২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কাজী জাফর আহমেদ আর নেই

কাজী জাফর আহমেদ আর নেই

স্টাফ রিপোর্টার ॥ জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান কাজী জাফর আহমেদ আর নেই। বৃহস্পতিবার সকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৬ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদ (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। এরশাদের শাসনামলে দেশের অষ্টম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কাজী জাফর আহমেদ। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন, রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদ, ২০ দলীয় জোটের নেত্রী খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিকসহ পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। হঠাৎ প্রবীণ এই নেতার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ ২০ দলীয় জোটের এই শরিক নেতাকে এক নজর দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান। অনেকে দীর্ঘদিনের পথ চলার সাথীর বিদায় সহ্য করতে না পেরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। হাসপাতালজুড়ে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘসময় এরশাদের সঙ্গে ছিলেন জনপ্রিয় শ্রমিক নেতা জাফর। কিন্তু রাজনৈতিক টানাপোড়েনে দু’জনের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। মৃত্যুর পরও মান ভাঙ্গেনি সাবেক সেনাপ্রধান এরশাদের। শেষবারের মতো হাসপাতালে কাজী জাফরকে দেখতে যাননি তিনি। এরশাদের প্রেস সচিব সুনীল শুভ রায় জানান, কাজী জাফর বেইমানি করে দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে পৃথক জাতীয় পার্টি করেছেন। তাই স্যার (এরশাদ) এসব ইতিহাস ভোলেননি। তিনি কাজী জাফরকে দেখতে যাবেন না।

আজ শুক্রবার কাজী জাফর আহমেদের প্রথম জানাজা হবে টঙ্গীর মিলগেট এলাকায় সকাল ৮টায়। দ্বিতীয় জানাজা হবে বেলা ১২টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। আর বাদ জুমা বায়তুল মোকাররমে হবে তৃতীয় জানাজা। বিকেলে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নিজ বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করার কথা রয়েছে।

কাজী জাফর ১৯৩৯ সালের ১ জুলাই কুমিল্লার প্রখ্যাত চিওড়া কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মেধাবী ছাত্র হিসেবে তিনি খুলনা জেলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে রাজশাহী সরকারী কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ অনার্স ও এমএ (ইতিহাস) পাস করেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে এমএ এবং এলএলবি কোর্স সম্পন্ন করা সত্ত্বেও কারাগারে চলে যাওয়ায় পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে পারেননি। তিনি স্ত্রী মমতাজ বেগম, তিন মেয়ে কাজী জয়া আহমেদ, কাজী সোনিয়া আহমেদ ও কাজী রুনা আহমেদসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, কর্মী রেখে গেছেন। ৬ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে কাজী জাফর দ্বিতীয়।

কাজী জাফরের একান্ত সহকারী গোলাম মোস্তফা বলেন, হঠাৎ করে স্যার সকাল ৭টায় গুলশানের নিজ বাসভবনে (রোড-৬৮, বাসা-২) হৃদরোগে আক্রান্ত হন। দ্রুত রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সোয়া ৭টায় তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। বহুবার দল ও মত বদলের কারণে আলোচিত প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ হৃদযন্ত্র ও কিডনির সমস্যা ছাড়াও ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন।

দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা দীর্ঘদিনের অভ্যাস ছিল কাজী জাফরের। কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। তাই খুব সকালে ঘুম ভাঙ্গে। ৭টা ৪০ মিনিটের মহানগর-প্রভাতী ট্রেনের টিকেট কাটা ছিল। কে জানত, এই টিকেটই ছিল তার ‘পরপারের’ টিকেট। শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফেরা হলো না। টিকেট রয়ে গেছে। পরপারের টিকেট পেয়ে একেবারে চির বিদায় নিয়েছেন প্রবীণ এই রাজনৈতিক নেতা। কথা ছিল কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে উঠবেন। পথে ফেনীতে নেমে দলীয় কাজ শেষ করে বাড়ি যাবেন। তবে সবকিছুর ব্যত্যয় ঘটিয়ে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন পরপারে। তাঁর ভাতিজা কাজী মোহাম্মদ ইকবাল ট্রেনের টিকেট দেখিয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকেন। তিনি বলেন, আমার একটি কিডনি তার শরীরে ছিল। বাড়ি যাওয়ার জন্য আমিই সব কাজ করে দেই। তাকে সঙ্গে নিয়ে আমার বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু আমাদের রেখে একেবারেই ‘বাড়ি’ চলে গেলেন। চাচার হঠাৎ মৃত্যুতে নিজেকে সামলাতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন কাজী মোহাম্মদ ইকবাল। তাকেও ইউনাইটেড হাসপাতালের জরুরী বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে।

আর স্বামীর মৃত্যুর বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারছেন না স্ত্রী মমতাজ বেগম। হাসপাতালে তাঁর অভিব্যক্তি, আমি হেরে গেলাম। সংসারের কোন কিছুতেই তাঁকে আটকে রাখিনি। রাজনীতি করতে দিয়েছি। শেষ দিনটা পর্যন্ত পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। এর আগে বুধবার রাতে জাতীয় পার্টির (জাফর) মহাসচিব মোস্তফা জামাল হায়দারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন কাজী জাফর। এ সময় তিনি মহাসচিবকে ভোরেই বাসায় আসতে বলেন। জামাল হায়দার বলেন, আমাকে বলেছিলেন, আমি কিন্তু খুব ভোরেই চলে যাব। তুমি তাড়াতাড়ি আমার বাসায় চলে এসো।

গত শতকের ষাটের দশকের ছাত্রনেতা এবং পরে চীনপন্থী বাম নেতা হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিতি পাওয়া কাজী জাফর শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জিয়াউর রহমানের আমলে। পরে সামরিক শাসক এইচএম এরশাদের হাত ধরে তার সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন। দীর্ঘ তিন দশক এরশাদের আস্থাভাজন হিসেবে জাতীয় পার্টির সঙ্গেই ছিলেন। রাজনৈতিক কারণে ২০১৩ সালের ২৮ নবেম্বর মতবিরোধ হওয়ায় কাজী জাফরকে দল থেকে বহিষ্কার করেন এরশাদ। এরপর দলের একাংশকে নিয়ে জাতীয় পার্টি নামেই নতুন দল গঠন করে গতবছর ২৫ জানুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেন কাজী জাফর। তাঁর এপিএস কামরুজ্জামান রনি জানান, কাজী জাফরের মরদেহ গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে রাখা হয়েছে। তাঁর স্ত্রী মমতাজ বেগম এবং দলীয় নেতাকর্মীরাও সেখানে আছেন।

তাদের তিন মেয়ের মধ্যে দুজন দেশের বাইরে থাকেন। তাদের মধ্যে সোনিয়া ইতোমধ্যে দেশে এসেছেন। আর রুনাও দেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। দলের মহাসচিব মোস্তফা জামাল হায়দার জানান, শুক্রবার সকাল ৮টায় টঙ্গীর মিলগেটে, বেলা ১২টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় এবং জুমার পর বায়তুল মোকাররম মসজিদে এই নেতার জানাজা হবে। পরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে গ্রামের বাড়িতে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করার কথা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৬২-১৯৬৩ সালে অবিভক্ত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি ‘চীনপন্থী’ কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরে টঙ্গীর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক রাজনীতিতে জড়িয়ে খ্যাতিমান শ্রমিকনেতা হিসেবে সকালের কাছে পরিচিত হন তিনি। ১৯৭১ সালের যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। স্বাধীনতার পর তিনি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন এবং পরে পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন।

১৯৭৪ সালে ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চীনপন্থী কমিউনিস্টদের সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস পার্টিতে (ইউপিপি) যোগ দেন কাজী জাফর। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সরকারে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন ইউনাইটেড পিপলস পার্টির (ইউপিপি) সাধারণ সম্পাদক কাজী জাফর। জেনারেল জিয়া নিহত হলে আরেক সামরিক অভ্যুত্থানে বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের সরকারকে হটিয়ে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক ফরমান জারি করে ক্ষমতা নেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ।

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে কাজী জাফরের ইউপিপিও ছিল। এরশাদকে ক্ষমতা থেকে নামানোর হুমকিও তিনি সে সময় দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সেই কাজী জাফরই নিজের দল বিলুপ্ত করে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়ার পর ১৯৮৯ সালে কাজী জাফরকে প্রধানমন্ত্রী বানান সামরিক বাহিনী থেকে ক্ষমতায় আসা এরশাদ।

এর আগে ১৯৮৮ সালের বন্যার পর ত্রাণ হিসেবে আসা চিনি বাজারে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ ওঠে কাজী জাফরের বিরুদ্ধে। সে সময় তাঁকে রসিকতা করে ‘চিনি জাফর’ বলেও ডাকা হতো। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচীর অর্থ আত্মসাতের দায়ে ১৯৯৯ সালে তাঁকে ১৫ বছরের কারাদ- দেয় আদালত। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিন বার কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম আসন থেকে জাতীয় পার্টির সাংসদ নির্বাচিত জাফর আর ২০১৩ সালে বহিষ্কৃত হওয়ার আগপর্যন্ত তিনি এরশাদের জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন।

জাতীয় পার্টির নেতারা জানান, ২০০৭ সালে এরশাদের জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে যোগ দেয়ার পর বিভিন্ন সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোটের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্ব কাজী জাফরকে দেয়া হয়। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টি শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নেয়ায় এক বিবৃতিতে এরশাদকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেন কাজী জাফর। এরপর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেন চেয়ারম্যান এরশাদ।

এরশাদের আমলে জাফর যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সে সময় উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন আজকের বিএনপি নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। হাসপাতালে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কাজী জাফর বয়সে আমার ছোট। তার চলে যাওয়াটা আমরা জন্য বেদনার। বিভিন্ন সময়ে রাজনীতিতে মতভিন্নতা হয়েছে আমাদের মধ্যে আবার একসঙ্গে আমরা মন্ত্রিসভায়ও ছিলাম। কিন্তু গণমানুষের রাজনীতির থেকে কখনও সে বিচ্যুত হননিÑ কাজী জাফর কাজী জাফরই ছিলেন।

রাশেদ খান মেনন বলেন, কাজী জাফর ভাই ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। একসঙ্গে অনেকদিনের রাজনীতির সম্পর্ক। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। দুপুরে হাসপাতালে এসে সাবেক রাষ্ট্রপতি বিকল্পধারার সভাপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, কাজী জাফর আহমেদ আমার ভাল বন্ধু ছিলেন। তাঁর মতো রাজনীতিবিদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক এমডি মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আমরা একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছি। উনি রাজনীতি করতেন, আমি করতাম না। কিন্তু আমাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। হাসপাতালে উপস্থিত সাংবাদিকদের ড. ইউনূস জানান, কিছুদিন আগে বন্ধু কাজী জাফর তাঁর আত্মজীবনী বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের জন্য প্রকাশনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু বিদেশে প্রচুর কর্মসূচী থাকায় আমি অপারগতা প্রকাশ করি। তাঁর শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে না পারায় খুব খারাপ লাগছে।

১৯৯৯-২০০০ সালে অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় টহরাবৎংরঃু ড়ভ ডবংঃবৎহ ঝুফহবু তে ঠরংরংঃরহম উরংঃরহমঁরংযবফ চৎড়ভবংংড়ৎ হিসেবে দক্ষিণ এশীয় ভূ-ম-লীয় রাজনীতি বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। আন্তর্জাতিক পরিসরেও কাজী জাফর আহমেদের রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি। ১৯৭৮ সালে তিনি এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় শিক্ষামন্ত্রী সম্মেলনে সহ-সভাপতি, ১৯৭৭-১৯৮৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল জুচে (স্বনির্ভর) ইনস্টিটিউটের পরিচালক, ১৯৮৬ সালে ব্যাঙ্ককে অনুষ্ঠিত এসকাপ ট্রেড মিনিস্টারস্ সম্মেলনের চেয়ারম্যান হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭-১৯৮৮ সালে এশীয় ৭৭ জাতি মন্ত্রিপরিষদের চেয়ারম্যান, ১৯৮৭ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত ৭ম আন্কটাড্ সমাপ্তি অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে তিনি যথাযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে রয়েছে তাঁর পরিচিতি, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সু-সম্পর্ক।

তাঁর মত্যুতে বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান বলেন, তিনি ছিলেন একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তাঁর মৃত্যু আমাদের ২০ দলীয় জোটের জন্য বেদনার। আমরা এ রকম বড়মাপের একজন রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে শোকহত।

অন্যদের মধ্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যন আবদুল্লাহ আল নোমান, স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান, যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান, এনডিপির খন্দকার গোলাম মুর্তজা, ইসলামিক পার্টির ব্যারিস্টার সাইয়েদুল হাসান ইকবাল, এলডিপির সাহাদাত হোসেন সেলিম, ব্যবসায়ী নেতা মাহবুবুর রহমান, বিজেএমইএর সাবেক সভাপতি গোলাম কুদ্দুস, সাংবাদিক কাজী সিরাজ, জাপা (জাফর) নেতা টিআইএম ফজলে রাব্বী ও কণ্ঠশিল্পী ফকির আলমগীর হাসপাতালে আসেন। এছাড়াও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি শফিউল আলম প্রধান ন্যাপের জেবেল রহমান গনিসহ অনেকেই শেষবারের মতো কাজী জাফরকে দেখতে হাসপাতালে যান।

কাজী জাফরের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক, এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব) অলি আহমেদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), ছাত্রদল, জাতীয় জনতা পার্টি, সাম্যবাদী দল, দেশপ্রেমিক নাগরিক পার্টিসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠন।

এদিকে সন্ধ্যা সাতটার পর কাজী জাফরের মৃতদেহ হাসপাতালের মরচুয়ারি থেকে গুলশানের নিজ বাসভবনে নেয়া হয়। রাতে বাসায় লাশ রাখা হবে। সকালে প্রথম জানাজার জন্য টঙ্গীতে নেয়া হবে। রাতে কাজী জাফরকে শেষবারের মতো গুলশানের বাসায় দেখতে আসেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।

কুমিল্লায় শোকের ছায়া ॥ নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, কাজী জাফরের আসাকে কেন্দ্র করে গ্রামের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজনও চলছিল। কিন্তু তাঁর এ আকস্মিক মহাপ্রয়াণে জিয়ারত করা হলো না বাবা-মায়ের কবর এবং সাক্ষাত হলো না এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে। এতে আনন্দঘন এ আয়োজন নেতাকর্মী ও স্বজনদের মাঝে মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হয়। তাঁর মৃত্যুর খবরে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাক্সক্ষীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ। প্রবীণ এ রাজনীতিবিদের ৭৬তম জন্মদিন পালন করা হয় গত ১ জুলাই।

কাজী জাফর ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন। ঢাকা ও চৌদ্দগ্রামে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। কুমিল্লা প্রেসক্লাবের স্থান ও ভবন নির্মাণে তিনি অবদান রাখেন। তাঁর পারিবারিক সূত্র আরও জানায়, দীর্ঘদিন যাবত কাজী জাফর আহমেদ কিডনির রোগ, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। এর আগে অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর কিডনি ট্রান্সফার করা হয়েছিল।

কাজী জাফরের বাসভবনে খালেদা জিয়া ॥ বৃহস্পতিবার রাত নয়টার দিকে কাজী জাফরের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর গ্রীন কাজী ম্যানশন বাসভবনে আসেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। প্রয়াত এই রাজনীতিবিদের মরদেহ রাখা এ্যাম্বুলেন্সের কাঁচঘেরা দরজার সামনে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিএনপি নেত্রী। এর পর তিনি প্রয়াতের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করেন। এ সময় জাতীয় পার্টির (জাফর নেতৃত্বাধীন) মহাসচিব মোস্তাফা জামাল হায়দার, টিআইএম ফজলে রাব্বীসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পরে বিএনপি চেয়ারপার্সন বাসার দোতলায় গিয়ে কাজী জাফরের স্ত্রী মমতাজ বেগম ও তাঁর মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের শান্তনা দেন। এ সময় ড্রইংরুমে রাখা শোক বইতে স্বাক্ষর করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন।

প্রসঙ্গত, কাজী জাফরের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে খালেদা জিয়া তাঁর বাসায় আসবেন বলে রাতে ইউনাইটেড হাসপাতালের হিমঘর থেকে শবদেহ গুলশানের বাসায় আনা হয়। চীন ও উত্তর কোরিয়ার দূতাবাসের পক্ষে কূটনীতিকরাও এ সময় বাসায় এসে লাশবাহী গাড়ির সামনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান।