২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কালপ্রবাহের কবি

  • জাফর ওয়াজেদ

কবি নজরুল কোন বিশেষ দল কিংবা সমাজের ছিলেন, তা নয়। কোন দেশ, কাল ও জাতির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। সকল কালের মানুষের গীতে মুখর তাঁর কাব্য। বাঙালীর চিরকালের চেতনাকে সমুন্নত করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সকল কালের, সকল জাতির কবি। বনের কুসুমের মতো, আকাশের পাখির মতো আপনি ফুটে উঠেছেন আপন স্বভাবে। আপনি গান গেয়েছেন মুক্তকণ্ঠে, আপন খেয়ালে। আর সে কারণেই হয়ে উঠেছেন সর্বদলীয় কবি। শুধু মুসলমান বা শুধু হিন্দুর কবি ছিলেন না, ছিলেন সকল ধর্মের, সকল গোত্রের সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার স্মারক। নিজেই বলেছেন,‘ রাজবন্দীর জবানবন্দী’তে যে,‘‘ আমার কণ্ঠে প্রলয় হুংকার একা আমার নয়, সে নিখিল আর্ত-পীড়িত আত্মার যন্ত্রণার চিৎকার।’’ আবার এমনটাও বলেছেন, ‘ আমি লীগ কংগ্রেস কিছুই মানি না, মানি শুধু সত্যকে; মানি সর্বজনীন ভ্রাতৃত্বকে, মানি সর্বজনগণের মুক্তিকে।’ তাই দেখি ‘ বিদ্রোহী’র যে ‘আমি’ সেতো ‘বিশ্ব আমি’, সারা বিশ্বের মুক্তিকামী। সারা বিশ্বের উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল থামানোর জন্যই আজীবন সংগ্রামমুখর ছিলেন। জগতের অনশনবন্দী, লাঞ্ছিত জনগণের ঘুম ভাঙ্গাতে আশা-অনুপ্রেরণায় বিশ্ববাসীকে উদ্দীপ্ত করতেই যেন তাঁর আবির্ভাব। গেয়েছেন সাম্যের গান। বুঝেছেন, মানুষের চেয়ে নয় কিছু গরীয়ান। লিখেছেনও তাই, ‘দীন দরিদ্র রবে না কেউ সমান হবে সর্বজন/ বিশ্ব হবে মহাভারত নিত্যপ্রেমের বৃন্দাবন।’

নজরুল বাংলা সাহিত্য-সঙ্গীতের ইতিহাসে শুধু নয়, বাঙালীর রাজনৈতিক ইতিহাসেও অনন্য বিশিষ্টতার দাবিদার। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নজরুলের বিশিষ্টতার দাবি প্রতিষ্ঠা করে প্রধানত তার প্রথম পর্বের কবিতার মৌলিকতা এবং একটি দশকের রাজনৈতিক-সামাজিক আবেগকে ধারণ, গদ্যে-পদ্যে, বিশেষত কবিতায়। নজরুল একমাত্র কবি যিনি প্রতিবাদী লেখার দরুন কারাবরণ করেছেন। বিদেশী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে দ্রোহ ছিল একান্তই তার। প্রতিবাদী কণ্ঠ পৌঁছেছিল সারাদেশের স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষের চিত্তে ও চেতনায়। তিনি মূলত কবি। বিদ্রোহের কবি, সাম্যের কবি, গণজাগরণের কবি, সংগ্রামী কবি, চেতনার কবি, শ্রমজীবী মানুষের কবি, সাম্রাজ্যবাদী শোষণের হাত থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করার প্রয়াসের কবি। ভারত স্বাধীনতার প্রথম প্রেরণার দানের কবি। নজরুলের কাব্যভুবন, সঙ্গীতভুবন অথবা তার সামগ্রিক সৃষ্টির মধ্যে তার সৃষ্টিশীলতার সময়কালটি গুরুত্ববহ। পরাধীন দেশে স্বাধীনতার জন্য মানুষের মধ্যে যে গণজাগরণ প্রয়োজন, নজরুল সেখানে অগ্রপথিকের ভূমিকায় নেমেছেন। দেশমুক্তির সাধনায় নজরুলের সৃষ্টিশীল শিল্পীসত্তা জ্ঞান ও কর্মতৎপরতায় উদ্বুদ্ধ করেছে দেশবাসীকে। তার আগুনজ্বলা কবিতা কখনও ডাক দিয়েছে সাম্যবাদী চেতনাকে, কখনও বাঙালীর অনির্দিষ্ট বিপ্লবকে। বেশিরভাগ সময় যে বাণী ছড়াতে চেয়েছেন-কবিতা, গান ও গদ্য-তার সঙ্গে স্বল্পোন্নত বিশ্বের সাযুজ্য আজ আরও পরিষ্কার দেখা যায়। বলেছেন, ভাঙ, ভাঙ, ভাঙ। অথবা গাইছেন চল্, চল্, চল্। এই কবির আধুনিকতায় ধুলো পড়েনি, বক্তব্যেও নয়। পরমাসক্ত কবি নজরুল যিনি গড়ার জন্যই ভাঙতে চান। নজরুলের সবকিছুতেই ছিল তার বিদ্রোহী মন। শাসক নিয়ন্ত্রিত শিষ্টাচারের সংস্কৃতি পারেনি দেশজ সংস্কৃতির নজরুলকে পরিণত করতে দাসে। কোটি মানুষের ভারতবর্ষের, মুটে-মেথরের কবি বলে নিজেকে শনাক্ত করতেন তিনি সগর্বে। নজরুল নিজের সমাজ, ঐতিহ্য ও দেশকে ছাড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন বলেই নিজেকে বিশ্বের কবি মনে করতে পেরেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের পর সে কালের উজ্জ্বলতম কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)। খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনকেন্দ্রিক ক্ষণস্থায়ী হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির পরিবেশে কাজী নজরুল সাম্যবাদী চিন্তার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলা কাব্যক্ষেত্রে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর রচনার মধ্যে বিভিন্ন ভাবপ্রবাহের সঙ্গে মানবতাবোধের মহামিলনের ফলে তা এক অত্যাশ্চর্য পরিণতি লাভ করেছে। উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে কবি, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তিনি লেখনী চালনা করেছেন। মানবতার শক্তির জাগরণের অসামান্য কাব্যরূপ নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা।

কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যভাবনার এক প্রধান অংশজুড়ে আছে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি কামনা। স্মরণযোগ্য যে, সমগ্র আধুনিক বাংলাকাব্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামই একমাত্র কবি, যিনি সমান দক্ষতার সঙ্গে হিন্দু ও মুসলমান উভয় ঐতিহ্যকে আপন কাব্যে ব্যবহার করতে সমর্থ হয়েছেন। উভয় ঐতিহ্য থেকে অবলীলাক্রমে তিনি বিষয়, উপমা, রূপক, বাকভঙ্গি প্রভৃতি আহরণ করেছেন। তিনি একদিকে যেমন বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কালীকীর্তন রচয়িতা (রাঙ্গাজবা, ১৯৩৬), তেমনি অন্যদিকে তিনি বাংলা ইসলামী গানের প্রবর্তক (জুলফিকার, ১৯৩২) এবং কাব্যে আমপারা (১৩৩৩), মরুভাস্কর (১৩৬৪) প্রভৃতির প্রণেতা। নজরুলমানসে হিন্দু ও মুসলমান বৈপরীত্যের দ্যোতক না হয়ে পরিপূরক হতে পেরেছে তাঁর সাম্যবাদী চিন্তার ফলে। হিন্দু-মুসলমান মিলনকামী গান ‘কা-ারী হুঁশিয়ার’ যে গ্রন্থে মুদ্রিত হয়, সেই সর্বহারাতেই (১৯২৬) সাম্যবাদ বিষয়ক তাঁর অনেক কবিতা সঙ্কলিত হয়। প্রত্যক্ষভাবে নজরুল কবিমানসের মানবতাবোধ তথা সত্যসন্ধানের প্রকাশ ঘটেছে সাম্যবাদী (১৯২৫), সর্বহারা (১৯২৬), ফণিমনসা (১৯২৭), সন্ধ্যা (১৯২৯) ও প্রলয়শিখা (১৯৩০) কাব্যগ্রন্থসমূহে। এসব কাব্যে কবি সকল ‘ব্যবধান’ উত্তীর্ণ হয়ে মানুষের জয়গান করেছেন।

১৯২২ সালে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত অর্ধসাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ প্রকাশিত হয়। পত্রিকার শিরোভূষণ আশীর্বাণীতে রবীন্দ্রনাথ লিখেন : ‘আয় চলে আয় রে ধূমকেতু/আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,/দুর্দিনের এই দুর্গশিরে/উড়িয়ে দে তোর বিজয়-কেতন!/ অলক্ষণের তিলকরেখা/রাতের ভালে হোক না লেখা,/জাগিয়ে দে রে চমক মেরে/আছে যারা অর্ধ-চেতন।’ ধূমকেতু দাবি করে পূর্ণ স্বাধীনতা ‘সর্বপ্রথম, ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।... ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীদের অধীনে থাকবে না।’ ১৯২২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত হয় অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থ ও যুগবাণী প্রবন্ধগ্রন্থ। আর ধূমকেতুতে (২৬ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত হয় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা। ব্রিটিশ সরকার ওই কবিতা (আনন্দময়ীর আগমনে) এবং যুগবাণী গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করে। নবেম্বরে নজরুলকে কুমিল্লায় গ্রেফতার করে প্রেসিডেন্সি জেলে পাঠানো হয়। সরকার একের পর এক তাঁর গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করে। প্রকাশের প্রায় পরপরই বাজেয়াপ্ত হয় বিষের বাঁশি, ভাঙার গান ও প্রলয়শিখা। প্রলয়শিখার জন্য কবিকে ছয়মাসের সশ্রম কারাদ- প্রদান করা হয়। হাইকোর্ট থেকে কবির জামিন হয়। পরে গান্ধী-অরউইন চুক্তির ফলে ‘সরকারপক্ষ আপত্তি না করায়’ তিনি অব্যাহতি পান।

বস্তুতপক্ষে কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী বাংলার তারুণ্যের প্রতিমূর্তি। বিশ শতকের প্রথম চার দশকের বাংলা সাহিত্যেরও অন্যতম প্রধান প্রসঙ্গ ইউরোপ সম্পর্কে মোহভঙ্গ ও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম। সে ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের পর কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা, গান ও বক্তব্যই তৎকালীন তরুণ বাঙালীকে অনুপ্রাণিত করে। ১৯২৯ সালে কলকাতার এ্যালবার্ট হলে আয়োজিত ত্রিশ বছর বয়সে নজরুল সংবর্ধনা সভার সভাপতি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, প্রধান অতিথি সুভাষচন্দ্র বসু ও অন্যদের ভাষণে এ কথাই উচ্চারিত হয়। ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মাত্র দুই দশকের সাহিত্য ও সঙ্গীত সাধনায় নজরুল বাংলা কবিতা ও কাব্যগীতিতে সুস্পষ্ট স্বকীয়তার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

কবির কবিতা ও গান তার পরবর্তী কবিদের ওপর বিবিধ প্রভাব ফেলেছে। একদিকে তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ একদল কবি মানবতাবাদী ও সাম্যবাদী চিন্তাকে গ্রহণ করেছেন, অন্যদিকে তুরস্কের কামাল আতাতুর্কের বৈপ্লবিক ইসলামের আদর্শে উদ্বুদ্ধ তাঁর কবিতাবলী ও ইসলামী গান তৎকালীন বাঙালী মুসলিম তরুণ কবি-সম্প্রদায়কে অনুপ্রাণিত করেছে। নজরুল সাহিত্য ও সঙ্গীত সাধনা করেছিলেন পরাধীন দেশে, যে পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য তার লেখা গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত হয় একের পর এক। কবিকে গ্রেফতার করা হয়। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। জেল হয়। জেল-জুলুমের প্রতিবাদে অনশন করতে হয়। আর তিনি পরিণত হন কিংবদন্তির নায়কে। কিন্তু পরাধীন যুগের ওই কবির মন-মানসিকতা ও সৃষ্টিকর্মে পরাধীনতার কোন ছোঁয়া নেই। নজরুলের সৃষ্টির ভুবনে তিনি স্বাধীন। নজরুলের স্বাধীন চিত্ততার যে জাগরণ, তা তার সুস্থাবস্থায় কোনদিন লয় হয়নি। যদিও বলেছেন কবি, ‘আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসিনিÑ আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম।’ নতুন সৃষ্টির সাধনা ছিল নজরুলের শিল্পীসত্তার মূল প্রেরণা ও প্রবণতা। আর সেজন্যই সমাজ, সংস্কৃতি, শিল্প সর্বক্ষেত্রে পুরাতন ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধ ভাঙ্গার জন্য তিনি বিদ্রোহী। তার প্রবণতা ও আনন্দ ছিল নিজের জন্য আলাদা পথ তৈরি করে নেয়া। অর্থাৎ নতুন নতুন সৃষ্টিতে নবঐতিহ্য ও মূল্যবোধের সৃষ্টি করা। নজরুল করেছিলেনও তাই। নজরুল নিজেকে বলেছিলেন, ‘বর্তমানের কবি’। কিন্তু কালের কষ্টিপাথরে যাচিত হয়ে আজ স্পষ্ট নজরুল চিরকাল প্রবাহের কবি।

নির্বাচিত সংবাদ