১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মানবতার চিরায়ত আকাক্সক্ষা রবীন্দ্রনাথের ‘শ্যামাপ্রেম’

  • আইজিসিসির আয়োজনে বিশেষ মঞ্চায়ন

সাজু আহমেদ ॥ বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে অন্যতম একটি সফল সংগঠন প্রাঙ্গণেমোর। বাংলাদেশ তো বটেই বিশ্বনাট্য অঙ্গনে মৌলিক বাংলা নাটকের প্রসারে নাট্যচর্চার দৃঢ় প্রত্যয়ে ১০ বছর আগে যাত্রা শুরু করে দলটি। সেই প্রত্যয়ে যোগ হয় রবীন্দ্রনাট্য চর্চার অঙ্গীকার। তারুণ্যনির্ভর নাট্যকর্মীদের প্রাণান্ত চেষ্টা আর দলের সিনিয়র সদস্য অনন্ত হীরা ও নূনা আফরোজের মেধা মননের সম্মিলনে যাত্রার শুরু থেকে একের পর এক নীরিক্ষাধর্মী ও সমৃদ্ধ প্রযোজনা উপহার দিয়ে যাচ্ছে দলটি। অভিনয় ও আঙ্গিক নির্মাণের গুণে তাদের প্রযোজনাগুলো নিমিষেই আলাদা করে চেনা যায়। রবীন্দ্রনাট্য চর্চার পাশাপাশি দলটি তাদের প্রযোজনায় দেশের ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। তবে দলের অন্যতম প্রচেষ্টা দুই বাংলার বাংলা নাট্যপ্রেমীদের মিলনমেলার আয়োজন। বিশেষ করে একাধিকবার দুইবাংলার রবীন্দ্রনাট্যমেলার সফল আয়োজনের মাধ্যমে উপমহাদেশে একটি সফল নাট্যদল হিসেবে গুণী ও বোদ্ধাদের কাছে স্বীকৃতি অর্জনে সক্ষম হয়েছে নাট্যদলটি। দলের প্রাণ একঝাঁক নাট্যকর্মী দেশে ও দেশের বাইরের বিভিন্ন উৎসবে তাদের প্রযোজনাগুলো নিয়মিত মঞ্চায়নে অংশ নিয়ে থাকে। দলের এমনি একটি প্রযোজনা ‘শ্যামাপ্রেম’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্য অবলম্বনে ‘শ্যামাপ্রেম’ নাটকটি ২০০৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম মঞ্চায়ন হয়। আঙ্গিক নির্মাণ এবং অভিনয় সমৃদ্ধ হওয়ায় দলের প্রথম প্রযোজনা হিসেবে নাটকটি প্রথম মঞ্চায়নের পর থেকেই প্রশংসিত হয়ে আসছে। দলের অন্য নাটকগুলোর মতো দেশে ও বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। সফল মঞ্চায়নের ধারাবাহিকতায় গত ৯ মে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে রবীন্দ্রজয়ন্তীর বিশেষ প্রদর্শনী হিসেবে ‘শ্যামাপ্রেম’ নাটকের ৫০তম মঞ্চায়ন সম্পন্ন হয়। সম্প্রতি ইন্ধিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের (আইজিসিসি) আয়োজনে রাজধানীর গুলশান ভারতীয় দূতাবাসে শনিবার সন্ধ্যায় আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য মঞ্চায়ন করা হয় প্রাঙ্গণেমোরের নাটক ‘শ্যামাপ্রেম’। এদিন নাটকটির ৫১তম মঞ্চায়ন হয়। দেশে ও বিদেশে দর্শক নন্দিত ‘শ্যামাপ্রেম’ নাটকটির নাট্যরূপ দিয়েছেন শ্রী চিত্তরঞ্জন ঘোষ ও নির্দেশনা দিয়েছেন অনন্ত হিরা। নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন নূনা আফরোজ, অনন্ত হিরা, রামিজ রাজু, ইউসুফ পলাশ, নিজাম লিটন, শুভেচ্ছা, আশা, আবু হায়ত জসিম, রিগ্যান রত্ম, জসিম, সুজন, সুজয়সহ আরও অনেকে।

‘শ্যামাপ্রেম’ নাটকে দেখানো হয়েছে ভালবাসা, স্বাধীনতা ও মানবতার চিরায়ত আকাক্সক্ষা। নাটকের গল্পে দেখা যায় নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র শ্যামা রাজ নর্তকী। গ্রামের সাধারণ এক কৃষক পরিবারের এই মেয়েটিকে কৈশোরে লুট করেছিল অত্যাচারী জমিদারের লোকেরা। ভাগ্যচক্রে রাজ নর্তকী হয়ে উৎকোচ আর বশীকরণের বাঁকা পথে অভ্যস্ত শ্যামার প্রায় মরে যাওয়া স্বপ্নগুলো আরেকবার বেঁচে উঠে যাঁর সান্নিধ্যে, সে এক বিদেশী বণিক প্রেমময় শৌর্যবান পুরুষ বজ্রসেন। অন্যদিকে ছেলেবেলার হল্লাহাটির সাথী অভিমানী বিপ্লবী উত্তীয় প্রাণ দিয়ে ভালবাসে শ্যামাকে। কিন্তু তার কাছে ধরা দেয়াটা হয়ে ওঠে না শ্যামার। অন্যদিকে বজ্রসেনের সঙ্গে স্বপ্নযুথের আকুলতায় শ্যামা প্রত্যাখ্যান করে প্রতাপশালী অমাত্ত সায়নের আয়োজিত ভোজসভায় গীতনৃত্যের আহ্বান। অপমানজ্ঞানে বৈরী হয় সায়ন বজ্রসেনকে গুপ্তচর সাব্যস্ত করে আটক করে। এরপর তার শিরñেদের আয়োজন শুরু হয়। যেই উত্তীয় তার ভালবাসার প্রতিদানে কোনদিন শ্যামার কাছ থেকে কিছুই পায়নি, সেই বজ্রসেনকে বাঁচাতে আত্মদানে প্রবৃত্ত হয়। শ্যামার কাছ থেকে এক অসাধারণ মুগ্ধতায় ভালবাসার স্বীকৃতি পায় উত্তীয়। কুটচালে সিদ্ধহস্ত রাজকোটালের বন্দোবস্তে বজ্রসেনকে ছেড়ে দেয়া হয় আর বজ্রসেন পরিচয়ে উত্তীয়কে শিরñেদে হত্যা করা হয়। বজ্রসেন ফিরে আসে ঠিকই, কিন্তু সব জানতে পেরে ঘৃণায়, অপমানে আত্মঘাতী হতে বের হয়ে যায়। চিত্ত স্থির হলে আবার ফিরে আসে, শ্যামাকে সঙ্গে করে যাত্রা শুরু করে মৃত্যুঞ্জয়ী উত্তীয়র খোঁজে, অন্ধকার থেকে মুক্তির খোঁজে। এই গল্পে তাই উত্তীয় অমর হয়ে থাকে স্বাধীনতা ও ভালবাসার এক আলোকসামান্য প্রতীক হয়ে। প্রসঙ্গত, ‘শ্যামাপ্রেম’ ছাড়াও প্রাঙ্গণেমোর রবীন্দ্রনাথের আরও ৩টি নাটক মঞ্চে এনেছে। এগুলো হলো রবীন্দ্রনাথের চার অধ্যায় উপন্যাস অবলম্বনে ‘স্বদেশী’, ‘রক্তকরবী’, শেষের কবিতা উপন্যাস অবলম্বনে ‘শেষের কবিতা’। এছাড়া প্রাঙ্গণেমোরের ‘লোকনায়ক’, ‘দ্রোহ প্রেম নারী’, ‘আওরঙ্গজেব’ ও ‘ঈর্ষা’ নামে আরও ৪টি নাটক মঞ্চে এসেছে। দলের ৮টি নাটকেরই নিয়মিত মঞ্চায়ন হচ্ছে।