২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

’৭৫ থেকে ’৮১- কেমন ছিল বাংলাদেশ?

  • গোলাম কুদ্দুছ

বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতাকে হত্যা, গ্রেফতার-নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্যেও ওই সময় আওয়ামী লীগ মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় এবং দেশব্যাপী সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক এই অবস্থান কর্মী-সমর্থকদের সাহসী ও প্রতিবাদী করে তোলে। গতকালের পর আজ পড়–ন তৃতীয় কিস্তি...

আওয়ামী লীগ এবং জাসদ ‘হ্যাঁ-না’ ভোট বর্জন করে। সিপিবি ও ন্যাপ (মোজাফ্ফর) আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং পরবর্তীতে ময়মনসিংহ পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদী খননে জিয়াউর রহমানের কর্মসূচীতে যোগ দেয়। সিপিবি তখন জিয়াউর রহমানের সরকারকে- “সীমাবদ্ধ হইলেও মূলত দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী” হিসেবে আখ্যায়িত করে।

[সূত্র : কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসের সময় হইতে কেন্দ্রীয় কমিটির মূল নীতি ও কার্যাবলী পর্যালোচনাÑ২৮/৯/১৯৭৯ পৃষ্ঠা-১৮/১৯]

বাকশালের অন্যতম অংশীদার সিপিবি-ন্যাপ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ক্ষমতা দখলকারীদের দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী মূল্যায়ন করা কত বড় রাজনৈতিক ভুল ছিল তা নিশ্চয়ই আজ দলের নেতৃত্ব উপলব্ধি করছেন। কারণ, সেই সরকারই দালাল আইন বাতিল করে দেয়, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালু করে, সমাজতন্ত্র শব্দটিকে সংবিধান থেকে ছেঁটে ফেলে। তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি। পরে জিয়াউর রহমানের সরকার সিপিবি সভাপতি মণি সিং এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদকে গ্রেফতার করে।

জ.

এ সময় প্রতিরক্ষা বাহিনীতে অনেক ক্যু, পাল্টা ক্যু সংঘটিত করার তৎপরতা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭ বিমান বাহিনী দিবসে একটি ক্যু করার পরিকল্পনার কথা জানা যায়। কিন্তু এর একদিন আগে ২৭ সেপ্টেম্বর জাপান এয়ারলাইন্সের একটি ডি-সি-৮ বিমান ১৫৬ জন যাত্রীসহ হাইজ্যাক হয়ে ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। জাপানী রেড আর্মির ‘হিদাকা কমান্ডো ইউনিট’-এর পাঁচজন সদস্য ৬ মিলিয়ন ডলার মুক্তিপণ ও জাপানের কারাগারে আটক তাদের সহযোদ্ধাদের মুক্তির দাবিতে এ ছিনতাই করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কুদেতারা তারিখ পরিবর্তন করে। দু’দিন পিছিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর ২২ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা দু’জন অফিসারকে হত্যা এবং ৯৩ ব্রিগেড কমান্ডারসহ কয়েকজন অফিসারকে বন্দী করে কারাগারে আটক ১৭ সৈনিককে মুক্ত করে দেয়। একই সময় ঢাকায় আর্মি ফিল্ড সিগন্যাল ব্যাটালিয়নের সৈন্যরা সিগন্যালম্যান শেখ আবদুল লতিফের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করলে তাদের সঙ্গে কুর্মিটোলা এয়ার বেইসের সিপাহীরা যোগ দেয়। ভোররাতে বিদ্রোহীরা রেডিও স্টেশন দখল করে এবং বিপ্লবী সরকার গঠনের ঘোষণা দেয়। কয়েক শত সৈন্য এয়ারপোর্ট দখল করে নয় জন অফিসার এবং বিমানবাহিনীর দুই জন পাইলটকে হত্যা করে। ইতোমধ্যে জেনারেল জিয়ার অনুগত সৈন্যরা বিমানবন্দর এবং রেডিও স্টেশন পুনর্দখল করে নেয়। সংঘর্ষে কয়েকজন সৈন্য নিহত হয়। জিয়াউর রহমান এক বেতার ভাষণে বিদ্রোহ দমন করার কথা ঘোষণা করেন। এই ক্যু এবং পাল্টা ক্যু প্রচেষ্টায় কিছু অফিসার ও সৈনিকের মৃত্যু হয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সামরিক আদালতে ১১৪৩ জনকে ফাঁসি এবং কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করে জিয়াউর রহমান তার অবস্থান সুদৃঢ় করেন।

ঝ.

১৫ ডিসেম্বর ১৯৭৭ জেনারেল জিয়া এক বেতার ভাষণে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি ফ্রন্ট গঠনের কথা বলেন। অতঃপর তার ইচ্ছানুযায়ী উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে আহ্বায়ক করে জাতীয়তাবাদী গণতন্ত্রী দল (জাগদল) গঠন করা হয়।

১৯৭৮ সালের ৩-৫ মার্চ ঢাকায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তিন দিনব্যাপী দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পর এটিই ছিল সামরিক শাসনের অধীনে প্রথম পূর্ণাঙ্গ কাউন্সিল। এ কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা নতুন করে উজ্জীবিত ও সংগঠিত হয়। উক্ত কাউন্সিল অধিবেশন থেকে অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার করে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া কারাগারে আটক আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মুক্তি এবং ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড এবং জেলহত্যার বিচার দাবি করা হয়। সম্মেলনে পরবর্তী দু’ বছরের জন্য আবদুল মালেক উকিলকে সভাপতি এবং আবদুর রাজ্জাককে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগকে বিভক্ত করার নানা উদ্যোগের কথা শোনা যায়। খুনী মোশতাকের নেতৃত্বে গঠিত হয় ডেমোক্র্যাটিক লীগ। ১৯৭৮ সালের ১১ আগস্ট মিজানুর রহমান চৌধুরী ঢাকায় নিজ বাসভবনে এক সাংবাদিক সম্মেলন ডাকেন। সাংবাদিক সম্মেলনে নিজেকে আহ্বায়ক ঘোষণা করে আওয়ামী লীগের নামে একটি কমিটি ঘোষণা করেন। একজন প্রবীণ নেতা হিসেবে তাঁর এ ঘোষণায় দেশবাসী বিস্মিত হলেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বিভ্রান্ত হয়নি। তাঁরা জানে কোনটি তাদের প্রকৃত ঠিকানা।

৫ এপ্রিল ১৯৭৮ জেনারেল জিয়ার সরকার বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে এক অধ্যাদেশ জারি করে। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে স্বাধীনতা বিরোধীরা এবং বিদেশে পালিয়ে থাকা আলবদর-রাজাকারদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। যার ফলাফল পরবর্তীতে দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে।

রাজনৈতিক দলসমূহের দাবির মুখে জেনারেল জিয়ার নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার ২১ এপ্রিল ১৯৭৮ এক ঘোষণার মাধ্যমে ৩ জুন ১৯৭৮ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। স্বল্প সময়ের প্রচারণার সুযোগ রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা সরকারের এক ধরনের চাতুরী ছাড়া আর কিছু নয়Ñ জনগণ এটি বুঝে নেয়। ২২ এপ্রিল অপর এক ঘোষণায় বলা হয় ১ মে থেকেই রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো যাবে। ২৮ এপ্রিল জেনারেল জিয়ার নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার ইতোপূর্বে জারিকৃত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের অধ্যাদেশ সংশোধন করে একটি নতুন অধ্যাদেশ জারি করে। এতে বলা হয়, সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে একমাত্র সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবেন এবং রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। বন্দুকের জোরে গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতার অপব্যবহারের এ ধরনের নজির সারা বিশ্বে বিরল। যাই হোক, জেনারেল জিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত উপ-রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন জাগদল, মশিউর রহমান যাদু মিয়ার নেতৃত্বাধীন ভাসানী ন্যাপ, কাজী জাফরের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস পার্টি, জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন (জাগমুই) এবং বাংলাদেশ লেবার পার্টির সমন্বয়ে ১৯৭৮ সালের ১ মে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’Ñ গঠিত হয়। এ ফ্রন্টের চেয়ারম্যান ছিলেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, রাষ্ট্রপতি ও সেনাবাহিনীপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।

অপরদিকে সংসদীয় গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের মৌল আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলসমূহ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট’ গঠন করে। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (মোজাফফর), সিপিবি, জনতা পার্টি, গণআজাদী লীগ ও পিপলস লীগ কৌশলগত কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। সামরিক সরকারের গণতন্ত্রের লেবাসের স্বরূপ উন্মোচন ছিল ‘গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট’-এর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণের মূল উদ্দেশ্য। এ নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী জেনারেল জিয়া প্রদত্ত ভোটের ৭৬.৭% এবং গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট মনোনীত জেনারেল ওসমানী ২১.৭% ভোট পেয়েছেন বলে সামরিক সরকার মনোনীত নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে।

২৯ জুন ১৯৭৮ রাষ্ট্রপতি, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ৩০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ২৮ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ২ জন প্রতিমন্ত্রী। নীলনক্সার নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে সকল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি নতুন রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ সংক্ষেপে বিএনপি গঠন করে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮-এ দলের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ করেন।

চলবে...

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব