১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ব্রিটেনে নতুন ধারার জঙ্গী

  • মুসান্না সাজ্জিল

২০১৪ সালের আগস্ট মাসে আইএসের হাতে এক মার্কিন নাগরিকের শিরñেদের যে ভিডিও দৃশ্য প্রচারিত হয়েছিল সেখানে শিরñেদকারী ব্যক্তিটি কোন আরব ছিল না, ছিল একজন ব্রিটিশ। এমন ব্রিটিশ নাগরিক শ’য়ে শয়ে আছে আইএসে। এই সংগঠনে যোগ দিতে গত তিন বছরে এরা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। বেশিরভাগই গেছে সিরিয়া ও ইরাকে। যেখানে গিয়ে ওদের কেউ হয়েছে সুইসাইডবোম্বার, কেউ হয়েছে জল্লাদ, আবার কেউ বা প্রচারকাজেই নিয়োজিত রয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের হিসেবে প্রায় ৭ শ’ বিট্রিশ আইএসের সদস্য হিসেবে জিহাদে অংশ নিতে গেছে।

সুতরাং এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, ব্রিটেনে এক নতুন ধারায় সন্ত্রাসবাদী তৈরি হচ্ছে। ১৩-১৪ বছর আগে যেসব সস্ত্রাসবাদী তৈরি হতো তারা প্রায় সবাই ছিল পুরুষ। বয়স অধিকাংশ ক্ষেত্রে ২৫-৩৫ বছর। বিদেশে নিহত মুসলিম সিভিলিয়ানদের প্রতি সহমর্মিতাবোধ থেকে তারা উদ্বুদ্ধ হতো। এরাই ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বে বহুজাতিক হামলার পর সেখানে তালেবানদের পক্ষে লড়াই করতে গিয়েছিল।

তারপর থেকে বিশেষত গত ৭ মাসে ব্রিটিশ জিহাদীদের বয়স নেমে এসেছে ১৪ থেকে ২৫-এর মধ্যে। মেয়েরাও আছে প্রায় ১০ শতাংশ। কিছু শ্বেতাঙ্গ আছে। কেউ কেউ আগে খ্রীস্টান অথবা নাস্তিক ছিল। তবে ২০১২-১৫ সালের জিহাদীদের নিয়ে ঝামেলার মাত্রাটা বেশি। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে এদের সংশ্লিষ্টতা সচরাচর লক্ষণীয়। আগের প্রজন্মের জিহাদীদের তুলনায় এদের ধর্মভক্তি অপেক্ষাকৃত কম। ব্রিটেনে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। এদের ৪৬ শতাংশ সবচেয়ে বঞ্চনাময় এলাকায় বাস করে। এই বঞ্চিতদের মধ্যে কিছু অংশ জীবনে বড় কিছু করে ফেলার সুযোগের সন্ধানে থাকে। আইএস মার্কা তৎপরতা তাদের সামনে সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। ইন্টারনেট এই শ্রেণীর লোকদের মধ্য থেকে রিক্রুট করার পথ সুগম করেছে। আজ আইএস সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারে। টুইটার আর ইউটিউব ক্লিপের দ্বারা আইএসের বক্তব্য সহজেই পৌঁছে দেয়া হচ্ছে দ্বিতীয় প্রজন্মের এসব অভিবাসীর কাছে। আইএসের বক্তব্যে কেউ একবার প্রভাবিত হলে তাকে সহিংসতার পথে টেনে আনা তেমন কোন ব্যাপারই নয়।

সম্প্রতি কিছু কিছু ভূখ- হাতছাড়া হওয়া সত্ত্বেও আইএস এখনও ব্রিটেনের মতো আয়তনের এলাকায় প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে আছে। এই সংগঠনের কলেবর এবং রিক্রুট করার ক্ষমতার কাছে আল কায়েদাসহ অন্যান্য জঙ্গী সংগঠন নিতান্তই ম্লান হয়ে পড়ে। ইরাক ও সিরিয়ায় খিলাফত ঘোষণা আইএসকে ইসলামী জঙ্গীদের চোখে বাড়তি মর্যাদা এনে দিয়েছে। তার ওপর আছে এদের প্রচার-প্রচারণার অত্যাধুনিক কৌশল, বিশেষত ভিডিও রেকর্ডিংয়ে অসাধারণত্ব। আইএস সমর্থকদের টুইটার এ্যাকাউন্ট আছে ৫০ হাজারের বেশি। বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে আছে। আইএসের প্রচারণার একটি কৌশল হলো শত্রুর শিরñেদ করার মতো নিষ্ঠুরতা ভিডিওর মাধ্যমে তুলে ধরা। তবে নতুন রিক্রুটদের এটা যত না প্রভাব ফেলে, তার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে এই সংগঠনের দেখানো সুন্নি মুসলমান ভ্রাতৃত্ব ও মুসলমানদের গৌরব ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন। সিরিয়া ও ইরাকে আইএস নিজেকে সুন্নি মুসলমানদের চোখে নিপীড়ক এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিকল্প শক্তি প্রতিষ্ঠিত করেছে। আইএস এই শ্রেণীর সুন্নি মুসলমানদের কাছে একই সঙ্গে একটা বিকল্প সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আইএসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে যেসব বিদেশী মুসলমান এই বাহিনীতে যোগ দিয়েছে তাদের মধ্যে যে শুধু ব্রিটিশরাই আছে তা নয়, পোর্টস মাউথ, প্যারিস ও আমস্টারডাম থেকে মুসলমানরাও এদের দলে ভিড়েছে। আইএসের বিদেশী সৈন্যের সংখ্যা হবে সম্ভবত ৩ হাজার। তার মধ্যে এক হাজারের মতো চেচনিয়া থেকে এসেছে বলে শোনা যায়। সবশুদ্ধ ইউরোপীয় যোদ্ধার সংখ্যা হবে ২ হাজার। এদের মধ্যে কিছু আছে আমেরিকানও।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট