১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বপ্নের পথচলা

  • তৌফিক অপু

ছোটবেলা থেকে বড়দের বিভিন্ন উপদেশ পেয়ে বড় হয়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। আর এ উপদেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হলোÑ মিথ্যা বল না, ভাল কাজ কর, সৎপথে চল ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু ক’জন যে এসব উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে বড় হয়েছে সে হিসেব করা হয়ত মুশকিল, কিন্তু এ কথা দৃঢ়ভাবে বলা যায় যে, সঠিক ফ্রেমে থেকে জীবন সাজালে অবশ্যই মানুষের মতো মানুষ হওয়া সম্ভব। স্কাউটিং বুঝি তেমনই এক ফ্রেম। আর কিছু কিছু মানুষ আছেন যারা জীবনের পুরোটা সময় এই ফ্রেমে আটকেই পার করে দিয়েছেন। আফজাল হোসেন তেমনই এক ব্যক্তি। যিনি জীবনের পুরোটা সময় ব্যয় করেছেন মানুষের কল্যাণে এই স্কাউটিং এর মাধ্যমে। ধ্যানে জ্ঞানে এবং কর্মে স্কাউটিং প্রাধান্য পেয়েছে সব সময়। স্কাউটিংয়ের তিনটি স্তরেই (কাব স্কাউট, বয় স্কাউড ও রোভার স্কাউট) ছিল তার সমান বিচরণ। ১৯৫৭ সাল থেকে লালবাগ ফ্রেন্ডস সেন্টারে কাব স্কাউট হিসেবে যাত্রা শুরু করেন কীর্তিমান এই স্কাউটার। স্কাউট লিডার শহীদ ভাইয়ের হাত ধরে পথ চলা শুরু। এর পরপরই ১৯৫৮-৫৯ সালে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় পাকিস্তান জাম্বুরিতে কাব হিসেবে অংশ নেন। এরপর বয়েজ স্কাউট হিসেবে ১৯৬৭ সালে চতুর্থ এবং রোভার স্কাউট হিসেবে ১৯৬৯-৭০ সালে পঞ্চম পাকিস্তান জাম্বুরিতে অংশ নেন।

স্কাউট জীবনে বড় একটি মাইল ফলক অতিক্রম করার সুযোগ মিলে যায় ১৯৬৩ সালে গ্রীসে অনুষ্ঠিত ১১তম ওয়ার্ল্ড জাম্বুরিতে অংশ নেয়ার মধ্যে দিয়ে। সে সময় গ্রীসে যাওয়ার দলটি নেতৃত্ব দেন আরমানিটোল গব. স্কুলের প্রধান শিক্ষক শামসুল আলম স্যার। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে সে সময় দলে অংশ নিতে পারেননি। তবে সেই সাধ পূর্ণ হয় ১৯৮৩ সালে কানাডাতে অনুষ্ঠিত ১৫তম ওয়ার্ল্ড জাম্বুরিতে। তবে দুঃখ অবশ্য একটি জায়গায় থেকে যায়। কারণ কানাডা কোন স্কাউট হিসেবে নয় বরং স্কাউট লিডার হিসেবে দলের নেতৃত্ব দেন তিনি। অনেক সাধ ছিল স্কাউট হিসেবে অংশ নেয়ার, সে সাধ অপূর্ণই থেকে যায়। কারণ স্কাউট হিসেবে কোন সফরে যাওয়া বেশ রোমাঞ্চকর। আর লিডার হিসেবে গেলে অনেক দায়িত্ব মাথায় নিয়ে যেতে হয়। তারপরেও দুধের সাধ ঘোলে মেটান কানাডা সফরের মাধ্যমে। এছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ইরান, ইংল্যান্ড এবং জাপানের নিজস্ব জাম্বুরিতে বহুবার অংশ নিয়েছেন তিনি। এছাড়া বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সব জাম্বুরিতে অর্গানাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এবারে ২৩তম ওয়ার্ল্ড জাম্বুরি অনুষ্ঠিত হয়েছে জাপানে। এ পর্বেও বাংলাদেশ থেকে চার শ’ জনের ওপরে একটি দল প্রতিনিধিত্ব করেছে। আর এ দলেরও উপদেষ্টা হিসেবে সঙ্গে রয়েছেন কৃতী এই স্কাউট ব্যক্তিত্ব। আর সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ড. নিজাম।

সারা পৃথিবীতে ভাতৃত্ব বন্ধন জোরদার করতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে স্কাউট। এ প্রতিষ্ঠানটি পৃথিবীতে জনপ্রিয় এবং সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। স্কাউটের তিনটি স্তরেই রয়েছে মিলনমেলা। যেমন কাব স্কাউটদের ক্যাম্পপুরী, বয় স্কাউটদের জাম্বুরি এবং রোভার স্কাউটদের মুট। এই তিনটি শাখাতেই তার যেমন বিচরণ ছিল দাপটের সঙ্গে ঠিক তেমনি কর্মকর্তা হিসেবেও তার জুড়ি মেলা ভার।

স্কাউট জীবনে সবচেয়ে স্মরণীয় সময়টি হচ্ছে ১৯৬১ সালে। ওই বছর স্কাউটের জন্মদাতা ব্যাডেন পাওয়েলের স্ত্রী লেডি ব্যাডেন পাওয়েল আসেন বাংলাদেশে। এবং সেন্ট গ্রেগরী স্কুলে ভিজিটে যান। ঢাকা শহর থেকে বাছাই করা সেরা স্কাউটারদের দিয়ে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়। সেখানে অভ্যর্থনা জানাতে তিনিও সেই সারিতে সামিল ছিলেন। যা স্মৃতিতে আজও অম্লান হয়ে আছে তার।

এভাবেই জীবনের প্রতিটি স্তরের স্কাউটিং ছাড়া অন্য কোন কিছুই যেন তার মাথায় ঢোকেনি। কোন প্রাপ্তির হিসেব কষে নয়, মনের টান এবং ভালবাসার তাগিদ থেকেই স্কাউটিং করে গেছেন। আর জীবনের বাকি সময়টুকুও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে চান। আগামী ২০১৯-২০ সালে আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ২৪তম ওয়ার্ল্ড জাম্বুরিতে যাওয়ার বাসনা এখনও রয়েছে মনের কোণে।

এই বর্ণোজ্জ্বল ক্যারিয়ারে প্রাপ্তি কিংবা হারানোর হিসেবের চেয়ে গর্ববোধটাই যেন মুখ্য। কারণ জাপানে অনুষ্ঠিত ২৩তম ওয়ার্ল্ড জাম্বুরিতে যাওয়া সুবাদে এই নিয়ে ৯টি ওয়ার্ল্ড জাম্বুরিতে অংশ নেয়া হয়েছে। যা বাংলাদেশ তো বটেই অন্য কোন দেশের স্কাউট ব্যক্তির কপালে জুটেছে কিনা হিসেব করে দেখার বিষয়। কারণ একেকটি জাম্বুরি চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়। সেদিক থেকে টানা নয় বার অংশ নেয়া সত্যিকার অর্থেই প্রশংসার দাবিদার। সেই ১৯৮৩ সালে কানাডা, ৮৭-৮৮ সেশনে অস্ট্রেলিয়া, ১৯৯১ সালে কোরিয়া, ১৯৯৫ সালে হল্যান্ড, ১৯৯৯ সালে চিলি, ২০০৩ সালে থাইল্যান্ড, ২০০৭ সালে লন্ডন, ২০১১ সালে সুইডেন এবং সর্বশেষ ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিতব্য জাপান ওয়ার্ল্ড জাম্বুরিতে অংশ নিয়ে দেশের জন্য এক বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তিনি। সবার কপালে এমন সৌভাগ্য হয় না। হয়ত খোঁজখবর নিলে দেখা যাবে সারা বিশ্বে তিনিই একজন যিনি কিনা নয়বার ওয়ার্ল্ড জাম্বুরিতে অংশ নিয়ে গৌরব অর্জন করেছেন। সত্যিকার অর্থেই আমাদের দেশের জন্য গৌরবজনক এক অধ্যায়। যে দেশকে নিয়ে আজ আমরা গর্ব করি, পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি সে দেশ মাতৃকার সম্মানার্থে তার অবদান কম নয়। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। এক সময়ের জনপ্রিয় চিত্র নায়ক কামরুল আলম খান খসরুর নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছেন। যে দেশ গড়ার লক্ষ্যে যুদ্ধ করেছেন সে দেশ গড়ার কাজ আজও যেন তার শেষ হয়নি। আর দেশ গড়ার হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন স্কাউটকে। যতদিন বেঁচে থাকবেন স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে দেশ গড়ার কাজ চালিয়ে যাবেন।