২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাপুরুষ সৃষ্টি করেনি কখনও

  • মুনতাসীর মামুন

বিজ্ঞাপন প্রকাশের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক পদের জন্য অনেকে আবেদন করেছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন ফনেটিকসে নোয়েল আর্মফিল্ড, ইংরেজীতে মি. পিংক ও ইতিহাসে মি. হালিম। যাদের যোগ্য বিবেচনা করা হয়নি তাদের জানিয়ে দিতে বলা হয়েছিল। আবদুল হালিম পরে ইতিহাস বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন। গতকালের পর আজ পড়ুন তৃতীয় কিস্তি...

পরে অবশ্য জ্ঞান চন্দ্র ঘোষকেই কেমেস্ট্রির প্রফেসর ও চেয়ারম্যানশিপ দেওয়া হয়। ড. ঘোষ ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঋণ শোধ না করে তাঁর পক্ষে ঢাকায় যোগ দেওয়া সম্ভব ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর ক্যাপিটাল গ্রান্ট থেকে এ ঋণ শোধ করে দিয়েছিল। টাকার পরিমাণ ১০,৭০০ টাকা। এ পরিপ্রেক্ষিতে এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল ১৩ ডিসেম্বর ১৯২১ সালে ৩৬ নং প্রস্তাব নিয়েছিল এভাবে-

“That Rs. 10,700 be paid to Dr. J.C. Ghosh to pay his debt to the Calcutta University and that the sum be debited to the annual capital expenditure of the University provided that Dr. Ghosh gives an undertaking that he will remain in service of the University for a period of five years and his scale of salary remain unaffected.”

পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে জানিয়েছেন হার্টগ, আরেকজন ভারতীয়ই শ্রেষ্ঠ। তাঁর নাম মেঘনাদ সাহা; যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন লেকচারার এবং তখন ছিলেন লন্ডনে। হার্টগ, ড. সাহাকে উল্লেখ করেছেন- ‘Man of great ability’ হিসেবে। কিন্তু বিভাগ প্রধানের দায়িত্ব তিনি পালন করতে পারবেন কিনা সে বিষয়ে তাঁর সন্দেহ ছিল, কারণ ড. সাহার বয়স খুবই কম। এ পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা কলেজের অধ্যাপক ডব্লিউ, এ জেনকিনসের কথা তাঁরা ভাবছিলেন।

পদার্থবিদ্যা বিভাগের নিয়োগ নিয়ে হার্টগ আসলে মনস্থির করতে পারছিলেন না। ১৯ অক্টোবর স্যার অলরি সুস্টার এফ আর এস কে জানালেন, কেমব্রিজে রাদারফোর্ডকে তিনি লিখেছেন, কয়েকজনের নাম প্রস্তাব করতে। ড. সাহাকে হার্টগের বেশ পছন্দ হয়েছিল। সুস্টার ও রাদারফোর্ডকেও তিনি তা জানিয়েছিলেন। সুস্টারকে লিখেছিলেন- “The most promising candidate was Saha but we were all of opinion that inspite of brilliant abilities he had not the experience necessary to take charge of a Department.”

হার্টগের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে রাদারফোর্ড গ্লাসনের নাম প্রস্তাব করেন। ১০ নবেম্বর হার্টগ রাদারফোর্ডকে জানালেন, গ্লাসনের সাক্ষাতকার নেয়া হয়েছে এবং নির্বাচকম-লী তাঁকে পছন্দও করেছে। কিন্তু বিচার করতে হবে, এ ক্ষেত্রে জেনকিন্স থেকে তিনি যোগ্যতর কিনা। জেনকিন্স শেফিল্ডে ছিলেন এবং রিসার্চ স্কলারশিপ নিয়ে ক্যাভনডিশ ল্যাবরেটরিতেও ছিলেন। তা সত্ত্বেও হার্টগ জানিয়েছিলেন, এ পরিস্থিতিতে গ্লাসনকেই শক্তিশালী মনে হচ্ছে। তবে, গ্লাসন বা সাহা নন, শেষ পর্যন্ত জেনকিন্সকেই পদার্থবিদ্যা বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।

ইতিহাস বিভাগের জন্য তখনও উপযুক্ত কাউকে পাওয়া যায়নি। হার্টগের ইচ্ছে ছিল আলিগড় থেকে এ এফ রহমানকে আনা; কিন্তু রিডার হওয়ার মতো উপযুক্ত যোগ্যতা তাঁর ছিল না। হার্টগ শিক্ষা বিভাগের পরিচালক হর্নেলকে লিখেছিলেন, ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর ও চেয়ারম্যান পদের প্রার্থী হিসেবে রহমানের দরখাস্ত তিনি দেখেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে নিতে তিনি বড়ই ইচ্ছুক। কিন্তু এ পদে রহমানের নিযুক্ত তিনি ডিফেন্ড করতে পারবেন না, কারণ রহমানের কোন প্রকাশনা নেই। তবে হার্টগ যেহেতু চেয়েছিলেন সেহেতু তিনি পথও বের করেছিলেন। এফ রহমানকে এস এম হলের প্রভোস্ট ও ইতিহাস বিভাগের রিডার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিনকে হার্টগ লিখেছিলেন, রহমান যেন এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করে, কারণ “ও ঃযরহশ ঃযব ঢ়ড়ংঃ যধফ মৎবধঃ ড়ঢ়ঢ়ড়ৎঃঁহরঃরবং ভড়ৎ যরস ধহফ ভড়ৎ উধপপধ.” হার্টগের ভবিষ্যতবাণী মিথ্যা হয়নি। এ এফ রহমান ১৯৩৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন এবং সে পদে তিনি ছিলেন ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত। তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় উপাচার্য।

আদি নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষকদের যোগ্যতার একটি মাপকাঠি ছিল নিজ বিষয়ে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং গবেষণা। ঐ সময় বিভিন্ন পদে নিয়োগের ব্যাপারে সাম্প্রদায়িক প্রশ্নও উঠতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্টের মুসলমান সভ্যরা চাইতেন মুসলমান প্রার্থী যদি তুলনামূলকভাবে কম যোগ্যও হয় তবুও যেন পদটি তারই হয়। এখানেই শেষ নয়। আমলাতন্ত্রের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দ্বন্দ্ব গোড়া থেকেই ছিল। অধ্যাপকদের বেতনের হার ও আবাসস্থল নিয়ে ক্ষোভ ছিল। প্রধান ক্ষোভ ছিল পদমর্যাদা নিয়ে। ঢাকায় যে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স ছিল তাতে এক নম্বরে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। দু’নম্বরে ঢাকার কমিশনার। লাট-বেলাট কেউ ঢাকায় এলে, লাঞ্চ বা ডিনার খেতে হলে উপাচার্যের সঙ্গেই তা খেতেন। বলাবাহুল্য, এই ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের জন্য কমিশনার, জজ প্রভৃতি আমলারা অসন্তুষ্ট ছিলেন।

এ ধরনের ভাষ্যে পূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরা অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে। আমি শুধু বোঝাতে চেয়েছি, শিক্ষা সংকোচন যেখানে সরকারী নীতি, সেখানে পূর্ববঙ্গের জলাভূমিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য তারা কত যতœ করেছে। প্রেসক্লাব, মিন্টো রোডের বাড়ি, পুরনো মেডিক্যাল কলেজ, পররাষ্ট্র ভবন, সিরডাপ থেকে শুরু করে পুরোটাই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দখলে। এমনকি পুরনো হাইকোর্ট ভবনও। প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য তারা আমলাতন্ত্রের থেকে উচ্চবেতন ও সুবিধা দিয়েছিলেন। এর ফলও তারা পেয়েছিলেন। পদের ক্ষেত্রে বয়স বা সিনিয়রিটি কোন প্রতিবন্ধক ছিল না। এখনও তাই। সারা ভারতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। সত্যেন বোস থেকে ড. শহীদুল্লাহ কে না জড়িত ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে! বুদ্ধদেব বসু থেকে শামসুর রাহমান, ১৯৩০ সালের সশস্ত্র বিপ্লবী অনিল রায় থেকে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান কে না জড়িত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু দিয়েছে দেশ ও জাতিকে, বিনিময়ে চায়নি কিছু, নেয়নি কিছু।

তিন.

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষকদের সঙ্গে বিরোধ শুরু হয়েছিল আমলাতন্ত্রের। সেই ১৯২৬ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয় শিক্ষার্থীদের। ঐ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ক্রিকেট খেলার জন্য সেনাবাহিনীর মেজর কারবেরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেকে অনুমতি নেয়। ছাত্র ও দর্শকরা খেলা দেখছিল। একজন খেলোয়াড়ের অপটুতা নিয়ে জনতা হেসে ওঠে। এ নিয়ে ক্ষোভ, কথা কাটাকাটি এবং এক পর্যায়ে কয়েকজনকে সেনা কর্তৃক ‘চোপ শালা হট যাও’ বলার পরই হাতাহাতি শুরু হয়। যথারীতি তদন্ত ইত্যাদি শুরু হয়। উপাচার্য ল্যাংলি শ্বেতকায় বিধায় সৈন্যদের মৃদু সমর্থন করায় তার সঙ্গেও ছাত্রদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। অনেকদিন পর্যন্ত ছাত্রদের ক্ষোভ প্রতিবাদ চলেছিল।

১৯৩০-৩৫ সালে সৈন্যদের একটি দলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রাখা হয়েছিল। তাদের গর্হিত আচরণের কারণে ছাত্র-শিক্ষকের যৌথ প্রতিবাদ শুরু হয়। সেটিও দীর্ঘদিন চলে। আরও পরে ২০০৭ সালেও একই ঘটনা ঘটে। প্যাটার্নটি একই রকম। ঔপনিবেশিক মানসিকতা যা উপযুক্ত নয় স্বাধীন দেশের।

দেশ মুক্তির আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অসহযোগ আন্দোলনের সময় থেকেই জড়িত হয়ে পড়ে। সেটি এমন কিছু নয়। কিন্তু ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন ও অন্যান্য আন্দোলনে ছাত্ররা অংশ নেয়া শুরু করে। বিপ্লবীদের দল শ্রীসংঘের সঙ্গে জড়িত ছিলেন ইংরেজীর অনিল রায়, প্রথম ছাত্রী লীলা রায়, রেনুকা সেনগুপ্ত, শৈলেন বসু, ইতিহাসে প্রথম হওয়া হরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য প্রমুখ। তারা সবাই জেল খেটেছেন। শ্রীসংঘের সভাপতি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিচ্ছু ছাত্র অজিতনাথ ভট্টাচার্য ১৯৩০ সালে কার্জন হলের সামনে পুলিশের পিটুনিতে মারা যান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম শহীদ।

চলবে...