২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কাছ থেকে দেখা আইভি রহমান

  • নীলুফার বেগম

আইভি রহমানকে কাছ থেকে দেখার কিছু স্মৃতি বিশেষভাবে মনে পড়ছে। সময়টা ১৯৯৭-২০০০ সাল। ঐ সময় প্রথমে আমি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ও পরে মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের মহাপরিচালক ছিলাম। তখন তিনি জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারপার্সন/সভানেত্রী ছিলেন। মনে পড়ে, জাতীয় মহিলা সংস্থার অফিসে কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় আমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করছি। সে সভায় আইভি রহমান তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নারী উন্নয়নের খুঁটিনাটি বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন, যা আমার খুব ভাল লেগেছিল। মন্ত্রণালয়ের মাসিক সভায় তাঁর সংস্থার নারী উন্নয়নের বিষয়গুলো খুব স্পষ্ট করে গভীর মমতার সঙ্গে তুলে ধরতেন। উল্লেখ্য, আমরা দু’জন নবীন বয়স থেকেই পরিচিত ছিলাম।

আরও মনে পড়ে আমরা দু’জন এক সময়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়নকারী দুটি সংগঠনের প্রধান ছিলাম। তিনি জাতীয় মহিলা সংস্থার সরকার কর্তৃক মনোনীত অবৈতনিক চেয়ারপার্সন বা সভানেত্রী আর আমি সরকারের বেতনভুক যুগ্মসচিব হিসেবে মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের মহাপরিচালক। জাতীয় মহিলা সংস্থার অফিস ৬৪ জেলায় ও ৫০ উপজেলায় ছিল। আর ছিল কিছু সংখ্যক প্রকল্প। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করছি স্বকর্ম সহায়ক প্রকল্প ও গ্রামীণ মহিলা উন্নয়ন প্রকল্প, যে দুটিতে মহিলাদের ঋণ দেয়ার ব্যাপ্তি ছিল ১০৭ থানার আওতাধীন গ্রামগুলোতে। আর অন্যদিকে মহিলা অধিদফতরের ৬৪ জেলায় ও ৩৯৯ উপজেলায় অফিস ছিল আর গ্রামে গ্রামে ছিল সমিতি। আমি উপজেলায় ট্যুরে গেলে কখনও কখনও পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁর সংস্থার ঋণ বিতরণ অনুষ্ঠানে সৌজন্যমূলকভাবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতাম। মনে পড়ে পার্লামেন্টারি মূল্যায়ন কমিটির মিটিংয়ের কথা। সেখানেও তিনি সংস্থার নারীবিষয়ক বক্তব্য সোচ্চারভাবে তুলে ধরতেন। প্লানিং কমিশনের প্রজেক্ট মিটিংয়েও নারী উন্নয়নমূলক বিষয়গুলো যৌক্তিকভাবে অত্যন্ত স্পষ্ট করে উপস্থাপন করতেন। তাঁর সঙ্গে নারী উন্নয়নের অনেক বিষয়ে কমবেশি শেয়ার করেছি। এছাড়াও নারীকে স্বাবলম্বী বা অধিষ্ঠিত করার অনেক প্রচেষ্টা, অনেক কথা তাঁকে ঘিরে আছে। উদাহরণস্বরূপ এসিডদগ্ধ মাসুমা ও শামীমার কথা উল্লেখ করা যায়। এসিডদগ্ধ এই দুই মহিলার যখন ভয়ঙ্কর অবস্থা তখন স্নেহ-মমতার হাত বাড়িয়েছিলেন আইভি রহমান। তিনি তাঁদের সুচিকিৎসা, পুনর্বাসন, প্রশিক্ষণ ও চাকরির ব্যবস্থা করেছিলেন। কাজগুলো খুব একটা সহজ ছিল না। কিন্তু রীতিমতো লড়াই করে তিনি এ কাজগুলো করেছেন। আমি যতদূর জানি, শামীমাকে চিকিৎসার জন্য তিনি বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থাও করেছিলেন। ফলে আজ তাঁরা মাথা উঁচু করে জাতীয় মহিলা সংস্থায় কাজ করছেন। শুধু তাই নয়, কালের পরিক্রমায় তাঁরা বিয়ে-শাদি করে স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে আছেন।

জাতীয় মহিলা সংস্থার ১৪৫, নিউ বেইলী রোডের অফিস ভবনটি যতদিন টিকে থাকবে আইভি রহমানের নামও সেখানে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। ১৮ কাঠা জমির ওপর নির্মিত এই জাতীয় মহিলা সংস্থার ভবনটি দৃঢ়প্রত্যয়ী আইভি রহমানের সৃষ্টি। তিনি তিলে তিলে এই ভবন গড়েছেন। এর কাজকর্মের ভেতরে জোয়ার এনেছেন। এই ভবনের প্রতিটি ইট-কাঠ তাঁর অতি পরিচিত ছিল বললে অতিশয়োক্তি হবে না।

মনে পড়ে এই ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানের কথা (৩০ নবেম্বর ’৯৮)। তিনি এই অনুষ্ঠানে তাঁর উপজেলা পর্যায়ের অফিস প্রধানদের নিয়ে এসেছিলেন নারী উন্নয়নে অধিকতর উদ্বুদ্ধ করতে। বিশেষ করে মনে পড়ে অফিস ভবনের উদ্বোধনের কথা। ১৩ মার্চ ২০০০-এ এর উদ্বোধন হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এর উদ্বোধন করেছিলেন। এই উদ্বোধন অনুষ্ঠান ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। এই অনুষ্ঠানের প্রাণও ছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানের প্রথমে বক্তৃতার বদলে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি নাটিকা ও জারিগানের মধ্য দিয়ে শিশুশিল্পীদের দ্বারা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছিলেন। অনুষ্ঠানটি এত মনোজ্ঞ ও আকর্ষণীয় হয়েছিল যে, এত দিন পরেও সেই স্মৃতি এতটুকু পুরনো হয়নি। এসব অভিনব ও ব্যতিক্রমধর্মী পরিকল্পনার দাবিদার ছিলেন আইভি রহমান। দুই বছরের ভেতরে ১২ তলা ভবনের প্রথম ফেজের ৬ তলা শেষ করা ছিল খুবই কঠিন কাজ। আইভি রহমান দেখিয়ে গেছেন একনিষ্ঠতা, একাগ্রতা, ধৈর্য ও সমাজ উন্নয়নের অঙ্গীকার থাকলে মানুষ অনেক অসাধ্য সাধন অল্প সময়েও করতে পারে। তিনি এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যদিও আমরা জানি তাঁর স্বামী তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হিসেবে তাঁকে সহযোগিতা করেছিলেন। তবে এ সহযোগিতা তিনি আদায় করে নিয়েছিলেন, তা আমাদের স্বীকার করতেই হবে।

তৎকালীন সরকার তৃণমূল পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে প্রায় ১৪ হাজার মহিলা সদস্য/চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন। নির্বাচিত মহিলা সদস্যদের নারী উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে, তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সাহসী ভূমিকা রাখতে, সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় কর্মকা-ে নারীর ক্ষমতায়নের যে ধারা সূচিত হয়েছে তা সাফল্যম-িত করার লক্ষ্যে জাতীয় মহিলা সংস্থার তরফ থেকে আইভি রহমানের নেতৃত্বে ২৫ এপ্রিল ’৯৯ ঢাকার শেরেবাংলা নগরে এক ঐতিহাসিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ বিশাল কাজটিও সাংগঠনিক কর্মে দক্ষ আইভি রহমান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেন।

আইভি রহমান ছিলেন দেশের একজন বিশিষ্ট অধ্যক্ষের কন্যা। আগেই বলেছি, তিনি বিদ্যানুরাগী ছিলেন। সাহিত্যের প্রতি ছিল তাঁর অনুরাগ। তাঁর সময়কালে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আমার জানা মতে তাঁর সংস্থা থেকে চারটি স্মরণিকা বের হয়েছিল। সেই স্মরণিকাগুলো ’৯৮, ’৯৯, ২০০০ ও ২০০১-এ প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোতে তাঁর ‘মুক্তিযুদ্ধে নারী’, ‘আজই এ পুণ্য প্রভাতে তোমারে স্মরণ করি হে বঙ্গ জননী’, ‘একটি স্বপ্ন ও একটি বিশ্বাস’ ও ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি’ শীর্ষক চারটি নিবন্ধে বিভিন্ন বিষয়ে যেমনÑ ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজনীতি ও নারী উন্নয়নের যে উপলব্ধি এবং গভীরতা প্রকাশ পেয়েছে সেগুলো কালের চাহিদা মিটিয়েও সাহিত্যে অবদান রাখবে।

নারী উন্নয়নের সম্পৃক্ত ব্যক্তি হিসেবে বলব, মুক্তিযোদ্ধা আইভি রহমান নারী উন্নয়নের জন্য অনেক উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। বিভিন্ন নারী সংগঠনের সঙ্গে যুক্তও ছিলেন। আলোচিত বিভিন্ন বিষয়ের প্রেক্ষিতে পরিশেষে বলব, জাতীয় মহিলা সংস্থার ক্ষেত্রে তিনি যেসব অনবদ্য, ব্যতিক্রমধর্মী কর্মসূচী নিয়েছেন সেগুলো পর্যালোচনা করলে তাঁকে জাতীয় মহিলা সংস্থার একজন নিবেদিতপ্রাণ, সংবেদনশীল সফল সভানেত্রী বলা যায়। জাতীয় মহিলা সংস্থার অফিস যতদিন থাকবে ততদিন তাঁর নাম রইবে চিরভাস্বর। আমরা যাঁরা তাঁর কাছের মানুষ ছিলাম আমাদের অন্তরে তাঁর পরিপাটি চেহারাটি থাকবে চির অমলিন। তাঁর মৃত্যুর মাসে (আগস্ট) তাঁকে অন্তর দিয়ে স্মরণ করছি। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। সেইসঙ্গে আশা করছি, তাঁর অকালমৃত্যুতে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে সেটা যেন ভরে ওঠে শত শত আইভি রহমানসম নারীর জন্মের মধ্য দিয়ে।

লেখক : সাবেক যুগ্মসচিব