২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ষড়যন্ত্র চলছে, উৎস খুঁজতে হবে

  • স্বদেশ রায়

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব নানানমুখী। আবার ১৫ কোটির বেশি মুসলিম জনগোষ্ঠীর কারণে রয়েছে আরেক ধরনের গুরুত্ব। অন্যদিকে বর্তমানে মুসলিম বিশ্বজুড়ে অস্থিরতার সময়ে ১৫ কোটির বেশি মুসলিম নাগরিক নিয়ে একটি সেক্যুলার রাষ্ট্রের অব্যাহত যাত্রা যেমন বিস্ময়কর তেমনি অনেক সমীকরণ এখানে। এর সঙ্গে রয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব, যে নেতৃত্বকে এখন বিশ্ব নেতৃবৃন্দের অস্বীকার করার কোন উপায় নেই বরং তাঁকে কাছে পেতে চায় অনেকে। এ কারণে শেখ হাসিনাও আবার আরেকটি গোষ্ঠীর কাছে- আপনা মাংসে হরিণী বৈরী। শেখ হাসিনার যোগ্যতা এ মুহূর্তে পৃথিবীর একটি গোষ্ঠীর কাছে সব থেকে বেশি প্রয়োজনীয় আবার অন্যদিকে আরেকটি গোষ্ঠীর কাছে সব থেকে বড় বাধা। ঠিক তেমনিভাবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে উন্নয়ন হচ্ছে বাংলাদেশে- এ উন্নয়ন যেমন পৃথিবীর একটি অংশের কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আবার কিছু অংশ চায় এ উন্নয়ন থেমে যাক। সর্বোপরি শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে যেখানে নিয়ে যাচ্ছেন তাও যেমন একটি বিস্ময় তেমনি পশ্চাদমুখী শক্তির জন্য বড় বিপদ। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে যে পথে পরিচালিত করছেন তাতে ২০২১ সালের ভেতর বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি স্থায়ী আকার ধারণ করবে। কোন অর্থনীতি স্থায়ী আকার পেলে ওই অর্থনীতিকে পেছনে ফেরানো সহজ নয়। কঠিন হয় ওই দেশকে পিছন দিকে নিয়ে যাওয়া।

যখন কোন দেশের অর্থনীতিকে আর পেছনে ফেরানো যায় না তখন ওই দেশকে পেছনে টানা অনেক কষ্টের। পশ্চাদমুখী শক্তি তখন অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে। শেখ হাসিনার এই লক্ষ্য স্থির বলেই কিন্তু শুরু থেকে তাঁর এবং তাঁর সরকারের ওপর একের পর এক আঘাত এসেছে। অনেক সময় বহুমুখী আক্রমণ হয়েছে শেখ হাসিনার সরকারের ওপর। এই আঘাত শেখ হাসিনা যেভাবে মোকাবেলা করেছেন তা মাঝে মাঝেই মনে করিয়ে দেয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের ব্রিটেনের নেতা চার্চিলকে। চার্চিলের মতো তিনি থেকেছেন ধীরস্থির এবং পাশাপাশি সব সময়ই চেষ্টা করেছেন একটার পর একটা আঘাতকে পর্যুদস্ত করার। কখনই তিনি হিটলারের মতো এক সঙ্গে অনেকগুলো ফ্রন্ট খোলেননি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এ গুণাবলী কিন্তু প্রথমেই বোঝা যায় ১৯৯৬ সালের সরকার পরিচালনার সময়। এ কারণেই ২০০৪-এ একুশে আগস্ট সৃষ্টি করে খালেদা-তারেক তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কারণ, তাদের দেশী-বিদেশী পরামর্শদাতারা তখনই বুঝেছিল কত উচ্চতায় যাবেন শেখ হাসিনা। তাই তারা তাঁকে তখনই থামাতে চেয়েছিল হত্যার মাধ্যমে।

২০০৯-এর পর থেকে দেখা যাচ্ছে, শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে প্রথমে যে ফ্রন্ট খোলা হয়েছিল রাজপথে আন্দোলন- সেখানে তারা ব্যর্থ হয়েছে। এর পরে তারা এক ধরনের আরবান গেরিলাযুদ্ধ শুরু করে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে- সেখানেও ব্যর্থ হয়। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে শেখ হাসিনাকে ও তাঁর সরকারকে অগণতান্ত্রিক, বিরোধী মত দলনকারী হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য খুব বড় আকারে চেষ্টা করে। এ কাজে তারা বাংলাদেশে অবস্থিত কিছু বিদেশী কূটনীতিক, দেশীয় তথাকথিত সুশীল সমাজ এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক কিছু এনজিওকে কাজে লাগায়। এ ফ্রন্টের যুদ্ধও শেখ হাসিনা খুব শান্ত মাথায় মোকাবেলা করেন।

এইসব যুদ্ধে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে কতগুলো বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে গেছে। এক. বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে খালেদা চিরবিদায় হয়ে গেছে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার কোন পথ নেই। দু’জনেই এখন ক্রিমিনাল। খালেদার এই বিদায়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের আলো উঁকি দিচ্ছে। কারণ, ষড়যন্ত্রকারীরা তথাকথিত রাজনীতির নামে খালেদাকে সামনে রেখে শেখ হাসিনা বা গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে যে কোন চক্রান্ত করতে পারত। যে চক্রান্ত ২০০১ সালে খালেদাকে সামনে রেখে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন, বিচারপতি লতিফুর রহমান ও ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহম্মদরা করেছিলেন। তাদের ওই চক্রান্তের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় শুধু জামায়াতে ইসলামী আসেনি, দেশে জঙ্গীবাদ শতমূল বিস্তার করে। যে জঙ্গীবাদ ও খালেদা-জামায়াতকে কঠোর হাতে দমন করতে হচ্ছে শেখ হাসিনাকে।

যাহোক, খালেদা ও জামায়াত-জঙ্গীদের স্পেস কমে আসাতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তথাকথিত রাজনীতিকে ঢাল হিসেবে রেখে ষড়যন্ত্র করার সুযোগ কমে গেছে। এর অর্থ এ নয় যে, বাংলাদেশে ষড়যন্ত্র শেষ হয়ে গেছে। রাজনীতিকে ঢাল হিসেবে রেখে বা রাজপথকে উত্তপ্ত করে সেই ঘোলা পানির ভেতর বসে ষড়যন্ত্র করবে সে সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। খালেদাকে সামনে ঢাল হিসেবে রেখে রাজনীতি ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে ঠিকই; কিন্তু বাংলাদেশ এখন একটা ক্রান্তিকাল পার করছে। কারণ বাংলাদেশ একটি নতুন ডানপন্থী প্রকৃত রাজনৈতিক দল সৃষ্টির পথে এগোচ্ছে। যে কোন সৃষ্টির পূর্ব মুহূর্তটি যেমন শুভ তেমনি বিপজ্জনক। এমনকি মাতৃগর্ভ থেকে একটি নবজাতকের আগমনের সময়টি। এ সময় একটি মায়ের জন্য যেমন চরম আনন্দের তেমনি কখনও কখনও মায়ের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ সেই সময় পার করছে। ষড়যন্ত্রকারীরাও মোক্ষম সময়টি বেছে নিয়েছে। আর বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র আসে পাকিস্তানের পথে। তাই বাংলাদেশে এখন যে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে তা বাংলাদেশের জন্য নতুন; কিন্তু পাকিস্তানে সে অস্ত্র প্রয়োগ করে তারা সফল হয়েছে।

ষাট, সত্তর ও আশির দশকে আমেরিকা পৃথিবীর দেশে দেশে ষড়যন্ত্রের জন্য একই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে সফল হয়েছিল। তখন পৃথিবীর বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। তবে এ মুহূর্তে পৃথিবীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। তাই এখন একই অস্ত্র আবার প্রয়োগ করা কঠিন। তাছাড়া পাকিস্তানে যে অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে ওই অস্ত্র দিয়ে বাংলাদেশে সফলতা আনাও কষ্টকর। তারপরও ষড়যন্ত্র ষড়যন্ত্রই। কোন ষড়যন্ত্রকেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে এখন পাকিস্তানী স্টাইলে একটি ষড়যন্ত্র চলছে। এই ষড়যন্ত্রের অন্যতম একটি বড় শক্তি অর্থ ও ক্ষমতার মোহ। আর বর্তমান ষড়যন্ত্রের পথ অসামরিক- অতীতের মত কোন সেই সামরিক পথে নয়।

বাংলাদেশে এ মুহূর্তে নয়, বেশ কিছুদিন যাবত পাকিস্তান স্টাইলের এই ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। একটি বিশেষ উচ্চ স্থানকে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্রকারীরা এগোচ্ছে। মুখগুলোও খুব অপরিচিত নয়। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গিয়ে দোকান খুলে বসে থাকা এক ব্যক্তি আছেন। একাত্তরে এম আর আখতার মুকুলের চরমপত্রেও তার আদ্যোপান্ত আছে, যার নাম ও যড়যন্ত্র ইতোমধ্যে বাংলাদেশে সমার্থক শব্দ হয়ে গেছে। এই ব্যক্তির দোকানের কিছু লোক ধর্ম, বর্ণ যাই হোক তারা এ চক্রের ভেতর বেশ সক্রিয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে, যার কারণে পদ্মা সেতু থেকে বিশ্বব্যাংক টাকা ফিরিয়ে নিয়েছিলো তিনিও। উঁচুস্থানকে ঘিরে এই যে ষড়যন্ত্র- শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে এই যে চক্রান্তের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, এর সঙ্গে এখন স্বাভাবিকভাবে যোগ হবে জামায়াত, বিএনপি, আইএসআই ও ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্থ। এই বিভিন্ন বেশধারী জঙ্গী ও ষড়যন্ত্রকারীদের স্পেস বাংলাদেশে শেখ হাসিনা কমিয়ে এনেছেন ঠিকই, কিন্তু এদের অর্থের শক্তির ওপর এখনও হাত দিতে পারেননি। জামায়াত, বিএনপি, আইএসআই ও ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্থ এখনও বাংলাদেশের সাদা ও কালো সব ধরনের ব্যবসায় জড়িত। যে অর্থ এসব কাজে ব্যয় হচ্ছে। তাই এই অর্থ ও পাকিস্তানী স্টাইলের ষড়যন্ত্র এক হওয়ার পরে কিছু বিষয়কে এখন আর হালকা করে দেখার কোন সুযোগ নেই। যেমন, স্বাধীনতার সপক্ষ কণ্ঠগুলো কেন রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে? কেন সেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত আসছে? এগুলো যদি হালকা করে নেয়া হয়, তাহলে ভুল হবে। কারণ যখন এগুলো ঘটছে, তখন ঢাকা শহর হিযবুত তাহরীরের পোস্টারে ছেয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের টাকা-পয়সা নড়াচড়া করছে। এছাড়া এমন কিছু স্পর্শকাতর ইস্যু সামনে এনে, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে যা মূলত আঘাত করে শেখ হাসিনাকে। আর সেসব আঘাতকে ফুলের মালা দিচ্ছে বিএনপি এবং ওই বিশেষ দোকানের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তাদের কিছু কিছু ব্যক্তি। এসব লক্ষণ কিন্তু পরিচিত। পাকিস্তানের সহায়তায় যখনই এ ধরনের ষড়যন্ত্র হয় তখন কিন্তু এগুলো দেখা যায়।

পাশাপাশি কেন কিছু কিছু পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যাচ্ছে? কেন হচ্ছে এই অবস্থা? হঠাৎ কারও কারও গলায় ওই ব্যক্তির চিরকালের বন্ধুর বিরুদ্ধে বিপ্লবী সুর কেন? উদ্দেশ্য কী? পাশাপাশি আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের ভেতর সারাদেশে যে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে- এই চেষ্টা ও এর জন্য কোথা থেকে অর্থ আসে এগুলোও কিন্তু খুব অপরিচিত কিছু নয়। তাই ষড়যন্ত্র যে চলছে এ নিয়ে দ্বিধার কিছু নেই। বরং এখন জরুরী এর উৎস খোঁজা ও উৎসমূলটি এখনই কেটে দেয়া।

swadeshroy@gmail.com