২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারে বড় দরপতন

  • এশিয়ার অবস্থা টালমাটাল ॥ সোমবার দিনটিকে ‘ব্লাক মানডে’ হিসেবে অভিহিত

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন চলছে। গত কয়েক দিনে চলমান পতনের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক দেশ চীনের শেয়ারবাজারে গত জুলাই মাস থেকে প্রায় ধারাবাহিকভাবে পতন চলছে। দেশটির সরকার শেয়ারবাজারকে চাঙ্গা করতে নানা উদ্যোগ নিলেও সেগুলো কোন কাজে আসেনি। বরং পতনের মাত্রা বেড়েই চলছে। চীনের পতনের প্রভাব পড়ছে বিশ্বের অন্যান্য দেশের শেয়ারবাজারেও।

সোমবার চীন, জাপান ও ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব শেয়ারবাজারে সূচকের লাগামছাড়া পতনের প্রেক্ষিতে দিনটিকে ‘ব্লাক মানডে’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। দরপতনে রেকর্ড করেছে চীনের সাংহাই স্টক মার্কেট। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে দরপতন ত্বরান্বিত হলেও সোমবার মাথায় হাত পড়েছে সেখানকার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বছরের সব অর্জন ধুয়ে নিয়ে গেছে সাম্প্রতিক এ ধস। প্যান চোঙ নামে এক বিনিয়োগকারী দরপতনের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, মনে হচ্ছে, পৃথিবীর শেষ সময় চলে এসেছে। চলতি বছর এপ্রিলে ৫০ হাজার ইউয়ান (৭,৯০০ ডলার বা ৬ লাখ ৮ হাজার টাকা) বিনিয়োগ করেছিলাম। চল্লিশ শতাংশ লাভও পেয়েছিলাম। কিন্তু তারপরই সব যেন ধুয়ে গেল।

বিবিসি, ইকোনমিক টাইমস, ব্লুমবার্গের খবরে দেখা যায়, সোমবার চীনের শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার পর দেশটির প্রধান সূচক সাংহাই কম্পোজিট সূচকের পতন হয়েছে ৮.৫ শতাংশ। ফলে সূচক নেমে এসেছে ৩২০৯.৯১ পয়েন্টে। হংকং স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক হ্যান চেন সূচক কমেছে ৫.৮ শতাংশ। এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম শেয়ারবাজার জাপানের নিক্কি ৫২৫ সূচকের পতন হয়েছে ৪.৬১ শতাংশ বা ৮৯৫ পয়েন্ট। প্রতিবেশী দেশ ভারতের বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক সেনসেক্সের পতন হয়েছে ১৬০০ পয়েন্টেরও বেশি। গত ৭ বছরের মধ্যে এটি সেনসেক্সের সর্বাচ্চ পতন। এর আগে ২০০৮ সালের ২২ জানুয়ারি একদিনে ২২০০ পয়েন্টেরও বেশি পতন হয়েছিল। সূচক পতনের দিক থেকে এটি চতুর্থ সর্বোচ্চ। এছাড়া দেশটির মুদ্রা রুপীর মান ডলারের বিপরীতে ৬৬.৪৯ তে নেমে এসেছে। গত দুই বছরের মধ্যে এটি রুপীর সর্বনিম্ন দর।

ভারতের পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেনসেক্স সূচক ১৬৫০ পয়েন্ট পড়ে যায়। নিফটি সূচকও নেমে যায় ২৭৫ পয়েন্ট। ভারতের শেয়ার বাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এ ধসে একদিনে বিনিয়োগকারীদের লোকসান দিতে হলো সাত লাখ কোটি রুপী।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনা বাজারে সঙ্কটের জেরেই ভারতের পুঁজিবাজারে এত বড় ধস। তবে বিনিয়োগকারীদের অভয় দিয়েছেন দেশটির রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গবর্নর রঘুরাম রাজন। তিনি বলেছেন, অন্যান্য অর্থনীতির তুলনায় ভারতের অর্থনীতি অনেক বেশি স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। আমি বাজারকে আশ্বস্ত করে বলছি, আমাদের মাইক্রো ফিনান্সিং ফ্যাক্টরগুলিও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। সোমবার ভারতের সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, গত কয়েক বছরের নিরিখে সোমবার সবচেয়ে বড় ধসের সাক্ষী হলো শেয়ারবাজার। সকালে বাজার খুলতেই সেনসেক্স ও নিফটির পতন ঘটে প্রায় ৪ শতাংশ। শেয়ারবাজারে প্রবল ধসের প্রভাব পড়ে ভারতীয় মুদ্রার উপরেও। ১ শতাশ পড়ে যায় রুপীর দাম। এক মার্কিন ডলারের দাম দাঁড়ায় ৬৬.৫০ রুপী। গত দু বছরে কখনও এতটা কমেনি রুপীর দাম।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাংহাই স্টক মার্কেটের প্রভাবেই সেনসেক্স ও নিক্কেইয়ে মন্দা হাওয়া লেগেছে। দিনটিকে তারা এশিয়ার ‘কালো সোমবার’ বলে অভিহিত করছেন।

চীনের শেয়ারবাজারের পতনের প্রভাব পড়েছে ইউরোপের শেয়ারবাজারেও। সোমবার লেনদেন শুরুর পর দিনের শুরুতে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক এফটিএসই ১০০ সূচকের পতন হয়েছে ২.৬ শতাংশ। এছাড়া ফান্স ও জার্মানীর প্রধান বাজারসমূহের সূচক কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ হারে। রবিবার লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের এফটিএসই ১০০ সূচক ১৮০.২৪ পয়েন্ট বা ২.৮৩ শতাংশ, এফটিএসই ২৫০ সূচক ৩৬২২ পয়েন্ট বা ২.১০ শতাংশ পতন হয়েছে। ফ্রান্সের শেয়ারবাজারের সূচক কমেছিল ৩.১৯ শতাংশ। এশিয়ার মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহের শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের পতন ঘটেছে। রবিবার দুবাই শেয়ারবাজার ও সৌদি শেয়ারবাজারে সূচকের পতন হয়েছে ৭ শতাংশ হারে। তেলের দর কমে যাওয়ার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে শেয়ারবাজারে পতন হচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনেতিক দেশ আমেরিকার শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের দর পতন হয়েছে। শুক্রবার সপ্তাহের শেষ লেনদেন দিবসে এস এ্যান্ড পি ৫০০ সূচকের পতন হয়েছে ৩.২ শতাংশ। ডাউ জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল সূচকের পতন হয়েছে ৫৩৯ পয়েন্ট বা ৩.১১ শতাংশ। নাসডাক সূচক কমেছে ৩.৫ শতাংশ। এক সপ্তাহের ব্যবধানে সূচকের পতন হয়েছে ৭ শতাংশেরও বেশি।

চীনের শিল্প খাতে উৎপাদন কমে হওয়া ও অপরিশোধিত তেলের দর কমে যাওয়াকে বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজার পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে বলছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক দেশ চীনের শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারে বিক্রয় চাপ বেড়ে গেছে। দেশটির শিল্প উৎপাদন সূচক ৪৭.৮ থেকে ৪৭.১ এ নেমে এসেছে। চীনের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে তেলের দরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। গত এক সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের দর ৪.৮ শতাংশ পড়ে গেছে। গত ২৯ বছরের মধ্যে এক সপ্তাহে তেলের দরের এতবড় পতন আর হয়নি।

এছাড়া মজুরি না বাড়া, ডলার শক্তিশালী হয়ে উঠা, বিশ্বব্যাপী পণ্যের দর কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট না হওয়ায় বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারে পতন ঘটছে বলে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন। যুক্তরাজ্য ভিত্তিক ফাইন্যান্সিয়াল ডেরিভেটিভস ডিলার সিএমসি মার্কেটস এর বিশ্লেষক নিকালাস টিও বলেন, চীন এখন শুধু একটি দেশই নয় এটি বিশ্বের জন্য একটি ‘কারখানা’। এটি বিশ্বের পণ্য ও সেবার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক।

বিশ্বের অনেক দেশের কোম্পানি ও শিল্পকারখানা চীনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এখন দেশটি ক্রয়ক্ষমতার দিক থেকে কিছুটা অসুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। এ দেশটিতে যদি মন্দ কিছু ঘটে বিশ্বে তার প্রভাব পড়বে বলেও মন্তব্য করেন এই বিশ্লেষক। তবে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এএমপি ক্যাপিটালসের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা শেইন অলিভার বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারে মূল্য সংশোধন হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন।

নির্বাচিত সংবাদ