২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাড়ে তিন মাসেও পল্লবীর জোড়া খুনের ঘটনার কিনারা হয়নি

সাড়ে তিন মাসেও পল্লবীর জোড়া খুনের ঘটনার কিনারা হয়নি

গাফফার খান চৌধুরী ॥ অবশেষে চরম ভয় নিয়েই নিজ বাসায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও পিতার সঙ্গে বসবাস শুরু করতে হলো ছোট্ট শিশু সাবিদ বিন জাহিদকে। শিশুটির কচি মনে এখনও মা আর নানাকে নিজ চোখের সামনে কুপিয়ে হত্যার দৃশ্য ভেসে উঠে। এখনও মাঝে মধ্যেই ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে উঠে ৫ বছরের জাহিদ। অজানা ভয় সারাক্ষণ তাকে তাড়া করে ফেরে। খুনীদের গ্রেফতার করতে পুলিশও তাড়া করে ফিরছে। কিন্তু সাড়ে ৩ মাস পরেও খুনীরা শনাক্ত হয়নি; গ্রেফতার তো দূরের কথা!

গত ১৩ মে। দুপুর দেড়টা। ঘটনাস্থল রাজধানীর পল্লবী থানাধীন আবাসিক এলাকার ২০ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর ‘ক্রিস্টাল ডি আমিন’ নামের বহুতল বাড়ির ছয়তলা বাড়ির ষষ্ঠতলা। ডেসকোর (ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি) উপসহকারী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম জাহিদ (৩৪) স্ত্রী সুইটি খাতুন (২৮) ও জাহিদের মামা আমিনুল ইসলামকে (৫৫) নিয়ে বসবাস করছিলেন ষষ্ঠতলার নিজ ফ্ল্যাটে। ওই ফ্ল্যাটেই দুই যুবক গ্যাসের চুলা ঠিক করার কথা বলে ঢুকে দু’জনকে ছুরিকাঘাতে ও গলা কেটে হত্যা করে। তবে ফ্ল্যাটে থাকা সুইটির ছেলে সাজিদ বিন জাহিদকে হত্যা করেনি খুনীরা। সাজিদকে বাথরুমে আটকে রাখা হয়েছিল।

বাড়ির নিরাপত্তা কর্মী আব্দুল খালেক (৫৫) জানিয়েছেন, ওই দিন একটি লাল মোটরসাইকেল নিয়ে দুই যুবক বাসার সামনে হাজির হয়। বাসার দরজায় টোকা দেয়। তাদের পরিচয় জানতে চাই। নিজেদের ইঞ্জিনিয়ার জাহিদের আত্মীয় পরিচয় দেন। স্বাভাবিক কারণেই মূল গেট খুলে দেন তিনি। যুবকদের পরণে জিন্স প্যান্ট, গায়ে টি-শার্ট আর পিঠে ব্যাগ ছিল। যুবকরা দ্রুত বাড়ির ষষ্ঠতলায় উঠে যায়।

পুলিশ নিহত সুইটির একমাত্র ছেলে সাজিদের জবানবন্দী রেকর্ড করেছে। সেই জবানবন্দীর বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, যুবকরা জাহিদের বাসায় দরজায় নক করে। ভেতর থেকে জাহিদের মামা তাদের পরিচয় জানতে চান। তারা গ্যাসের চুলার মিস্ত্রি বলে পরিচয় দেয়। বাসার গ্যাসের চুলা অনেকটাই অকেজো ছিল। স্বাভাবিক কারণেই দরজা খুলে দেন। এরপরই ঘটে যায় সব সিনেমার মতো কাহিনী।

যুবকরা প্রথমেই জাহিদের মামা প্যারালাইসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে বাঁ হাত ও বাঁ পা অবশ হয়ে পড়া আমিনুল ইসলামকে (৫৫) এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। তার চিৎকারে জাহিদের স্ত্রী সুইটি বেরিয়ে আসেন। তাকে জোর করে বেডরুমে নিয়ে যায় দুই হত্যাকারী। সেখানেই সুইটিকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। হত্যার দৃশ্য দেখে চিৎকার দেয় একমাত্র ছেলে সাজিদ। তাকে মাথা দেয়ালের সঙ্গে সজোরে ঠেসে ধরে। এরপর বেডরুম সংলগ্ন বাথরুমে ঢুকিয়ে বাইরে ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়। হত্যাকারীরা দ্রুত নেমে মোটরসাইকেলে করেই পালিয়ে যায়।

নিহত সুইটির স্বামী জাহিদ জানান, তিনি ওই দিন বেলা আড়াইটার দিকে বাসায় যান। বলেন, বাসায় নক করি। কেউ দরজা খোলে না। লক ঘুরাতেই দরজা খুলে যায়। দরজা খুলতেই মামার নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখি। এরপর স্ত্রী-সন্তানের খোঁজ নেই। ডাকাডাকি করি। কারও কোন সাড়াশব্দ নেই। ভেতরে বেড রুমে গিয়ে দেখি স্ত্রীর নিথর দেহ পড়ে আছে। তাকে কুপিয়ে ও গলাকেটে হত্যা করা হয়েছে। তার লাশটি বিছানার ওপর উপুড় করে রাখা ছিল। উল্টাতেই নিথর দেহ থেকে তখনও রক্ত ঝরছিল। চিৎকার শুনে বাথরুম থেকে ছেলেকে উদ্ধার করি। ছেলে ঘটনার বর্ণনা দেয়।

এ ঘটনায় ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের সূত্র ধরে হত্যাকা-ের ঘটনাটি ঘটে বলে অভিযোগ এনে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন নিহত সুইটির স্বামী জাহিদ। পুলিশ ব্যবসায়িক পার্টনার আশরাফুল আলম চিশতী ওরফে শাহীনকে (৪৭) গ্রেফতার করে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। হত্যাকা-ে জড়িত থাকার কথা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে অস্বীকার করেছে শাহীন। পরবর্তীতে মামলার বাদীর এক ভাগ্নে সোহেলকেও গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা বর্তমানে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে জামিনে রয়েছেন।

মামলার বাদীর দাবি, ২০১৩ সালের এপ্রিলে প্রায় ১২শ’ বর্গফুটের ওই ফ্ল্যাটটি ৪৮ লাখ টাকায় তিনি কেনেন। চাকরির পাশাপাশি তিনি ব্যবসা করেন। ব্যবসার মূলধন বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ টাকা। চাকরির কারণে ব্যবসায় ঠিকমতো সময় দিতে না পারায় তিনি তার বন্ধু শাহীনকে ব্যবসার পার্টনার হিসেবে নেন। ব্যবসা দেখাশোনার সার্বিক দায়িত্ব পালন করে স্ত্রী সুইটি। স্ত্রী আমার বন্ধু শাহীনকে নিয়ে ব্যবসা দেখাশোনা করছিল। দেখাশোনা বাবদ শাহীনকে ব্যবসার ৩০ ভাগের মালিকও করে দেয়া হয়। বাকি ৭০ শতাংশের মধ্যে স্ত্রী ৪০ ভাগ আর তিনি ৩০ শতাংশ শেয়ার মালিক। ব্যবসার পুরো টাকাটাই তার। তারা বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র স্থাপনের ব্যবসায় জড়িত। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি পল্লবী-১২ নম্বরে অবস্থিত।

ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে পার্টনার শাহীনের সঙ্গে ঝামেলা চলছিল। তারই জের ধরে হত্যাকা-ের ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে।

জাহিদ জানান, ঘটনার পর থেকেই তারা আর ওই বাসায় থাকছিলেন না। সম্প্রতি তারা আবার বাসায় বসবাস শুরু করেছেন। তবে ছেলে এখনও স্বাভাবিক হতে পারেনি। এখনও মাঝে মধ্যেই ঘুমের ঘোরে আঁতকে উঠে। হয়ত মাকে ও নানাকে খুন করার দৃশ্য তার চোখের সামনে ভেসে উঠে। বাসায় একা থাকতে ভয় পায়। এমন ভয় ছেলের মনে স্থায়ীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে অন্যত্র বসবাস করাও সম্ভব নয়। তাই নিতান্তই নিরুপায় হয়ে আবার তারা সেই বাসায় বসবাস শুরু করেছেন। তবে ছেলে এখনও স্বাভাবিক হতে পারেনি।

মামলার তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পশ্চিম বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম জানান, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ছাড়াও নানা বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে মামলা তদন্তে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি হয়নি। তবে শীঘ্রই হত্যা রহস্যের কিনারা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। হত্যাকা-ের বিষয়ে তারা অনেককেই নজরদারির মধ্যে রেখেছেন। এর মধ্যে নিহতের পরিবারের ঘনিষ্ঠরাও রয়েছেন।