২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রেল দুর্ঘটনা রোধে নেয়া হচ্ছে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প

  • দ্রুত সময়ের মধ্যেই কিছু পদক্ষেপ;###;ট্রেন আসার কিছু আগেই অটোবেল;###;আপগ্রেড হবে পাঁচ ধরনের লেভেল ক্রসিং;###;লাইনের দুপাশে উঠবে দেয়াল

রাজন ভট্টাচার্য ॥ ট্রেন আসার আগে দেড় কিলোমিটার পথ বাকি থাকতেই বাজবে সতর্কতামূলক অটো বেল। কাছে আসার পর বাজবে জরুরী ঘণ্টা। লাল ও নীল বাতির মাধ্যমে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। দুর্ঘটনা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে থাকবে বাড়তি জনবল। অবৈধ বাজার ও স্থাপনাসহ দখল রোধে লাইনের দু’পাশে নির্মাণ করা হবে দেয়াল। করা হবে লাইনের মানোন্নয়ন। পাঁচ ধরনের লেবেল ক্রসিংগুলোকে আপগ্রেড করা হচ্ছে। ট্রেন দুর্ঘটনা রোধে দ্রুত সময়ের মধ্যে নেয়া হচ্ছে এ সব ব্যবস্থা। এর মধ্যে ‘কারিগরি ডিভাইস’ বসানোর পাইলট প্রকল্প আগে শুরু হবে। পরবর্তীতে স্থায়ী সমাধানের জন্য আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা আছে। স্থায়ীভাবে সমস্যা সমাধানের জন্য তৈরি করা প্রকল্পটি ইতোমধ্যে সরকারীভাবে অনুমোদন হয়েছে।

এদিকে সারাদেশে রেললাইনের ওপর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) ও ইউনিয়ন পরিষদের অনুমোদনহীন লেবেল ক্রসিং সবচেয়ে বেশি। এর সংখ্যা প্রায় এক হাজার। এছাড়াও পৌরসভা, জেলা পরিষদ থেকে শুরু করে সড়ক মহাসড়ক বিভাগের অবৈধ রেল ক্রসিং রয়েছে। পর্যায়ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ লেবেল ক্রসিংগুলো নিজেদের করে নেবে রেল বিভাগ। পাশাপাশি ইচ্ছেমতো লেবেল ক্রসিং ঠেকাতে দেশের সকল জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দেবে রেলপথ মন্ত্রণালয়। রেলওয়ে সূত্রে এ সব তথ্য জানা গেছে।

রেলওয়ে সূত্রগুলো বলছে, অবৈধ ক্রসিংই রেল দুর্ঘটনার মূল কারণ। এই প্রেক্ষাপটে ট্রেন দুর্ঘটনা রোধে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি দুটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে, যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেনগুলো বারবার লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা কমে আসবে বলে মনে করেন তারা। তাদের বক্তব্য, অনুমোদনহীন লেবেল ক্রসিং, মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বরত রেল সংশ্লিষ্টদের কর্তব্যে অবহেলা, লাইনে ত্রুটিসহ মূলত তিন কারণে দুর্ঘটনা হচ্ছে। তবে দুর্ঘটনার হার আগের চেয়ে অনেক কমেছে বলে দাবি তাদের। কর্মকর্তারা বলছেন, বৈধ লেবেং ক্রসিংগুলোতেও ট্রেন দুর্ঘটনা হয়। এক্ষেত্রে সড়কে চলা পরিবহন চালকদের অসকর্তাই মূলত দায়ী। এছাড়া রেল দুর্ঘটনা রোধে লাইনের আন্তর্জাতিক মানদ- নির্ধারণের বিকল্প নেই।

জানতে চাইলে রেলওয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মোঃ ফিরোজ সালাহ উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, রেল দুর্ঘটনার জন্য লেবেল ক্রসিংগুলো অনেকাংশে দায়ী। নিয়ম অনুযায়ী কেউ রেললাইনের ওপর দিয়ে রাস্তা করলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু অনুমোদন ছাড়াই বেশিরভাগ রাস্তা লাইনের ওপর দিয়ে নেয়া হচ্ছে। যেগুলো অনুমতি নিয়ে করা হয় সে সব লেবেল ক্রসিংয়ের দায় আমাদের। অনুমোদনহীন ক্রসিং-এ দুর্ঘটনার দায় আমরা কোনভাবেই নেব না। এরপরও অনুমোদন ছাড়া লেবেল ক্রসিংগুলোতে বিশেষ সতর্কবার্তা মূলক সাইনবোর্ড ঝোলানো হয়েছে। কিন্তু পথচারী ও যানবাহনগুলো সতর্ক হয়ে পথ চলে না।

তিনি বলেন, প্রতিবছর আমরা গুরুত্ব বিবেচনা করে নতুন-নতুন কিছু ক্রসিং বৈধ করছি। অধিকাংশ ক্রসিং নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বৈধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি জানান, রেলের নিরাপত্তায় ‘কারিগরি ডিভাইস’ বসানোর কাজটি আমরা দ্রুতই শুরু করতে যাচ্ছি। ঢাকাসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি লেবেল ক্রসিং-এ প্রথমে পাইলট প্রকল্প হিসেবে ডিভাইস বসানো হবে। এতে সফলতা এলে আস্তে আস্তে তা ছড়িয়ে দেয়া হবে। ডিভাইস বসানোর কাজ শেষ হলে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে থাকতে ট্রেন আসার খবর পাওয়া যাবে। এতে পথচারী ও পরিবহনগুলো সতর্ক হয়ে পথ চলবে। দুর্ঘটনাও কমবে। এছাড়াও যেখানে সেখানে যেমন ইচ্ছেমতো লেবেল ক্রসিং না হয় সেদিকে নগর রাখতে সকল জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেয়া হবে। জেলা প্রশাশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি দেখ-ভাল করা হলে অবৈধভাবে ইচ্ছা করলেই যে কেউ রাস্তা করতে পারবে না।

সারাদেশে অনুমোদনহীন ক্রসিং ॥ শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুমোদনহীন লেবেল ক্রসিংয়ের অভাব নেই। রেলওয়ে সূত্র জানায়, বর্তমানে রেলওয়ে নেটওয়ার্কে মোট এক হাজার ৪১৩টি অনুমোদিত এবং এক হাজার ১২৮টি অননুমোদিত রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং গেট রয়েছে। অনুমোদিত এক হাজার ৪০৩টি গেটের মধ্যে ৩৭১টি ম্যান্ড এবং এক হাজার ৪২টি আনম্যান্ড। এ সব অননুমোদিত এবং আনম্যান্ড রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং গেটের কারণে দুর্ঘটনার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। অননুমোদিত লেভেল ক্রসিংগুলো ও সব সংস্থা কর্তৃক নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলো হলো এলজিইডি ৪৭০টি, সড়ক ও জনপথ ১২টি, ইউনিয়ন পরিষদ ৫০৫টি, পৌরসভা ৮৪টি, সিটি কর্পোরেশন ৩৬টি, চট্টগ্রাম পোর্ট ৩টি, বেনাপোল স্থলবন্দর ১টি এবং প্রাইভেট ১৭টি ।

বারবার দুর্ঘটনা দুই রুটে ॥ ঢাকা-চট্টগ্রাম ও সিলেট-চট্টগ্রাম প্রধান রুটে মাত্র ৫০০ কিলোমিটার রেলপথে দুর্ঘটনার হার বেশি। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, গত আড়াই বছরে ৩৫টি যাত্রীবাহী, ১১৫টি মালবাহী ট্রেনসহ ১৫০টির অধিক ছোট-বড় ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশে ট্রেন দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে অকার্যকর সিগন্যাল ব্যবস্থা, লেভেল ক্রসিংয়ের অব্যবস্থা এবং চালকের সিগন্যাল অমান্য করাকে দায়ী করা হয়। এছাড়া দায়িত্বহীন গেটম্যান লেভেল ক্রসিংয়ের গেট বন্ধ না করার কারণে রাস্তায় চলাচলকারী যানবাহনের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষ বাঁধে। এ সব ট্রেন দুর্ঘটনায় অনেক যাত্রী হতাহত হয়। অনেককে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।

বারবার রেল দুর্ঘটনা রোধে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নেয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোঃ হাবিবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, রেল দুর্ঘটনা রোধসহ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে করণীয় নির্ধারণ করে সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রস্তাবটি অনুমোদন হয়েছে। চূড়ান্ত হয়ে কাজ বাস্তবায়ন হলে রেল দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি। এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ হলো লেবেল ক্রসিংগুলোতে আপগ্রেড করা। মূলত পাঁচ ধরনের লেবেল ক্রসিং এর আওতায় আসবে। এর মধ্য দিয়ে ক্রসিংগুলোর মান বাড়বে। ‘ডি’ মানের ক্রসিংগুলো ‘সি’ মানের হবে, ‘সি’ মানেরগুলো ‘বি’ মানের। এভাবে পর্যায়ক্রমে মান বাড়বে। এছাড়া যেখানে গেটম্যান নেই সেখানে গেটম্যান দেয়া হবে। যেখানে একজন কাজ করেন সেখানে বাড়ানো হবে জনবল। গুরুত্ব বিবেচনা করে বেরিয়ার দেয়া হবে। যে সব লেবেল ক্রসিংয়ে বেল নেই, সেখানে বেল ও সিগন্যাল বাতি দেয়া হবে। বাড়বে নিরাপত্তা প্রহরী। লাইনের মান বাড়ানোর পাশাপাশি লাইনের দু’পাশে যত সম্ভব দেয়াল নির্মাণ করা হবে। তিনি জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।

রেলওয়ের কর্তা ব্যক্তিরা বলছেন, লেবেল ক্রসিংগুলোতে দুর্ঘটনার হার অনেক। পয়েন্ট সিগন্যাল লাইনে ত্রুটি ও উন্নয়ন কাজ চলা অবস্থায় ট্রেন লুপ লাইন কিংবা সাইড লাইনে গেলে অনেক সময় লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটে। তবে এর পরিমাণ খুবই কম। মূল লাইনে কিছু ত্রুটি দেখা দিলেও ট্রেন লাইনচ্যুত হতে পারে। তৃতীয় কারণের মধ্যে রয়েছে নিউম্যান ফেলুর। অর্থাৎ রেলওয়ের সিগন্যাল, গার্ডসহ নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিতদের অসতর্কতা কিংবা অবহেলার কারণেও রেল দুর্ঘটনা হচ্ছে।