২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্বে জ্বালানি তেলের দাম কমার সুফল পাচ্ছে না দেশের মানুষ

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ অনেক দেশেই জ্বালানি তেল জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য। তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর এই লাইফব্লাড বা ‘প্রাণরক্ত’ এখন বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা পণ্যে পরিণত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ জ্বালানি তেলের এই মূল্য হ্রাসের কোন সুফল না পেলেও বিশ্বের তেল ভিত্তিক দেশগুলোর অর্থনীতি এখন টালমাটাল। তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোতে ক্রমেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে। আবার অনেক দেশই তেলের মূল্য হ্রাসের কারণে লাভবান হচ্ছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা। তবে এ মূল্য হ্রাসের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বাংলাদেশের জনগণ।

এক বছর আগেও বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ছিল ব্যারেল প্রতি ১০৩ মার্কিন ডলার। গত সোমবার ওই তেলের মূল্যই ৪২ ডলারে নেমে এসেছে। যা গত শুক্রবারের চেয়েও ছয় শতাংশ কম।

তেল ভিত্তিক অর্থনীতির দেশ ইরাকের রাজনীতি এখন ইসলামিক স্টেটের হুমকির মুখেই পড়েনি, দেশটির সরকার বিদ্যুত দিতে না পারায় জনগণের ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে পড়েছে। তারা এখন সরকারের কাছে তেল বিক্রির টাকার হিসাব জানতে চাইছে। অপর শীর্ষস্থানীয় তেল উৎপাদক দেশ রাশিয়ার জনগণকেও এখন পণ্য আমদানিতে বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। এটা হচ্ছে মূলত দেশটির মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়নের কারণে। একই অবস্থা নাইজিরিয়া ও ভেনিজুয়েলারও। তেলের ওপর নির্ভরশীল এ দুটি দেশও অস্থিরতা ও অসন্তোষ সৃষ্টির শঙ্কার মধ্যে রয়েছে।

ইকুয়েডরের মতো দেশেরও তেল রফতানি আয় গত এক বছরে অর্ধেকে নেমে এসেছে। এই দেশটিতেও প্রতি সপ্তাহে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে বিক্ষোভ করছে সরকারের আর্থিক নীতির বিরুদ্ধে।

এমনকি সম্পদশালী দেশ সৌদি আরবও তেলের মূল্য কমে যাওয়ায় অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে। এই দেশটিকে এক মাসে প্রায় ১০০০ কোটি ডলার ঋণ করতে হয়েছে তার কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য। ২০০৭ সালের পর এই প্রথম সৌদি আরবকে অর্থ বাজার থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার করতে হলো।

তেল রফতানির ওপর নির্ভরশীল পারস্য উপসাগরের অপর আরব দেশগুলোর অবস্থাও সঙ্গিন। কুয়েত, ওমান এবং বাহরাইনের মতো দেশও গত দুই দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো বাজেট ঘাটতির মধ্যে পড়তে হয়েছে।

এই দেশগুলো যতই স্বপ্ন দেখছে যে, জ্বালানি তেলের এই নিম্ন দাম হবে খুবই ‘সাময়িক’, ততই কমে যাচ্ছে তেলের দাম। গত কয়েক মাসেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। আর তেলের এই মূল্য পতনে গত এক বছরে প্রধান তেল রফতানিকারক দেশগুলো এক ট্রিলিয়ন ডলার লোকসান দিয়েছে। তারপরও তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর এখন চাওয়া তেলের দাম অন্তত ৬০ ডলারের মধ্যে থাকুক। কিন্তু তেলের মূল্যের যে অধোগতি দেখা যাচ্ছে, তাতে আশঙ্কা করা হচ্ছে এই মূল্য প্রতি ব্যারেল ৩০ ডলারে নেমে আসতে পারে। তেল দাম পড়ে যাওয়ায় শুধু অস্বস্তির মধ্যেই পড়েনি তেল উৎপাদক দেশগুলো, তাদের রফতানি আয় সমান রাখতে বেশি পরিমাণে তেল উৎপাদন করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে এগিয়ে আছে সৌদি আরব। পারস্য উপসাগরের এ দেশটি শুধু রেকর্ড পরিমাণ তেল উৎপাদন করেই চলছে না, ভবিষ্যত উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য তেল উত্তোলনের রিগের সংখ্যাও বাড়াচ্ছে। এমনকি এই আইএসের এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই ইরাক তার তেলের উৎপাদন এক লাফে প্রায় ২০ শতাংশ বাড়িয়েছে। ইরানও এখন উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরের পর তেল উৎপাদন বাড়িয়েছে। দেশটি এখন ১০ লাখ ব্যারেল উৎপাদন বাড়িয়ে ৯ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে।

চীনা অর্থনীতির দুর্বলতা এখন পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে চীনের ওপর নির্ভরশীল তেল উৎপাদক দেশগুলো এক সময় যে সুখের সাগরে ভাসছিল, তারা এখন ‘তৈলশোকে’ ভুগছে।

তবে তেলের এই মূল্য পতন নিঃসন্দেহে অনেক দেশের জন্যই সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। লাভবান হচ্ছে তেল আমদানিকারক দেশগুলো। যদিও বাংলাদেশের মানুষ জ্বালানি তেলের এই কম মূল্যের কোন সুফল পাচ্ছে না। এর সুফল ভোগ করছে সরকার একাই। অদক্ষ সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের দায়ভার বহন করতে হচ্ছে দেশের জনগণকে। আইএমএফ প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করে তেলের দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। তবে এখন সরকার দাম কমানোর এ ঘোষণা থেকে পিছু হটছে।

জ্বালানি তেলের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তেলের দাম বেশি থাকায় পরিবহন ব্যয় বেশি হচ্ছে। ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। ফলে ভোক্তাদের বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। এতে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে ছয়-সাত শতাংশের ঘরে অবস্থান করছে।

জ্বালানি তেলের এই মূল্য হ্রাসের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দেশ যুক্তরাষ্ট্র। প্রতি বছর গড়ে একজন আমেরিকান ১২শ’ গ্যালন তেল ক্রয় করে। ২০১৪ সালের পর মার্কিনীরা সেই তেল এখন এক ডলারের নিচে ক্রয় করতে পারছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে তেলের ব্যবহার এখন অনেক কমে গেছে।

তেলের এই মূল্য হ্রাস আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর দুর্বলতা কেটে যাচ্ছে। তারা এখন কম দাম বেশি পণ্য ক্রয় করতে পারছে। শিল্প সমৃদ্ধ দেশগুলোও এক্ষেত্রে সুবিধা পাচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাসের নানা প্রভাব রয়েছে। আমদানিনির্ভর বিধায় একদিকে আমদানি ব্যয় কমবে। এর ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যের স্থিতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে ট্যারিফ ভ্যালুর ভিত্তিতে আমদানি পর্যায়ে জ্বালানি তেল থেকে প্রাপ্ত শুল্ক ও করাদি নির্ধারিত হয় বিধায় এ খাতে রাজস্ব আদায় অপরিবর্তিত থাকবে। এমনকি মূল্য হ্রাসের কারণে আমদানি বৃদ্ধি পেলে রাজস্ব বাড়তেও পারে। দুটি সরকারী প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন আমদানি মূল্য হ্রাস এবং বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড জ্বালানি ব্যয় হ্রাসের ফলে বিশেষভাবে উপকৃত হবে।

জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস বাংলাদেশে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণকে অবাধ ও প্রতিযোগিতামূলক করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের মতো এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। জ্বালানি তেলের মূল্য কিছুটা হ্রাস করে নাগরিক প্রত্যাশা পূরণ এবং অর্থনীতি চাঙা করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। বিশেষত বাস-ট্রেনের ভাড়া থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন, এমনকি শাকসবজির মূল্যের ওপর ডিজেলের মূল্যের পরিবর্তনের ব্যাপক প্রতিক্রিয়া রয়েছে। বিভিন্ন পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের জন্য প্রদত্ত ভর্তুকি ও পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।

অনেক সময়ই বৈরি বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্ভব হয় না। জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস, বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার অতি প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

উল্লেখ্য, ১৯৮৬-২০০৪ সময়কালে তেলের মূল্য ছিল বর্তমান মূল্যে ২১-৪৮ মার্কিন ডলার। ২১-৪৮ মার্কিন ডলার তেলের মূল্যকে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর ৪৮-১২০ মার্কিন ডলার তেলের মূল্যকে ওপেক নির্ধারিত একচেটিয়া মূল্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সার্বিক বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তেলের মূল্য, দৈব দুর্ঘটনা না ঘটলে, বর্তমান নিম্ন পর্যায়ে বেশ কিছুদিন স্থিতিশীল থাকবে।