২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নজরুল প্রয়াণ দিবসে শিল্পীদের শ্রদ্ধা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। যার কলম ছিল মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার, প্রভুত্ব, ধর্মের দোহাই দিয়ে অধর্মের চর্চা এবং সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী, সেই মহান পুরুষ জন্মেছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে। কবির মৃত্যু দিবসকে ঘিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলছে ব্যাপক আয়োজন। নজরুলের অন্যতম সৃষ্টি তাঁর গানকে হৃদয়ে ধারণ করে সুরমন্দ্রিত কণ্ঠে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার প্রত্যয়ী যারা, তাঁরা কবির মৃত্যু দিবসকে কিভাবে দেখেন? সম্প্রতি তাঁর প্রাসঙ্গিকতার রূপটি কেমন? প্রশ্নগুলো নিয়েই নজরুল জয়ন্তীর এই বিশেষ আয়োজন লিখেছেন গৌতম পা-ে।

ফাতেমা তুজ জোহরা ॥ নজরুল নামের এই মানুষটির এত দ্রুত আবির্ভাব ও চলে যাওয়া এটা আমার ভাবতে কষ্ঠ হয়। এই নামে কেউকি ছিলেন এটাও ভাবায় আমাকে। কেননা নজরুলকে আজও করা হচ্ছে দ্বিভাজিত, নগন্য যা মেনে নিতে পারি না। নজরুলের গান নিয়ে যে ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছিল তা এখন আর নাই। শুদ্ধভাবে নজরুল চর্চার সময় এসেছে। আমরা শুদ্ধভাবে এই গান করতে পারছি। শিল্পীরা নিবেদিত হয়ে এই গানের চর্চা করবে এটাই আমার প্রত্যাশা। এখনকার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে অনেক প্রতিভা আছে যার ফলে গানের শুদ্ধতা বজায় রেখে তারা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারছে। তবে গানের ক্ষেত্রে আরও চর্চা ও নিবেদিত হয়ে গান করতে হবে এদের।

সুজিত মোস্তফা ॥ শুধুমাত্র জন্ম ও মৃত্যু দিবসে আমরা নজরুল-রবীন্দ্রনাথের মতো সৃষ্টিশীল মানুষকে স্মরণ করার চেষ্টা করি। এর জন্য কিছু অনুষ্ঠান করা হয় এবং পত্র পত্রিকায় কাভারেজ যায়। আমি মনে করি এই সীমাবদ্ধের মধ্যে আমাদের থাকা উচিত নয়। নজরুলের কথাই বলি, তিনি আমাদের বিশেষ করে বাঙালীদের যা দিয়ে গেছেন তার প্রতিদান জন্ম ও মৃত্যু দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেলে চলবে না। তাঁর দর্শন আমাদের সামাজিক জীবনে প্রতিদিন যেন উচ্ছ্বসিত হয় এটা হওয়া উচিত। আমাদের দেশে নজরুলচর্চার ক্ষেত্রে দল বিভাজন হয়ে গেছে। সবাই দাবি করছে আমরা যেটা করছি এটাই ঠিক। সত্যিকার অর্থে নজরুল চর্চা করতে গেলে সবাইকে ঐকমত্যে আসতে হবে। সরকারের উচিত সকলকে নিয়ে নজরুল চর্চার ক্ষেত্রে বিশেষ এক জায়গায় আসা। আমরা এখনও নজরুল আদর্শে দীক্ষিত হতে পারিনি। উচিত ছিল সব মানুষই নজরুল চর্চায় এগিয়ে আসবে, বিভিন্ন অবস্থান থেকে এর পৃষ্ঠপোষকতা করবে কিন্তু এ বিষয়ে অনেকেই যেন উদাসীন। আমাদের দেশে নজরুল সঙ্গীতের শিল্পী হয়ত বেড়েছে কিন্তু কোয়ালিটি বাড়ে নেই। যা যা করলে আমরা আরও বেশি করে নজরুল দীক্ষায় দীক্ষিত হতে পারতাম এবং নজরুলকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারতাম সেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। কিছু কিছু শিল্পী নজরুলের জন্ম ও মৃত্যু দিবসে বিভিন্ন মাধ্যমে আমন্ত্রণ পায় নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন ও এ বিষয়ে কিছু বলার জন্য কিন্তু এ বিষয়টা প্রবহমান নয়।

খায়রুল আনাম শাকিল ॥ জন্ম ও মৃত্যু দিনেই স্মরণ করা হয় আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। বিশেষ এ দুটো দিনের পাশাপাশি বছরের অন্য দিনগুলোতেও বিভিন্নভাবে কবির জীবন দর্শন আমাদের আদর্শ হওয়া উচিত। আমরা কবির সঙ্গীত হয়ত অন্তরে ধারণ করতে পেরেছি কিন্তু মানুষ নজরুলকে এখনও সেভাবে ধারণ করতে পারিনি। সঙ্গীত ছাড়াও তাঁর সৃষ্টির অন্যান্য শাখাও ছিল সব মানুষের জন্য সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। তিনি যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি ছিলেন আজীবন এটা থেকেও আমাদের অনেক শিক্ষা নেয়ার আছে। মানব প্রেম নজরুল মনেপ্রাণে ধারণ করেছিলেন। এটা নজরুলে জীবিতকালেও যেমন প্রাসঙ্গিক ছিল এখনও ঠিক তেমনই প্রাসঙ্গিক।

সালাহ্উদ্দীন আহমেদ ॥ নজরুলের মতো সৃষ্টিশীল মানুষের কখনও মৃত্যু হয় না। তবে তাঁর জন্ম ও মৃত্যু দিবসে আমরা নতুনভাবে উজ্জীবিত হই। এ সব দিনে তাঁকে নতুন করে জানার একটা ক্ষেত্র ও তৈরি হয়। আমি কখনও আশাহত হই না। নতুন প্রজন্মকে সত্যিকার অর্থে নজরুল সম্পর্কে জানাতে হলে শুধু জন্ম ও মৃত্যু দিবসে নয়, বছরজুড়ে বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁকে তুলে ধরতে হবে। শুধু বাণিজ্যিক দিকে লক্ষ্য দিলে নজরুল চর্চার প্রসার হবে না। নজরুল ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক কবি ও লেখক। দেশের কিছু অশিক্ষিত লোক নজরুলকে সাম্প্রদায়িক বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত। নজরুল জীবিতকালেও তাঁর ওপর এমন অপবাদ দেয়া হয়েছে কিন্তু নজরুলের গুরুত্বকে বাঙালী কখনই উপেক্ষা করতে পারেনি।

ইয়াসমিন মুশতারী : আমি মনে করি সৃষ্টিশীল মহামানবদের কখনও মৃত্যু হয় না। শরীরীয়ভাবে হয়ত তিনি আমাদের মাঝে থাকেন না, কিন্তু থেকে যায় তার সৃষ্টি। কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যু নেই। নজরুলও তেমন এক ব্যক্তি যিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সব সময় আমাদের মাঝে আছেন, থাকবেন। বাঙালী সব সময় উৎসব বা অনুষ্ঠানপ্রিয়। বিশেষ করে এ কারণেই এই সময় উৎসবগুলো করা হয়। কিন্তু আমরা যারা রবীন্দ্রসঙ্গীত বা নজরুলসঙ্গীত চর্চা বা গবেষণা করি, তারা সব সময় নীরবেই এ নিয়ে কাজ করে চলেছি। আমাদের এ কাজগুলো দৃশ্যমান নয়। তবে উচিত মহামানবদের শুধু জন্ম ও মৃত্যুকে ঘিরে নয়, বছরজুড়ে তাঁদের নিয়ে অনুষ্ঠান করা উচিত।

শারমিন সাথী ইসলাম ময়না ॥ নজরুলের মৃত্যু হয় না। সৃষ্টির মাঝেই এসব মহামানব বেঁচে থাকেন কালান্তর। নতুন প্রজন্ম অনেকেই নজরুলের গানের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে এবং তারা শিখছে। সে অর্থে বলা যায়, নজরুলের গানের দিক থেকে আমরা বেশ খানিকটা এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু গান পরিবেশন করার প্লাটফর্ম খুবই কম। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে বছরে হাতে-গোনা কয়েক অনুষ্ঠান করে যেখানে শিল্পীরা নজরুলের গান পরিবেশন করার সুযোগ পায়। সার্বিক দিক দিয়ে বলা যায়, নজরুলের গানের চর্চা আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু সার্বিক নজরুলকে তেমন এগিয়ে নিতে পারছি না।

বিজন চন্দ্র মিস্ত্রি ॥ আমরা সময়ের মধ্যে বন্দী। এ জন্যই নজরুলের জন্ম ও মৃত্যু দিবসকে ঘিরেই তাঁকে স্মরণ করা হয়। যেটা হওয়া উচিত ছিল বছর জুড়ে কিন্তু তাকে আনা হয়েছে শুধুমাত্র জন্ম ও মৃত্যু দিবসে।

বাঙালীর জন্য এটা কাম্য নয়। আমি মনে করি সবার জন্য, সব সময়ের জন্য নজরুল আমাদের সাথী। নিঃসন্দেহে আমাদের দেশে নজরুল সঙ্গীতের চর্চা আগের তুলনায় বেড়েছে কিন্তু এটা সীমাবদ্ধ রয়েছে নজরুলের জন্ম ও মৃত্যু দিবসকে কেন্দ্র করে।

দেশে অনেক টিভি চ্যানেল রয়েছে কিন্তু সেখানে বছরে খুব কমই নজরুল সঙ্গীতের অনুষ্ঠান হয়। শুধু নজরুল জয়ন্তী ও মৃত্য দিবস আসলে আমরা যারা নজরুল সঙ্গীতচর্চা করি তাদের ডাকা হয়, অন্য সময় নয়। যার ফলে নতুন প্রজন্ম অনেক সময় আশাহত হয়। কষ্ট করে সঙ্গীত সাধনা করে যদি তার বহির্প্রকাশ না ঘটানো যায় তা হলে সে ধরনের বিষয়ে আগ্রহ কমে আসে। তবে এখন নতুনরা যেভাবে নজরুলের গানের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে, আগামীতে আরও ভাল ফল পাওয়া যাবে বলে আমার বিশ্বাস।