১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভারতে বাঙালীর প্রথম ‘বন্ধন ব্যাংক’

  • উদ্বোধন করেন ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি, উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংক গবর্নর

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ ভারতের সব রাজ্যের নামে ব্যাংক থাকলেও এতদিন বাংলার নামে কোন ব্যাংক ছিল না। তবে এবার সরাসরি বাংলার নামে হয়ত ‘ব্যাংক অব বেঙ্গল’ হচ্ছে না; কিন্তু বাঙালীর ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে ‘বন্ধন ব্যাংক’। এ ব্যাংকের অন্যতম উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠা হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশের ছেলে চন্দ্রশেখর ঘোষ। ব্যাংকটির পরিচালকম-লীতেও রয়েছে বাঙালী প্রাধান্য। ১০ সদস্যের বোর্ডে ছয়জনই বাঙালী। রবিবার কলকাতার সায়েন্স সিটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ব্যাংকটির উদ্বোধন করেন ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র, চন্দ্রশেখর ঘোষ, অশোক লাহিড়ি, বিশেষ আমন্ত্রণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, প্রথম বছরেই বাংকটিতে ১ কোটি গ্রাহক করার পরিকল্পনা নিয়ে ৬০০ শাখা খোলার ইচ্ছা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। তিন বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালের মধ্যেই শেয়ারবাজারে নথিভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করেছে বন্ধন ব্যাংক।

অরুণ জেটলি বলেন, বাংলার জন্য বিশেষ আর্থিক প্যাকেজের পরিকল্পনা নিয়েছে কেন্দ্র। শুধু বাংলাই নয়, বিহারের জন্যও আর্থিক সহায়তার ভাবনা রয়েছে কেন্দ্রের। যদিও বিস্তারিতভাবে এ নিয়ে তিনি আর কিছু জানাতে চাননি। সেই সঙ্গে জেটলি বলেছেন, উন্নয়ন নিয়ে কোন রাজনীতি নয়। উন্নয়নের প্রশ্নে কেন্দ্র সবসময় রাজ্যের পাশেই আছে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বললেন, বন্ধনের আত্মপ্রকাশ রাজ্যের উন্নতিতে সাহায্য করবে। স্বল্প বিনিয়োগের শিল্পোদ্যগীরা বন্ধনের উত্থানে উৎসাহিত হবেন। ব্যাংকিং পরিষেবা যত উন্নত এবং আধুনিক হবে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি তত সুদৃঢ় হবে। বন্ধন এ রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বন্ধনের অগ্রগতি দেশের উন্নয়নে কালজয়ী পদক্ষেপ বলেও বর্ণনা করেছেন তিনি। রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র বন্ধন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকে মহিলাদের ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণের নজির বলে মনে করেন।

জানা যায়, বাংলাদেশের ছেলে চন্দ্রশেখর ঘোষ সেখানকার ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা ব্র্যাকে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে ভারতে এসে প্রথম চালু করেছিলেন ‘বন্ধন’ নামের ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা। সেই সংস্থার সাফল্যেই তাকে ব্যাংক চালু করার সুযোগ দিয়েছে। গত জুন মাসে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক দেশের ২৩তম বেসরকারী ব্যাংক হিসেবে কাজ শুরু করার চূড়ান্ত লাইসেন্স দিয়েছে বন্ধনকে। অবশ্য এই ব্যাংক লাইসেন্স পাওয়ার জন্য আম্বানি থেকে শুরু করে অনেক বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী আবেদন করেছিল। কিন্তু বন্ধনকে লাইসেন্স দেয়ার জন্য বাছাই করেছিল রিজার্ভ ব্যাংক। ব্যাংকের চেয়ারম্যান হচ্ছেন অশোক কুমার লাহিড়ি। তিনি এক সময় ছিলেন ভারত সরকারের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। তাছাড়া এই বাঙালী অর্থনীতিবিদের এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর এবং আন্তর্জাতিক অর্থ ভা-ার ও বিশ্বব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বোর্ডে একমাত্র মহিলা সদস্য নাবার্ডের পূর্বাঞ্চলীয় চীফ জেনারেল ম্যানেজার টিএস রাজি গাইন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বন্ধনকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে জনপ্রিয় করে তুলতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিকভাবে দেশজুড়ে ব্যাংকের প্রায় ৬০০টি শাখা খোলা হবে। এর মধ্যে রাজ্যে ১৪৭টি এবং কলকাতাতেই খোলা হবে ৩৮টি শাখা। প্রথম পর্যায়ে ২৫০টি এটিএম খোলার পরিকল্পনাও নিয়েছে বন্ধন ব্যাংক। চন্দ্রশেখর বাবু জানান, প্রতিবছর প্রায় ৩০ শতাংশ হারে ব্যবসা বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছেন তারা। সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য বায়োমেট্রিক (বুড়ো আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে) পদ্ধতিতে এ্যাকাউন্ট খোলার পদ্ধতি চালু করবে বন্ধন। এ জন্য ব্যাংকের শাখায় শাখায় ছোট ছোট যন্ত্র রাখা হবে। সেখানেই আঙুলের টিপছাপ দিয়ে এ্যাকাউন্ট খুলে লেনদেন করা যাবে। ব্যাংক শুরু করতে যেখানে ন্যূনতম ৫০০ কোটি টাকা মূলধনের প্রয়োজন সে তুলনায় অনেক বেশি ৩,২০০ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে বন্ধন ব্যাংক আত্মপ্রকাশ করছে। যেহেতু রিজার্ভ ব্যাংকের নিয়ম অনুসারে, কাজ শুরুর তিন বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে শেয়ারবাজারে নথিভুক্ত করার সুযোগ আসবে তাই তখনই সুবিধামতো সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চান বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন চন্দ্রশেখর বাবু। ব্যাংকের লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকে এখনও পর্যন্ত ৮,০০০ নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে, যার মধ্য একেবারে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে আনা হয়েছে প্রায় ৮৫০ জনকে। এছাড়া ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা হিসেবে সারাদেশে বন্ধনের ওই ২০২২ শাখাকেও ব্যাংকিং পরিষেবায় শামিল করা হবে। নতুন ব্যবস্থায় ওই সব শাখা ক্ষুদ্রঋণ দেয়া ছাড়াও ছোট অংকের আমানত সংগ্রহ, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় টাকা হস্তান্তর করা (রেমিট্যান্স), বীমা প্রকল্প বিক্রিসহ আরও কিছু কাজ করবে। নতুন ব্যাংক চালুর ব্যাপারে বন্ধনকে বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে সারাদেশে তাদের ক্ষুদ্রঋণ পরিষেবার অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছে বলে চন্দ্রশেখর মনে করেন। তাই ক্ষুদ্রঋণ পরিষেবাও বন্ধন চালু রাখতে চায় বলে জানিয়েছেন তিনি। বর্তমানে সারাদেশে বন্ধনের ৬৬ লাখ ক্ষুদ্রঋণ গ্রাহক রয়েছেন। চন্দ্রশেখর বলেন, আমাদের লক্ষ্য উদ্বোধনের দিনেই মোট গ্রাহকসংখ্যা এক কোটিতে নিয়ে যাওয়া। ওই ৬৬ লাখ গ্রাহকও আমাদের ব্যাংকেরই এ্যাকাউন্ট হোল্ডার হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর বন্ধন ব্যাংককে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি এবং গ্রীন ব্যাংকিংয়ে মনোনিবেশ করারও আহ্বান জানান। এ সময় তিনি কিভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি এবং মানিটারি পলিসি বাংলাদেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জনে সহায়ক হয়েছে তার ওপরও আলোকপাত করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জনসাধারণকে প্রচলিত ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যেতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি ব্যাংকসমূহের উচিত সব ধরনের জনগণ বিশেষতÑ প্রান্তিক, দরিদ্র এবং ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ জনগণের দোরগোড়ায়ও তাদের সেবা পৌঁছে দেয়া। এর মাধ্যমে আমরা ব্যাংকিং আওতামুক্ত জনগণকে প্রচলিত আর্থিক কাঠামোর মধ্যে আনতে পারি, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে।