২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাপুরুষ সৃষ্টি করেনি কখনও

  • মুনতাসীর মামুন

বেতন ও চাকরি কমিশন ২০১৩, ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর খুব একটা উচ্চবাচ্য হয়নি। বেতন কমিশন মানেই বেতন বৃদ্ধি। এই সন্তুষ্টিতে সবাই অপেক্ষা করছিল কবে বেতন স্কেল ঘোষণা করা হবে সেই সময়ের জন্য। একটি জাতীয় কমিশনের রিপোর্টের সারমর্ম বা সুপারিশ কেবিনেট কোন সাব-কমিটি মূল্যায়ন করে মন্ত্রিসভায় পেশ করলে তা যথাযথ হতো। কিন্তু এটি মূল্যায়নের ভার অর্পিত হয়েছিল একটি সুপ্রা কমিটি সচিব কমিটির ওপর। সচিব কমিটির মূল্যায়ন পত্রিকায় প্রকাশিত হলে ক্রমে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে থাকে এবং এখন তা তুঙ্গে। অর্থমন্ত্রী, পত্রিকার প্রতিবেদন অনুসারে, সচিব কমিটির মূল্যায়নকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু বিসিএস সমন্বয় কমিটি এর প্রতিবাদ জানালে বিশেষ করে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড নিয়ে তখন মন্ত্রী দ্বন্দ্বে পড়েন। একটি ক্যাডারের জন্য সামগ্রিক অসন্তুষ্টির সম্মুখীন হওয়া রাজনৈতিক দিক থেকে কতটা সমীচীন? এই চিন্তা থেকে খুব সম্ভব তিনি বলেছেন, পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করতে হবে। এর অন্য অর্থ হতে পারে, সবাইকে অন্তর্বর্তীকালীন একটি ভাতা দিয়ে বেতন স্কেল স্থগিত রাখা।

এই বেতন স্কেল সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে না পারা, আমাদের দেশের রাজনৈতিক সরকারগুলোর একটি বৈশিষ্ট্য। বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় এমনটি হয়নি। রাজনৈতিক সরকারই ছিল সত্যিকার অর্থে প্রভু। এবং তার মন্ত্রীরা প্রথমবার ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক মন্ত্রীরা যেভাবে কাজ করেন সেভাবেই কাজ করেছেন। রাজনৈতিক বা সামরিক আমলাতন্ত্র এতে অখুশি ছিল। বঙ্গবন্ধু তাতে ভ্রƒক্ষেপ করেননি। তারাও কোন উচ্চবাচ্য করতে সাহস করেনি।

এই অবস্থার পরিবর্তন হয় সামরিক আমলা জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করার পর। পাকিস্তানী মানসের প্রতিনিধিত্বকারী এই দুই আমলাকে সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র ভালবেসেছিল। তাদের ডিকটাটে প্রশাসন চলেছে। একগুচ্ছ মন্ত্রী বা সামরিক শাসকদের যারা কোলাবরেটর ছিলেন, তবে তারা যে নন-এনটিটি তা সবাই জানতেন। সামরিক শাসকদের পর রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় এসেছেন বটে, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকালীন রাজনৈতিক সরকার সম্পূর্ণ অর্থে প্রবর্তন করতে পারেননি। তারা শাসন করলেও আমলাতন্ত্র শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং নীতিনির্ধারকরা তাদের সহকর্মী থেকে তাদের ওপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখতে শুরু করেন। এই আমলাতন্ত্রে সামরিক আমলাতন্ত্রের স্থান ওপরে। আজ পর্যন্ত জানা যায়নি তারা কত বেতন পান, সেই বেতন থেকে কত বেশি সুবিধা পান বা কত টাকা রেশন পান। ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনও সেটি মেনে নিয়েছেন। এই যখন অবস্থা, তখন এই আমলাতন্ত্রই সম্মিলিতভাবে আবার রাজনীতিবিদ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় না থাকলে আজকের আমলারাও আমলা হতেন না, স্বাধীনতাও হতো দূরঅস্ত। বিভিন্ন সরকারের আমলে বিশেষ করে সামরিক আমলে সুযোগ পেলেই তারা আক্রমণ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। এর সর্বশেষ উদাহরণ মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের আমলাতান্ত্রিক সামরিক শাসন। ট্র্যাজেডি হলো ঢাকা বা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নুন খাওয়া আমলাতন্ত্রের সদস্যরা সুযোগ পেলেই ঢাকা বা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়কে কিভাবে অপদস্থ করা যায় তার চেষ্টা করেছেন। এটা জাতীয় ট্র্যাজেডি, পৃথিবীর কোন দেশে এমনটি হয়নি, এমনকি ভারত, শ্রীলঙ্কা বা অন্যান্য দেশেও। এর জন্য রাজনৈতিক শাসনের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা দায়ী। এই যখন অবস্থা, তখন আমলাতন্ত্রের ডিকটাট রাজনীতিবিদরা মেনে নেবেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অবাক হইওনি। বরং অবাক হয়েছি শিক্ষকদের এক্ষেত্রে অন্যমনস্কতা দেখে।

খুব শীঘ্রই আমি অবসরে যাব। বেতন স্কেল নিয়ে আমার মাথা ঘামানোর কথা ছিল না। এখন মাথা ঘামাইও না। কেননা এই বেতন স্কেল আমার ওপর অভিঘাত হানবে না, হানবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রজন্মের শিক্ষকদের ওপর। কিন্তু আমলাতন্ত্রের এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তিগতভাবে আমার ভাল লাগেনি। এর মধ্যে সবাইকে নস্যাত করার, অধস্তন করার একটা ভাব আছে। এই সরকারের আমলে এই সময় কেন এমনটা হবে? আমলাতন্ত্রের সঙ্গে তো আমাদের বিরোধ নেই। আমি তো মনে করি, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন বিজ্ঞানীর বেতন, আমাদের সবার থেকে বেশি না হলেও সমান হওয়া উচিত। তাদের ভাতার পরিমাণ সেনাবাহিনী থেকে বেশি হওয়া উচিত। কারণ, আজ কৃষিতে যে সাফল্য তাতে কৃষিবিজ্ঞানীদের অবদান বেশি। আমার বেতনের ক্ষতি না হয়ে যদি তিনি বেশি পান তাতে আমার কী? অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ থেকে যেসব কৃষিবিজ্ঞানী গেছেন অস্ট্রেলিয়া সরকার তাদের সবাইকে লুফে নিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হয়েছে এই বেতনক্রমের সঙ্গে রাষ্ট্রাচার বা মর্যাদার একটি প্রশ্ন আছে। সেটি আরও ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের [সব বিশ্ববিদ্যালয়কেই ধরতে পারেন] সঙ্গে যুক্ত ৪৭ বছর। বিশ্ববিদ্যালয়কে মর্যাদাহানিকর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে আমার ভাল না লাগারই কথা। কেননা ঔপনিবেশিক শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের যে অবদান তা আমলাতন্ত্রের নেই।

শুধু তাই নয়, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের [বা সমূহের] অবদান অনেক এই সরকারকে ক্ষমতায় আনার। এটা অস্বীকার করতে পারেন কিন্তু এটাই সত্য। সুতরাং, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকি বা না থাকি এ বিষয়ে কথা বলার অধিকার আমি অর্জন করেছি। আমলাতন্ত্র করেনি। নীতিনির্ধারকরা এই কথাটি ভুলে গেলে সামগ্রিক মঙ্গল থেকে অমঙ্গল হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

দুই.

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি। বাধ্য হয়েই তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পত্তন করেছিলেন। শিক্ষার বিস্তার তাদের এজেন্ডায় ছিল না। কিন্তু তারা যখন এতে হাত দিলেন তখন কী যতেœ যে তা করেছিলেন তা ভাবা যায় না। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হার্টগ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য। একজন ইহুদী যাকে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের পছন্দ না করার কথা। কিন্তু করেছিল। হয়ত তাদের ধর্মবোধ এখনকার মানুষজনের থেকে ছিল বেশি। বাংলার গবর্নর রোনাল্ড শ’ তখন আচার্য। বাংলার গবর্নরের সঙ্গে মফস্বলের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, তিনি শ্বেতাঙ্গ হলেও তফাত অনেক। কিন্তু দু’জনে মিলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে বেছে বেছে শিক্ষক নিয়োগ করেছিলেন, বিশেষ বেতন দিয়ে। আজকের যে সব বাসায় মন্ত্রীরা থাকেন এবং নীলক্ষেত এলাকার লাল বাংলোগুলোতে শিক্ষকরাই থাকতেন। হার্টগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার ব্যাপারে মনস্থির করার পরই গবর্নর ও লন্ডনে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। কাজে যোগ দেয়ার মাস পাঁচেক থেকেই এ প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়। হার্টগের প্রথম কাজটি ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রতিশ্রুতিশীল ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করা। এ কারণে, ভারত ও গ্রেটব্রিটেনে তিনি খোঁজ করেছেন বর্ণ, সম্প্রদায়ের কথা না ভেবে। যাদের তিনি চেয়েছিলেন তাদের যে তিনি আনতে পেরেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে তা নয়। তবে বেশ কিছু বিভাগের জন্য তিনি চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর চিঠিপত্রগুলো এর প্রমাণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি আকর্ষণীয় করার উদ্দেশ্যে বেশ উঁচু হারে বেতন স্কেল দেয়া হয়। প্রফেসরদের বেতন স্কেল ছিল ১০০০-১৮০০ আর রিডারের ৬০০-১২০০। এ বেতন স্কেল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের বেতন স্কেল থেকে বেশি ছিল। এ কারণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেকেই যোগ দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্যার আশুতোষ এটি পছন্দ করেননি; তবে রমেশ চন্দ্রকে বলেছিলেন : “দেখো, ঢাকায় অনেকেই দরখাস্ত করেছে এবং চাকরিও পাবে। আমি তাতে বাধা দিতে চাই না। কারণ, তোমরা যদি অনেকে ঢাকায় গিয়ে অধ্যাপনা করো, তাহলে আমি বলতে পারব যে ঈধষপঁঃঃধ টহরাবৎংরঃু রং ঃযব এৎধহফসড়ঃযবৎ ড়ভ ওহফরধহ টহরাবৎংরঃরবং.”

১৯২৯ সালের আইন অনুযায়ী বাংলার প্রথম বাঙালী শিক্ষামন্ত্রী হলেন প্রভাস চন্দ্র মিত্র। তিনি প্রায় জেদ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বেতন কমিয়ে দিলেন। প্রফেসরদের বেতন হার সর্বোচ্চ ১০০০ করা হলো। অন্যান্য পদের বেতনও হ্রাস পেল। চলবে...

নির্বাচিত সংবাদ