২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ পবিত্র হজ ও কা’বা শরীফ

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। স্তম্ভগুলো হচ্ছে ইমান, সালাত, সওম, হজ, যাকাত। দৈহিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্য ব্যক্তিদের জন্য জীবনে একবার হজ করা ফরজ।

আল্লাহ জাল্লা শানুহু কা’বা শরীফকে হজ পালনকারীদের সমাবেশ কেন্দ্ররূপে নির্ধারিত করে দিয়েছেন। কা’বাঘর বিশ্ব মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম ইবাদতগাহ্ যা সমগ্র মানবজাতির জন্য কিবলারূপে নির্ধারিত হয়েছে। কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে : আল্লাহ মানুষের কল্যাণের জন্য পবিত্র কা’বাগৃহ ও পবিত্র মাস (জিলহজ) নির্ধারিত করে দিয়েছেন (সূরা মায়িদা : আয়াত ৯৭)।

কা’বা শরীফ হচ্ছে বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর। এই পবিত্র গৃহের সঙ্গে প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের শ্রদ্ধা ও ভক্তি জড়িয়ে আছে। আমরা জানি, প্রথমে কা’বাগৃহের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন আল্লাহ জাল্লা শানুহুর নির্দেশে ফেরেশতাগণ আর সেই ভিত্তির উপর দেয়াল তোলেন হযরত আদম আলায়হিস সালাম। সেই গৃহের ছাদ ছিল না, দরজাও ছিল না। পরবর্তীকালে এর দরজা স্থাপন করেছিলেন হযরত আদম (আ)-এর ছেলে হযরত শীছ আলায়হিস সালামের পুত্র হযরত আলূশ (আ)।

জানা যায়, আদ জাতি একবার তাদের দেশে দুর্ভিক্ষ হলে একদল লোককে মক্কা মুকাররমায় কা’বা শরীফে পাঠায় দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দু’আ করতে। তারা তাই করলে দুর্ভিক্ষ দূর হয়ে যায়। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবূ মূসা আল আ’শারী থেকে বর্ণিত একখানা হাদিসে আছে যে, ৭০ জন আল্লাহর নবী বায়তুল্লাহ শরীফে হজ করেছেন।

৬৩২ খ্রিস্টাব্দে বিদায় হজের সময় মক্কা মুকাররমা যাওয়ার পথে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যখন উসফান উপত্যকা অতিক্রম করছিলেন তখন বলেছিলেন : হযরত হূদ আলায়হিস সালাম ও হযরত শু’আয়ব আলায়হিস সালাম বায়তুল্লাহর হজের উদ্দেশে উটে চড়ে এই উপত্যকা অতিক্রম করেছিলেন (আহমদ মুসনাদ)।

হযরত মূসা আলায়হিস সালাম, হযরত ইউনূস আলায়হিস সালাম হজ পালন করেছেন বলে হাদিস শরীফে উল্লেখ রয়েছে। (দেখুন ইবনে মাজা)।

হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস সালাম কা’বা শরীফ আল্লাহর নির্দেশে পুনর্নির্মাণ করে হজের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই ঘোষণা শুনে প্রতি বছর জিলহজ মাসে বিভিন্ন স্থান থেকে বহু মানুষ হজ করতে মক্কা মুকাররমায় আসতে থাকেন। কিন্তু কালক্রমে হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস সালামের সেই হজে প্রবেশ করে কুসংস্কার, শিরক, কুফর, অন্ধবিশ্বাস এমনকি ৩৬০টি মূর্তি স্থাপিত হয়। অধিকাংশ মূর্তি ক্রয় করে আনা হয় পারস্যের মাদায়েন থেকে। কোন কোন মূর্তি স্থানীয়ভাবে তৈরি করে বসানো হয়, যেমন লাত। মক্কায় হজ করতে আসা মানুষকে পানি পান করানো একটা পুণ্যের কাজ। এই পানি পান করাত একটি গোত্র। এক ব্যক্তি পানি পান করানোর জন্য পাথর দিয়ে এক বিশাল পাত্র তৈরি করেন। এই পাত্রকে বলা হতো আল্লাত। সেই পানির পাত্রের নামে একটা মূর্তি স্থাপিত হয়। এমনিভাবে শুধু কা’বা শরীফেই নয়, মক্কার আশপাশেও বিগ্রহ স্থাপিত হয় যেমন, মক্কা ও তায়েফের মধ্যখানে নাখলা নামক স্থানে একটি বৃক্ষ ছিল। তাকে উজ্জা বলা হতো। তায়েফবাসী পুজো করত মানাতকে। সেই অন্ধকার যুগে মানুষ যার যার দেবীর নামে হজের নিয়ত করত। তারা কা’বা শরীফের নির্দিষ্ট পবিত্র স্থানের সীমানায় পৌঁছার পূর্বে নারী-পুরুষ সবাই উলঙ্গ হয়ে যেত। মক্কার কুরায়শরা উলঙ্গ হতো না। তাদের পরিধানে কেবলমাত্র একখ- কাপড় থাকত। কা’বা শরীফের জনপ্রিয়তা দেখে ইয়েমেনের খ্রিস্টান নৃপতি আবরাহা ঈর্ষাকাতর হয়ে দক্ষিণ ইয়েমেনের রাজধানী সানআয় একটি গির্জা নির্মাণ করে মক্কার কা’বার পরিবর্তে সেখানে হজ করতে আসার জন্য আহ্বান করেন। তার আহ্বানে কেউ সাড়া না দিলে তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে আবিসিনিয়ার সম্রাটের নিকট থেকে কয়েকটি হাতি এনে একটি বাহিনী গঠন করেন এবং ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা আক্রমণের উদ্দেশে মিনা ও মুযদালিফার মাঝখানে এসে ছাউনি ফেলেন। আবরাহার সৈন্যরা মক্কায় প্রবেশ করে লুটপাট করে এবং আবদুল মুত্তালিবের দুই শ’ উট নিয়ে যায়। আবদুল মুত্তালিব আবরাহার তাঁবুতে যান। আবরাহা ভেবেছিলেন মক্কার প্রধান আবদুল মুত্তালিব তার কাছে সন্ধি করার প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। কিন্তু আবদুল মুত্তালিব বললেন, দেখুন আমি এসেছি আপনার লোকজন আমার যে দুই শ’ উট লুট করে এনেছে তা ফেরত নিতে। আবরাহা অট্টহাসি দিয়ে বলে উঠল, আমরা এখানে এসেছি মক্কা দখল করার জন্য, সেই সঙ্গে কা’বাগৃহ ধ্বংস করে দেয়ার জন্য। তা রক্ষা করার কোন চেষ্টাই তো আপনার নেই আর আপনি এখানে এসেছেন কয়েকটি উট ফেরত নিতে। আবদুল মুত্তালিব বললেন, দেখুন উটগুলোর মালিক আমি আর কাবার রব হচ্ছেন আল্লাহ। কা’বার রব আল্লাহ-ই তাঁর ঘরকে হিফাজত করবেন। এই বলে তিনি নগরীতে এসে জনগণকে পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় নিতে বরলেন এবং কা’বা শরীফের দরজা ধরে দু’আ করলেন : হে আল্লাহ বান্দাকে তার নিজের ঘর হিফাজত করার তওফিক দিন। আপনার ঘর (বায়তুল্লাহ) আপনি হিফাজত করুন।

আবরাহা মামুদ নামের হাতিতে চড়ে সৈন্যবাহিনীকে মক্কা আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন। এমন সময় লোহিত সাগরের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট ছোট পাখি (আবাবিল) পায়ে-ঠোঁটে কঙ্কর বয়ে এনে আবরাহার বাহিনীর উপর নিক্ষেপ করল। ফলে বাহিনী ধ্বংস হয়ে গেল। এমনিভাবে আল্লাহ জাল্লা শানুহু তাঁর ঘরকে হিফাজত করলেন। এই ঘটনা ঘটেছিল প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জন্মের ৫০ দিন পূর্বে। কুরআন মজীদের সূরা ফীলে ইরশাদ হয়েছে : তুমি কি দেখনি তোমার রব হস্তি অধিপতিদের প্রতি কী করেছিলেন? তিনি কি ওদের কৌশল ব্যর্থ করে দেননি? ওদের বিরুদ্ধে তিনি ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি (আবাবিল) প্রেরণ করেন যারা ওদের উপর প্রস্তর-কঙ্কর নিক্ষেপ করে। অতঃপর তিনি ওদের ভক্ষিত তৃণসদৃশ করেন।

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ,

উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা),

সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।