২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ছে ১ সেপ্টেম্বর থেকে

রশিদ মামুন ॥ জ্বালানি তেলের দাম না কমলেও বাড়ছে গ্যাস এবং বিদ্যুতের দাম। সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য আপাতত না কমানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে আগামী পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে বাড়ছে গ্যাস এবং বিদ্যুতের দর। বিদ্যুত এবং দেশীয় সারকারখানা ছাড়া সকল খাতে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাবে গড়ে ২০ থেকে ২৫ ভাগ হারে। অন্যদিকে ৬০০ ইউনিটের অতিরিক্ত বিদ্যুত ব্যবহারকারীদের গুনতে হবে বাড়তি বিল। সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং কৃষি সেচে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হবে না। বিদ্যুত-জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র বুধবার এসব খবর নিশ্চিত করেছে।

বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় শিল্প উন্নয়ন পরিষদ এবং প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টার সভাপতিত্বে বিদ্যুত এবং গ্যাসের মূল্যহার সমন্বয় সংক্রান্ত পৃথক দুটি বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দুটি বৈঠকেই বিদ্যুত এবং গ্যাসের দাম বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক সূত্র বলছে, বিপিসির লোকশান কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ে সাধারণ মানুষ কোন সুবিধা পাবেন না এমন আশঙ্কা থেকে জ্বালানি তেলের দাম আপাতত কমানো হচ্ছে না।

দেশীয় বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমাতে যাচ্ছে অর্থমন্ত্রীর এমন বক্তব্যর পরই সরকার আপাতত জ্বালানি তেলের দাম না কমানোর সিদ্ধান্ত এল। জ্বালানি তেলের দাম বিশ্ববাজারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছানোতে মূল্য সন্বয়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। অর্থ-বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে কাজ করছে বলেও সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে জানিয়েছিল।

এখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেল বিক্রি হচ্ছে ৪০ ডলারে। আর আগামী ২০২০ সাল পর্যন্ত এই দাম ব্যারেল প্রতি ৫০ ডলারের মধ্যেই থাকবে বলে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এর প্রেক্ষিতে দেশেও জ্বালানির দর কমানো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলছিল। তবে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে নানা সময়ে এ বিষয়ে না সূচক উত্তর আসে। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। তবে বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত আপতত সরকার নিচ্ছে না বলে জানানো হলো।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় শিল্প উন্নয়ন পরিষদের বৈঠকে দেশের শিল্প কারখানায় গ্যাস এবং বিদ্যুত সংযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় দাম বৃদ্ধির প্রসঙ্গটি আসলে ব্যবসায়ীরা গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে সম্মতি জানান। তারা আবাসিক ব্যবহারকারীর ১২ ভাগ এবং সিএনজির ছয় ভাগ গ্যাস শিল্প কারখানায় দেয়ার সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত নিশ্চিত করতে পারলে ক্যাপটিভ (শিল্প কারখানার নিজস্ব জেনারেটরে) গ্যাস সংযোগ না দেয়ার সরকারী নীতিকেও সমর্থন করেন তারা।

অন্যদিকে বিদ্যুত এবং গ্যাসের মূল্যহার বৃদ্ধি সংক্রান্ত বৈঠকে বিদ্যুত জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, বিদ্যুত সচিব মনোয়ার ইসলাম, জ্বালানি সচিব আবু বকর সিদ্দিক এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের প্রতিনিধিও অংশ নেন বলে জানা গেছে।

বিদ্যুত জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এ প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে বলেন, আবাসিক শিল্প এবং বাণিজ্যে গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করা উচিত। আমরা শিল্প কারখানায় ৩৫০টি গ্যাসের সংযোগ এবং লোড বৃদ্ধি করেছি। এছাড়া গত বছরই ৩৫ হাজার ৯১৪টি শিল্প কারখানায় নতুন সংযোগ দিয়েছি। ভবিষ্যতেও শিল্প কারখানায় গ্যাস এবং বিদ্যুত সংযোগের বিষয়টি অব্যাহত রাখতে চাই। আমাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা হচ্ছে শিল্প কারখানায় নিরবছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ করা। তবে বিষয়গুলো বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের বিবেচনায় রয়েছে আশা করছি তারাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গ্যাস এবং বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে রয়েছে। এসব প্রস্তাব যাচাই বাছাই করে দাম বৃদ্ধির বিষয়টিও নির্দিষ্ট করেছে। তবে সরকারের সবুজ সংকেত না পাওয়ায় এতদিন ঘোষণা দেয়নি বিইআরসি।

তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমায় দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমেছে। বিশেষ করে কয়েকটি ভাড়ায় চালিত বিদ্যুত কেন্দ্র সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল ক্রয় করে বিদ্যুত উৎপাদন করছে। এছাড়া অন্য কেন্দ্রগুলোকেও শীঘ্রই ফার্নেস অয়েল আমদানির অনুমোদন দিয়ে দেবে জ্বালানি বিভাগ। এতে বিদ্যুত খাতে জ্বালানি তেলের ব্যবহারে অতিরক্তি অর্থ ব্যয় করতে হবে না। এখন যে কোন কোম্পানি চাইলেই বিদেশ থেকে তেল ক্রয় করে বিদ্যুত কেন্দ্র চালাতে পারে।

সরকারী সূত্রগুলো বলছে, জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ে দেশে পরিবহন ভাড়া পুনর্নির্ধারণ হবে না। উপরন্তু এখন দেশের সবগুলো দূরপাল্লার পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনার জন্য মালিক সমিতি দাবি করছে। তাদের দাবি অনুযায়ী দূরপাল্লার সকল বাসের ভাড়া পুনর্নির্ধারণে বিআরটিএকে নির্দেশ দিয়েছে সড়ক পরিবহন এবং সেতু মন্ত্রণালয়।

আবাসিক গ্রাহক পর্যায় গ্যাসের দাম ১২২ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব রেখে এক চুলার গ্যাস ৪০০ টাকার স্থলে ৮৫০ টাকা ও দুই চুলা ৪৫০ টাকার স্থলে এক হাজার টাকার প্রস্তাব পাঠায় বিতরণ কোম্পানিগুলো। অন্যান্যদের ক্ষেত্রে শিল্পের জন্য প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ১৬৫ দশমিক ৯১ থেকে বাড়িয়ে ২২০ টাকা, বাণিজ্যিকে ২৬৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০৫ টাকা, চা বাগানে ১৬৫ দশমিক ৯১ থেকে বাড়িয়ে ২০০ টাকা, শিল্প-কারখানায় স্থাপিত নিজস্ব বিদ্যুত বা ক্যাপটিভ পাওয়ারে ১১৮ দশমিক ২৬ থেকে ২৪০ টাকা, বিদ্যুত উৎপাদনে ব্যবহƒত গ্যাস ৭৯ দশমিক ৮২ থেকে ৮৪ টাকা, সিএনজিতে ৬৫১ দশমিক ২৯ থেকে ৯০৫ দশমিক ৯২ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছিল দর প্রস্তাবে। এছাড়া সার কারখানার গ্যাস ৭২ দশমিক ৯২ থেকে মাত্র ৮০ টাকা করার প্রস্তাব দেয় গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন শুনানি করে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা খুঁজে পায়নি। উপরন্তু দেশীয় কোম্পানিগুলো এখন লাভজনকভাবে চলছে বলে শুনানিতে দেখা যায়। যদিও এখন বলা হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ ভাগ গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হবে। সরকারী সূত্র বলছে সার উৎপাদন ছাড়া অন্য সকল ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে। তবে কাফকোর সারকারখানায় গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে। তাদের সঙ্গে সরকারের ২০ বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। কোম্পানিটি বাংলাদেশের দরে গ্যাস নিয়ে আন্তর্জাতিক দামে বাংলাদেশের কাছেই সার বিক্রি করে আসছে।

এর আগে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি সবশেষ ২০০৯ সালে নির্বাহী আদেশে করা হয়। এরপর সিএনজির মূল্য কয়েক ধাপে সমন্বয় করা হলেও শিল্প, আবাসিক ও অন্যান্য খাতের গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়নি।

বিইআরসিতে প্রস্তাব এবং মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ থেকে জানা যায়, পিজিসিবির বিদ্যুতের সঞ্চালন মাশুল ইউনিটে ১৬ দশমিক ৭৪ ভাগ বৃদ্ধির প্রস্তাবে এক দশমিক ৫৩ ভাগ বৃদ্ধিকে যুক্তিযুক্ত মনে করছে কমিটি। অন্যদিকে ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ২১ দশমিক ৩১ ভাগ বৃদ্ধির প্রস্তাবের স্থলে দুই দশমিক ২৮ ভাগ, আরইবির ১৫ দশমিক ৬০ ভাগ বৃদ্ধির প্রস্তাবের স্থলে দশমিক ২৭ ভাগ এবং পিডিবির ২২ ভাগের স্থলে তিন দশমিক নয় ভাগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এছাড়া ডিপিডিসি এর ১৭ দশমিক ৮৫ ভাগ এবং ডেসকোর ১৮ দশমিক ৬২ ভাগ বৃদ্ধির দুটি প্রস্তাব নাকোচ করে দিয়েছে কমিশন।

পাইকারি পর্যায়ে সরকারের গত মেয়াদে ছয় দফায় দুই টাকা ৩৭ পয়সা থেকে ৯৮ দশমিক ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি করে চার টাকা ৭০ পয়সা করা হয় বিদ্যুতের দাম। সর্বশেষ বাড়ানো হয় ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে। আর গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে চার টাকা থেকে ৫৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে ছয় টাকা ১৫ পয়সা করা হয়। সর্বশেষ বাড়নো হয় গত বছর মার্চে। তখন বলা হয় অনেকদিন আর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না বলেই বিদ্যুতের দাম কিছুটা বেশি বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু তুলনামূলকভাবে একটু বেশি দাম বৃদ্ধির পর আবারও বিতরণ কোম্পানিগুলো বছর না ঘুরতে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির আবেদন নিয়ে কমিশনে হাজির হয়।