১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উত্তরে অধিকাংশ নদীর পানি বাড়ায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

উত্তরে অধিকাংশ নদীর পানি বাড়ায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি
  • বেড়েছে নদী ভাঙ্গন, লাখ লাখ পানিবন্দী

জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ উজানের ঢলে উত্তরাঞ্চলের প্রায় সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বেশ কয়েকটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে নদী ভাঙ্গন। ঝুঁকির মুখে পড়েছে বেড়িবাঁধ ও বহু স্থাপনা। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। পানিতে তলিয়ে গেছে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ফসল। নওগাঁর আত্রাই নদীর বেড়িবাঁধের দুটি জায়গায় ভেঙ্গে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে আত্রাই ও ফকিরনী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অন্তত ১০ পয়েন্ট। খবর স্টাফ রিপোর্টার ও নিজস্ব সংবাদদাতাদের।

উজানের ঢলে রবিবার ভোরে নওগাঁর আত্রাইয়ে ছোট যমুনা নদীর তীরবর্তী ফুলবাড়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ এবং আত্রাই নদীর তেঁতুলিয়াতে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে যায়। এ দু’টি স্থানে বাঁধ ভাঙ্গার ফলে শতশত বিঘা জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার মানুষ। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় আত্রাই-নওগাঁ ও আত্রাই-পতিসর পাকা সড়ক হুমকির মুখে পড়েছে। রবিবার দুপুরে আত্রাই নদীর পানি ধামইরহাটের শিমুলতলী পয়েন্টে বিপদসীমার ৫১ সেমি, মান্দার জোতবাজার পয়েন্টে ৭৩ সেমি এবং আত্রাই পয়েন্টে বিপদসীমার ২০ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

পানি বৃদ্ধির ফলে চকবালু নামে এলাকায় আত্রাই নদীর দক্ষিণ তীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এছাড়া পারনুরুল্লাবাদ, কয়লাবাড়ী, চকরামপুর, শহরবাড়ী ভাঙ্গীভাড়া এবং ফকিরনী নদীর গোয়ালমান্দা, করতিপাড়া ও নিখিরাপাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

কুড়িগ্রাম ॥ ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ৬০ ইউনিয়নের প্রায় সোয়া লাখ মানুষ। বসতভিটা ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। রবিবার দুপুরে বন্যার পানিতে ডুবে সামিয়া নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। বানভাসী মানুষজন গবাদি পশু নিয়ে পাকা সড়ক, বাঁধ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে বানভাসীদের মাঝে এখন পর্যন্ত কোন ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়নি। ফলে বানভাসী মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সঙ্কট। জেলায় প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমির ফসল এখন পানির নিচে।

রবিবার সেতু পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি ৯ সেমি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩৩ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ২২ সেমি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

নাগেশ্বরীতে শুটকিয়া ব্রিজের মুখসহ পরপর দুটি বাঁধ দিয়ে পানির গতিপথ বন্ধ করে মাছ চাষ করায় বন্যার পানির তোড়ে ভেঙ্গে গেছে পয়রাডাঙ্গা-ভগিরভিটা সড়কের ডুবাছড়ি ব্রিজ। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ১০ গ্রামের ৩০ হাজার মানুষ।

এদিকে বন্যায় দাশিয়ারছড়ার এক হাজার পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। তলিয়ে গেছে শতশত বিঘা জমির ফসল। গোটা দাশিয়ারছড়া এখন পানিতে থৈ থৈ করছে। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট। এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া হয়নি কোন সহায়তার উদ্যোগ।

গাইবান্ধা ॥ জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঘাঘট ও করতোয়াসহ সব নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। রবিবার ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বিপদসীমার ১০ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদীসংলগ্ন সুন্দরগঞ্জের ১৫ ইউনিয়ন। এসব ইউনিয়নের প্রায় ৪০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ঘাঘটের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বামনডাঙ্গা ও সর্বানন্দ ইউনিয়নের দুই হাজার পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। ঘাঘট নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি যে কোন মুহূর্তে ধসে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বন্যায় আমন বীজতলা, বর্ষালী ও আউশ ধান, পটল ও সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে। পানিবন্দী লোকজন মাচা করে বসবাস করছে। ফুলছড়ির সিংড়িয়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। বাড়িঘরে পানি ওঠায় ১৫ ইউনিয়নে ১২টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

বগুড়া ॥ উজানের ঢলে বগুড়ার পূর্বাঞ্চলে যমুনা তীরবর্তী সারিয়াকান্দির চার ইউনিয়নের অন্তত ১২ গ্রাম বন্যাকবলিত হয়েছে। যমুনার পানি এখনও বিপদসীমার ৪৮ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বসতভিটায় পানি ঢুকে পড়ায় প্রায় পাঁচ শ’ পরিবার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ও স্কুলে আশ্রয় নিযেছে। এদিকে জেলার ৫২ স্কুলে পানি ঢুকে পড়ায় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।

জামালপুর ॥ ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ ও বকশীগঞ্জের অন্তত ৩০ ইউনিয়নে কমপক্ষে ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। যমুনা তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের গ্রামগুলো বন্যাকবলিত হয়ে পড়ায় অনেক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে এসব এলাকার সদ্য রোপণ করা রোপা-আমন ধান, বীজতলা, পাট, আখ ও সবজির বাগান। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে রোপা আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছে স্থানীয় কৃষকরা।

সিলেট ॥ ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে সিলেটের নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে পায় ৯০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ৩৫০ হেক্টর আউস, আমন ও ৫০ হেক্টর বীজতলা পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে।

সিরাজগঞ্জ ॥ স্টাফ রিপোর্টার, সিরাজগঞ্জ থেকে জানান, যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি ৩৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে রবিবার সন্ধ্যায় তা বিপদসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনা নদী তীরবর্তী কাজীপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

এদিকে শনিবার রাতে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাহুকায় পুরাতন রিং বাঁধের ২শ’ মিটার এলাকা ভেঙ্গে বাঁ অভ্যন্তরের বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় প্রায় একশ’ বাড়ি প্লাবিত হয়েছে। বন্যা প্রতিরোধে বিকল্প হিসেবে নবনির্মিত রিং বাঁধটি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে বলে স্থানীয় এলাকাবাসী মনে করছে। কাজীপুরের ঢেকুরিয়া, পাইকরতলী, পলাশপুরসহ কয়েকটি গ্রামের নিম্নাঞ্চল ও কৃষি জমি ও বসত বাড়ি নতুন করে প্লাবিত হয়েছে।