১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ট্র্যাকের রাজা-রানী বোল্ট ও শেলী

  • বিউটি পারভীন

সন্দেহ তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। দীর্ঘ ছয় সপ্তাহ ছিলেন ট্র্যাকেরই বাইরে এবং মৌসুমে নিজের সেরা ৯.৮৭ টাইমিং নিয়ে র‌্যাঙ্কিং নেমে গিয়েছিল ৬ নম্বরে। সর্বকালের সবচেয়ে গতিধর মানব বিশ্বরেকর্ডধারী উসাইন বোল্টের শ্রেষ্ঠত্ব ক্ষুণœ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ অন্যদিকে তার চরম প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিন গ্যাটলিন তুলেছিলেন গতিঝড় এবং মৌসুমসেরা ৯.৭৪ সেকেন্ড টাইমিং নিয়ে ছিলেন শীর্ষে। কিন্তু যে বার্ডস নেস্ট স্টেডিয়ামে বিশ্বরেকর্ড দিয়ে শুরু করেছিলেন সাত বছর আগে অলিম্পিকে, সেখানে আবারও সেরা হিসেবেই শেষ করেছেন ‘বিদ্যুত’ বোল্ট। ০.০১ সেকেন্ডের ব্যবধানে টানা ২৮ রেস বিজয়ী গ্যাটলিনকে পরাস্ত করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছেন। বোল্ট যদি হন গতির সম্রাট, তাহলে তার স্বদেশী মহিলা স্প্রিন্টার শেলী এ্যান ফ্রেজার-প্রাইস গতির সম্রাজ্ঞী। বোল্টের মতোই তিনিও তৃতীয়বারের মতো বিশ্বসেরা হয়েছেন ১০.৭৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে। গতিময়তার দুনিয়ায় তাই শ্রেষ্ঠত্ব অটুট থাকল জ্যামাইকার দখলে।

শুরু করেছিলেন বেজিংয়ের বার্ডস নেস্ট দিয়ে। ক্যারিয়ারের প্রথম অলিম্পিকে অংশ নিয়েই চিতার ক্ষিপ্রতা দেখিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েন ৯.৬৯ সেকেন্ড টাইমিং গড়ে। পরের বছরই অবশ্য ৯.৫৮ সেকেন্ড সময় নিয়ে নতুন যে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন ১০০ মিটারে সেটা এখনও বহালতবিয়তে আছে। বিশ্বের অন্য কোন স্প্রিন্টার পারেননি ধারেকাছেও যেতে। তবে এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সাত বছর পেরিয়ে গেছে। বয়স বেড়ে ২৯ হয়ে গেছে বোল্টের। সঙ্গে ছিল দুটি গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত হওয়া এবং ইনজুরির সমস্যা। পুরো এক বছরে অল্প কয়েকটি রেসে নেমেছিলেন বোল্ট। ততদিনে ট্র্যাক এ্যান্ড ফিল্ডে ঝড়োগতি দেখিয়ে ক্রীড়ানুরাগীদের সমর্থন নিজের ওপর নিয়ে ফেলেছেন গ্যাটলিন। টানা ২৮ রেস জয় এবং সেমিতে ৯.৭৭ সেকেন্ড টাইমিং। মৌসুমসেরা ৯.৭৪ সেকেন্ড ছাড়াও এ বছর দু’বার তিনি ৯.৭৫ সেকেন্ড নিয়ে শেষ করেছেন ১০০ মিটার। কিন্তু ফাইনাল তো অন্য এক স্নায়ুচাপ। আর নিজের ওপর বিশ্বাস হারাননি বোল্ট। তাছাড়া গ্যাটলিনের বিরুদ্ধে জয়-পরাজয়ের পরিসংখ্যানটা ছিল ৬-১। এ কারণে দুর্বিনীত হয়ে ওঠা গ্যাটলিনকে আবারও পেছনে ফেলেছেন। জয়ের পর তিনি বলেন, ‘যে কোন শীর্ষ এ্যাথলেটকে প্রশ্ন করে দেখুন তিনি যদি নিজেকে নিয়েই সন্দিহান থাকেন সেক্ষেত্রে আগেভাগেই পরাজিত হয়ে যান। আমি কখনও নিজেকে নিয়ে সন্দিহান ছিলাম না এবং নিজের সামর্থ্য আমি জানি। আমার যেটা প্রয়োজন ছিল সেটা হচ্ছে সবকিছু একত্রে করে ভালভাবে দৌড়ানো। আমি নিখুঁত ছিলাম না, কিন্তু যা চেয়েছিলাম তাই করতে পেরেছি।’

শুধু এদিন জিতেছেন তাই নয়, বিশ্ব এ্যাথলেটিক্সে ব্যক্তিগতভাবে সর্বাধিক পাঁচ সোনাজয়ী এ্যাথলেট এখন তিনি। ছাড়িয়ে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কার্ল লুইস, মাইকেল জনসন ও এ্যালিসন ফেলিক্সকে। বিশ্ব আসরে সব মিলিয়ে পদক জয়েও পুরুষ এ্যাথলেটদের মধ্যে বোল্ট এখন সবার উপরে। তিনি ৯ স্বর্ণ ও ২ রৌপ্যসহ ১১ পদক জিতেছেন আর লুইস জিতেছিলেন ১০ পদক। তবে এবার বিশ্ব আসরে জেতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সংগ্রাম করেছি অনেক এবং নিজের নৈপুণ্য পড়ে গিয়েছিল। সুতরাং ফাইনালে এভাবে নিজেকে ফিরে পাওয়া এবং জেতাটা অবশ্যই অনেক বড় বিষয়। কিন্তু যখন প্রতিযোগিতায় নামা হয় তখনই সেটা এক নম্বর আকাক্সিক্ষত লড়াই হয়ে ওঠে। আমি এখানে নিজের কিংবদন্তি মর্যাদাটা আরেকটু শাণিয়ে নিতে এসেছিলাম এবং সেজন্য দেশের হয়ে জিততে চেয়েছিলাম। চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নিজের উচ্চতা আরও বাড়াতে চেয়েছিলাম। সেটাই পেরেছি বলে খুশি।’ অবশ্য জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আগেই বোঝা যাচ্ছিল। একটা পলক মাত্র। বার্ডস নেস্টে রবিবার ১০০ মিটার স্প্রিন্টের ফাইনালে যে দর্শকরা একটা পলক ফেলেছেন তারাই বঞ্চিত হয়েছেন বোল্টের ০.০১ সেকেন্ড এগিয়ে থেকে শেষ লাইন ছোঁয়ার সময়টাকে। এত কম ব্যবধানে আগের কোন ফাইনালে জেতেননি এ জ্যামাইকান। এ বিষয়ে বোল্ট বলেন, ‘এটা অবশ্যই আমার ক্যারিয়ারের কঠিনতম রেস। আমি অনেক বছর আগেই শিখেছি যে, জাস্টিন যখন কোন চ্যাম্পিয়নশিপসে আসেন তখনই নতুন কিছু করে দেখান। এ কারণে আমি নিশ্চিত ছিলাম জিততে হলে আমার জীবনের সেরা দৌড়টাই দিতে হবে।’ সম্রাট হিসেবে নিজের অবস্থান ধরেই রাখলেন। অথচ সেমিফাইনালে ৯.৯৬ সেকেন্ড সময় নিতে হয়েছিল তাকে। হিটেও খুব বেশি গতি তুলতে পারেননি। গত এক বছরে এটিসহ মাত্র দু’বার ১০ সেকেন্ডের নিচে টাইমিং করেছেন। আর ফাইনালে মৌসুমে নিজের সেরা টাইমিং গড়েই জিতলেন তিনি। বোল্টের পাশাপাশি এতদিন গতির রাজ্যে রানী ছিলেন শেলী। কিন্তু এবার তিনিও তা ধরে রাখতে পারবেন কিনা সেটা নিয়ে ছিল সংশয়। কিন্তু বোল্টকে দেখে অবশ্যই অনুপ্রাণিত হয়েছেন এ মহিলা স্প্রিন্টার। বোল্টের মতোই ২০০৯ ও ২০১৩ সালের বিশ্ব এ্যাথলেটিক্সে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। বোল্টের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই যেন ২০০৮ ও ২০১২ অলিম্পিকে ডাবলও জয় করেছিলেন। এবার সেই সাফল্য ধরে রাখলেন শেলী। সময় নিলেন ১০.৭৬ সেকেন্ড। তার পেছনে থাকলেন হল্যান্ডের সাবেক হেপ্টাথলন এ্যাথলেট ড্যাফনে শিপার্স ১০.৮১ সেকেন্ড টাইমিং নিয়ে। আবারও বিশ্বসেরা হয়ে বোল্ট এখন আরেকটি রেকর্ড গড়ার অপেক্ষায়। ২০০ মিটার স্প্রিন্টেও জিতলে প্রথম স্প্রিন্টার হিসেবে তিনবার বিশ্ব আসরে ডাবল জয়ের অনন্য নজির সৃষ্টি করবেন তিনি। তবে এমনটা ইচ্ছা নেই শেলীর। ৩৩ বছর বয়সী এ দ্রুততম মানবী জয়ের পর এ বিষয়ে বলেন, ‘আমার যে লক্ষ্য ছিল সেটা আমি পূরণ করেছি। আর কিছুই আমি প্রত্যাশা করি না। ১০০ মিটারে চ্যাম্পিয়ন হতে এসেছিলাম, সেটা হতে পেরেছি। আমার পরবর্তী লক্ষ্য অবশ্যই রিও ডি জেনিরো অলিম্পিক। ২০০ মিটারে আমার কোন লক্ষ্য নেই।’ মাত্র ২১ বছর বয়সে বেজিংয়ের বার্ডস নেস্টে আগন্তুক হিসেবে এসেছিলেন শেলী এবং স্বর্ণ জিতে ফিরেছিলেন। বোল্টের ঘটনাও তাই। সাত বছর পরও বেজিং এবং বার্ডস নেস্টের সঙ্গে পুরো বিশ্ব গতির অভিন্ন সেই সম্রাট-সম্রাজ্ঞীকেই দেখলো। সময় পরিবর্তন হলেও নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব অটুট রাখলেন এ দুই জ্যামাইকান গৌরব।ৃ