২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আস্থা সঙ্কটে ইসলামী ব্যাংক ॥ সরে যাচ্ছেন বিদেশী উদ্যোক্তারা

অপূর্ব কুমার ॥ বেসরকারী খাতের ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের মালিকানা ছেড়ে দিচ্ছে বিদেশী প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তারা। প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম শেয়ার উদ্যোক্তা দুবাই ইসলামী ব্যাংক গত ১০ আগস্ট হাতে থাকা ৬৭ লাখ ৩ হাজার ৫৪০ শেয়ারের মধ্যে ৩৭ লাখ ৩ হাজার ৫৪০ শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দেয়। এর আগে গত বছরের আগস্টে ব্যাংকটির মালিকানার পুরো অংশই বিক্রি করে দিয়েছে বাহরাইন ইসলামী ব্যাংক। সে সময়ে মালিকানার উল্লেখযোগ্য অংশ বিক্রি করে দুবাই ইসলামী ব্যাংকও। একই সময়ে শেয়ার বিক্রির আগ্রহ দেখিয়েছিল কুয়েতের তিন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তাও। তবে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদন না পাওয়ায় তারা শেয়ার বিক্রি করতে পারেনি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, গত ১০ আগস্ট দুবাই ইসলামী ব্যাংক তাদের প্রায় ৫৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দেয়। ২০ আগস্টের মধ্যে ঘোষণা দেয়া শেয়ার বিক্রি করে দেয়। এর আগে ২০১৪ সালের জুন ও অক্টোবরে দুই কিস্তিতে বাহরাইন ইসলামী ব্যাংক তাদের হাতে থাকা মোট ৪ লাখ ৬৫ হাজার ৮৪৪টি শেয়ার বিক্রি করে। অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকে তাদের আর কোন শেয়ার রইল না। দুবাই ইসলামী ব্যাংক গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ঘোষণা দিয়ে দুই কিস্তিতে ৭০ লাখ শেয়ার বিক্রি করে।

অবশ্য বিদেশী উদ্যোক্তাদের শেয়ার বিক্রির বিপরীতে দেশী উদ্যোক্তারা শেয়ার কেনার ঘোষণা দিয়েছেন। এ বছরের জুলাইয়ে ব্যাংকটির উদ্যোক্তা প্রকৌশলী মুস্তাফা আনোয়ার ৩ লাখ ৮০ হাজার শেয়ার কেনার ঘোষণা দেন। একই মাসে ব্যাংকটির উদ্যোক্তা প্রকৌশলী মুহাম্মদ দাউদ খানও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৮০ হাজার শেয়ার কিনেছেন। তবে বিদেশী উদ্যোক্তাদের শেয়ার বিক্রির তুলনায় এই শেয়ার কেনার সংখ্যা নগণ্য।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কেন্দ্র করে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণজাগরণ মঞ্চসহ নানা স্থান থেকে ইসলামী ব্যাংক সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের প্রচার শুরু হয়। ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় এ সময় হামলাও হয়। এছাড়া জঙ্গী অর্থায়নের অভিযোগে উঠলে কিছুটা ভাবমূর্তি সঙ্কটে পড়ে ব্যাংকটি। পাশাপাশি আনন্দ শিপইয়ার্ডসহ চট্টগ্রামভিত্তিক কয়েকটি গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারিও ব্যাংকটি সম্পর্কে বিদেশী উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

একই সঙ্গে চলতি বছরের আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ব্যাংকটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে নথি সংগ্রহ করেছে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)। এ নিয়ে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্কও তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে অনেকটাই আস্থার সঙ্কটে ভুগছে ব্যাংকটি। যার প্রভাব পড়ে কোম্পানিটির শেয়ার দরেও। চলতি বছরের মে মাসে ব্যাংকটির প্রতিটি শেয়ারের দর নেমে যায় মাত্র ১৬ টাকায়। যেমনটি আগে কখনও ঘটেনি। আগে সব সময় একটি স্থিতিশীল কোম্পানি হিসেবে বিনিয়োগকারীদের চাহিদার শীর্ষে ছিল ব্যাংকটি। এর আগে ২০১৩ সালের কাদের মোল্লার মানবতাবিরোধী অপরাধে রায় ঘোষণার আগে কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দর ছিল ৩৮ টাকা। আস্তে আস্তে শেয়ারটি কিছুটা আগ্রহ হারাতে থাকে।

জানা গেছে, গত বছরে বিদেশী উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি ব্যাংকটিতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তারাও। এর মধ্যে বড় উদ্যোক্তা ইবনে সিনা ট্রাস্ট তাদের হাতে থাকা ১০ লাখ শেয়ার গত বছর বিক্রি করে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির হাতে ইসলামী ব্যাংকের ৩ কোটি ৩২ লাখ ৯৭ হাজার ৬২৯টি শেয়ার রয়েছে। এছাড়া শেয়ার ছেড়ে দিচ্ছে ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যুরো। প্রতিষ্ঠানটি তিনবার ঘোষণা দিয়ে এরই মধ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার শেয়ার বিক্রি করেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির হাতে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার রয়েছে ১৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩৪৪টি। এছাড়া বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার ৩ লাখ ৪০ হাজার ৫০০টি শেয়ার বিক্রি করেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির হাতে আরও ৩৫ লাখ ৫০ হাজার শেয়ার রয়েছে।

জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় অনিয়মের ঘটনা আনন্দ শিপইয়ার্ডকে দেয়া ৫৪৬ কোটি টাকার ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংক আনন্দ শিপইয়ার্ডকে দেয়া ইসলামী ব্যাংকের ৫৩৬ কোটি টাকা ঋণ মন্দ বা ক্ষতিকর ধরে নিয়ে তিন বছরে সঞ্চিতি সংরক্ষণের সুযোগ দেয়। এ হিসাবে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ১৭৮ কোটি ৬৪ লাখ, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে একই অঙ্কের অর্থ সঞ্চিতি সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয়; এরই মধ্যে যা বাস্তবায়ন হয়েছে। ফলে কোম্পানিটির আগের তুলনায় মুনাফা বেড়েছে। তারপরেও ব্যাংকটি ছেড়ে যাচ্ছে দুবাই ইসলামী ব্যাংক।

২০১৪ সালের হিসাবে ব্যাংকটিতে বিদেশী শেয়ার ৬৬ দশমিক ৩৮ ও দেশী ৩৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। বিদেশী শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক থেকে বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছে দুবাই ইসলামিক ব্যাংক (ডিআইবি)। ১৯৮৩ সালে ১৩ মার্চ দেশী-বিদেশী যৌথ মালিকানায় ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠালগ্নে এর উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হয়েছিল ডিআইবি। ইসলামী ব্যাংকে বিদেশী উদ্যোক্তারা হলেনÑ ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, কুয়েত ফিন্যান্স হাউস, জর্দান ইসলামী ব্যাংক, ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট এ্যান্ড কর্পোরেশন দোহা, বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংক, ইসলামিক ব্যাংকিং সিস্টেম ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং লুক্সেমবার্গ, আল-রাজি কোম্পানি ফর কারেন্সি এক্সচেঞ্জ এ্যান্ড কমার্স, রিয়াদ, শেখ আহমেদ সালেহ জামজুম, শেহ ফুয়াদ আবদুল হামিদ আল-খতিব, দুবাই ইসলামিক ব্যাংক, দ্য পাবলিক ইনস্টিটিউট ফর সোস্যাল সিকিউরিটি কুয়েত ও মিনিস্ট্রি অব জাস্টিস কুয়েত।