর্মী-ক্যাডার, জঙ্গীগোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যেও ভয়ভীতি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় গা-ঢাকা দিচ্ছে। দেশ-বিদেশে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- অভিহিত করে তা বন্ধ, প্রতিবাদ, নিন্দা ও উদ্বেগ জানানোর ঘটনার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানায়, শাসক দলের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ অন্যান্য সংগঠনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, টেন্ডারবাজি, ব্যবসা-বাণিজ্যের বিরোধসহ শিশু রাজন, রাকিবসহ অনেক শিশুকে অমানুষিক নির্যাতনে নির্মম হত্যাকা-, কয়েকটি নারী ধর্ষণ ও লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা, বেশ কয়েকজন ব্লগার হত্যা ও হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত দাবি করে জঙ্গী সংগঠন বিশেষ করে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ জেএমবি, হুজি, হিযবুতের তৎপরতা, জঙ্গী সংগঠন আইএসে যোগ দেয়ার অস্ত্র হাতে প্রশিক্ষণ তৎপরতার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে আন্ডারওয়ার্ল্ড অশান্ত হয়ে ওঠার অশুভ ইঙ্গিত বহন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নে কঠোর অবস্থান নেয় সরকার। সরকারী দলের সহযোগী সংগঠনের কর্মী-ক্যাডাররাও বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় সরকারী দলের বাইরের বিরোধী দল বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত ও জঙ্গী সংগঠনগুলোর কর্মী-ক্যাডারদের মধ্যেও ভীতির সঞ্চার হয়েছে। আন্ডারওয়ার্ল্ড কাঁপানো দুর্ধর্ষ শীর্ষ সন্ত্রাসী, অপরাধীরাও প্রাণ বাঁচাতে গা ঢাকা দিতে শুরু করেছে বলে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরে এক অনির্ধারিত আলোচনায় অপরাধী দলের হলেও ন্যূনতম কোন সহানুভূতি দেখানো হবে না বলে জানিয়ে দেন। তারপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সরকারের নীতিনির্ধারক মহল থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ে ‘সবুজ সঙ্কেত’ যায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে কঠোর এ্যাকশনে যাওয়ার জন্য জেলা পর্যায়েও নির্দেশ দেয়া হয়। গত এক সপ্তাহ ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটার রেশ চলে যায় আন্ডারওয়ার্ল্ডে। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, খুনী, জঙ্গীসহ দুর্ধর্ষ অপরাধীরা আন্ডারগ্রাউন্ড বা আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না এবং যারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির জন্য দায়ী তাদের গ্রেফতারের জন্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর জোটের কর্মী-ক্যাডারদের ব্যাপক আধিপত্য বিস্তারের বিরোধ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখল পাল্টা দখল, অপরাধী কার্যক্রমের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্রথমে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনীর মাধ্যমে ক্লিনহার্ট অপারেশন অভিযান পরিচালনা করে বিচারবর্হিভূত হত্যাকা- চালু করে বিএনপি-জামায়াত জোট। টানা তিন মাস ক্লিনহার্ট অপারেশনে অর্ধশতাধিক নিহত ও সহস্রাধিক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। তারপরও নিয়ন্ত্রণহীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে জোট সরকার গঠন করে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। র‌্যাবই প্রথম দেশে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ চালু করে এবং এ ঘটনার জন্য সাজানো গল্প তৈরি করে, যা এখনও অব্যাহত আছে। শুধু তাই নয়, ২০০২ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের সেই অপারেশন ক্লিনহার্টকে জাতীয় সংসদে আইন করে বৈধতা দেয় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার।

চলতি আগস্টে সরকারী দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের টেন্ডার, ব্যবসা-বাণিজ্য, আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় সরকারী দলের কর্মী-ক্যাডারদের মধ্যে একাধিক খুনোখুনির ঘটনা ঘটেছে। বাড্ডায় ঝুট ব্যবসা নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের তিন নেতা খুন হয়েছেন। জাতীয় শোক দিবসের দিন কুষ্টিয়ায় খুন হয়েছেন এক যুবলীগ নেতা। চাঁদপুরের কচুয়ায় চাঁদার দাবিতে স্কুলের শিক্ষক ও ছাত্রীদের ওপর যুবলীগের হামলার ঘটনা ঘটেছে। মাগুরায় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে মায়ের পেটে শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং রাজধানীর হাজারীবাগে ছাত্রলীগ নেতার এক কিশোরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কার সৃষ্টি হয়। এমনকি গাজীপুরে মন্ত্রীর অনুষ্ঠানের অদূরে যুবলীগ নেতাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় শুক্রবার। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি সঙ্কট কাটাতে সরকারী দলের নীতিনির্ধারক মহল থেকে শাসক দলের কর্মী-ক্যাডারদের বিরুদ্ধেই কঠোর এ্যাকশন নেয়ার নির্দেশের কারণে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাঁচজন নিহত হয়। সরকারী দলের কর্মী-ক্যাডাররা ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, শীর্ষ সন্ত্রাসী যারা বিরোধী দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে, জঙ্গীগোষ্ঠীতে, কিংবা আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণের মধ্যে জড়িত তাদের মধ্যে ভীতি, আতঙ্ক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এসব অপরাধী আন্ডারগ্রাউন্ডে বা আত্মগোপনে চলে যেতে পরামর্শ দিয়েছে তাদের ব্যবহারকারী আশ্রয়দাতা, মদদদাতারাও।

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় না পৌঁছা পর্যন্ত যে বিশেষ অভিযান চলবে এবং জনগণের জানমাল বিনষ্টকারী, সশস্ত্র সন্ত্রাসী, আইনশৃঙ্খলা অবনতিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর এ্যাকশন অব্যাহত থাকবে। দেশ-বিদেশের মানবাধিকার সংগঠনসহ যারা যতই প্রতিবাদ, নিন্দা, উদ্বেগ জানাক না কেন, নিরীহ নির্দোষ সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন, অস্ত্র, মাদক ও জঙ্গীগোষ্ঠীর তৎপরতা বন্ধে সরকারের অঙ্গীকার ও সেই অঙ্গীকার পূরণে বদ্ধপরিকর। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এটাকে কোনভাবে ‘ক্রসফায়ার’ অভিহিত করার পরিবর্তে বা বন্দুকযুদ্ধ বলে অভিহিত করে বলা হয়েছেÑ সারা পৃথিবীর উন্নত ও সভ্য দেশেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদস্যদের আত্মরক্ষার্থে যা ঘটে থাকে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে।