১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এদের সঙ্গে সংলাপের অবকাশ আছে কি?

  • সৈয়দ মহসিন আলী

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ, ১৯৭১ রাত ১২:০১ মি. বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং ইপিআরের মাধ্যমে ঘোষণাপত্রটি চট্টগ্রামে পাঠান। ২৬ মার্চ দুপুর দেড়টায় চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা এম এ হান্নান চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে এ ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন। মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে ২৭ মার্চ, ১৯৭১ বিকেল ৪টায় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে পাঠ করেন, এটাই ঐতিহাসিক সত্য। উল্লেখ্য, বাংলার অবিসংবাদিত নেতা এবং কিংবদন্তি নায়ক কেবল যার পক্ষে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক মুক্তির ঘোষণা দেয়া সম্ভব ছিল। তিনি একদিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার যোগ্য হয়ে উঠেছিলেন কি? অবশ্যই নয়! একজন বঙ্গবন্ধু, একজন স্বাধীনতার মহান স্থপতি একজন স্বাধীনতার ঘোষক হয়ে উঠতে তাঁকে কালের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে, স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাসের বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল। ইতিহাস আলোকপাত করলে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে মন্ত্রিসভায় প্রথমে কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনিই আবার পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর অব্যাহত বৈষম্য ও দীর্ঘ শোষণনীতি থেকে স্বাধিকারের লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধীদলীয় সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা দাবি সংবলিত ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। যা পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তির সনদ হিসেবে খ্যাত। প্রকৃতপক্ষে এ ৬ দফা প্রথম স্বাধীনতার স্মারক, যেখানে বাঙালীর মুক্তি সংগ্রাম নতুনভাবে গতি লাভ করে, যা পাকিস্তানের স্বৈরশাসকগণের জন্য ছিল একটি মারণাস্ত্রস্বরূপ। সেই বঙ্গবন্ধুই আবার বলিষ্ঠ নেতা হিসেবে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ছাত্রসমাজের ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনে তাঁর স্বরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। অবশেষে বাংলার মেহনতি মানুষ, স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্বেলিত আপামর জনসাধারণ, ছাত্র-জনতা, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাকে যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে, যা ছিল অগ্ন্যুৎপাতের মতো। কাজেই তিনিই তো স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার যোগ্য নেতা হয়ে উঠেছিলেন এবং সেই মাহেন্দ্রক্ষণে ঘোষণাও দিয়েছিলেন। অন্যদিকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পাঠক তৃতীয় ব্যক্তি মেজর জিয়া ছিলেন সরকারের আজ্ঞাবহ দাস একজন সিপাহীমাত্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠকারী ব্যক্তিকে তথাকথিত স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে দাবি করা সত্যের অপলাপ এবং বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের অভাব বৈ কিছু নয়।

কোন অনুষ্ঠান বা কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সাধারণত অনুষ্ঠানটি শুরুর আগে যিনি ঘোষক তিনি ঘোষণা করে থাকেন। এটি স্বতঃসিদ্ধ রেওয়াজ। কোনক্রমেই তা অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হওয়ার পরে নয়। পরে দিলে তা আর ঘোষণা নয়, বরং ঘোষিত বিষয়ের প্রচারণা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। আর বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ঘোষণার এ কাজটি মুক্তিযুদ্ধের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ তারিখে করেছেন। তাই ২৭ মার্চ ঘোষণা দিলে তা ২৬ মার্চের স্বাধীনতা দিবসের ক্ষেত্রে কোন তাৎপর্য বা কার্যকারিতা থাকে না এবং তা দাবি করাও সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অবান্তর। বরং তথাকথিত এ ঘোষণাটিকে ২৬ মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রচারণামাত্র বলা যায়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জিয়াউর রহমান নিজে তার জীবদ্দশায় কখনোই নিজেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে ভাবেননি বা দাবি করেননি।

বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ করে ২৪ এপ্রিল, ১৯৭১ তৈরিকৃত/প্রণীত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের বিষয়ে জিয়াউর রহমান একমত পোষণ করেছেন।

১. জিয়াউর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে মেনে নিতে পারেনি এবং মুক্তিযুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিলেন তাদের নিয়ে জোট করে এবং স্বাধীনতার ঘোর বিরোধিতাকারী শাহ আজিজকে তার মন্ত্রিসভার প্রধানমন্ত্রী করেন এবং অন্যদের মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য করেন। যা বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি।

২. বাংলাদশের জাতীয় পতাকাকে যারা মেনে নিতে পারেনি তাদের গাড়িতে পবিত্র জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে তিনি জাতীয় পতাকার অসম্মান করেন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করেন; তার স্ত্রীও ক্ষমতায় এসে একই কাজ করেছেন। যা ক্ষমারও অযোগ্য।

৩. বঙ্গবন্ধু এবং জেলহত্যাকারীদের বিচার না করে বরং তাদের বিচার চিরতরে রোধ করে দেয়ার জন্য ইনডেমনিটি আইন পাস করা হয়, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। শুধু তাই নয়, নৃশংস হত্যাকারীদের পদোন্নতি দিয়ে বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি দিয়ে তাদের পুনর্বাসন করেছেন। যা বাঙালী জাতির জন্য আত্মহননের শামিল।

৪. কোন ছাত্র যদি পূর্ব নির্ধারিত চূড়ান্ত পরীক্ষার তারিখ জেনেও এবং পরীক্ষার প্রবেশপত্র হাতে পেয়েও সে যদি পরীক্ষা কেন্দ্রে না যায় বা পরীক্ষা না দেয় সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রত্যাশা করতে পারে না। আর যে পরীক্ষা দিয়েছে সে তো পরীক্ষায় পাস করার আশা করতেই পারে। তাই বলে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি একথা বলা যাবে না এবং এও বলা সমীচীন হবে না যে, ছাত্রবিহীন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাই বিএনপি ৫ জানুয়ারি, ২০১৪-এ সাধারণ নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল জেনেও কোন আসনে প্রার্থী না হয়ে বা প্রার্থী না দিয়ে ভোটারবিহীন নির্বাচন হয়েছে-এটা দাবি করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অসাংবিধানিকও বটে।

৫. যদি বিএনপি-জামায়াত জোট মানুষকে ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা প্রদান না করত, মানুষকে পুড়িয়ে না মারত, ভোট কেন্দ্র তথা স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা না পোড়াত তাহলে সব ভোটারই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে ভোট কেন্দ্রে যেত এবং ৯০% ভোট পড়তে পারত। গাছ কাটা, রাস্তা কাটা, সেতু ভাঙ্গা এবং পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে মারার দায় বিএনপি কোনক্রমেই এড়াতে পারে না।

৬. নির্বাচনে অংশ না নিয়ে ভোটারদের কেবল ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার অনুরোধ করে যদি বিএনপি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে শান্ত থাকত তাহলে তারা মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা বলতে পারত বা দাবি করতে পারত। তা না করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি হাস্যকর বৈকি! মোট কথা বিএনপি যদি কেবল মানুষকে ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার অনুরোধ করত এবং কোনরকম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি না করত, মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকত তাহলে তাদের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরতে পারত। কিন্তু তারা তা না করে নির্বাচন ঠেকানোর নামে আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে মানুষ পুড়িয়ে মারল, ‘ভোট কেন্দ্র স্থাপিত’ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দিল। এখন তারাই আবার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ধুয়া তুলছে, যা পরস্পরবিরোধী চরিত্রের বহির্প্রকাশ। কাজেই শেখ হাসিনা তথা সরকার কথা দিয়ে কথা রক্ষা করেনি একথা বলা মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়। তাছাড়া সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা/সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যই যদি ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এবং এটাই যদি সত্য হয় তাহলে সে নির্বাচনের কার্যকারিতাও পাঁচ বছর মেয়াদের জন্যই হবে এটাই তো বিধান। আশা করি বিএনপি-জামায়াত জোট এটি বুঝতে ভুল করবে না।

৭. ৫ জানুয়ারি, ২০১৫-কে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াত চক্র বিপুলসংখ্যক বাস, সিএনজি, অটোরিক্সা পোড়ায় এবং শিশুসহ শতাধিক মানুষকে পুড়িয়ে মারে। পোড়ার যন্ত্রণা নিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে বেঁচে আছে প্রায় ২০০ মানুষ। যা বর্বরতার চরম প্রকাশ এবং অমানবিক। যা কোনক্রমেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ভাষা হতে পারে না। কোন সভ্য সমাজে এমনটি হতে পারে না। ধিক্কার এ পৈশাচিক জঙ্গী তৎপরতাকে! ধিক্কার এ আগুন সন্ত্রাসীদের!! এ জঙ্গীবাদের সমূলে উৎপাটন চায় শান্তিপ্রিয় মানুষ। এ জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে আরও একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ অপেক্ষমাণ এবং সে যুদ্ধে আমাদের সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে হবে। আর এতে আমাদের জয়ী হতেই হবে।

৮. ‘৯৬ জন বাস শ্রমিক হত্যা কোন বিষয়ই নয়, শিক্ষা দিয়ে কি হবে, রাখেন আপনার পরীক্ষা’Ñ পরীক্ষা চলাকালে হরতাল দিয়ে এমন কথা যারা দম্ভভরে বলতে পারে তাদের দিয়ে এ জাতির উন্নতি ও কল্যাণ আদৌ সম্ভব কি? এদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে আপামর সকলকে ।

৯. বেগম খালেদা জিয়া প্রথমবার যখন সংসদ নির্বাচন করেন তখন যে জন্ম তারিখ ব্যবহার করেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন যে জন্ম তারিখ ও বয়স দিয়ে, নবম শ্রেণীতে ভর্তির সময় যে জন্ম তারিখ দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করেন, সেই জন্ম তারিখ বাদ দিয়ে তিনি জাতীয় শোক দিবস ১৫ আগস্ট নতুন করে জন্ম তারিখ বানিয়ে উল্লাস করে কেক কাটেন। তাদের সঙ্গে কোন বিষয়ে আলোচনা বা সংলাপ করার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। বরং মিথ্যা তথ্য দেয়ার অপরাধে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া আবশ্যক।

১০. সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে যারা মেনে নিতে পারে না, স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তথা জাতির পিতার নেতৃত্বকে যারা মানতে পারে না, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী সেøাগান ‘জয় বাংলা’কে যারা অবজ্ঞা ও অস্বীকার করে, এমনকি যারা বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান স্বীকৃত স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে মেনে নিতে পারে না, তাদের সঙ্গে কোন বিষয়ে সংলাপ করার আদৌ অবকাশ আছে কি?

লেখক : সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী