১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বার বার স্বপ্নভঙ্গ হলেও মোহভঙ্গ হয়নি আমৃত্যু

  • রাজনীতিক কাজী জাফর-

ওবায়দুল কবির ॥ ’৯৩ সালের মাঝামাঝি কোন এক রাতে অফিসে কাজ করছি। তখনও মোবাইল ফোনের যুগ শুরু হয়নি। অপারেটর জানাল, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ কথা বলবেন। এর মাত্র কয়েকদিন আগে এক অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। ‘ইয়ংম্যান, এগিয়ে যাও’ ইত্যাদি ধরনের কথা বলে আমার সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করছিলেন। ফোনে জাফর ভাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাল সকালে তোমার কাজ কি’। ‘তেমন কিছু না। বিকেলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশ আছে’। তিনি বলেন, ‘সকালে বাসায় চলে এসো। তোমার সঙ্গে কথা বলব’।

কাজী জাফর আহমেদ তখন দেশের অনেক বড় নেতা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন। ছাত্র রাজনীতি, শ্রমিক আন্দোলন, ক্ষমতার রাজনীতিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং সর্বশেষ বিরোধী দলে নির্যাতিত নেতা। তাকে নিয়ে অনেক রাজনৈতিক বিতর্কও রয়েছে। সব মিলিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাত করা আমার মতো একজন জুনিয়র রিপোর্টারের কাছে লোভনীয়। অফিসের অনুমতি নিয়ে পরদিন পৌঁছে গেলাম তার বনানীর বাসায়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই জাফর ভাই রেডি হয়ে বের হলেন। আমাকে নিয়ে গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বললেন, সোনারগাঁও হোটেলে চল।

সোনারগাঁও হোটেলে তখন বিদেশ থেকে আগত এরশাদের আইনজীবী অবস্থান করছেন। ’৯০ সালের পতনের পর এরশাদ তখন জেলখানায় বন্দি। তার মামলা লড়ার জন্য কাজী জাফর আহমেদ বিদেশ থেকে সাদা চামড়ার আইনজীবী নিয়ে এসেছিলেন। সোনারগাঁও হোটেলের স্যুটে আইনজীবীর সঙ্গে বেশ কিছু সময় কথা বললেন। হোটেল থেকে বের হয়ে আবার গাড়িতে। দামী বিলাসবহুল গাড়ি। শহরের এপথ ওপথে ঘুরছে। কোন গন্তব্য আছে বলে মনে হলো না। আমার সঙ্গে মনোযোগ দিয়ে কথা বলছেন। আমিও খুব মনোযোগী স্রোতা। রাজনীতিতে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কাহিনী। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম, আওয়ামী লীগের রাজনীতি, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-, জিয়ার সামরিক শাসন, গণতন্ত্রে উত্তোরণ, এরশাদের ক্যু, জাতীয় পার্টি গঠন, মন্ত্রিত্ব ইত্যাদি কোন কিছুই বাদ গেল না। সব কিছুই বলছেন তিনি তার মতো করে। তিনি এক সময় সাংবাদিকতাও করেছেন এমন তথ্য দিতে ভুল করলেন না। সংবাদে দু’বছর রিপোর্টার ছিলেন। তখন একজন সিনিয়র সাংবাদিক তার হাতে কলম তুলে দিয়ে নাকি বলেছিলেন, ‘এই কলম দিয়ে তুমি মানুষের উপকার করতে পার, আবার ইচ্ছে করলে ক্ষতিও করতে পার’।

তিনি আমাকে বললেন, ‘তরুণ রিপোর্টার, কথাটা তোমার জন্যও প্রযোজ্য। এই পেশায় যখন এসেছ তখন অনেক দিন থাকবে নিশ্চয়ই। কথাটা মনে রেখ’। জাফর ভাইয়ের নীতি, আদর্শ, নৈতিকতা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য না হলেও এই বাক্যটি আমি মনে রেখেছি। মনে রেখেই আমার পেশার কাজ করতে চেষ্টা করেছি।

কথার মাঝে আমি কয়েকবারই জানতে চেয়েছি, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি’ ?

জাফর ভাই তেমন কোন জবাব দিচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত বুঝে গেছি, তার এই যাত্রার লক্ষ্য কোথাও না, আমার সঙ্গে কথা বলা এবং কিছু সময় কাটানো। রাজনীতিবিদদের সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা থাকে। কিছু বিনিয়োগ থাকে। আমার সঙ্গে অনেক কথা বলে এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় করে তিনি আমাকে মুগ্ধ করতে চেয়েছেন। এটি তার পরিকল্পনা। কয়েক ঘণ্টা সময় কাটিয়েছেন এটি তার বিনিয়োগ। তার এই পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগ ব্যর্থ হয়নি। আজকাল রাজনীতিকদের এতো ধৈর্য চোখে পড়ে না। হয়তো প্রয়োজনও হয় না।

এরপর আমি দীর্ঘদিন তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। তার কাছ থেকে অনেক তথ্য পেয়েছি যা আমার রিপোর্টার জীবনে কাজে লেগেছে। তার অনেক নীতি আমার কাছে পছন্দ হয়নি। আমি তার সমালোচনা করেছি। পত্রিকায় এর বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেছি। সামনাসামনি প্রতিবাদ করেছি। বিশেষ করে তার একটি কাজকে আমি কখনই সমর্থন করতে পরিনি। ’৯৬ সালে নির্বাচনের পর বিএনপির সঙ্গে জামায়াতকে জোটবদ্ধ করে দেয়া। বিএনপি-জামায়াতের এই জোট আজও বিদ্যমান। দেশী-বিদেশী কোন চাপেই জোট ভাঙ্গেনি। এই জোটের অন্যতম রূপকার ছিলেন কাজী জাফর আহমেদ।

’৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর রাজনীতির নানা উত্থান-পতনের এক পর্যায়ে ১৯৯৬ সালে সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান শেলির নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা দিয়ে পদত্যাগ করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার। একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২২ বছর পর সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টি, জাসদ নিয়ে গঠিত হয় জাতীয় ঐকমত্যের সরকার।

খুব বেশি দিন ভাল কাটেনি আওয়ামী লীগ সরকারের। নানা ইস্যুতে আন্দোলন শুরু করে সংসদে বিশাল বিরোধী দলের অধিকারী বিএনপি। তেমন কোন বড় ইস্যু ছাড়াই আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। এক পর্যায়ে সন্ত্রাস-দুর্নীতির অভিযোগ এনে সরকারের পদত্যাগ দাবি করে বিএনপি। নানা ইস্যুতে শুরু হয় লাগাতার সংসদ বর্জন। আন্দোলনে ক্রমশ শরিক হয় জামায়াতে ইসলামী। ধীরে ধীরে যুক্ত হয় এরশাদের জাতীয় পার্টি। সরকারের বিরোধীতার ইস্যুতে ভেঙ্গে যায় জাতীয় পার্টি। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে আলাদা জাতীয় পার্টি গঠন করা হয় এবং এই অংশটি থেকে যায় সরকারের সঙ্গে। এই সময় জাতীয় পার্টিকে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের রূপকার হিসেবে কাজ করেন কাজী জাফর আহমেদ।

জাফর ভাইয়ের এই উদ্যোগ নিয়ে আমার কোন প্রশ্ন নেই। রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি কখন কোন অবস্থানে থাকবেন তা নিতান্তই তার নিজস্ব কৌশল। আমার আপত্তি ছিল বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের জোটবদ্ধ করার কৌশলে তার ভূমিকা নিয়ে। ’৯৫-৯৬ সালে বিএনপি সরকার বিরোধী আন্দোলনে জামায়াতের সঙ্গে স্পষ্টতই দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল বিএনপির। কাজী জাফর আহমেদ দিনের পর দিন পরিশ্রম করে তাদের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটান। একথা জাফর ভাই নিজেই আমাকে বলেছেন। তিনি দম্ভ করেই বলেছিলেন, ‘এই মেরুকরণে আওয়ামী লীগ আর কোন দিন ক্ষমতায় আসতে পারবে না’।

আমি তাকে বলেছিলাম, ‘বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্কোন্নয়নে আপনার ভূমিকা কোনভাবেই আমি মানতে পারছি না। এক সময় আপনি প্রগতিশীল রাজনীতি করতেন। মনে প্রাণে এখনও প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করেন। শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে নিজের বিশ্বাসকে বিসর্জন দিয়ে এটি আপনি করতে পারেন না। এর জন্য শুধু আপনি নন, গোটা জাতিকে খেসারত দিতে হবে। ইতিহাসের কাঠগড়ায় আপনাকে একদিন দাঁড়াতেই হবে’।

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জামায়াত জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করে। কাজী জাফর আহমেদ এই জোটের রূপকার হয়েও শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টিকে জোটে রাখতে পারেনি। গড়তে পারেননি নিজের ভাগ্য। তবে দেশে জঙ্গীবাদ-সন্ত্রাসবাদের উত্থানে তার ভূমিকার কথা একদিন ইতিহাস স্বাক্ষী দেবে।

কেন সেদিন কাজী জাফর আহমেদের মতো একজন প্রগতিবাদী নেতার এই ভূমিকা ছিল। এই প্রশ্নে সরাসারি কোন উত্তর তিনি আমাকে দেননি। আওয়ামী লীগের প্রতি তীব্র ক্ষোভের কথাই বলেছেন বার বার। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যা বলেছেন তাতে মনে হয়েছে, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম আসনটি আওয়ামী লীগ তাকে ছাড়তে রাজি হয়নি। এই আসনে বর্তমান রেল মন্ত্রী মজিবুল হককে বাদ দিয়ে কাজী জাফরকে এমপি হতে দেয়নি আওয়ামী লীগ। তার ক্ষোভ ছিল এ জন্যই।

২০০০ সালের শেষ দিকে হঠাৎ করেই সিঙ্গাপুরে জাফর ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। একটি ট্র্যাভেল এজেন্সির অফিসে দেখা হতেই আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। দেশের খবর জানতে চাইলে সেদিন আমি বলেছিলাম, আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে চলেছে। বিএনপি-জাতীয় পার্টি-জামায়াত জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলে তো কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। তিনি খুব আনন্দ পেয়েছিলেন আমার কথায়।

দুর্নীতি মামলায় সাজা নিয়ে কাজী জাফর আহমেদ পাড়ি জমিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। ওখানে কিডনির ডায়লেসিস চলছিল। অস্ট্রেলিয়ায় এই চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল। অপেক্ষাকৃত কম খরচে চিকিৎসার জন্যই তিনি সিঙ্গাপুর অবস্থান করছিলেন। দেশে ফিরবেন কিনা জানতে চাইলে বেশ আস্থার সঙ্গেই বলেছিলেন, ‘অবস্থা অনুকূলে এলে অবশ্যই ফিরব’।

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির জোটে শেষ পর্যন্ত এরশাদের জাতীয় পার্টি থাকতে পারেনি। জামায়াতকে নিয়ে জোটবদ্ধ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ে ক্ষমতায় বসে বিএনপি। স্বাধীনতা বিরোধী এবং যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে খালেদা জিয়া রচনা করেন বাংলাদেশের একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। কাজী জাফর আহমেদের স্বপ্ন পূরণ হয়। সেই স্বপ্নের সমাপ্তি অবশ্য ভাল হয়নি তার জন্য। কারাদ- মাথায় নিয়ে দেশে ফিরে তিনি মোটেও উঞ্চ আতিথেয়তা পাননি। সাধারণ নাগরিকের মতো আইনী প্রক্রিয়া মোকাবেলা করেই তাকে দেশে থাকতে হয়েছে।

দেশে ফেরার পর একদিন ফোনে আমি জাফর ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনার স্বপ্ন কি ভঙ্গ হয়েছে? তিনি এমনভাবে জবাবটা দিলেন যার কোন অর্থই আমি করতে পারলাম না। তবে তার কণ্ঠে হতাশা ছিল বেশ স্পষ্ট। পরে বুঝেছিলাম, সেদিন তার স্বপ্ন ভঙ্গ হলেও মোহ ভঙ্গ হয়নি। এ কারণে ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি এরশাদের সঙ্গ ত্যাগ করে আলাদা জাতীয় পার্টি গঠন করেন এবং বিএনপি-জামায়াত জোটের সমর্থনে নির্বাচন বর্জনের পক্ষে যোগ দেন। এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং তার স্ত্রী রওশন এরশাদ সংসদে বিরোধী দলের নেত্রী নির্বাচিত হন। এমন একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেই চলে গেলেন কাজী জাফর আহমেদ।