১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সন্ত্রাসের ব্যাকরণ

  • মিলু শামস

একের পর এক পৃথিবীর প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ধ্বংস করছে আইএস। এদের মতো মূঢ়ের পক্ষে এ সবের গুরুত্ব উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। মৌলবাদ মুক্তসংস্কৃতি ও চিন্তা সইতে পারে না। গত শতকের নব্বই দশকে নোবেল বিজয়ী মিসরীয় লেখক নাগিব মাহফুজ ধর্মীয় মৌলবাদীদের আঘাতের শিকার হয়েছিলেন। মৌলবাদী খ—গ তাঁর প্রাণ কেড়ে নিতে না পারলেও ডান হাতে আঘাতের কারণে তিনি হারিয়েছিলেন লেখার ক্ষমতা। লেখালেখির কাজ পরে চালিয়েছেন অনুলিখনের মাধ্যমে। যে তাঁকে আঘাত করেছিল, ধরা পড়ার পর তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নাগিব মাহফুজের লেখা পড়েই কি সে ক্রুদ্ধ ও উত্তেজিত হয়েছিল? সে জানায়, মাহফুজের কোন লেখাই সে পড়েনি। তাঁর লেখা সম্পর্কে কোন ধারণাই তার নেই। তার উত্তেজনার কারণ ধর্মীয় নেতাদের অনর্গল বক্তৃতা বা ওয়াজ। ক্রমাগত ওসব শুনেই সে হিংস্র হয়ে উঠেছে, উত্তেজিত ও আঘাত করেছে। যাদের হয়ে এবং যাঁকে সে হত্যা করতে চেয়েছিল এ দুয়ের মধ্যে গুরুত্বের পার্থক্য সে বোঝেনি। একজন নাগিব মাহফুজ সমান হাজার হাজার জঙ্গী যে তুলনায় আসতে পারে না, সে বোধ ওই হামলাকারীর ছিল না। কারণ, তার ব্রেন ওয়াশ হয়ে গিয়েছিল জঙ্গীবাদী ‘যন্তরমন্তরে’।

এই ব্রেন ওয়াশের কাজ নানা রূপে নানা নামে পৃথিবীজুড়ে চলছে। স্বাধীন বাংলাদেশেও তার একটি ধারা বহমান গত শতকের মধ্য সত্তর থেকে। মৌলবাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সাধারণত সামরিক শাসন। আমাদের দেশে মৌলবাদী রাজনৈতিক দলের জন্মের সঙ্গেও এ সত্য জড়িয়ে আছে। দালাল আইন বাতিল এবং ধর্মীয় রাজনীতি, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীকে সক্রিয় রাজনীতির আইনী অধিকার দেয় সামরিক শাসক; যারা সর্বতোভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর নৃশংস অত্যাচার করেও স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম ঠেকাতে পারেনি। অন্য সব রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি তারাও রাজনীতি করার সমানাধিকার পেল এবং ধীরে ধীরে তাদের আসল রূপ উন্মোচিত হতে লাগল। সংবিধান থেকে উধাও হলো ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি। পরের সামরিক সরকার সংবিধানকে আরেকটু ধর্মীয়করণ করে তাদের বিচরণকে আরও স্বচ্ছন্দ করে দিল। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও অন্যান্য সহযোগী দেশ থেকে তাদের জন্য অর্থ সাহায্য আসার সোনালি দিগন্ত খুলে গিয়েছিল মূলত সামরিক শাসকদের সময় থেকেই। সে টাকায় তারা নিজেরা শক্তিশালী হয়েছে, মসজিদ-মাদ্রাসা বানিয়েছে আর প্রতিপক্ষের ওপর সহিংস হয়েছে। শুধু সাংগঠনিকভাবে নয়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও এরা শক্তিশালী হয়েছে। ব্যাংক, বীমা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদির মাধ্যমে একদিকে সমাজের মূলস্রোতের সঙ্গে মিশে গেছে; অন্যদিকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম দিয়ে মাঝে মাঝে ঝলসে উঠে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। তবে একটা সঙ্গত প্রশ্ন এখানে এসেই যায়, যে সামরিক জান্তারা এদের পুনর্বাসন ও বিকশিত করেছে তাদের কাছে সুবিধাভোগী তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী বা সুশীলরা এ বদান্যের প্রতিবাদ করেছিলেন কি? সত্য স্বীকারের দায় থেকে বলতে হয়Ñ করেননি। তারা নিজেদের সুবিধা বুঝে নিতে ব্যস্ত থেকেছেন। বলা যায়, জামায়াতে ইসলামীর সোস্যালাইজেশনকে পরোক্ষে সহযোগিতা করেছেন। একদিকে প্রকাশ্য রাজনীতি করার আইনী অধিকার, অন্যদিকে সামাজিকভাবে মিশে যাওয়ার অনিবার্য সাংস্কৃতিক অভিঘাতের মধ্যে বেড়ে উঠেছে গোটা একটি প্রজন্ম, পরিণত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির প্রত্যক্ষ সমর্থক না হলেও এদের অনেকে ইসলামী ভাবধারা বা জিহাদের প্রতি সহানুভূতিশীল শুধু ধর্মীয় দুর্বলতার কারণে। আন্তর্জাতিকভাবে ধর্মীয় জঙ্গীবাদের উত্থানও এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

আশির দশকে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকায় সামরিকতন্ত্রের যে উত্থান তা দুর্বল দেশগুলোকে গিনিপিগ বানিয়ে সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য পূরণেরই অন্য এক কৌশল। একই উদ্দেশে আন্তর্জাতিকভাবে ধর্মীয় মৌলবাদী জঙ্গী গোষ্ঠীকে পরিপোষণ করা হয়েছে। বিশেষ করে সোভিয়েত সমাজতন্ত্র পতনের পর এ প্রক্রিয়া দ্রুত বেগবান হয়েছে। ইসলামের শান্তি, সাম্য ও প্রগতিশীল ধারাটি জঙ্গীবাদী ধারার চাপে কোণঠাসা হয়ে আছে। মৌলবাদী সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির ধারকরা মানুষকে দু’ভাগে ভাগ করে। একভাগে ইসলামে বিশ্বাসীরা, অন্যভাগে ইসলামে অবিশ্বাসীরা। তারা মনে করে, অবিশ্বাসী কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা তাদের ধর্মীয় কর্তব্য। এরা ওহাবী আন্দোলনের উত্তরসূরি; যারা মনে করে ইসলাম কোন অবস্থাতেই আদি ইসলামী ভাবধারা অর্থাৎ হযরত মুহম্মদ (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের রীতিনীতি থেকে বিচ্যুত হবে না। আঠারো শতকের শেষদিকে গোটা আরব ভূখ- যখন তুর্কি খিলাফতের অধীনে ছিলÑ ক্ষয়িষ্ণু সেই খিলাফত আমলে মৌলবাদী ধর্মীয় নেতা মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব এই আন্দোলনের সূচনা করেন। এ উপমহাদেশে একে গতিশীল করেছেন উত্তর ভারতের রায়বেরেলির সৈয়দ আহমদ নামে আরেক মৌলবাদী নেতা। উনিশ শতকের শুরুর দিকে তার আবির্ভাব। তিনি ইসলামী রাজত্ব পুনর্প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যে পথে এগোচ্ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের সে সময়ের বাস্তবতায় সেটা যে অসম্ভব তা অল্পদিনেই বুঝেছিলেন। তার আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িকতার মধ্যেই পথ খুঁজেছে। ধর্মীয় আন্দোলন সম্পর্কে আধুনিক উপলব্ধি নিয়ে উত্তর ভারত থেকেই এসেছিলেন আরেকজন, সৈয়দ আহমদ খান। আর পশ্চিমবাংলা থেকে সৈয়দ আমির আলী। ইংরেজী শিক্ষিত এ দুই নেতা সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে উদার-যুক্তিবাদী চিন্তা দিয়ে ইসলামের ব্যাখ্যা করেছেন। আমির আলী মুক্ত মন নিয়ে কোরান পাঠ করার কথা বলেছেন, আগেকার দিনের আলেম-উলামারা যেভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সেভাবে নয়। তার মূল বক্তব্য ছিল, জ্ঞানের চর্চা ছাড়া কোন সংস্কার সম্ভব নয়। মানুষের মনকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে হলে সেখানে জ্ঞানের আলো প্রবেশ করাতে হবে। সৈয়দ আমির আলী মাদ্রাসা শিক্ষার বিরোধী ছিলেন। মনে করতেন এ ব্যবস্থা একেবারেই পশ্চাদমুখী এবং মনকে আলোকিত করতে অক্ষম। তিনি মাদ্রাসা তুলে দিয়ে ইংরেজী ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পক্ষপাতি ছিলেন। সৈয়দ আহমদ খান, সৈয়দ আমির আলীর পথ ধরে এসেছিলেন আরও কয়েক উদার ও মুক্তবুদ্ধির ইসলামী চিন্তাবিদ। কিন্তু ইসলামের উদার ধারার বদলে সারা পৃথিবীতে এখন রাজত্ব করছে উগ্র ধর্মীয় জঙ্গীবাদ যা ইসলামের সমন্বয়ধর্মী ও মানবতাবাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রায় ভুলিয়ে দিয়েছে।

সাতচল্লিশে ভারত ভাগের পর সে সময়ে বিশ্বের দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এ অঞ্চলের রাজনীতিতেও মেরুকরণ হয়েছে। রাশিয়া যাতে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে যুক্তরাষ্ট্র সে জন্য পূর্বপরিকল্পিতভাবেই পাকিস্তানের ইসলামী সামরিক সরকারকে সমর্থন দেয়। তারা হয়ত ভেবেছিল, রক্ষণশীলতা ও মৌলবাদের পৃষ্ঠপোষকতা কমিউনিস্টদের রুখতে পারবেÑ যার লাভের ফসল তাদের ঘরে উঠবে। সে জন্যই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে স্বাধীনতাবিরোধীদের সমর্থন দিয়েছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, স্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ তাদের বিরোধী শিবিরে যোগ দিতে পারে। কিন্তু সব বিরোধিতা উপেক্ষা করে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ নিয়ে এদেশ স্বাধীন হয়। চমৎকার একটি সংবিধান রচিত হয়। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। এদেশ প্রতিষ্ঠার যারা বিরোধিতা করেছিল নানা কূটকৌশলে তারাই দেশের ‘বন্ধু’ হয়। সামরিক শাসন আসে। ধর্মতন্ত্রী মৌলবাদ শিকড় গাড়তে থাকে। রগকাটা, কুপিয়ে মারার সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করে। এমনকি ব্লাসফেমি প্রবর্তনের চেষ্টাও হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ এই বাংলাদেশে।

এখন আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামের নামে আইএস’র দাপট আর দেশে কণ্ঠরোধ হচ্ছে মুক্তচিন্তার। এ সবই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ। এর বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদের বিকল্প নেই।