২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পথের পাঁচালীর ৬০ বছর

পথের পাঁচালী, বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক মাইলফলক। ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট মুক্তি পেয়েছিল পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি এই মানবিক আখ্যান। গত ২৬ আগস্ট ছিল পথের পাঁচালী মুক্তির ৬০ বছর। সারা পৃথিবীর নানা দেশে ভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষ এখনও প্রতিনিয়ত দেখছে ‘পথের পাঁচালী’ আর মুগ্ধ হচ্ছে চলচ্চিত্রটির নির্মান শৈলী আর মানবিক আবেদনে। সব মিলিয়ে ১১টি দেশী বিদেশী আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছিল চলচ্চিত্রটি। এর মধ্যে কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘শ্রেষ্ঠ মানব দলিল’ পুরস্কারটি। পথের পাঁচালী মুক্তির

৬০ বছর পূর্তিতে আনন্দকণ্ঠের বিশেষ আয়োজনে লিখেছেন সায়েম খান

প্রত্যেকটা জিনিসের হয়ে ওঠার পেছনে কিছু না হতে চাওয়ার গল্প থাকে। আর এই না হতে চাওয়ার সঙ্কটের সমাধানের মধ্য দিয়েই পুরো জিনিসটা অধিকতর সুন্দর হয়ে ওঠে। এই রকমই ছিল বাংলা চলচ্চিত্রে মানিক দা-এর চলচ্চিত্র যাত্রা। এতক্ষণ যার কথা বলেছিলাম তিনি বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম সেরা (অনেকের মতে একমাত্র সেরা) চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়, আর গল্পটা হলো তার অমর সৃষ্টি ‘পথের পাঁচালী’-র নির্মাণের গল্প। ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট মুক্তি পাওয়ার পর চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করে এক অমর ইতিহাস। এর মুগ্ধতার আড়ালে কখন যে চাপা পড়ে গেছে এটার নির্মাণের পেছনের ইতিহাস, যা কেউ মনে রাখেনি বা কেউ সেটা নিয়ে আলোচনাও করতে চায় না। চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর থেকে এর মুগ্ধতা বা এটার বিজয়গাঁথার সাফল্যে বানের জলে ভেসে গেছে এর ‘পথের পাঁচালী’ হয়ে ওঠার গল্প। পরিচালক ক্যামেরার পেছনে তার চোখ রেখে লেন্সের মাধ্যমে যা দেখান দর্শক তাই দেখে, আর সেটাই চলচ্চিত্র। তেমনি ভাল চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় পরিচালকের পেছন দেখা গল্পগুলো নিয়ে হয়ে উঠতে পারে আরেকটি চলচ্চিত্র। ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে তেমন একটি গুঞ্জন অবশ্য আছেও, যদিও তার দিনক্ষণ এখনও নির্দিষ্ট হয়নি। আর ‘পথের পাঁচালী’-এর পেছনের গল্প নিয়ে ‘দ্য মেকিং অব পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্র নির্মাণের আশা প্রকাশ করেছেন লেখক-পরিচালক উদয়ন নাম্বুদিরি। ছবিটি প্রযোজনা করছেন কৌস্তব রায়। ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রটির পেছনে ফিরে দেখা। কেমন ছিল তার নির্মাণের ইতিহাস বা এটা নির্মাণ করতে গিয়ে সত্যজিৎ রায় ও বা কি ইতিহাস তৈরি করেছেন। বিশেষভাবে বলতে গেলে সত্যজিৎ রায় ইতালিয়ান নিওরিয়ালিজমের সময়ে ভিত্তেরিও ডি সিকার ‘দ্য বাইসাইকেল থিফ’ দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও তার ‘পথের পাঁচালী’ না ছিল প্রথাগত হলিউড বা না ছিল পুরোপুরি নিওরিয়ালিস্ট ঘরনার। ১৯৪০ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হলে কিছুদিনের মধ্যে তা নির্মাণ কৌশলে হলিউডকে অনুসরণ করা শুরু করে, যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেই ধারায় ছেদ ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উপমহাদেশও স্টুডিও ব্যবস্থা নাজুকতার মধ্যে পড়ে। শুরু“হয় কিছু অসাধু লোকের চলচ্চিত্র শিল্প মাধ্যমটি নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। এর মধ্যেই ১৯৪৬ সালে প্রথম সত্যজিৎ রায় তার চলচ্চিত্র নির্মাণের বাসনার দিকে ধাবিত হন। ১৯৪৮ সালে তিনি মোটামুটি স্থির করেন যে বিভূতিভূষণের উপন্যাসটি নিয়েই তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। এরপর থেকেই শুরু হয় সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ নির্মাণের সংগ্রাম যাত্রা। দর্শকদের কাছে মনে হতে পারে এটা বাকি আট-দশটা চলচ্চিত্রের মতো। কিই বা বিশেষত্ব আছে? কিন্তু তা নয়। ১৯৫৫ সালে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রটি হঠাৎ করে আকাশ থেকে টুপ করে পড়েনি, এটি প্রায় এক দশকের সংগ্রামের ফসল। এই সংগ্রামী যাত্রায় একে একে যুক্ত করেন তৎকালীন প্রথাবিরোধী একাধিক নতুন পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত কৌশল। বাস্তবতার নির্মম রূপ, পরিবারকেন্দ্রিক কাহিনী, অপেশাদার অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। সেটা ইন্দিরা ঠাকুরণ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য যেভাবে চুনিবালা দেবীকে খুঁজে বের করেন তা ছিল অনন্য। শুধু তাই নয় উপন্যাসের ভিত্তিতে তিনি স্কেচ এঁকেছিলেন। চুনিবালা দেবী হুবহু তাঁর অবিকল রূপ ছিলেন। এই চলচ্চিত্রটির সবচাইতে সীমাবদ্ধতার জায়গা ছিল বাজেট। চিত্রনাট্য লেখার পর তাঁর আর্থিক বন্দোবস্ত যে কত কঠিন, আবার তা যদি হয় বাণিজ্যিক ছবির চেনা গ-ির বাইরে। ঋত্বিক ঘটকের কথায়, ‘নতুন চলচ্চিত্রকার যদি নতুন ভাবনা নিয়ে কোন চিত্রনাট্য লিখে ফেলেন, তা শোনার মতো মন প্রযোজক প্রজাতির মানুষের সচরাচর থাকে না।’ সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’র ক্ষেত্রেও তেমনটা ঘটেছে। তাঁর ইউনিটের প্রোডাকশন কন্ট্রোলার অনিল চৌধুরীর বন্ধু কুমুদবন্ধু দাস (প্রযোজক) এর কাছে নিয়ে গেলে সে এই চিত্রনাট্য গান না থাকার কারণে ভালভাবে নেয়নি। বাজেটের অভাবে তিন বছর শূটিং বন্ধ ছিল। নিজের জমানো টাকা, ধার করা পয়সা, স্ত্রীর গয়না বিক্রির পরও আর্থিক সঙ্কটের কারণে এই বিরতি মেনে নিতে হয়েছিল। সত্যজিৎ রায় এই সময়ে অপু, দুর্গার বয়সের কন্টিনিউটি নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন। ভাগ্য ভাল ইন্দিরা ঠাকুরণ চরিত্রে চুনিবালা দেবী বেঁচে ছিলেন। এরপর পশিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধান চক্রবর্তী এর সহায়তায় সরকারী অনুদানে তিনি চলচ্চিত্রটি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। এরপরের ইতিহাস সবার জানা।

স্টুডিও এর বাইরে আউটডোরে প্রথম ক্যামেরা নিয়ে নির্দিষ্ট লোকেশনে পুরো চলচ্চিত্রটি শূটিং। আর এই কাজ সেই সময়ে মোটেও সহজসাধ্য ছিল না। সেখানে এটাকে অধিকতর সহজসাধ্য করার জন্য সাহসের সঙ্গে সহকারী আলোকচিত্রী পূর্ণেন্দু বোসের সহায়তায় সত্যজিৎ রায় ও সুব্রত মিত্র ক্যামেরার এসি মুডের বদলে ডিসি মোটর ও তার ব্যাটারি ভাড়া করে শূটিং করলেন। তাঁর এই চলচ্চিত্রে প্রতিটি দৃশ্যে ডিটেলিং লক্ষ্য করা যায়। ক্যামেরায় গতিশীলতাও ছিল লক্ষণীয়। ওই সময়ে বাংলা ছবিতে একটি দৃশ্যে প্রথাগতভাবে যত শট থাকত তা থেকে বেশি শট ছিল। ইন্ডাস্ট্রির নিয়ম অনুযায়ী ওই সময় প্রতিদিন ২৫০০ ফিট বা ৩ মিনিট এডিটেড রাশ শুট করতেই হবে। তাই যত স্বল্প দৈর্ঘ্যরে শট হবে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণের আশা তত ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর এবং বাজেট বৃদ্ধি হওয়ার কথা থাকলেও তিনি স্বল্প বাজেটে কাজটি সুচারুভাবে করেছেন। ওই সময় স্বল্প বাজেটে সেরাটাই দিয়েছেন সত্যজিৎ রায়।

শুধু বাংলা না উপমহাদেশের চলচ্চিত্র হিসেবে বিশ্বে প্রতিনিধিত্বকারী প্রথম চলচ্চিত্র ছিল ‘পথের পাঁচালী’। অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নির্মিত একটি বাংলা চলচ্চিত্রের আবেদন সারা বিশ্বে ৬০ বছর পরেও আছে। আরও থাকবে। কিন্তু তারপরও এই চলচ্চিত্রটি নিয়ে খোদ নির্মাতার কিছু অপূর্ণতা ছিল। যেটা তিনি নিজের সাক্ষাতকারে বলেছেন- প্রথম অর্ধাংশের সম্পাদনার কাজে কিছু অসঙ্গতির কথা। দ্বিতীয় অর্ধাংশের সম্পাদনা শক্তিশালী ছিল। প্রথম অর্ধাংশ কিছু জায়গায় তাঁর কাছে ঝোলানো মনে হয়েছে, যা আরেকবার সম্পাদনা করতে পারলে তিনি আরও ভাল কিছু উপহার দিতে পারতেন বলে মনে করতেন। ক্যামেরা রিপ্লেসমেন্টের ব্যাপারেও তাঁর কিছু পরিবর্তিত সিদ্ধান্ত পরিলক্ষিত ছিল। এছাড়া কিছু কৌশল ও যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতার কথাও তিনি বলেছিলেন।

সর্বোপরি বলব, শ্রেণীকক্ষে কথা কম বলা এবং প্রশ্নের উত্তর না দেয়া বালক একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে মানুষের ওপর নিজের ক্ষমতা বিস্তারের অসাধারণ ক্ষমতা দেখিয়েছিলেন। তিনিই ‘পথের পাঁচালী’র সত্যজিৎ রায়।