১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

’৭৫ থেকে ’৮১- কেমন ছিল বাংলাদেশ?

  • গোলাম কুদ্দুছ

জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখলের পর পরই বঙ্গবন্ধুর খুনীদের পৃষ্ঠপোষকতার ধারাবাহিকতা রক্ষায় আরও সচেষ্ট হন। জিয়া কয়েকজন খুনীকে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরিরও ব্যবস্থা করেন। গত মঙ্গলবারের পর আজ পড়ুন চতুর্থ কিস্তি...

১৯৭৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গেজেট নোটিফিকেশন নং- ৭/৮/১৭৫-১৬০ অনুযায়ী তৎকালীন সেনাপ্রধান, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান নিজেকে মেজর জেনারেল পদ থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত করেন। কিন্তু একই বছরের ৯ এপ্রিল তারিখের গেজেট নোটিফিকেশন নং- ৭/৮/২৭৫/২৭০ অনুযায়ী পূর্বে ইস্যুকৃত নোটিফিকেশন বাতিল করে নতুন করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়, যা ১৯৭৮ সালের ২৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর করা হয়। ৯ এপ্রিল ১৯৭৯ জারিকৃত আরেকটি নোটিফিকেশন নংÑ ৭/৮/১৭৫-২৭০ অনুযায়ী জিয়াউর রহমান লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন, যা ১৯৭৮ সালের ২৯ এপ্রিল তারিখ থেকে কার্যকর করা হয়। এসব সিদ্ধান্তের কোন কারণ জানা না গেলেও এটা স্পষ্ট এবং দালিলিকভাবে প্রমাণিত যে, ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত জেনারেল জিয়া সামরিক বাহিনীতে ছিলেন। ব্যাক ডেটে কেন তিনি পদোন্নতি নিয়ে আবার অবসরে যাবার জন্য ব্যাক ডেটকে ব্যবহার করেন তা আজও বোধগম্য নয়।

ট.

জেনারেল জিয়া প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও ক্ষমতার ভিত্তিকে পাকাপোক্ত করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতাকে হত্যাকারী মেজরচক্র পুনরায় ক্ষমতা দখলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তাদেরই আনুকূল্য এবং যোগসাজশে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পাওয়া জেনারেল জিয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতাকে মেজরচক্র পুরো মেনে নিতে পারেনি। আর সে কারণেই পাল্টা ক্যুর মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জাল বুনতে থাকে। দেশে-বিদেশে অবস্থান করে নানা বৈঠক শেষে ১৭ জুন ১৯৮০ সিপাহি বিদ্রোহ করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট অফিসাররা দ্বিমত পোষণ করায় ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়। অনেকে অভিযুক্ত থাকার কথা শোনা গেলেও সর্বশেষ পাঁচজনকে সশস্ত্র অভ্যুত্থান সংঘটিত করার ষড়যন্ত্রের জন্য অভিযুক্ত করা হয়। অভিযুক্তরা হলেন : লে. কর্নেল দিদারুল আলম, লে. কর্নেল নুরুন্নবী খান, লে. কর্নেল আনোয়ার আজিজ পাশা, মেজর কাজী নূর হোসেন এবং সে সময় কৃষি ব্যাংকে প্রশিক্ষণরত অফিসার মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ হোসেন বীর প্রতীক। বিচারে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে লে. কর্নেল দিদারুল আলমকে ১০ বছর, মোশাররফ হোসেন বীর প্রতীককে ২ বছর এবং লে. কর্নেল নুরুন্নবী খানকে ১ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। খুনী মেজর চক্রের দুই সদস্য লে. কর্নেল আনোয়ার আজিজ পাশা এবং মেজর কাজী নূর হোসেন দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হওয়ায় তাদের কোন শাস্তি না দিয়েই জিয়াউর রহমানের সরকার আংকারা এবং তেহরানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে পূর্বের চাকরিতে ফেরত পাঠান। এভাবে প্রকারান্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার খুনীদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়।

খুলনা কারাগারে আটক কয়েদিরা কিছু সুনির্দিষ্ট দাবী আদায়ের জন্য ১২ অক্টোবর ১৯৮০ ডেপুটি জেলারসহ ২৪ জন ব্যক্তিকে জিম্মি হিসেবে আটক করে। ২১ অক্টোবর পুলিশ বাহিনী কারাগারে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩৫ জন কয়েদিকে হত্যা করে আটক জিম্মিদের উদ্ধার করে।

ঠ.

এ সময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুটো বড় ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করি। একটি হলো জাসদের ভাঙন এবং আরেকটি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে সভাপতি নির্বাচন। স্বাধীনতার পর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল সংক্ষেপে জাসদের প্রতিষ্ঠা এবং উত্থান সকলেই প্রত্যক্ষ করেছি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী তরুণ নেতৃত্বের একটি অংশ স্বাধীনতার পর ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে। সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে তারা নতুন দল জাসদ গঠন করেন। বিভক্ত হয়ে যায় ছাত্রলীগ।

এ সংগঠন গড়ার মূল নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান, কাজী আরেফ আহমেদ, মেজর জলিল, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, মো. শাহজাহান, নূরে আলম জিকু, খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া, আবদুল্লা সরকার, আ ফ ম মাহবুবুল হক, এ্যাডভোকেট হাবিবুল্লাহ চৌধুরী, মুবিনুল হায়দার চৌধুরী, কামরুজ্জামান টুকু, একরামুল হক, মমতাজ বেগম, বিধানকৃষ্ণ সেন, মোশাররফ হোসেন, হাসানুল হক ইনু, শরীফ নুরুল আম্বিয়া প্রমুখ। ১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রছাত্রী সংসদ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগ প্যানেল থেকে মাহমুদুর রহমান মান্না ভিপি এবং আক্তারুজ্জামান জিএস নির্বাচিত হন।

১৯৮০ সালে এসে জাসদ বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর জন্ম হয়। এ সংগঠনটির নেতৃত্বে আসেন খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া, আবদুল্লা সরকার, মুবিনুল হায়দার চৌধুরী, আ ফ ম মাহবুবুল হক, এ্যাডভোকেট হাবিবুল্লা চৌধুরী, মমতাজ বেগম, সুভ্রাংশু চক্রবর্তী, মাইনুদ্দিন খান বাদল, একরামুল হক প্রমুখ। মাহমুদুর রহমান মান্না, আক্তারুজ্জামান, জিয়াউদ্দিন বাবলুর নেতৃত্বে জাসদ ছাত্রলীগের বড় অংশই বাসদের সঙ্গে যুক্ত হয়।

১৯৭৬ সালে সামরিক সরকারের রাজনৈতিক দলবিধি অনুযায়ী বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) অনুমোদন লাভ করে। এ সময় তারা সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আহ্বানে ‘খালকাটা’ কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী একটি রাজনৈতিক দল কর্তৃক সামরিক শাসকের কর্মসূচী বাস্তবায়নে এ ধরনের উদ্যোগ নজিরবিহীন।

ড.

১৯৮১ সালের ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ইডেন হোটেলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে দলের নেতৃত্ব এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে বিদেশে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করে। এ নির্বাচনের পেছনে দুটি কারণ বিদ্যমান ছিল বলে সর্বমহল থেকে বলা হয়েছে। প্রথমত, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর বাংলাদেশের রাজনীতি যেভাবে দক্ষিণপন্থীদের হাতে চলে যাচ্ছে তাকে প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। এক সময়কার প্রগতিশীলদের এক বড় অংশই ক্ষমতার লোভে সামরিক শাসকের সহযোগী হয়ে সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করে। এমনই পরিস্থিতিতে দলের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের কাছে শতভাগ আস্থাশীল নেতৃত্বের প্রয়োজন দেখা দেয়। এছাড়া পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং বাস্তব অবস্থার নিরিখে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে দলের দায়িত্ব প্রদানের দাবী ওঠে দেশের সর্বস্তরে।

চলবে...

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব