২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হিযবুতের ভিডিও কনফারেন্সের ডাক!

  • লিফলেট, জিহাদী বইসহ দুজন গ্রেফতার

স্টাফ রিপোর্টার ॥ আগামী ৪ সেপ্টেম্বর সারাদেশে ভিডিও কনফারেন্সের ডাক দিয়েছে নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন হিযবুত তাহরীর। এমন ঘোষণায় নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভিডিও কনফারেন্সের ঘোষণার মধ্য দিয়ে জঙ্গী সংগঠনটির সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকার বিষয়টি অনেকটা প্রকাশ্যে চলে এসেছে। এটিকে সংগঠনের তরফ থেকে ডিজিটাল ডিভিও কনফারেন্স নাম দেয়া হয়েছে। এজন্য নিজস্ব প্যানেল গঠন করেছে সংগঠনটি। ইসলামী রাষ্ট্র গঠন ও এ সংক্রান্ত প্রশ্নকর্তাদের অনলাইনে করা প্রশ্নের জবান দেবেন প্যানেলের সদস্যরা। এ সংক্রান্ত প্রচারণা চালানোর সময় ২ সদস্যকে রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী লিফলেট, জিহাদী বই ও নিজস্ব ম্যাগাজিনসহ গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে কারাবন্দী শীর্ষ নেতাসহ ভুল তথ্য দিয়ে জামিনে থাকা জঙ্গী সংগঠনটির ১০ পর্যায়ের নেতা।

রবিবার বিকেলে রাজধানীর দক্ষিণখান থানাধীন আইনুসবাগ শাহী মসজিদের সামনে থেকে আলতামাস আহম্মেদ বাবু (৩২) ও সৈয়দ জানে আলম রুবেল (৩০) নামে দুই জনকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। তিনজন মসজিদের সামনে লিফলেট বিতরণ করছিল। অপরজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। গ্রেফতারকৃত ২ জনের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ জিহাদী বই, রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী সেøাগান সংবলিত লিফলেট, সংগঠনের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রকাশিত ম্যাগাজিন উদ্ধার হয়।

সোমবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির উত্তর বিভাগের উপকমিশনার শেখ নাজমুল আলম জানান, গ্রেফতারকৃতরা দক্ষিণখান থানা এলাকায় বসবাস করত। তারা লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে ছাত্র-শিক্ষক, পেশাজীবী, চাকরিজীবী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র ও সরকার সম্পর্কে বিভ্রান্তি প্রচার করে আসছিল। এছাড়া তারা সরকারকে উৎখাত বা ক্ষমতাচ্যুত করে খিলাফত রাষ্ট্র (ইসলামী রাষ্ট্র) গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছিল। এজন্য তারা উস্কানিমূলক প্রচার চালাচ্ছিল।

আগামী ৪ সেপ্টেম্বর হিযবুত তাহরীর অনলাইনে ডিজিটাল ভিডিও কনফারেন্সের ডাক দিয়েছে। কনফারেন্স সংক্রান্ত প্রচারণা চালাচ্ছিল গ্রেফতারকৃতরা। ভিডিও কনফারেন্সের জন্য নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠনটি একটি প্যানেল গঠন করেছে। অনলাইনে প্রশ্ন করলে বা পাঠালে সে সব প্রশ্নের উত্তর দেবে প্যানেলে থাকা সদস্যরা।

ডিবির উত্তর বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাহফুজুল ইসলাম জনকণ্ঠকে জানান, গ্রেফতারকৃতরা মূলত ব্যবসায়ী। তারা নিজেরা ব্যবসা করে নিয়মিত সংগঠনকে চাঁদা দিচ্ছে। চাঁদা দেয়ার পাশাপাশি তারা নিজেরাও মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। লিফলেট বিতরণ, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, ভিডিও কনফারেন্সের বিষয়ে প্রচার চালানো থেকে শুরু করে নানা কাজে জড়িত। তারা প্রশিক্ষিত। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখেও তারা তেমন কোন তথ্য দিচ্ছে না। সংবাদ সম্মেলনে ডিবির পূর্ব বিভাগের উপকমিশনার মাহবুবুর রহমান, ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম, দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার মাশরুকুর রহমান খালেদ উপস্থিত ছিলেন।

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃতরা গ্রোসারী শপের মালিক। তারা দোকান মালিক হলেও প্রযুক্তিতে পারদর্শী। সম্প্রতি বেশকিছু হিযবুত তাহরীর সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। গ্রেফতারের পর তারা জামিনে ছাড়া পেয়ে যায়। ছাড়া পাওয়াদের সবাই আবার দলে ফিরে কার্যক্রম চালাচ্ছে। তাদের ভিডিও কনফারেন্সের ডাক দেয়ার বিষয়টি যথেষ্ট আতঙ্কের কারণ। ধারণা করা হচ্ছে, তারা সাংগঠনিকভাবে সারাদেশেই শক্ত অবস্থানে রয়েছে। শক্ত অবস্থানের কারণেই তারা সারাদেশে ভিডিও কনফারেন্সের ডাক দেয়ার ঘোষণা দিতে পারে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, বিশ্বের ৫৩টি দেশে সংগঠনটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তানে ২০০৮ সালে এবং বাংলাদেশে ২০০৯ সালে সংগঠনটি নিষিদ্ধ হয়। বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হওয়ার পরও জঙ্গী সংগঠনটির কার্যক্রম থেমে নেই। নিষিদ্ধ হওয়ার পর সংগঠনটির ৩ শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়। এর মধ্যে সংগঠনটির প্রধান সমন্বয়কারী ও মুখপাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর শিক্ষক অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিন আহমেদ, যুগ্ম সমন্বয়কারী কাজী মোরশেদুল হক, সিনিয়র উপদেষ্টা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সৈয়দ গোলাম মাওলাসহ শীর্ষ পর্যায়ের ১০ নেতাও রয়েছেন। নেতাকর্মীদের অধিকাংশই এখন জামিনে।

কারামুক্তদের মধ্যে নেতা পর্যায়ের মোহাম্মদ মহসীন, মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান, আবুল কাশেম, ওমর ফারুক, শফিকুল ইসলাম, আব্দুল মান্নান, উচ্চ পর্যায়ের বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মোহাম্মদ রিদোয়ান, মোহাম্মদ রাজিব, নাজমুল হক ও আব্দুল্লাহ আল মাসুদ। কারামুক্ত হওয়ার পর থেকেই তারা ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে। বিশেষ করে এই দশ নেতা প্রযুক্তির কল্যাণে এবং আদালতে যাতায়াতের সময় সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে নির্দেশনা পাচ্ছে। সেই নির্দেশনা মোতাবেক সংগঠনটি কাজ করছে। তাদের হন্যে হয়ে খুঁজছে গোয়েন্দারা। এরা বেনামে জামিন নিয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, কারামুক্তদের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেলের ছেলে ইংরেজী মাধ্যমের ছাত্র রিসাদ কামাল খানের যোগাযোগ রয়েছে। রিসাদ তার বন্ধু ফয়সালসহ ইতোপূর্বে হিযবুত তাহরীরের পোস্টার লাগানোর সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী পোস্টার ও লিফলেটসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিল। ফয়সাল ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা পাশ।

প্রসঙ্গত, জঙ্গী সংগঠনটির বিরুদ্ধে ইহুদী দেখামাত্র হত্যার ঘোষণা, তেলআবিবে এক মদের দোকানে বোমা হামলা চালিয়ে ৩ জনকে হত্যা, উজবেকিস্তানের মার্কিন ও ইসরায়েলী দূতাবাসে আত্মঘাতী বোমা হামলা, তাজিকিস্তানের তাসখন্দ এলাকায় বোমা মেরে ৪৭ জনকে হত্যা ছাড়াও আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন আল কায়েদা ও তালেবানদের বৈশ্বিক জিহাদের জন্য কর্মী সংগ্রহে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।