২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জার্মান বাংলার যৌথ মঞ্চায়ন ক্যাসপার একজন আগন্তুক

  • অপূর্ব কুমার কুন্ডু

আগন্তুক মানুষ মাত্রই যেহেতু আগত স্থানে সে সকলের কাছে অপরিচিত, ফলে আগন্তুক মানুষটিকে নিয়ে সকলেই যথাসম্ভব কৌতূহলী হবে সেটাই স্বাভাবিক। স্বাভাবিক অপরিচিতকে পরিচিতরা পথ দেখাবে আর অস্বাভাবিক, অজানার কারণে অপরিচিতকে নিয়ে পরিচিতরা ফুটবল মাঠের ফুটবল বানিয়ে খেলবে। তথাপি তাইতো হয়। বিপদাপন্ন মানুষের পাশে সম্পদাপন্ন মানুষ যেমন মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়, আবার সেই মানুষই অমানবিক হয়ে বিপদাপন্ন মানুষটির বিপদকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। অনেকটা সেভাবে জার্মানের নুরেমবার্গ শহরে হঠাৎ এসে পড়া এক আগন্তুক ক্যাসপারকে কেন্দ্র করে একদল সমব্যাথী ও একদর সমঘাতী মানুষের আচরণের ভিন্নতা, আত্ম উপলব্ধির ক্ষেত্রে ক্যাসপারের অর্জিত জ্ঞান আর অপরাপরদের চাপিয়ে দেয়া পা-িত্যের সাংঘর্ষিকতা, আপন আলোয় আপনার মাঝে বেঁচে থাকতে ক্যাসপারের অন্তিম ইচ্ছা প্রভৃতি নিয়েই নাটক ‘ক্যাসপার একজন আগন্তুক’। বিশ্ব মানচিত্রে জার্মান দেশের অবস্থানকে বৃক্ষ ভাবলে শেকড়ের অংশে যে দেশ তার নাম অস্ট্রিয়া। অস্ট্রিয়ান নাট্যকার পিটার হ্যানকের নাটক ‘ক্যাসপার’ দ্বারা অনুপ্রাণিত, জার্মান নির্দেশক সিলকে শুমাখার ল্যাংগে নির্দেশিত, জার্মান-বাংলাদেশী অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দ্বারা অভিনীত, জার্মান কালচারাল সেন্টার প্রযোজিত নাটক ‘ক্যাসপার একজন আগন্তুক’ মঞ্চস্থ হলো গত ২৩ আগস্ট শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে।

কি হলে একটা মানুষ মেধা সম্পন্ন হয় কিংবা মেধাশূন্য হয় তার অজস্র কারণ থাকতে পারে। কিন্তু এই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ক্যাসপারকে যখন জার্মানির নুরেমবার্গ শহরের ফুটপাতে পরিত্যক্ত রূপে পাওয়া গেল তখন সে চলৎশক্তিহীন এবং একটি সংলাপ ব্যতীত বাকশক্তিহীন। স্বগোতক্তি একটিই আর তা হলো, ‘আমি তার মতো হতে চাই, সে যেমন ছিল’। চলতি পথে ক্যাসপার কিছু পথচলতি মানুষকে পায় যারা তাকে পথ চলতে সাহায্য করে, কিছু মানুষ তাকে ক্ষতবিক্ষত করে, কিছু মানুষের শেখানো ভাষা তাকে অপরকে আপন করতে শেখায়, কিছু ভাষা তাকে অপরের থেকে দূরত্ব বাড়ায়, একই বস্তুকে ভিন্ন ভিন্ন দেখার দৃষ্টি তাকে বিস্মিত করে আবার অপরের ডিজাইনে চলার বাধ্যবাধকতায় ক্রমশ ক্যাসপার পুনঃ আগন্তুক হয়ে বেঁচে থাকার মরিয়া চেষ্টা করে আর সেখানে উচ্চারিত হয় প্রথম এবং একমাত্র খুঁজে ফেরা সংলাপ, আমি তার মতো হতে চাই, সে যেমন ছিল।

কেউ কেউ অপরের মতো হবে আবার কেউ কেউ তার নিজের মতো হবে। অনেকটাই নিজের নিজের মতো নির্দেশক সিলকে শুমাখার ল্যাংগে। এমনিতেই জার্মানরা শেষ মিনিটে গোল পরিশোধ করে পুনঃ গোল দিয়ে দলকে জিতিয়ে নেয়। যে কারণে দুই সপ্তাহের কর্মশালার মধ্যে দিয়ে নির্দেশক, দুই দেশের অভিনেতা-অভিনেত্রী, কলাকুশলীকে দিয়ে এক ঘণ্টার নাটক মঞ্চায়ন করতে পারলেন নাটকীয় গতি অক্ষুণœ রেখে। শুরুতে এবং শেষে বরণ এবং বর্জন এর ইলিউশান নির্মাণ জীবন পরিক্রমার বৃত্তের সৃজন। আবহ এবং কোরিওগ্রাফির আদলে শহুরে যান্ত্রিক দৌড়াদৌড়ি ভাবনার স্ফুরণ। অন্ধের হাতি দর্শনের আদলে একটি মাত্র বসবার সোফা সেটকে ঘিরে বহুমাত্রিক দৃশকল্প নির্মাণ তার ২৫ বছর ধরে সেট নকশাকার পরিচিতির প্রতি সজ্ঞানে আস্থা জ্ঞাপন। গত বছরে বাংলাদেশের নির্দেশক ঋতু সাত্তারের নির্দেশিত নাটকে সেট নক্সাকার হিসেবে কাজ করার সাবলীল স্বীকার বিনয়ীর আদলে শৌর্যের প্রকাশ। নির্দেশকের ঘাটতি বলতে, বিষয়বস্তুর গভীরতার সঙ্গে সামাঞ্জস্যপূর্ণ সংলাপের কমতি, কোরিওগ্রাফে অভিনেতা-অভিনেত্রীর সীমিত সংখ্যা নির্ধারণ এবং পরিণত বয়সের উপলব্ধি ছেলেমানুষী বয়সে বলতে চাওয়া। নির্দেশক সিলকে শুমাখার ল্যাংগে নিশ্চই বিশ্বাস করেন, প্রশ্ন করাটা শুধু প্রশ্নের খাতিরে নয় বরং একটি সঠিক প্রশ্ন উত্তরদাতাকে উত্তর খুঁজে পেতে পঞ্চাশ ভাগ পথ পেরিয়ে দেয়। যেমনি ভাবে জার্মান নাট্যকার টমাস মান মেফিস্টো নাটকে সার্বক্ষণিক সময় মানুষের মুখোশ তথা মেফিস্টোর বিবর্তন নিয়ে নাট্য সৃজন করেন কিন্তু নাটক শেষে দর্শকমাত্রই উপলব্ধি করেন, মানুষটির একটা মলিন মুখও ছিল।

বাংলা মুখে মাঝে মাঝে ইংরেজী ভাষা আবার জার্মান মুখে মাঝে মাঝে বাংলা ভাষার পাশাপাশি দৈহিক ভাষায় অজস্র না বলা সংলাপ তুলে ধরতে অভিনেতা হাউকে ডিকাম্প, জোহানেস শুমাখার, ফরহাদ আহমেদ, সুজন মাহবুব, রেজওয়ান পারভেজ, সুরুভি রায়সহ সকলে প্রাণবন্ত। সচেতনভাবে অচেতন হয়ে নিজেকে ভুলে অদৃশ্যে হাতড়ে অজানাকে খুঁজে ফেরা ক্যাসপার চরিত্রে রূপদানকারী অভিনেতা সুজন মাহবুব নান্দনিক-সারল্যযুক্ত এবং পরিশ্রমী। নাটক শেষে দর্শকদের অনুভূতি জানতে দলটির আন্তরিক চাওয়া প্রশংসনীয়। উত্তরের খোঁজে প্রশ্ন জাগানিয়া প্রযোজনা ক্যাসপার একজন আগন্তুক।