১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মিয়ানমার সীমান্তের থানচিতে কম্বিং অপারেশন চলছে

মিয়ানমার সীমান্তের থানচিতে কম্বিং অপারেশন চলছে
  • রাজস্থলীতে আরাকান আর্মি সদস্য আটক ॥ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজিবি প্রধানের ঘটনাস্থল পরিদর্শন

মোয়াজ্জেমুল হক/বাসু দাশ/ এইচএম এরশাদ ॥ বান্দরবানের থানচি উপজেলাসংলগ্ন মিয়ানমার সীমান্তে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সেনাবাহিনী ও বিজিবির জোরালো যৌথ কম্বিং অপারেশন (চিরুনি অভিযান) শুরু হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গ্রুপের অবস্থান নির্মূলই এ অভিযানের উদ্দেশ্য বলে নিরাপত্তা বাহিনী সূত্রে জানানো হয়েছে।

বুধবার মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান আর্মির সশস্ত্র সদস্যরা থানচির বড়মদকে বিজিবির ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ ও ঘেরাও অপচেষ্টার ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওইদিনই সীমান্তে কম্বিং অপারেশনের নির্দেশনা প্রদান করেন। ওইদিন বিকেলেই সীমিত আকারে অপারেশন শুরু হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তা ব্যাপকভাবে শুরু করা হয়েছে। দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ হেলিকপ্টারযোগে বুধবারের সংঘর্ষস্থল বড়মদক এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তাঁরা সেনাবাহিনী ও বিজিবি অভিযান পরিচালনার নেতৃত্বে থাকা অফিসার ছাড়াও জোয়ানদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

এদিকে, বুধবার সকালে ঘটনার পর রাতে রাঙ্গামাটির রাজস্থলীস্থ তাইদং পাড়া থেকে অং ক্রাউ রাখাইন (২৫) নামের আরাকান আর্মির এক সদস্যকে গ্রেফতার করেছে সেনাবাহিনী। তার অবস্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে দুটি ঘোড়া, আরাকান আর্মির তিন সেট পোশাক, তিনটি ল্যাপটপ ও তিনটি ক্যামেরা। তার বিরুদ্ধে রাজস্থলী থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

অপরদিকে, বুধবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর প্রতি বিজিবির পক্ষ থেকে যে সব অনুরোধ আহ্বান জানানো হয়েছিল এর কোন সাড়া বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মেলেনি। তবে বিজিবির পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে মিয়ানমার সে দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নির্মূলে এগিয়ে আসবে এবং এ সংক্রান্তে বাংলাদেশের উদ্যোগে সহযোগিতা দেবে।

বুধবার থানচির বড়মদকে সংঘটিত ঘটনার পর ওইদিন বিকেল থেকেই ওই সীমান্ত এলাকায় সেনাবাহিনী ও বিজিবির অতিরিক্ত সদস্য সমাবেশ ঘটানো শুরু হয়। বৃহস্পতিবারও আলীকদম সেনানিবাস এবং বিজিবির বলীপাড়া ব্যাটালিয়ন থেকে হেলিকপ্টারযোগে আরও অস্ত্রশস্ত্র সমভিব্যবহারে ফোর্স নেয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে থানচি উপজেলার দুর্গম তিন্দু, রেমাক্রি, ছোটমদক, বড়মদক ও আন্ধারমানিক এলাকায় এ কম্বিং অপারেশন চলতে থাকবে। অপারেশনের টার্গেট প্রাথমিকভাবে তিন দিন ধরা হলেও তা আরও বৃদ্ধি করা হবে বলে বিজিবি সূত্রে আভাস দেয়া হয়েছে। বুধবার আরাকান আর্মির সঙ্গে বিজিবির গুলিবর্ষণের ঘটনার পর আহত নায়েক জাকির হোসেন চট্টগ্রাম সিএমএইচে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এদিকে, দুপুর পৌনে ১টার দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজিবি প্রধান হেলিকপ্টারযোগে বড়মদকে পৌঁছেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে এবং সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাঁরা বিকেল ৪টার পর ঢাকায় ফিরে যান।

বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, থানচির বড়মদক এলাকার পুরোটাই এখন বিজিবির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যৌথ অভিযানের পাশাপাশি নিয়মিত টহল আরও জোরদার করা হয়েছে। আরাকান আর্মির সশস্ত্র সদস্যরা মিয়ানমারের সীমান্তের আরও গভীরে পালিয়ে রয়েছে বলে তাদের ধারণা।

পাহাড়জুড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নেটওয়ার্ক ॥ স্বাধীনতার পর থেকে মিয়ানমার সরকারবিরোধী বিভিন্ন বিদ্রোহী গ্রুপ অস্ত্র পাচারসহ সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলকে বেছে নেয়। সশস্ত্র এ সংগঠনগুলো দুর্গম পাহাড়ের গহীন অরণ্যে ঘাঁটি গেড়ে বিভিন্ন ধরনের অপকর্মের পাশাপাশি চাঁদাবাজি, লুট, অপহরণ, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। বিগত বছরগুলোতে এসব সন্ত্রাসী গ্রুপ নিজেদের অস্ত্রভা-ার সমৃদ্ধ করতে অর্থের জন্য রাঙ্গামাটির রাজস্থলীর ব্যাংক ডাকাতি, থানচি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাকে অপহরণ, বিদেশী এনজিও সংস্থা ড্যানিডার প্রকল্প কর্মকর্তা ও পর্যটন কেন্দ্র মিলনছড়ির কর্মকর্তাসহ অনেককে অপহরণের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করে। ২০০৯ সালের ২৪ জানুয়ারি রোয়াংছড়ি উপজেলার মনজয়পাড়া থেকে শিক্ষক উচনু মার্মা, ব্যাঙছড়ি থেকে উহাই মার্মা, অংক্যচিং মার্মা, মং থোয়াইচিং মার্মা, থোয়াই চিং মং মার্মা এবং ওয়াব্রাই পাড়া থেকে লরেন ত্রিপুরা, গুলি ত্রিপুরা, শান্তিলাল ত্রিপুরাকেও অপহরণ করে। পরে মুক্তিপণ আদায়ের মাধ্যমে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। এছাড়া অংজয় পাড়া থেকে কারবারি শৈহলাউ মার্মা ও উচিং মং মার্মাকে অপহরণ করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব আরাকানের সশস্ত্র সদস্যরা। পরে কয়েক লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাদের ফিরে আসতে হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বান্দরবানে মিয়ানমারের আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামিক ফ্রন্ট, আরাকান পিপলস আর্মি (এপিএ), আরাকান লিবারেশন আর্মি (এএলএ), ন্যাশনাল ইউনাইটেড পার্টি অব আরাকান (নূপা), আরাকান অপারেশন পার্টি (ওপি), রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা (এনএলএফটি), আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে। ২০১০ সালের পর সীমান্ত এলাকায় এদের কার্যক্রম কিছুটা ঝিমিয়ে থাকলেও সম্প্রতি ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বান্দরবানসংলগ্ন মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকার যে অংশটুকু বিজিবির আনগার্ডেড রয়েছে মূলত সেখানেই এরা ঘাঁটি গেড়েছে। বিজিবির টহল অভিযান চললেই এরা অবস্থান পরিবর্তন করে সীমান্তের ওপারে আরও গহীনে চলে যায়।

নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের কাছে তথ্য রয়েছে এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর কাছে একে-৪৭, একে-২৭, একে-২২, এম-১৬, এলএমজি, মর্টার, চাইনিজ রাইফেল, রকেটলঞ্চার ও গোলাবারুদ এবং বিস্ফোরক মজুদ রয়েছে। গত ৯ মে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নাইক্ষ্যংছড়ির পয়েন্টে ৫৩-৫৪ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী পাইনছড়ি চাইও পাড়া এলাকার ঝনঝনিয়া কুম থেকে মস্তকবিহীন আরাকান আর্মির এক কমান্ডারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

আরাকান আর্মি ॥ আরাকান আর্মির প্রধান হলেন তুয়ান মার্ট নায়াং। ২০০৯ সালের ১০ এপ্রিল মিয়ানমারের সরকারবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী এ সশস্ত্র সংগঠনটির জন্ম। আরাকান রাজ্যের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের কথা বলে ওই রাজ্যকে স্বাধীন করার প্রত্যয় নিয়ে এ সংগঠনটি ২০১২ সালে তাদের প্রচারিত ঘোষণায় জানান দেয় যে, সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা ৫শয়েরও বেশি।

এদিকে, আরাকান আর্মির জন্য মাউন্টেন হর্স (ঘোড়া আকৃতির গাধা) নিয়ে আরও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘোড়া আটকের ঘটনা নিয়েই মূলত বিজিবি ও আরাকান আর্মির সঙ্গে গোলাগুলির জন্ম। জানা গেছে, এ ঘোড়াগুলো গত ঈদের পর সংগ্রহ করা হয় বান্দরবানের এক ট্রাক ড্রাইভারকে দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঘোড়াগুলো নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দেয়া হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরে থানচির এক ব্যবসায়ী আরেক ড্রাইভারকে দিয়ে একযোগে সাতটি ঘোড়া নিয়ে যায় ট্রাকে করে। আরও জানা গেছে, ঘোড়াগুলো থানচির সিংগাফা মৌজার হেডম্যানের মাধ্যমে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ওই হেডম্যান চড়াদামে তা আরাকান আর্মির কাছে বিক্রি করে দেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে বান্দরবানের বলীপাড়া বরাবর মিয়ানমারের পেলোআং পয়েন্ট থেকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত সীমান্ত এলাকার পরিমাণ ২৭১ কিলোমিটার। এর মধ্যে কক্সবাজার ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তে রয়েছে ১২২ কিলোমিটার। ৫৪ কিলোমিটার হচ্ছে নদীপথ সীমান্ত। আর ৬৮ কিলোমিটার স্থল সীমান্ত।

বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের বান্দরবান অঞ্চলে সীমান্তের যে পরিমাণ এলাকা এখনও আনগার্ডেড রয়েছে সেখানে বিওপি স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যেই বিজিবির পক্ষ থেকে প্রদত্ত প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন, যা প্রশাসনিক আদেশের জন্য রয়েছে। এ আদেশ পাওয়া গেলেই নতুন নতুন বিওপি প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হবে বলে বিজিবি সূত্রে জানা গেছে।

নিজস্ব সংবাদদাতা রাঙ্গামাটি থেকে জানান, বান্দরবান সীমান্তে গোলাগুলির পর পাশের জেলা রাঙ্গামাটি থেকে আরাকান আর্মির সক্রিয় সদস্য অংক্রাউকে আটক করা হয়েছে। পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির রাজস্থলী উপজেলা সদরের তাইদং কলেজপাড়া থেকে যৌথবাহিনী এক অভিযান চালিয়ে প্রচুর সামরিক সরঞ্জামসহ মিয়ানমারের বিদ্রোহী আরাকান আর্মির এক সক্রিয় সদস্যকে আটক করেছে। তার নাম অংক্রাউ রাখাইন। বুধবার গভীর রাতে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালিয়ে উপজেলা সদরের একটি দ্বিতল বাড়ি থেকে তাকে আটক করে।

তার কাছ থেকে সন্ত্রাসী আরাকান আর্মির তিন সেট পোশাক, ৩০ গজ কাপড়, তিনটি ল্যাপটপ, তিনটি ডিজিটাল ক্যামেরা, তিনটি মোটরসাইকেল, দামী মোবাইল সেট ও দুটি ঘোড়াসহ (এ্যারাবিয়ানহর্স) মূল্যবান দলিলপত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাপ্তাই ১১ আর ই ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক লে. কর্নেল ওবায়দুল্লাহ শাফির নেতৃত্বে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের একটি যৌথ দল তাইদং কলেজপাড়ার রেনাইজু মারমার বাসায় অভিযান চালায়। এই সময় সেখান থেকে দুই হাতবোমায় জখম আরাকান আর্মির সন্দেহভাজন সদস্য অংক্রাউ রাখাইনকে (২২) আটক করা হয় ।

রাজস্থলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অহিদ উল্লাহ সরকার ও রাঙ্গামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) শহীদুল্লাহ জানান, বৃহস্পতিবার সকালে আটক অংক্রাউ রাখাইনকে থানায় আনা হয়েছে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে আটক যুবক বাংলা ভাষায় কথা বলতে কিংবা বুঝতে পারছে না। অপরদিকে, উদ্ধারকৃত ক্যামেরা এবং ল্যাপটপে রক্ষিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ দলের তত্ত্বাবধানে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।