১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফারুকী হত্যা তদন্তে এক বছরেও রহস্য উন্মোচিত হয়নি

  • মামলা যাচ্ছে ডিবি থেকে সিআইডিতে

শর্মী চক্রবর্তী ॥ বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট নেতা এবং চ্যানেল আইয়ের ইসলামভিত্তিক অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মাওলানা শায়খ নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যা ঘটনার এক বছর পার হয়েছে। অথচ এ ঘটনার রহস্য এখন পর্যন্ত উন্মোচন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত বছর ২৭ আগস্ট দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন চ্যানেল আইয়ের ইসলামভিত্তিক ‘কাফেলা’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা নুরুল ইসলাম ফারুকী। এক বছর পরও অন্ধকারের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে এই তদন্ত। এ ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় দায়ের করা মামলাটি কয়েকদিন পরই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) স্থানান্তর করা হয়। এক বছরের তদন্তে সাফল্য না পেয়ে ডিবি এখন মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) স্থানান্তর করছে। এর মধ্যে ডিবি শুধু জানিয়েছে, ফারুকীর ধর্মীয় মতাদর্শের বিরোধী ‘উগ্রপন্থী’রা এ হত্যাকা- ঘটায়। তবে সেই উগ্রপন্থীদের আজও শনাক্ত করা যায়নি। তদন্তের এই পরিস্থিতিতে হতাশা প্রকাশ করে নিহতের স্বজনরা বলছেন, আর কবে শনাক্ত হবে খুনীরা? কোন কারণে মামলাটি যেন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত না করা হয় সে ব্যাপারেও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার অনুরোধ করেছেন তারা।

শুরু থেকেই জঈ গোষ্ঠীকে সন্দেহ করে আসা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তদন্তে নিষিদ্ধ ঘোষিত জামাআ’তুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যদের সম্পৃক্ততা খোঁজার কথা বলেছেন। তবে এর মধ্যে কোন সংগঠন বা কারা দায়ী- তার মীমাংসা তারা এখনও করতে পারেননি।

হত্যাকা-ের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা একেক সময় একেক তথ্য দিলেও প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কারণে তদন্তের ফলাফল শূন্য।

এ ব্যাপারে ডিবির উপকমিশনার (পশ্চিম) সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ডিবির তদন্তে ফারুকীর হত্যাকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাই মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তরের জন্য আবেদন করা হয়েছে। তারা (সিআইডি) শুরু থেকেই মামলাটির ছায়া তদন্ত করে আসছিল।

ডিবি সূত্র জানায়, গত বছরের ২৭ আগস্ট রাতে রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারের ১৭৪ নম্বর বাসায় মাওলানা ফারুকীকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ ও ডিবি সন্দেহভাজন হিসেবে এক নারীসহ তিনজকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোন তথ্য মেলেনি।

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক জুলহাস উদ্দিন আকন্দ বলেন, তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর সম্ভাব্য সব উপায়ে খুনীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। সন্দেহভাজন অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সন্দেহের তালিকায় থাকা বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা করেও তদন্ত-সহায়ক কিছু পাওয়া যায়নি।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগের এ্যাপ্লিকেশন সার্ভিসের কথোপকথন ট্র্যাকিং কিংবা অবস্থান ট্র্যাক করার কোন প্রযুক্তি তাদের নেই। এ সকল মাধ্যমে যোগাযোগের কারণে গোয়েন্দারা তাদের গতিবিধি অনুসরণ করতে পারননি। কল ট্র্যাকিং, ইউটিউব, ফেসবুক, ভাইভার, টুইটারের বার্তা নিয়ে তদন্তকাজ পরিচালনা করা হয়েছে। তদন্তের তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি।

নিহতের বড় ছেলে আহমেদ রেজা ফারুকী বলেন, অনেক ঘটনা ঘটার পর পরই জড়িতদের গ্রেফতার করে পুলিশ। অথচ নৃশংস এই হত্যাকা-ের পর এক বছরেও তদন্তের কোন অগ্রগতি নেই। বরং তদন্ত গতি হারিয়ে ফেলেছে। তিনি তদন্ত সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ করেন, মামলাটি যেন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত না করা হয়। তিনি বলেন, আমাদের যারা এভাবে এতিম করল, পুলিশ এখনও তাদের গ্রেফতার করতে পারেনি। তারা তদন্তের জন্য যে সব তথ্য চেয়েছে তার সবই আমরা দিয়েছি। কিন্তু ১ বছর হয়ে গেল এখনও কোন কিছুই হলো না।

রেজা ফারুকী বলেন, পারিবারিক বা ব্যবসায়িক বিরোধে আব্বা খুন হননি। আমরা পরিবারের সদস্যদের সবার সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করি। আমার আব্বা সুন্নি মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। হত্যার আগে তাকে তার মতাদর্শের বিরোধীরা মোবাইল ফোন ও ফেসবুকে হত্যার হুমকি দেয়। উগ্রবাদীদের হাতে তাকে নিহত হতে হয়েছে। এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকা-। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ হত্যাকা-ের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কোন ইসলামিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন না বলে জানান তিনি।

বাবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ ছেলে আহমদ রেজা ফারুকী বলেন, আমার বাবা সবসময় তার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন, বাংলাদেশের মুসলমানদের ধ্যান-ধারণা পরিবর্তন করতে হবে। তারা ইসলাম ও আধুনিক সংস্কৃতিকে আলাদা আলাদাভাবে দেখে। বহির্বিশ্ব বা ইসলামী যে দেশগুলো রয়েছে সেখানে ইসলাম ও আধুনিক সংস্কৃতি আলাদা করে দেখা হয় না। সেগুলো একসঙ্গে যুক্ত করে আধুনিক ইসলামী পন্থায় তারা চলছে। আমার বাবাও তাই চেয়েছিলেন। নিহত ফারুকীর ছোট ছেলে ফয়সাল ফারুকী বড় ভাইয়ের মতোই আক্ষেপ করে বলেন, প্রায় এক বছর হয়ে গেল, খুনীদের তারা গ্রেফতার করতে পারল না পুলিশ। তারা খুনীদের দেখতে চান।

বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন ফারুকী। হত্যার পর পরই তার রাজনৈতিক সহকর্মী ও স্বজনরা অভিযোগ করেন, জামায়াত-হেফাজত গোষ্ঠী এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এ ঘটনার আগে টেলিভিশনে ইসলামী অনুষ্ঠানের উপস্থাপকদের এক বৈঠকে তার বিরুদ্ধে নানা আলোচনা হয় বলেও দাবি করা হয়। পরে ছয় উপস্থাপকের বিরুদ্ধে আদালতে হত্যা মামলা করে ইসলামী ফ্রন্টের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসেনা।