২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাম্যের চেতনায় পুষ্পাঞ্জলি গান কবিতা কথায় নজরুল স্মরণ

সাম্যের চেতনায় পুষ্পাঞ্জলি গান কবিতা কথায় নজরুল স্মরণ
  • সংস্কৃতি সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ গাহি সাম্যের গান/যেখানে আসিয়া থেমে গেছে সব বাধা-ব্যবধান/ যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রিশ্চিয়ান...। এভাবেই মানুষে মানুষে সমতার স্বপ্ন জাগিয়ে ছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সৃষ্টির আলোয় একই সঙ্গে ধারণ করেছিলেন প্রেম ও মানবতাকে। কবিতার ছন্দে কিংবা গানের সুরে মিলিয়ে দিয়েছিলেন বিভেদের সীমারেখা। অন্যায় কিংবা শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে বিদ্রোহী কবির কলম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামল কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ধরা দিয়েছে তার সৃষ্টিসমগ্র। এভাবেই দ্রোহ, প্রেম, সাম্য ও মানবতার কবি হিসেবে ঠাঁই করে নেন বাংলা সাহিত্য ও শিল্পের অনুরাগীদের মননে। তাই আজো সঙ্কট কিংবা দুঃসময়ে তিনি আবির্ভূত হন বাঙালীর আলোর দিশারী হয়ে। বৃহস্পতিবার ছিল গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই লড়াকু কবির ৩৯তম প্রয়াণবার্ষিকী। জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতায় গান, কবিতা কিংবা বক্তৃতায় বারংবার উচ্চারিত হয়েছে সাম্যের চেতনা। অনুরাগীদের হৃদয় উৎসারিত ভালবাসার সঙ্গে কবির অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী চেতনার অনুরণন ছিল গোটা জাতির অন্তরে। কবির অসাম্প্রদায়িক চেতনায় দেশ গড়ার শপথ নিয়ে পালিত হলো তার মৃত্যুবার্ষিকী। কবির সমাধিতে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদনের পাশাপাশি নানা আয়োজনে গান-কবিতা ও কথায় স্মরণ করা হয় কবিকে। জাতীয় পত্রিকাগুলোয় গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়েছে নজরুলের প্রয়াণবার্ষিকীর সংবাদ। সরকারী-বেসরকারী টেলিভিশন ও বেতারে প্রচারিত হয়েছে নজরুলকে নিবেদিত গান-কবিতার অনুষ্ঠানমালা। তবে নজরুলের সৃষ্টির চর্চায় নিবেদিত বিভিন্ন সংগঠন মৃত্যুবার্ষিকীর পালনের আয়োজনটি করেছে এক দিন থেকে এক সপ্তাহ বা আরও পরে। জানা যায়, দিনটিকে ঘিরে সংগঠনের শিল্পীদের টেলিভিশনের আয়োজনে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যস্ততা থাকায় কবির মৃত্যুবার্ষিকীর আয়োজনগুলো পরে করা হবে। কবির প্রয়াণবার্ষিকীর দিন শুধু শিল্পকলা একাডেমি ও নজরুল ইনস্টিটিউটের যৌথ আয়োজনে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর আগে বুধবার বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকীর বক্তৃতার আয়োজন করা হয়। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক আয়োজনে ছায়ানট স্মরণ করবে কবিকে।

কবির সমাধিতে নিবেদিত পুষ্পাঞ্জলি ॥ পুব আকাশে সূর্যের রক্তিম আভার দেখা মিলতেই সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে কবির সমাধিতে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদনের মাধ্যমে শুরু হয় কবি স্মরণে দিনের কর্মসূচী। কিছুক্ষণের মধ্যেই সর্বস্তরের মানুষসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নিবেদিত ফুলে ফুলে আচ্ছাদিত হয়ে যায় কবির সমাধি। কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তার সমাধি ও স্মৃতি কমপ্লেক্সে নেমে আসে মানুষের। ভোর থেকে নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদÑমসজিদুল জামিয়াতে ফজরের নামাজের পর কোরানখানি অনুষ্ঠিত হয়। সকালে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক সমিতি ও ছাত্রছাত্রীরা কবির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ফাতেহা পাঠ ও নজরুল মঞ্চে আলোচনা করেন। কবি পরিবারের পক্ষে নাতনি মিষ্টি কাজীসহ অন্য সদস্যরা পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করেন।

জাতীয় কবির সমাধিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। আওয়ামী লীগের পক্ষে দলের দফতর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, বিএনপির পক্ষ থেকে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন, দলের মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ন্যাপ, সাইফুর রহমান সোহাগের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ কবির সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করে বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, শিশু একাডেমি, নজরুল সঙ্গীতশিল্পী পরিষদ, নজরুল সঙ্গীত সংস্থা, নজরুল ইনস্টিটিউট, নজরুল একাডেমি, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, ভাসানী সাহিত্য সাংস্কৃতিক পরিষদ, আন্তর্জাতিক নজরুল চর্চা কেন্দ্র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে কবির নাতনি মিষ্টি কাজী বলেন, জাতীয় কবির জন্ম কিংবা মৃত্যু দিবসে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও যাতে শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করা হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাচ্ছি।

এদিকে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, নজরুল গবেষক ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, ঢাবির বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বেগম আক্তার কামাল, সামাজিক বিভাগ অনুষদের ডিন অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমান, কলা অনুষদের ডিন আখতারুজ্জামান, সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক ড. লীনা তাপসী খান। এ পর্বের সঞ্চালনা করেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর।

আসাদুজ্জামান নূর বলেন, আমরা নজরুলকে সঙ্গে নিয়েই বেড়ে উঠেছি। তার কবিতা গান শুনে এবং পড়ে আমাদের চিন্তার বিকাশ ঘটেছে। বাঙালীর স্বাধিকার আন্দোলনে তার গান ও কবিতা আমরা কণ্ঠে ধারণ করেছি। তার কালজয়ী সৃষ্টিকর্মের মধ্যে দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে ৯ মাস তিনি আমাদের সঙ্গে ছায়ার মতো ছিলেন, আছেন আজও। কীর্তিমানের মৃত্যু হয় না, দেহাবসান হয় মাত্র। বেগম আক্তার কামাল বলেন, ‘জয় বাংলা ও বাঙালীর জয়’ এ চেতনা আমরা নজরুলের কাছেই প্রথম পেয়েছি। তিনি সৃজনশীল সব শাখায় যেমন অবদান রেখেছেন, তেমনি বঞ্চিত মানুষের অধিকার নিয়ে লিখেছেন এবং মাঠে নেমেছেন। কথা বলেছেন নারী অধিকার নিয়ে। তিনি বলেছেন, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’

উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, কবি নজরুলের গান, কবিতা ও বাণী বাঙালী জাতির জন্য উদ্দীপনা ও সঞ্জীবনী শক্তি হিসেবে কাজ করে। উপাচার্য কবি নজরুলের আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক অপতৎপরতার বিরুদ্ধে জাতিকে নজরুল চর্চা ও অধ্যয়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, কবি নজরুলের মানবতাবাদী চেতনা, সাম্য ও মুক্তবুদ্ধির ধারণায় আমাদের আত্ম-জিজ্ঞাসা প্রবণ হতে হবে এবং নতুন প্রজন্মকে এর তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। ধর্মের অপব্যবহার রুখতে নজরুলের মানবিক মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নজরুল মানুষে-মানুষে কোন ভেদাভেদ দেখেননি। তার রচনা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতিকে প্রেরণা যুগিয়েছে। তার সেই চেতনাকে ধারণ করেই দেশকে উন্নতি ও অগ্রগতির পথে নিয়ে যেতে হবে। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করেন।

নজরুল পুরস্কার, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ॥ কাজী নজরুল ইসলামের ৩৯তম প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমি ও নজরুল ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আলোচনা, নজরুল পুরস্কার ২০১৪ প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাাদুজ্জামান নূর। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি সচিব বেগম আক্তারী মমতাজ। মুখ্য আলোচক ছিলেন নজরুল ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ইমেরিটাস প্রফেসর রফিকুল ইসলাম। এর আগে স্বাগত বক্তব্য দেন নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ইকরাম আহমেদ। নজরুল ইনস্টিটিউট প্রবর্তিত ২০১৪ সালের নজরুল পুরস্কার প্রদান করা হয় নজরুল বিষয়ক গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ইমেরিটাস প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও নজরুল সঙ্গীতে শবনম মুশতারীকে। তাদের হাতে পুরস্কারে সমুদয় অর্থ ৫০ হাজার টাকা ও স্মারক তুলে দেন প্রধান অতিথি আসাদুজ্জামান নূর।

পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুভূতি ব্যক্ত করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, যে কোন বয়সেই পুরস্কার পেলে আনন্দ লাগে ও উদ্দীপনা জাগে। নজরুলের নামাঙ্কিত পুরস্কার পেয়ে আমিও আনন্দিত ও উদ্দীপ্ত। আর নজরুলের যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে তা হলো কবির স্বতন্ত্রতা। এ স্বতন্ত্রের মধ্যে আছে বহুমুখিতা ও বহুগামিতা। নজরুলের অনেক পরিচয়ের মধ্যে অন্যতম পরিচয় বিদ্রোহী কবি। তার অনেক কবিতার মধ্যে যদি শুধু এই একটি কবিতাকে উপস্থাপন করা হয় সেখানে পাওয়া যায় সৃষ্টির সুখের উল্লাস। অন্যদিকে আমাদের এই সমাজের সৃষ্টির অভাব প্রবল। এক অর্থে তিক্ত সুখ আর রিক্ত বুকে নজরুল হয়েছেন বিদ্রোহী কবি। নজরুলের কবিতায় ও জীবনে বেদনা আছে তবে এ বেদনা ব্যক্তিগত নয় সমষ্টিগত।

সঙ্গীতশিল্পী শবনম মুশতারী বলেন, এ দুর্লভ পুরস্কারের আমি যোগ্য কী না জানি না তবে এর সঙ্গে মানুষের ভালবাসা জড়িত রয়েছে আমি তা গ্রহণ করলাম। এ সময় শবনম মুশতারী তার বাবা কবি তালিম হোসেনের নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

সুর ও ছন্দমাখা গান এবং কবিতায় সাজানো হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এ পর্বের শুরুতেই সঙ্গীত পরিবেশন করেন শবনম মুশতারী। গেয়ে শোনান ‘সে দিন যদি পড়ে আমায় মনে’ ও ‘বনের পাখিরে কে চিনে রাখে।’ খায়রুল আনাম শাকিল পরিবেশন করেন নজরুলের গজল অঙ্গের গান ‘কেন আনো ফুল ডোর।’ সালাউদ্দিন আহমেদ গেয়ে কবির আধুনিক গান ‘ভুল করে যদি ভালোবেসে থাকি ক্ষমিও সে অপরাধ’। এ ছাড়াও একক কণ্ঠে গান শোনান খালিদ হোসেন, শাহীন সামাদ, ফাতেমা-তুজ-জোহরা, শবনম মুশতারী, ইয়াসমীন মুশতারী, ইয়াকুল আলী খান, ড. লীনা তাপসী খান, রাহাত আরা গীতি ও ছন্দা চক্রবর্তী। দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে শিল্পকলা একাডেমির রিপোর্টার সঙ্গীত দল ও নজরুল ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষণার্থী শিল্পীবৃন্দ। বাকশিল্পী লায়লা আফরোজ আবৃত্তি করেন নজরুলের কবিতা ‘নারী’। এ ছাড়াও একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, সীমা ইসলাম ও শাহাদাৎ হোসেন।