২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জাপান ॥ যে দুঃসহ স্মৃতি আজও তাড়া করে

  • এনামুল হক

গত ১৫ আগস্ট ছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জাপানের পরাজয় বরণের ৭০তম বার্ষিকী। সাত দশক আগের সেই যুদ্ধের স্মৃতি আজও পূর্ব এশিয়ার মানুষকে তাড়িত করে। সেই যুদ্ধ আজও যেন এই অঞ্চলকে বিভক্ত করে রেখেছে। কারণ তাদের কাছে সেই যুদ্ধের স্মৃতি অতি বেদনাদায়ক ও অপমানজনক।

যুদ্ধের অনেক আগে সেই ১৮৯৫ সালে তাইওয়ান জাপানের দখলে চলে গিয়েছিল। কোরিয়া দখলে আসে ১৯১০ সালে। মাঞ্চুরিয়া ১৯৩১ সালে, চীনের পূর্বাঞ্চল ১৯৩৭ সালে এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ১৯৪১ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই দেশগুলোর জনগণ জাপানের নির্মম লুণ্ঠন ও অর্তাচারের শিকার হয়। নারীরা হয় জাপানী সৈনিকদের ভোগের শিকার। জাপান এই দেশগুলোর সর্বস্ব শুষে নিয়ে নিঃস্ব করে ছেড়েছিল। সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও তারা ভুলতে পারে না।

চীনের বিরুদ্ধে জাপানের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯৩৭ সালে মুকদেন বন্দর দখলের মধ্য দিয়ে। জাপান আশা করেছিল দুর্বল চীনের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ হবে স্বল্পস্থায়ী। কিন্তু তা হয়নি। জাপানের বিরুদ্ধে কুওমিনটাং-কমিউনিস্ট যৌথ প্রতিরোধ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল এবং শেষ অবধি চলেছিল। যুদ্ধের প্রয়োজন মেটাতে সম্পদ ও লোকবলের দিক দিয়ে নিঃস্ব হয়েছিল কোরিয়া ও মাঞ্চুরিয়া। হাজার হাজার কোরীয় নারীকে অপহরণ করে সামরিক ব্রথেলে রাখা হয়েছিল। লাখ লাখ পুরুষকে মূলত জাপানে নিয়ে খনি ও অন্যান্য শিল্পে বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োগ করা হয়েছিল।

১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে গত ৭০ বছরে জাপান বাইরের কারও বিরুদ্ধে একটা গুলিও ছোড়েনি। অথচ যুদ্ধই তার অগ্রগতির পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। জাপানের সম্প্রসারণবাদ শুরু হয় ১৮৭৪ সালে যখন দেশটা ফরমোজা বা বর্তমানের তাইওয়ানের বিরুদ্ধে প্রথম পিটুনি অভিযান চালায়। ১৮৭৯ সালে, জাপান শান্তিপ্রিয় রাজ্য রাইয়কিউ (ওকিনাওয়া) গ্রাস করে নেয়। ১৮৯৪-৯৫ সালে চীনের কিং রাজবংশের বিরুদ্ধে জাপান যে যুদ্ধ চালায়, সেটি বহুলাংশে হয়েছিল কোরীয় উপদ্বীপে। ওই যুদ্ধে চীনের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। এর মধ্য দিয়ে পূর্ব এশিয়ার ওপর চীনের শত শত বছরের আধিপত্য হাতছাড়া হয়ে জাপানের হাতে চলে আসে। ১৯০৫ সালে জাপান প্রায় গোটা রুশ নৌবহরকে কোরিয়া ও জাপানের মধ্যবর্তী সুশিমা প্রণালীতে ডুবিয়ে দিয়েছিল। এক শ’ বছর আগে ট্রাফালগারে নেলসনের বিজয়ের পর ওটা ছিল কোন নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় বিজয়। ওই বিজয়ের মধ্য দিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে জাপান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোরিয়াকে গ্রাস করে নেয়।

জাপানের সমরবাদ পরবর্তীকালে নিন্দিত ও ধিকৃত হয়েছিল ঠিকই, তবে প্রথমদিকে জাপানের সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন অন্যদের প্রশংসাও কুড়িয়েছিল। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন শক্তিধর সাম্রাজ্যের মতো জাপানও বিদেশের মাটিতে তার সামরিক অভিযানগুলোকে ন্যায়পরায়ণতা ও আইনানুগ বৈধতার আবরণে মুড়িয়ে রেখেছিল। পাশ্চাত্যের এসব শক্তির সংঘে স্থান পেতে জাপানকে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। এশিয়ার জাতীয়তাবাদীরাও নব্য জাপানের প্রশংসা করতেন মুগ্ধকণ্ঠে। এদের মধ্যে চীনের ড. সানইয়াৎ সেনও ছিলেন। র‌্যাডিকেল ও বুদ্ধিজীবীরা দেশের প্রগতি ও সমৃদ্ধি আনার লক্ষ্যে এশিয়ার এই শক্তির কাছ থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্য টোকিওতে গিয়ে ভিড় জমাতেন।

ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর অনুকরণে জাপানী উপনিবেশবাদের মূলে নিহিত ছিল সহিংসতা এবং অনেক ক্ষেত্রে বর্ণবাদ। তবে এই উপনিবেশিক শক্তির নিজের মধ্যে বিশৃঙ্খল অবস্থাও নেহায়েত কম ছিল না। সামরিক বাহিনীর বৈদেশিক অভিযানগুলোর ওপর কেন্দ্র সরকারের নিয়ন্ত্রণ তেমন ছিল না। ১৯৩১ সালে সেনাবাহিনীর একদল অফিসার মাঞ্চুরিয়া দখল করে বসে এবং সরকারের কাছে সেটাকে ‘ফেইট্যাকপলি’ অর্থাৎ যা হবার হয়ে গেছে এখন সেটাকে মেনে নেয়াই ভালÑ বলে উপস্থাপন করে। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ এ ঘটনার নিন্দা করলে জাপান বিশ্বসংস্থা থেকে বেরিয়ে আসে এবং কমিউনিজম বিরোধিতার নামে নাৎসি জার্মানির সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। বিদেশের মাটিতে জাপানের আগ্রাসনকে স্বদেশবাসীর কাছে হয় ন্যায়সঙ্গত স্বার্থরক্ষা নয়ত নিঃস্বার্থভাবে কমিউনিজম বিরোধিতা হিসেবে দেখানো হয়। জাপান এমন এক ভাব ধারণ করে যেন সে পাশ্চাত্যের উপনিবেশবাদী শক্তিগুলোর হাতে নির্যাতিত দেশগুলোর মুক্তিদাতা ও স্বাভাবিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্যান এশিয়ান ভাবধারা জাপানী সম্প্রসারণবাদকে দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি জোগায়।

অথচ পদানত দেশগুলোতে জাপান যুদ্ধের সময় অন্যান্য দেশ থেকে ভিন্ন আচরণ করেছে মনে করার কারণ নেই। কোরিয়ায় জাপানীদের নিষ্ঠুরতা তো সকলেরই জানা। এর পাশাপাশি ১৯৩৭ সালে চীনের নানকিং এবং ১৯৪৫ সালে ফিলিপিন্সের ম্যানিলায় জাপানী সৈন্যরা যে পৈশাচিক নিষ্ঠুরতায় মেতে উঠেছিল, সেকথা স্মরণ করলে শিউরে উঠতে হয়। হত্যা ও ধর্ষণের সেই উন্মত্ততায় লাখ লাখ না হলেও হাজার হাজার সিভিলিয়ান ও যুদ্ধবন্দীকে মেরে ফেলা হয়েছিল। অথচ এই নারকীয়তা ইতিহাসে খাটো করে দেখানো হয়েছে অথবা অস্বীকৃত হয়েছে। যে কোন দেশই তার পরিচালিত যুদ্ধের উদ্দেশ্যকে মহৎ ও বিশুদ্ধ হিসেবে দেখাতে চায়। জাপানও তাই করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিজেকে পাশ্চাত্যে সাম্রাজ্যবাদ, কমিউনিজম ও চীনের যুদ্ধবাজদের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দুর্গ হিসেবে দেখানোর ব্যর্থ প্রয়াস পেয়েছিল।

১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবারে জাপানের বিশাল হামলা আমেরিকাকে যুদ্ধে টেনে এনেছিল বটে, তবে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত চীন এককভাবেই জাপানের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছিল। চীন যদি সে সময় আত্মসমর্পণ করত তাহলে পূর্ব এশিয়া কয়েক দশক ধরে জাপান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়ে থাকত। কিন্তু চীন আত্মসমর্পণ না করে লড়েছে। তার জন্য বিরাট মাশুলও দিতে হয়েছে। ১৯৩৭-৪৫ সালের যুদ্ধে চীনের সম্ভবত দেড় কোটি সৈন্য ও সিভিলিয়ান নিহত হয়েছিল। ১০ কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছিল। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষয়ক্ষতি ছিল চীনের কাছাকাছি। চীন জাপানকে পরাজিত করতে পারেনি সত্য, তবে লাখ লাখ জাপানী সৈন্যকে যুদ্ধে আটকে রাখতে পেরেছিল।

১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট যথাক্রমে হিরোশিমা ও নাগাসাকির ওপর আনবিক বোমা ফেলে আমেরিকা। ১৫ আগস্ট জাপান আত্মসমর্পণ করে। তবে এটমবোমা ফেলার আগেই জাপানের আত্মসমর্পণ ও যুদ্ধের অবসানের সমস্ত সম্ভাবনা ফুটে উঠেছিল। জানমাল ও সহায়-সম্পদের ক্ষেত্রে এটমবোমার ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ কারও অজানা নয়। এই ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়াও জাপানের উল্লেখ করার মতো আরও বিষয় আছে। যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটার সময় ৬০ লাখেরও বেশি জাপানী বিদেশের মাটিতে আটকা পড়েছিল। এদের অর্ধেকেরও বেশি ছিল সৈনিক যাদের অনেকেই ছিল আহত, অপুষ্টি ও রোগব্যাধির শিকার। মিত্রশক্তি আত্মসমপর্ণকারী জাপানী সৈনিকদের নিজেদের কাছে লাগানোর চমৎকার মওকা পেয়ে যায়। আমেরিকা এমন ৭০ হাজার সৈনিককে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ঘাঁটিগুলোতে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করে। মাঞ্চুরিয়া ও উত্তর কোরিয়ায় জাপানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর প্রায় ১৬ লাখ জাপানী সৈন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে পড়ে। ১৯৪৭ -এর শেষদিকে এদের মধ্যে সোয়া ৬ লাখ সৈন্যকে স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয়। বাকিরা কোরিয়ায় আমেরিকা নিয়ন্ত্রিত অংশে চলে যায়। ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত দাবি করে তাদের হাতে মাত্র ৯৫ হাজার জাপানী স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু জাপানী ও মার্কিনী হিসেবে যে সংখ্যা হবে ৩ লাখেরও বেশি।

১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে মাঞ্চুরিয়ায় ১০ লাখের মতো জাপানী সিভিলিয়ান ছিল। এদের মধ্যে ১ লাখ ৭৯ হাজার জাপানে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে প্রাণ হারায়।

এসব কিছু বিবেচনায় নিলে ১৫ আগস্ট জাপানীদের কাছে বড়ই নিরানন্দের দিন। জাপান এক ভয়াবহ বিধ্বংসী শক্তি হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মঞ্চে প্রবেশ করেছিল। তেমনি নিজের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে তাকে মঞ্চ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট