২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জাওয়েদ করিম তারুণ্যের আকাশে ধূমকেতু

  • পান্থ আফজাল

জাওয়েদ করিম। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত। ২০০৫ সালে সাদ হারলি ও স্টিভ চেনের সঙ্গে মিলে জনপ্রিয় ভিডিও বিনিময় ওয়েবসাইট ইউটিউব তৈরি করেন। বিশ্বের তরুণসমাজে অনুপ্রেরণীয় তারকাদের তালিকায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। বর্তমানে ভিডিও আপলোড ও প্লের জন্য বিশ্বের সেরা সাইটে পরিণত হয়েছে ইউটিউব। ইউটিউব ছাড়াও পোর্টেবল ত্রিমাত্রিক গ্রাফিক্স, সলভিং ড্যাড পাজল, থ্রিডি স্প্রিং সিমিউলেশন, রোবটিক ওয়েবক্যাম, রেডিওসিটি ইনজিন, রে-ট্রেসার, লাইফ থ্রিডি, কোয়াক ২ মডেল ভিউয়ারসহ বেশকিছু প্রজেক্টের উদ্ভাবকও তিনি। তিনি ২০০৭ সালের ১৩ মে ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেয়ার বিরল সম্মান অর্জন করেন। জাওয়েদ করিমের বাবা নাইমুল করিম হলেন একজন বাংলাদেশী বিজ্ঞানী এবং তার মা ক্রিস্টিন করিম, যিনি একজন জার্মান বিজ্ঞানী ও গবেষক।

বাংলাদেশী গবেষকের পুত্র জাওয়েদ করিম ছোটবেলা থেকে আবিষ্কারের নেশায় মত্ত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কোটি কোটি গ্রাহক ইউটিউবে লগইন করে বৃহত্তম এই ভিডিও আপলোডিং সাইটে যান। ছোটবেলা থেকেই সৃজনশীল ছিলেন তিনি। জাওয়েদ করিমের জন্ম ১৯৭৯ সালে জার্মানিতে, তার বেড়ে ওঠাও জার্মানিতে। ১৯৯২ সালে তার বাবা সপরিবারে আমেরিকা পাড়ি দেন। তার পড়ালেখার শুরুও ওখানেই। তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানে ভর্তি হন। কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক নিয়েছিলেন ২০০৫ সালে।

আজকের এই ধূমকেতুরূপী তরুণ জাভেদের সাফল্যের গল্প কিন্তু ফিল্মের মতো চমকপ্রদ। ২০০৪ সাল। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ছেন জাওয়েদ করিম। ছাত্রাবস্থায়ই যোগ দিলেন অনলাইন ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান পেপালে। চাকরিটা একবারে মন্দ ছিল না। তবু লেখাপড়ার ফাঁকে শুরু করা চাকরিটা উদ্ভাবনী মনের তৃষ্ণা কিছুতেই মেটাতে পারছিল না। খুঁজছিলেন বিকল্প পথ। কিভাবে নতুন কিছু করা যায়।

পেপালে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী চাঁদ হার্লি এবং স্টিভ চেনের সঙ্গেও মাঝে মাঝে শেয়ার করতেন তার মনের কথা। স্টিভও কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র আর হার্লি পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাইন বিভাগে পড়াশোনা করছেন। হার্লি আর স্টিভও চাচ্ছেন নতুন কিছু করতে। সবার মনেই একই ভাবনা। ঠেকায় কে! সবাই ভাবতে লাগলেন কি করা যায়। পারস্পরিক যোগাযোগের অভাবে কিছুদিন ভাটা পড়ে তাদের পরিকল্পনায়।

বছর গড়িয়ে যায়। পরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দিতে এবার নড়ে চড়ে বসেন। সিদ্ধান্ত নেন একসঙ্গে আলোচনায় বসার। আলোচনার সুবিধার্থে সানফ্রান্সিস্কোতে স্টিভ চেনের বাসায় নৈশভোজের দাওয়াত পড়ল সবার। সেখানেই সিদ্ধান্ত হলো ইউটিউব সাইটটি তৈরি করার। অনলাইনে প্রচুর সাইট থাকলেও ভিডিও শেয়ার করার মতো কোন উল্লেখযোগ্য সাইট নেই। এজন্য ভিডিও শেয়ারিং সাইটের সম্ভাবনা যাচাই করে একটি ভিডিও শেয়ারিং সাইট বানানোর সিদ্ধান্ত হলো।

২০০৫ সাল। ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখে ইউটিউব ডটকম নামে ডোমেইন নিবন্ধন করে ফেলা হলো। ডোমেইন নাম নিবন্ধনের পর তিন তরুণ প্রকৌশলী হাত লাগালেন সাইট ডিজাইনের কাজে। কয়েক মাসের চেষ্টায় দাঁড় করে ফেললেন সুন্দর একটি সাইট।

সাইট ডোমেইন নিবন্ধন এবং ডিজাইন শেষ হলেও এবার মূল কাজ বাকি। একই বছরের ২৩ এপ্রিলে ‘মি এট জু’ নামক প্রথম ভিডিও আপলোড করেন জাওয়েদ করিম নিজে। ভিডিওতে সান দিয়াগো পার্কে হাতিশালার দাঁড়ানো তার নিজের এ ভিডিওটি আপলোড করে শুরু করলেন ভিডিও শেয়ারিং। ঠিকানার ওয়েবসাইটে এখনও মিলবে ১৮ সেকেন্ডের ভিডিওটি। মে মাসে সাইটটির পরীক্ষামূলক সংস্করণ উন্মুক্ত করলেন তারা। পরীক্ষামূলক সংস্করণে ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়াও পেলেন।

দ্রুত বাড়তে থাকল ইউটিউব ব্যবহারকারীর সংখ্যা। ২০০৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার বিনিয়োগ করল স্কুইয়া ক্যাপিটাল। জুলাইয়ে প্রতিদিন সাইটটিতে ৬৫ হাজার ভিডিও আপলোড ঘোষণা দিল প্রতিষ্ঠানটি।

একই বছরের অক্টোবরে ঘটল ইউটিউবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ১৬৫ কোটি ডলারে ইউটিউব সাইটটি কিনে নেয়ার ঘোষণা দিল সার্চ ইঞ্জিন জায়ান্ট গুগল ইনকর্পোরেশন। ইউটিউব ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি চূড়ান্তভাবে শেষ হলো একই বছরের নবেম্বরের ১৩ তারিখে। ইউটিউবের ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের শেয়ার পেলেন জাওয়েদ।

২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই ৬ শ’ কোটি ভিডিও দেখেছেন ব্যবহারকারীরা। অ্যালেক্সা র‌্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভিজিট হওয়া ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে ইউটিউব রয়েছে ৩য় স্থানে।

মজার ব্যাপার হলো, জাওয়েদ ২০০৭ সালের ১৩ মে ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেয়ার বিরল সম্মান অর্জন করেন। তরুণপ্রজন্মকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘অনেকে খেয়াল করেছ, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ডিগ্রী প্রদান অনুষ্ঠানে যেসব বক্তা আসেন, তাদের মধ্যে আমি সর্বকনিষ্ঠ। এর ভালো-মন্দ দুটো দিকই আছে। খারাপ দিক হলো, বয়সের কারণে আমি তোমাদের জীবন সম্পর্কে গভীর কোনো দর্শনের ধারণা দিতে পারব না। না পারার কারণ হিসেবে বলা যায়, আমি নিজেই সেই ধারণা খুঁজে বেড়াচ্ছি। ভাল দিক হলো তোমরা এবং আমি বয়সে একই প্রজন্মের। তার মানে দাঁড়ায়, আমি যে সুযোগ পেয়েছি, যা শিখতে পেরেছি, তা এখনও প্রয়োগ করার সুযোগ আছে। তিন বছর আগে আমি যে সুযোগ পেয়েছি, যেসব ধারণা প্রয়োগ করেছি, তা তোমরা এখনও একইভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ ও সময় পাবে। এই উদ্যমের কারণেই প্রতিষ্ঠার ১৮ মাসের মধ্যেই আমাদের ওয়েবসাইট নিয়ে আমরা আলোচিত হই। সাধারণ মানুষের কাছে আমরা খবরের শিরোনাম হই। তাদের অনেকের জিজ্ঞাসা ছিল, এ ধরনের আইডিয়া আমরা কোথা থেকে পেলাম। আমি তাদের সব সময় একটাই কথা বলি, চারদিকে সব সময়ই তরুণ মেধাবী মানুষ থাকে, খুঁজে বের করতে হয় তাদের। তোমরা যখন এই হল থেকে বের হয়ে যাবে, তখন একটা কথাই মনে রাখবে। পৃথিবী তোমার জন্য অপেক্ষা করছে নতুন কোন বড় উদ্যোগ সুযোগ সৃষ্টির জন্য। তাই ঝুঁকি নাও, সফল হও।’

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ইউটিউবে প্রতিদিন ৩ মিলিয়ন অর্থাৎ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক লোক বিভিন্ন ভিডিও দেখে থাকেন। প্রতি মিনিটে এ সাইটে ৩৫ ঘণ্টার ভিডিও আপলোড হয়। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য মতে এটি ৪৮ ঘণ্টায় গিয়ে পৌঁছেছে। ফলে ৬ মাসে ভিডিও আপলোডের পরিমাণ বেড়েছে ৩৭ শতাংশ। বর্তমানে পৃথিবীর ২২টি ভাষায় ইউটিউব ব্যবহার করা যায়।