২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হামজা ব্রিগেডে অর্থায়ন নয়, মক্কেলের অর্থ ফেরতের স্বীকারোক্তি

  • চট্টগ্রামের আদালতে তিন আইনজীবীর জবানবন্দী

মাকসুদ আহমদ, চট্টগ্রাম অফিস ॥ জঙ্গী সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেডের ফান্ডে অর্থায়ন নয়, মক্কেল থেকে নেয়া অর্থ ফেরত দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা ও তার দুই সহকারী এ্যাডভোকেট হাসানুজ্জামান লিটন ও এ্যাডভোকেট মাহফুজ চৌধুরী বাপন।

বুধবার সকালে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কুদরত-এ-এলাহীর আদালতে জঙ্গী অর্থায়নের অভিযোগে ও সন্ত্রাস দমন আইনে হাটহাজারী থানায় দায়ের করা একটি মামলায় র‌্যাবের ৪৮ ঘণ্টা রিমান্ড শেষে তাকে এবং তার দুই সহযোগীকে হাজির করা হয়। একই আদালতে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শহীদুল ইসলামের খাস কামরায় এ তিন আইনজীবী জঙ্গী অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ নিয়ে জবানবন্দী প্রদান করেছেন। জবানবন্দী প্রদান শেষে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোসাদ্দেক মিনহাজের আদালতের তাদের জামিনের ওপর শুনানি হয়। শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে দিয়ে তাদের জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপরই তাদের কড়া নিরাপত্তায় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

র‌্যাবের অভিযোগ, জঙ্গী সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেড নেতা মনিরুজ্জামান ইতোপূর্বে গ্রেফতার হওয়ার পর আদালতে তার প্রদত্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে তার তিনটি ব্যাংক এ্যাকাউন্টে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা ও তার দুই সহকারী আইনজীবীর মাধ্যমে চারটি ব্যাংক যথাক্রমে ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ডাচ বাংলা ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকে কয়েক দফায় মোট ১ কোটি ৮ লাখ টাকা জমা দেয়ার তথ্য প্রদান করে। এ প্রেক্ষিতেই এ তিন আইনজীবীকে গত ১৮ আগস্ট ঢাকার ধানম-ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাদের হামজা ব্রিগেডের বাঁশখালীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ঘটনা সংক্রান্ত মামলায় সেখানে আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ড শেষে গত ২৪ আগস্ট এ তিন আইনজীবী আদালতে মনিরুজ্জামান ডনের এ্যাকাউন্টে উপরোক্ত অর্থ জমা প্রদান নিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেন। পরদিন চট্টগ্রাম আদালতে র‌্যাবের আবেদনের প্রেক্ষিতে হামজা ব্রিগেডের হাটহাজারী মাদ্রাসাতুল আল আবু বকর মাদ্রাসার ঘটনা সংক্রান্তে মামলায় শাকিলা ফারজানাকে ৪৮ ঘণ্টা ও অপর দুজনকে ৭২ ঘণ্টার রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে নির্ধারিত সময়ের আগেই বুধবার তাদের র‌্যাবের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম আদালতে সোপর্দ করা হয়। এরপর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তারা একে একে দুপুর একটা থেকে প্রায় তিনটা নাগাদ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেন।

যেসব ব্যাংকের মাধ্যমে এ অর্থায়ন হয়েছে সে সব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী অভিযুক্ত আইনজীবী অর্থ জমাদানে অন লাইন ব্যাংকিংয়ের সুবিধা নিয়েছেন। শাকিলা ফারজানা দুদফায় ৫২ লাখ, এ্যাডভোকেট হাসানুজ্জামান লিটন ৩১ লাখ, এ্যাডভোকেট মাহফুজ চৌধুরী বাপন ২৫ লাখ টাকা নগদে জমা দেন।

এর আগে বিভিন্ন দফায় র‌্যাবের অভিযানে গ্রেফতার হয় হামজা ব্রিগেডের ২৯ সদস্য। যারমধ্যে ২৮ জনই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে আদালতে। এরমধ্যে হামজা ব্রিগেড নেতা মনিরুজ্জামান ডনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে স্পষ্টভাবে এ তিন আইনজীবীর মাধ্যমে অর্থ প্রদানের বিষয়টি পাওয়া গেছে। এরই ভিত্তিতে র‌্যাব তাদের গ্রেফতার করে।

আসামি পক্ষের আইনজীবীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে পুনরায় তাদের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোসাদ্দেক মিনহাজের আদালতে জামিন শুনানি হয়। এ সময় আদালতের অনুমতি নিয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা বলেন, আমি আমার নীতি আদর্শের কথা চিন্তা করে মক্কেল থেকে গ্রহণ করা অর্থ ফেরত দিয়েছি। আমি কোন ধরনের জঙ্গীপনায় জড়িত নই। এরপর আসামি পক্ষের আইনজীবী ও সরকার পক্ষের পিপির আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত জামিন না মঞ্জুর করে আসামিদের কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। জনাকীর্ণ আদালতে এ সংক্রান্ত কার্যক্রম শেষে র‌্যাব সেভেনের সদস্যরা কোর্ট পুলিশের সহায়তায় আসামিদের একটি মাইক্রোবাসযোগে কড়া নিরাপত্তায় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যায়।

আসামি পক্ষের আইনজীবী আবদুস সাত্তার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ব্যারিস্টার ফারজানা কোন ধরনের দোষ স্বীকার করেননি বলে তাকে জানিয়েছেন। অথচ তাদের ফাঁসানোর জন্য অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে। জঙ্গী অর্থায়নের জন্য টাকা জমা দেয়ার বিষয়ে যে কথা বলা হচ্ছে তা সঠিক নয়। মক্কেলের নিকট থেকে মামলা পরিচালনার জন্য নেয়া অর্থ ফেরত দেয়ার ঘটনা মাত্র। তাদের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে।

সরকার পক্ষের পিপি এ্যাডভোকেট আবুল হাশেম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সন্ত্রাস দমন আইনের মামলা হওয়ায় আমি জামিনের বিরোধিতা করেছি। কারণ আসামিরা জামিনে বেরিয়ে পালিয়ে যেতে পারেন। ফলে মামলার তদন্ত বাধাগ্রস্ত হবে। এছাড়াও মনিরুজ্জামান ডনসহ ২৮ জন তাদের স্বীকারোক্তিতে শাকিলা ফারজানা জড়িত থাকার বিষয়ে আদালতকে জানিয়েছেন। মনিরুজ্জামান ডন তার স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, শাকিলার সঙ্গে তার আগে দেখা ও কথা হয়েছে এবং অর্থ লেনদেনও হয়েছে। পিপি জানান, একজন আইনজীবী যখন কোন মক্কেল থেকে টাকা গ্রহণ করেন তা ফেরত প্রদানের কোন রেকর্ড নেই। মামলা পরিচালনার আগেই আইনজীবীকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় মামলার দায়িত্ব গ্রহণ করা বা না করা নিয়ে। লেনদেনের পরে অর্থ ফেরত দেয়ার কোন ঘটনা অতীতে ঘটেনি। তবে শাকিলা ফারজানা সুপ্রীম কোর্টে খুব বেশি হলে দুই থেকে তিন বছর প্র্যাকটিস করছেন। ফলে তিনি ততটা অভিজ্ঞও নন।

বুধবার আদালত প্রাঙ্গণে র‌্যাব সেভেনের এএসপি রুহুল আমিন ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, আজ আমরা আর কোন মামলায় এ আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে কোন আবেদন করিনি। হাটহাজারীর মামলায় আদালতে অভিযুক্তদের হাজির করা হয়েছে। জামিন শুনানি শেষে আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

নির্বাচিত সংবাদ