১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

খান এ সবুর রোড ও শাহ আজিজুর রহমান হলের নাম বাদ দিতে হবে

  • হাইকোর্টের নির্দেশ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি জড়িত খুলনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক খান এ সবুর ও কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি হলের নাম শাহ আজিজুর রহমান এই দুই স্বাধীনতাবিরোধীর নাম বাদ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। একটি আবেদনের শুনানি করে বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মোঃ সাইফুর রহমানের বেঞ্চ মঙ্গলবার এই আদেশ দেয়।

দুই স্বাধীনতাবিরোধীর নাম প্রত্যাহার চেয়ে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ও শাহরিয়ার কবীর রবিবার এই আবেদনটি করেন। আদালতে তাদের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার এ কে রাশেদুল হক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেল তাপস কুমার বিশ্বাস। খুলনা মহানগরীর ‘খান-এ-সবুর’ সড়কের নাম প্রত্যাহার করে আগের ‘যশোর রোড’ নামটি ব্যবহার করতে সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শাহ আজিজুর রহমান’ হলের নামও প্রত্যাহার করতে বলা হয়েছে।

মুসলীম লীগের নেতা খান-এ-সবুর পাকিস্তান আমলে ছিলেন আইয়ুব খানের মন্ত্রী। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দালাল আইনে বিচার শুরুর সময় প্রকাশিত ছয়শ’ স্বাধীনতাবিরোধী অপরাধীর তালিকাতেও তার নাম ছিল। সেই স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারের নামেই পরে যশোর রোডের নামকরণ করা হয়। জিয়াউর রহমানের প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানও ষাটের দশকে মুসলীম লীগ নেতা ছিলেন। স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার কারণে ১৯৭২ সালে তাকেও দালাল আইনে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে তার নামেই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নামকরণ হয়।

আদেশের পরে রিটকারীর আইনজীবী ব্যারিস্টার একে রাশেদুল হক জনকণ্ঠকে বলেন, আমি আদালতে উপস্থাপন করে বলেছি যখন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে সেই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের নামে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সড়কের নামকরণ রাখা নীতিবাচক প্রভাব। আদালত উল্লিখিত বিষয় শুনে এই আদেশ প্রদান করেছেন। এছাড়া যতদিন পর্যন্ত এই শুনানি নিষ্পত্তি না হবে ততদিন পর্যন্ত এই আদেশ বলবৎ থাকবে।

আইনজীবী ব্যারিস্টার একে রাশেদুল হক আরও বলেন, এর আগে ২০১২ সালের ১৪ মে হাইকের্টে রুল জারি করেন। স্বাধীনতাবিরোধীদের নামে স্থাপনা-সড়কের নামকরণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থীÑ এ দাবিতে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ও লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীর হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। ওই সময় শুনানি শেষে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ একটি রুল জারি করেন।

রিটকারীর আইনজীবী বলেন, ওই রুলের শুনানিতে আমরা মঙ্গলবার একটি সম্পুরক আবেদন করে বলেছি যে দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। বিচার চলাকালীন সময়ে দেশের ঐতিহ্যবাহী সড়ক ও স্থাপনার নাম স্বাধীনতাবিরোধীদের নামে থাকতে পারে না। তাই রাজাকার খানে সবুরের নামে খুলনার ঐতিহ্যবাহী যশোর সড়ক নাম প্রত্যাহার এবং কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হল আজিজুর রহমানের নাম প্রত্যাহার করার জন্য বলেছেন আদালত।

এদিকে আদেশের পর রিটকারী অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন জনকণ্ঠকে বলেছেন, আমরা অনেক আগে রিট করেছিলাম। আমাদের কাছে রাষ্ট্র সংবিধান এবং মানবতাবিরোধী অপরাধীদের যে বিচার হচ্ছে তার সঙ্গে এটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই ধরনের নামকরণ যার করেছে তারা জাতির কাছে একটা অপরাধ করেছে। কেননা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরাজিত শত্রু যারা ৩০ লাখ শহীদ ও ৬ লাখ নারী নির্যাতনের জন্য দায়ী তাদের জন্য স্থাপনা ও সড়কের নাম শহীদদের ব্যঙ্গ করা। হাইকোর্ট রাষ্ট্রের মূল চেতনা অক্ষুণœ রেখেছেন বিধায় তারা জাতির ধন্যবাদের পাত্র। তিনি আরও বলেন, আমি আশা করি সারাদেশে নির্মূল কমিটি, সাংস্কৃতিক জোট ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নাগরিক গ্রুপসমূহ নিজ নিজ এলাকায় এ ধরনের নামকরণ হয়ে থাকলে কর্তৃপক্ষকে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করার পরামর্শ দেন।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১৪ মে স্বাধীনতাবিরোধীদের নামে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্মিত স্থাপনা ও সড়কের নামকরণ কেন বাতিল করা হবে না জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে খুলনায় খান এ সবুর রোড ও কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজুর রহমান মিলনায়তনের নামকরণ স্থগিত করে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার কোন সমাধান করেননি সংশ্লিষ্টরা । তাই হাইকোর্টে রিটের সঙ্গে সম্পুরক আবেদন করা হয়। ওই আবেদন শুনানির পর এই আদেশ দেন আদালত।

স্বাধীনতাবিরোধীদের নামে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্মিত স্থাপনা ও সড়কের নামকরণ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না স্থানীয় সরকার সচিব, শিক্ষা সচিব, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এবং কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীদের সাক্ষ্যবহন করা বহুল পরিচিত খুলনার যশোর রোডের নামকরণ স্বাধীনতাবিরোধী খান এ সবুরের নামে করা হয়। আর কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মিলনায়তনের নামকরণ করা হয় শাহ আজিজুর রহমানের নামে। এর আগের রুলের সময় সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, যারা বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছে তাদের পুনর্বাসিত করতে একটি গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করে রাজাকারদের নামে বিভিন্ন স্থাপনা ও সড়কের নামকরণ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃতি করে ভবিষ্যতে আর কেউ যেন কোন রাজাকারের নামে কোন স্থাপনার নামকরণ করতে না পারে সেজন্য এই রিট করা হয়েছে বলে জানান রিটকারীরা।