২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাঙ্গাকারা-ক্লার্ক দুই নক্ষত্রের বিদায়

  • মোঃ নুরুজ্জামান

একই সঙ্গে বিদায় ঘটল দুই দেশের দুই গ্রেট ক্রিকেটার কুমার সাঙ্গাকারা ও মাইকেল ক্লার্কের। তবে শেষটায় ভিন্ন অনুসঙ্গ নিয়ে আলোচনায় উঠে এলেন তারা। সাঙ্গা বিদায়ের ঘোষণা অনেক আগেই দিয়েছিলেন। কিন্তু ঐতিহ্যের এ্যাশেজে সিরিজ হারের পর অনেকটা হুট করে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ক্লার্ক। দু’জনের সমাপ্তির চিত্রটাও ভিন্ন। কলম্বোর পি সারা ওভালে জীবনের শেষ টেস্টে দলের হার দেখলেন সাঙ্গাকারা। অন্যদিকে সিরিজ হারলেও ম্যাচে জয় দিয়ে শেষ করলেন ক্লার্ক। যেভাবেই হোক, ক্রিকেট যে দুই তুখোড় উইলোবাজকে হারাল, তা বলা বাহুল্য।

দীর্ঘ ১৫ বছরের ক্যারিয়ারে ব্যাট হাতে করেছেন রানের পর রান, হাঁকিয়েছেন সেঞ্চুরির পর সেঞ্চুরি, দ্বীপদেশকে ভাসিয়েছেন আনন্দের বন্যায়, অনুজ্জ্বল বিদায় হলো সেই গ্রেটের। দল হারল বড় ব্যবধানে। নিজে করলেন মোটে ৩২ ও ১৮ রান। তাতে কি অনন্য সব অর্জন ম্লান হয়ে যায়? তাই তো পি সারা ওভালে প্রতিপক্ষ ভারত, স্থানীয় ভক্ত, লঙ্কান বোর্ড কর্তা, এমনকি দেশটির প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অকৃত্রিম শুভেচ্ছা পেলেন ৩৭ বছর বয়সী ব্যাটিং-জিনিয়াস। উপস্থিত ছিলেন বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান। মাইক্রোফোনে শেষবারের মতো ‘বিদায়’ বলতে গিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি আধুনিক ক্রিকেটে ভদ্রলোকের প্রতিমূর্ত সাঙ্গাকারা।

‘আজ আমাকে বিদায় জানাতে এখানে যারা হাজির হয়েছেন তাদের সবাইকে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ আমার বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান, সম্মানীয় প্রেসিডেন্ট, সতীর্থ ক্রিকেটার এবং অবশ্যই লঙ্কান সমর্থকদের, যারা এই দীর্ঘ ভ্রমণে আমার সঙ্গে ছিলেন এবং যাদের ভালবাসায় আমি সাঙ্গাকারা হতে পেরেছি। ধন্যবাদ প্রতিপক্ষ ভারতীয় খেলোয়াড়দেরও’, বলেন সাঙ্গাকারা। সুবক্তা হিসেবে পরিচিত সাঙ্গা তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে স্কুলজীবনের সহপাঠী-শিক্ষক থেকে শুরু করে মাঠের গ্রাউন্ডসম্যান, সাধারণ শ্রমিককেও ধন্যবাদ জানাতে ভুল করেননি। তিনি সত্যিকারার্থে কিংবদন্তি। আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান।

১৩৪ টেস্টে মোট রান ১২,৪০০। যে তালিকায় তার সামনে কেবল শচীন টেন্ডুলকর, রিকি পন্টিং, জ্যাক ক্যালিস ও রাহুল দ্রাবিড়। গড় ৫৩.৭৮, আধুনিক সময়ে যে কোন ব্যাটসম্যানের চেয়ে এগিয়ে। এমনকি ৫৩.৭৮, ৫২.৮৮, ৫২.৩১ ও ৫১.৮৫ গড় নিয়ে তার পেছনে গ্রেট শচীন, রাহুল, লারা, পন্টিংরা! অন্তত ২০ টেস্ট ম্যাচ খেলা ব্যাটসম্যানের মাপকাঠি ধরা হলে সাঙ্গার চেয়ে বেশি গড় মাত্র তিনজনের। ৯৯.৯৪ গড় নিয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে ডন ব্র্যাডম্যান। বাকিরা খুব কাছেÑ কেন ব্যারিংটন (৫৮.৬৭), ওয়ালি হ্যামন্ড (৫৮.৪৬), গ্যারি সোবার্স (৫৭.৭৮)। কুমার সাঙ্গাকারার এটাই আসল রেকর্ড। এমনকি উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান হয়েও এমন কৃতিত্ব বিরল।

কম যাননি ওয়ানডেতেও। এবারের বিশ্বকাপে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে টানা চার ম্যাচে হাঁকিয়েছেন সেঞ্চুরি। বয়স ৩৭, আরও দু-এক বছর খেলতে পারতেন। এ প্রসঙ্গে সাঙ্গার বক্তব্য, ‘চাইলে অনায়াশে দুই বছর চালিয়ে যেতে পারতাম। তাতে কম করে ১০০০ রান যোগ হতো। অবশ্যই ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের মালিক বনে যেতে পারতাম। গড়তে পারতাম সর্বোচ্চ ডাবল সেঞ্চুরিসহ আরও দারুণ কিছু রেকর্ড, হয়ে যেত ৪০টির বেশি টেস্ট সেঞ্চুরিও। এসব ভাবলে আপনার ভেতরে এক ধরনের লোভ কাজ করবে। কিন্তু ক্রিকেট এমন এক খেলা যেখানে ব্যক্তিগত লোভের স্থান নেই। সবার আগে দেশ। দেশের প্রয়োজনে নিজেকে উজার করে দিয়েছি, যা পেয়েছি তা নিয়ে সন্তুষ্ট আমি। এখন সময় তরুণদের সুযোগ করে দেয়ার।’ এই না হলে গ্রেট সাঙ্গাকারা।

অন্যদিকে এক ম্যাচ বাকি থাকতেই এ্যাশেজ ট্রফি খোয়ায় অস্ট্রেলিয়া। দলের ব্যর্থতায় তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েন অধিনায়ক ক্লার্ক। কিংস্টন ওভালে এ্যাশেজ সিরিজের শেষ ম্যাচ খেলে ক্রিকেটকে বিদায় জানান। অথচ সিরিজে পিছিয়ে পড়ার পরও অবসরের প্রসঙ্গ উড়িয়ে দিয়েছিলেন, চতুর্থ টেস্ট চলাকলে সেই ক্লার্ক হুট করে সিদ্ধান্ত নেন! ‘অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১শ’ বেশি টেস্ট খেলেছি। এটা বিরাট সৌভাগ্যের। সবসময় বলেছি, ক্রিকেট আমার কাছে ঋণী নয়, আমিই ক্রিকেটের কাছে ঋণী। এতদিন খেলতে পারলাম বলে কৃতজ্ঞ’, অবসরের ঘোষণা দিয়ে বলেন ক্লার্ক। তবে হতাশা ফুটে ওঠে পরের কথায়, যখন বলেন, ‘এভাবে চলে যেতে চাইনি, এ্যাশেজে, এমনকি জাতীয় দলের হয়ে ব্যক্তিগতভাবে গত ১২ মাস ছিল খুবই হতাশার। ড্রেসিংরুমে কাউকে আর কষ্ট দিতে চাই না। মনে হয়েছে বিদায় বলার এটাই সময়।’ ২০০৩ সাল থেকে ১১৫ টেস্টে ৪৯.১০ গড়ে করেছেন ৮,৬৪৩ রান। সেঞ্চুরি ২৮। ২৪৫ ওয়ানডেতে সংগ্রহ ৭,৯৮১। সেঞ্চুরি ৮। ক্লার্কের নেতৃত্বে ৪৭ টেস্টের ২৪টিতে জয় পেয়েছে অস্ট্রেলিয়া, হার ১৬টিতে। আর ৭৪ ওয়ানডের ৫০টিতে জয়, হার ২১। ১৩ টেস্ট সিরিজে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করে জিতিয়েছেন ৮টিতে। চতুর্থ অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক হিসেবে উপহার দিয়েছেন বিশ্বকাপও। সেই তাকেই বিদায় নিতে হলো অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধে!

তাতে কিছুটা হলেও বিতর্কের তৈরি হয়। দেশটির সাবেক কিংবদন্তি ক্রিকেটার শেন ওয়ার্ন যেমন বলেন, ‘ওরা অযথাই ক্লার্কের সমালোচনা করছে। তারা বুঝতে পারছে না যে, আমরা সেরা একটি ক্রিকেটার ও অধিনায়ককে হারালাম।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘বোর্ড (সিএ) প্রধান এবং কোচ তাকে পছন্দ করে না। এটা অন্যায়। ক্লার্কের প্রতি তাদের সম্মান থাকা উচিত। ক্লার্ক অসিদের হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছে। এ্যাশেজে ইংল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশও করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রোটিয়াদের বিপক্ষে সিরিজ জিতেছে। সেই সঙ্গে তার টেস্টে ৮ হাজারের ওপরে রান ওর।’ ব্যাটসম্যান ক্লার্ককে কিংবদন্তি এ্যালান বোর্ডারের সঙ্গে তুলনা করে ওয়ার্ন বলেন, ‘আমরা শুনেছি, যে কোন ম্যাচের আগে বোর্ডার বিশেষ পরিকল্পনা করতেন। ঠিক এই জায়গাতেই ক্লার্ক এবং বর্ডার এক জায়গায়। ক্লার্কও প্রতি ম্যাচের আগে নানা ধরনের পরিকল্পনা করত। অধিনায়ক হিসেবে ও কতটা পরিণত ছিল, তা বলে বোঝানো যাবে না।’ ক্লার্কের বিদায়ে আসন্ন বাংলাদেশ সফর থেকে স্থায়ীভাবে অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্ব দেবেন তরুণ স্টিভেন স্মিথ।