২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শেকল ছেঁড়ার তীরন্দাজ

  • সিরাজুল এহসান

‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ ঘোষণা দিয়ে যিনি কাব্য জগতে প্রবেশ করলেন তাতে বোঝা গেল এ কবি ভিন্ন ঘরানার। তার চলার পথ বা কাব্যানুষঙ্গ ফুল, পাখি, চাঁদ, নদী-নালা নয়; মানুষ কেবলি মানুষ আর দ্রোহ ও মুক্তির গাঁথা। এ পথে তাঁর পূর্বসূরি কাজী নজরুল ইসলাম, সমর সেন, সুকান্ত ভট্টাচার্য, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, কিছুটা আহসান হাবীবও। এমনকি তার নিকটবর্তী শামসুর রাহমান। ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ বাংলা সাহিত্যের যে ক’জন সৃষ্টিশীল মানুষ নিজেকে নিবেদন করেন তার মধ্যে কবি নির্মলেন্দু গুণ আগামী প্রজন্মের কাছে অন্যতম হয়ে থাকবেন, সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। কোন মোহের বশবর্তী না হয়ে মুক্তিপাগল, সামাজিক-রাজনৈতিক দায়বদ্ধ এ মানুষটি সৃষ্টির প্রতি, আদর্শের প্রতি এখনও সচল, অবিচল। তাঁকে বা তাঁর সৃষ্টিকর্ম মূল্যায়ন এ আয়োজন বা পরিসর নয়। শুধু একঝলক খ-াংশ ফিরে দেখা।

সাধ যখন বিজ্ঞানী হওয়া

নেত্রকোনার বর্তমানের বারহাট্টা সিকেপি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে কবি ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। অবশ্য তখন এ বিদ্যালয়টির নাম ছিল সিকেপি ইনস্টিটিউট। কবি ছিলেন প্রখর মেধাবী। কৃতিত্বের সঙ্গে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করেন। আইএ অর্থাৎ বর্তমানের ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর বেশকিছু দিন অবসর সময়। স্কুল থেকে ডাক পড়ল ‘তোমার রেজাল্টের তো কিছুদিন বাকি, তো স্কুলে সে ক’দিন মাস্টারি করো না বাপু।’ বর্তে গেলেন তিনি। ছাত্রত্ব শেষ না হতেই যে স্কুলে ছাত্র ছিলেন হয়ে গেলেন সেখানকার শিক্ষক। বিজ্ঞানের ক্লাস নেন। পদার্থ-রসায়ন পড়াতে গিয়ে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের জন্য প্রয়োজন পড়ে ল্যাবরেটরির। বিভিন্ন কেমিক্যালের ব্যবহার দেখাতে হয় শিক্ষার্থীদের। মনে মনে স্বপ্ন ছিল আগেই বিজ্ঞানী হওয়ার। কেমিক্যাল নিয়ে নিরীক্ষা করার জাগল সাধ। স্কুল সহকারী বেচুর সহায়তায় একদিন ল্যাবরেটরিতে ঢুকে কেমিক্যালের বোতল ও জার থেকে ঢেলে মিশ্রণ ঘটাতে থাকেন, দেখা যাক কী হয়! যা হওয়ার তাই হলো। ঘটল বিস্ফোরণ, অগ্নিকা-। অল্পতে রক্ষা পেলেন তিনি ও বেচু। ফলাফল পত্রপাঠ বিদায়। বিজ্ঞানী হওয়ার ‘সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল।’

সালটা যখন একাত্তর

দেশে তখন চলছে বাঙালীর ‘মুক্তির সনদ’ ছয় দফার আন্দোলন। বিপ্লবী চেতনায় ঋদ্ধ হয়ে নিজেকে সম্পৃক্ত করলেন এ আন্দোলনের ধারায়। রাজপথ দাপিয়ে বেড়ান বজ্রমুষ্ঠি তুলে। বঙ্গবন্ধু প্রণীত এ ছয় দফার রক্তস্রোত এগিয়ে আনে ’৬৯ পেরিয়ে ১৯৭১ সাল। বাঙালী জীবনেই শুধু নয়, বিশ্ব ইতিহাসে এ এক অবিস্মরণীয় ক্ষণ। সাহিত্য সাধনার পাশাপাশি তার রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সমানতালে চলছে। হয়ে উঠেছেন বিপ্লবী, মিছিলের পরিচিত মুখ।

কবি নির্মলেন্দু গুণের সাহসের কথা বন্ধু-বান্ধব, স্বজন-পরিচিতজনবিদিত। ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞের দু’দিন আগের ঘটনা। ঢাকায় আলোচনার নামে অবস্থান করছেন বাঙালীবিদ্বেষী ভুট্টো। সেদিন অর্থাৎ ২৩ মার্চের ঘটনা। কবি তখন ইংরেজী দৈনিক ডেইলি পিপলে সাব-এডিটর। অফিস বর্তমান শেরাটন হোটেলের বিপরীতে পশ্চিম পাশে। তার নিজের বয়ানে শোনা যাক সেদিনের কথাÑ ‘আত্মকথা ১৯৭১’ থেকে। ...‘২৩ মার্চ দুপুরে লাঞ্চ করতে শেরাটনে ফিরে আসা ভুট্টোর সামনে দাঁড়িয়ে আমি ও আমার বন্ধু কবি হুমায়ুন কবির জয়বাংলা শ্লোগান দিয়েছিলাম, ওই ঘটনাটিও পাক আর্মির মনে প্রচ- ক্রোধের সৃষ্টি করেছিল। দু’দিনের মধ্যেই ভুট্টোর সামনে পিপল পত্রিকার অফিস আক্রমণের ভিতর দিয়েই অপারেশন সার্চলাইট তার শুভ মহরত সম্পন্ন করে।’...

যুদ্ধ শুরুর পর দেশজুড়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নারকীয় তা-বে মানুষ ঘর ছাড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর তো আরও দ্বিগুণ অত্যাচার করেছে পাকবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা। কবি নির্মলেন্দু গুণের চালচলন দাড়ি দেখে এ দেশের পাক দোসর, এলাকার বিহারীরা তার আজিমপুরের মেসে খোঁজ করেছিল সেই ‘হিন্দু মৌলানা কিধার গিয়া’?

যুদ্ধ শুরুর দিকেই তিনি আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। যেহেতু আগে থেকেই তিনি ছিলেন পরিচিত মুখ। যুদ্ধকালীন বিপন্ন জীবনের কথা তিনি বহুবার বলেছেন। একাধিকার হয়েছেন মৃত্যুর মুখোমুখি। তখন মানুষ ধর্মালয়েও আশ্রয় নিয়ে বাঁচতে পারেনি। হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রীস্টান সবাই বেশিরভাগ আশ্রয় নিত মসজিদে, জঙ্গলে, খানাখন্দে। কার উপাসনালয়ে কে গেল, কারও ‘জাতপাত’ গেল কিনা, তা দেখার সময় ছিল না। তেমনি মানুষের জয়গান ঊর্ধ্বে ওঠা এক ঘটনা। শুভাড্যার এক মসজিদে অনেকের সঙ্গে তিনিও আশ্রয় নিয়েছেন। এরপর শোনা যাক তাঁর বর্ণনা। চয়ন করা হলো ‘আত্মকথা ১৯৭১’ থেকেÑ

...‘স্কুলে পড়ার সময়, মুহাম্মদ (স.) এর জীবনী লিখে আমি আমার জীবনের প্রথম পুরস্কারটি পেয়েছিলাম। কোরান শরীফে লিপিবদ্ধ সুরাগুলো শেষ-নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর মাধ্যমে আল্লাহর ওহী হিসেবে নাজিল হয়েছিল। আমি ওই কোরানটি দ্রুত লুফে নিলাম। ভাবলাম, আরবি না জানার কারণে সুরাগুলো পড়তে না পারলেও দু’চোখ দিয়ে তো দেখতে পারব। মানুষ যে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে তাদের প্রিয় ধর্মস্থান দর্শনে যায়, সে তো দু’চোখ ভরে দেখার জন্যই। সেখানে তো পাঠের বালাই থাকে না। চোখের দেখাটাকেই সেখানে পুণ্যজ্ঞান করা হয়। তো পড়তে না পারলেও কোরান শরীফের পাতায় চোখ বুলিয়ে দেখার পুণ্য থেকে আমিইবা বঞ্চিত হবো কেন? অমুসলিম বলে? আমার তা মনে হয় না।’...

’৭৫-এর দুর্যোগ ও অতঃপর...

একাত্তরের পরাজিত শক্তির মদদ, দেশী-বিদেশী কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্রে বাঙালী তার মুক্তির দিশা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হারায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এরপর দেশ চলে উল্টো পথে। মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা, বাঙালীর মূলধারার চেতনা যেন হয় নিষিদ্ধ। বঙ্গবন্ধু শব্দটি উচ্চারণ এক রকম হয়ে পড়ে অপরাধ। কবিকে ‘ভারতের চর’ অপবাদ দিয়ে গ্রেফতার করা হয় ১১ নভেম্বর। প্রগতিশীল চিন্তার শিল্প স্রষ্টাদের মধ্যেও বিভক্তি। যতদূর জানা যায়, ১৯৭৭ সালের মার্চে আবুল ফজলের একটি গল্পের কথা ‘মৃতের আত্মহত্যা’। সেখানে বঙ্গবন্ধুর নাম সরাসরি না এলেও তাঁর হত্যাকা-ের বিষয়টি বুঝতে বাকি থাকে না। তবে কবি নির্মলেন্দু গুণ সরাসরিই বঙ্গবন্ধুর কথা তখন প্রকাশ্যে এবং তাও সমাবেশে উচ্চারণ করেন অমিত সাহসিকতায়। সেই দৃশ্যটি এরকমÑ ১৯৭৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, সকাল সাড়ে নয়টা। বাংলা একাডেমির কবিতা পাঠের মঞ্চ। প্রথিতযশা কবিরা কবিতা পড়ে যাচ্ছেন। নাম ঘোষিত হলো কবি নির্মলেন্দু গুণের। কবি দাঁড়ালেন মাইকের সামনে। উচ্চারণ করলেন দৃঢ়স্বরে কবিতার নাম : ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি।’ তার পর পজ। উৎসুক দর্শক-শ্রোতা, কবি-লেখক, সংস্কৃতিকর্মীরা। হঠাৎ করেই দীর্ঘ নীরবতা। সবার মনে হতে লাগল নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম কিছু উপহার দেবেন কবি আজ। হলোও তাই। পাঠ করে যেতে লাগলেনÑ

‘সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালবাসি,

রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেই সব গোলাপের একটি গোলাপ গতকাল

আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।

আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

শহীদ মিনার থেকে খসে-পড়া একটি রক্তাক্ত ইট

গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।

আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

...

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি,

আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম।’

সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি তাঁর প্রতিকূলে জেনেও এ সাহসী পদক্ষেপ আজ ইতিহাসের অংশ। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা তাঁর এটাই প্রথম নয়। কবির ভাষ্যানুসারে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তিনি প্রথম কবিতা প্রকাশ করেছিলেন ১৯৬৭ সালের ১২ নবেম্বর দৈনিক সংবাদে।

১৯৭৫ সালের পর ১৯৯০ পর্যন্ত নামে-বেনামে সামরিক শাসন, অগণতান্ত্রিক, স্বৈরশাসক শাসনই শুধু নয়, শোষণও করেছে। এই দীর্ঘ সময় রাজনীতির আকাশ ছিল না স্বচ্ছ। রাষ্ট্রযন্ত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল নির্বাসনে। রাজনীতির একপক্ষ যারা দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব তারা ক্ষমতার বাইরে, রাজপথে। কবি নির্মলেন্দু গুণ তখনও পীড়িত মানুষের কাতারে। ক্ষেতমজুর সমিতির সঙ্গে জড়িত। কলম দিয়ে একে একে বিস্ফোরণ ঘটছে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দ্রোহী পঙ্ক্তিমালা। সেসব বিধৃত হয়Ñআনন্দ কুসুম, বাংলার মাটি বাংলার জল, তার আগে চাই সমাজতন্ত্র, চাষাভুষার কাব্য, অচল পদাবলী, পৃথিবী জোড়া গান, দূর হ দুঃশাসন, শান্তির ডিক্রি, ইসক্রা, আবার একটা ফুঁ দাও, নেই কেন সেই পাখি, নিরঞ্জনের পৃথিবী, দুঃখ করো না বাঁচো, ১৯৮৭, যখন আমি বুকের পাঁজর খুলে দাঁড়াই প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে।

শ্রেণী সংগ্রামের কবি হিসেবে তখন তার নাম-ডাক, খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। পার্টির কর্মীদের মাঝে তো বটেই, সারা দেশেও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে যারা জড়িত, মৌলবাদের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার, তাদের কাছে শামসুর রাহমানের পাশাপাশি গুণ হয়ে উঠলেন অবশ্য পাঠ্য। মঞ্চে তার কবিতা পাঠ না হলে অনুষ্ঠান যেন থেকে যায় অপূর্ণ, সে ধারা অব্যাহত এখনও। শ্রেণী সংগ্রামের জোয়ারে ক্ষেতমজুর কর্মীদের মধ্যে যে পঙ্ক্তিটি তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিয়েছিল সেটি এমনÑ

‘খোদার জমিন ধনীর দখলে

গেছে আইনের জোরে,

আমাগো জমিন অইব যেদিন

আইনের চাকা ঘোরে।’...

(ক্ষেতমজুরের কাব্য/পৃথিবীজোড়া গান)

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে চলমান আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির মূলধারার অগ্রগামী মানুষ এগিয়ে আসেন। সংগঠিত হন। একত্রিত হন রাজপথে। গঠিত হয় জাতীয় কবিতা পরিষদ ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রগতিশীল কবি, সাহিত্যিক, লেখক-সংস্কৃতিকর্মীর প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়ায় দুটি সংগঠন। শরীরে যার শৃঙ্খল ভাঙার রক্ত ফোটে তিনি কি আর বসে থাকতে পারেন? যোগদানই শুধু নয় অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে। ‘স্বৈরাচার নিপাত থাক/গণতন্ত্র মুক্তি পাক’Ñ এ অমর শ্লোগানের হলেন একজন। এরপর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে হন সক্রিয়। কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধে বিশেষত ‘নির্গুণের জার্নাল’-এ রয়েছে এর সরব স্বাক্ষর।

জনপ্রিয়তা ছোটে যাঁর পিছে

সমকালীন বাংলা কাব্য সাহিত্যে জীবদ্দশায় অনেক কবিই কমবেশি নিজের জনপ্রিয়তা দেখে যেতে পেরেছেন। পেয়েছেন শ্রদ্ধা, ভালবাসা, সম্মাননা। এদিক থেকে কবি নির্মলেন্দু গুণ একটু বেশিই ভাগ্যবান। এখনও তিনি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। তাঁর ব্যাপারে একটি কথা প্রচলিত আছেÑ তিনি জনপ্রিয়তার পেছনে ছোটেন না, জনপ্রিয়তা বা জনতাই তাঁর পেছনে ছোটে। তাঁর শারীরিক অবয়ব, দেহসৌষ্ঠব রবীন্দ্রনাথের মতো দেখতে এ কারণেই নয়, মানুষকে দ্রুত কাছে টানা, আপন করার সম্মোহনী শক্তি সর্বোপরি তাঁর সৃষ্টিকর্মও এ বাস্তবতার অনুষঙ্গ। বাংলা ভাষার কবি সমাজের এক বৃহৎ অংশ তরুণ কবিরা তাঁর ভক্ত-অনুরক্ত, কেউ কেউ অনুসারীও। তাঁর জীবনযাপন প্রণালী অনেকের কাছে আজ ‘মিথ’ হয়ে আছে বললে অত্যুক্তি হবে না।

‘হুলিয়া’ যখন ইতিহাস

উপন্যাস, গল্প বা কাহিনী নিয়ে আমাদের চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে বিস্তর। সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র এক সাম্মানিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে। কিন্তু কবিতা নিয়ে? যাঁর কবিতা নিয়ে প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র সৃষ্টি হয়েছে তিনি নির্মলেন্দু গুণ। এটা তাঁকে এনে দিয়েছে গৌরব। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’-এর অন্তর্ভুক্ত কবিতা ‘হুলিয়া’র চলচ্চিত্র রূপ মুক্তি পায় ১৯৮৩ সালে। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল। একজন রাজনৈতিক কর্মীর প্রতি রাজশক্তির জারি করা হুলিয়া নিয়ে লিখিত কবিতার নান্দনিক রূপ এ চলচ্চিত্রটি। মুক্তি পাওয়ার পর দর্শক সমাদৃত হওয়ার পাশাপাশি পুরস্কৃতও হয়। তাঁর কবিতা নিয়ে আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে গ্রামের এক যুবকের অংশগ্রহণ, শেষ পরিণতি, মানবিক এক আবেদন নিয়ে ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ নামে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ২০১৪ সালে। এটি পরিচালনা করেছেন আরেক তরুণ কবি মাসুদ পথিক। একই পরিচালকের পরিচালনায় কবির ‘মানুষ’ কবিতা অবলম্বনে আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মাণের অপেক্ষায়।

ভালোবাসা ভালোবাসা

এ দেশে কোনো গুণী মানুষ জীবিত থাকতে তাঁকে মূল্যায়ন, তাঁর কর্মের যথাযথ ব্যবহার বা স্বীকৃতি সাধারণত দেখা যায় কম। এমন বাস্তবতায় কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘ভাগ্য’ সুপ্রসন্ন। দেশের উল্লেখযোগ্য ও সম্মানজনক একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি দেশের বাইরের পুরস্কারও তিনি পেয়েছেন। দেশের অন্যতম প্রধান একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের মাধ্যমে তাঁকে সম্মানিত করা হয়েছে।

পাঠ্যপুস্তকে তাঁর কবিতা ‘স্বাধীনতা, শব্দটি কি করে আমাদের হলো’সহ সংক্ষিপ্ত জীবনীও সংকলিত হয়েছে। জীবদ্দশায় তিনি দেখে যেতে পারলেন নিজের ও স্বসৃষ্টিকর্মের ওপর এমফিল করা হলো, হলো গবেষণা। ‘নির্মলেন্দু গুণ উজান তরীর মাঝি’ গবেষণা গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে। গবেষক মজিবর রহমান। আর এমফিল করলেন ফাল্গুনী রানী চক্রবর্তী। ড. মজির উদ্দীন মিয়ার তত্ত্বাবধানে ২০০৮ সালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের শিরোনাম ছিল ‘নির্মলেন্দু গুণের কাব্যে সমাজ ও স্বদেশ ভাবনা’। তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন অগণতি কবি; কবিতার শিরোনামও পাওয়া গেছে ‘নির্মলেন্দু গুণ’ বা ‘কবি নির্মলেন্দু গুণ’ হিসেবে। আনন্দের আরেকটি বিষয় হলোÑ এক কবির কবিতাগ্রন্থের নামই ‘নির্মলেন্দু গুণ’। আর এই ভক্ত কবির নাম মৃগঙ্ক সিংহ।

কবির আকাক্সক্ষা যখন জনপ্রতিনিধি

গণমানুষের প্রতি কতটা দায়বদ্ধ, ভালোবাসা আর সহানুভূতি থাকলে একজন মানুষ জনপ্রতিনিধি হওয়ার আকাক্সক্ষা প্রকাশ পোষণ করেন। রাজপথ আর কলমের মাধ্যমে দীর্ঘ আন্দোলন শেষে স্বৈরাচারমুক্ত পরিবেশে ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর প্রিয় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে নিজ নির্বাচনী আসন নেত্রকোনা-বারহাট্টা এলাকা থেকে মনোনয়নপ্রার্থী হন। দল থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন নৌকার বদলে কুমির প্রতীক নিয়ে। প্রতীক নির্বাচনে তাঁর ব্যতিক্রমী পছন্দও কৌতূহলোদ্দীপক। এখানেও কিছুটা কবির খেয়ালিপনা ও বৈচিত্র্যের প্রকাশ পাই আমরা। এই প্রতীক নির্বাচনের ব্যাপারে তিনি বলেছিলেন, কবিরা নিরীহ মানুষ। আমি নির্বাচন করছি ভেবে আমার প্রতিপক্ষরা আমাকে দয়া বা করুণা করতে পারে। আপনারা জানেন, কুমির নিরীহ প্রাণী নয়। সে আক্রমণ করতে জানে। কুমির সমীহ আদায় করতে পারে। এ প্রাণীটি জলের রাজা আবার স্থলেও দাপট দেখাতে পারে। অতএব... কবির পছন্দের মধ্যেও প্রতীকী ব্যঞ্জনা; রূপকেরও ব্যবহার।

জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে

সরস্বতীর রাজত্বে লক্ষ্মীর দাপট একটু কম থাকে বলেই সবার ধারণা। কবি নির্মলেন্দু গুণের বোহেমিয়ান, উড়নচ-ী ও খেয়ালিপনার জন্য কোন কর্মেই তেমন স্থির হতে পারেননি। কর্মজীবনে বেশিরভাগই কেটেছে সংবাদপত্রের টেবিলে টেবিলে। নিজের আপোসহীন চরিত্রের কারণেই বেশিদিন স্থির হননি এক প্রতিষ্ঠানে। এক দৈনিক সংবাদেই দুই বার চাকরি করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে ইংরেজী দৈনিক পিপল, স্বাধীনতার পর যখন ছাত্রলীগের অধীনে ছিল গণকণ্ঠ তখন, তারপরে দৈনিক বাংলার বাণী, সাপ্তাহিক ঢাকা, দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, আজকের আওয়াজ প্রভৃতি সংবাদপত্রে তিনি জীবিকার তাগিদে নিজের মেধা ব্যয় করেছেন। এছাড়াও কিছুদিন কাজ করেছেন বিজ্ঞাপনী সংস্থা বিটপীতে।

গুণের চিত্রকলার গুণ

কবি নির্মলেন্দু গুণ শুধু কবিতাই লেখেন না সে কথা তাঁর গুণমুগ্ধ পাঠকরাও জানেন। ছড়া, ছোটদের গল্প, ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসার নিবন্ধ, গল্প, ভ্রমণ কথাচিত্র ইত্যাদি লেখার গুণপনার কথা জানেন। তবে চিত্রশিল্পী নির্মলেন্দু গুণের কথা খুব কম মানুষই জানেন। নিজের বইসহ আরও কয়েকটি বইয়ের প্রচ্ছদ তিনি এঁকেছেন। আরও এঁকেছেন বেশকটি চিত্রকর্ম। এরই মধ্যে তাঁর সৃষ্ট চিত্রকর্ম চিত্র সমালোচক ও বোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৭০ বছর বয়সে রংতুলি ধরে চিত্রশিল্পে ভাস্বর হয়ে আছেন। আর এদিকে কবি নির্মলেন্দু গুণ রংতুলির আঁচড় ক্যানভাসে দিলেন ৬৫ বছর বয়সে। ২০০৮ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত একনাগাড়ে চিত্রশিল্পে মন দেন। উপহার দেন ক্যানভাসে এক্রিলিক। একক প্রদর্শনীও হয় কবির চিত্রকর্ম নিয়ে। এ বহুমুখী প্রতিভাবান মানুষটিকে এ জগতেও স্বাগত জানান শিল্পবোদ্ধারা। তাঁর কিছু মিশ্র মাধ্যম এমনÑ পদ্মবনে মত্ত হস্তী (সিরিজ), পিলখানা মত্ত হস্তী (কাগজে এক্রিলিক), অপেক্ষা, কামিনী, মুখোশ, মোনালিসা, রঙের জাতক, আনন্দ বন্ধনী, গিন্সবার্গ, সিডর, রাধাপদ্ম, নর্তকী, অনাঘ্রাত প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

কবির স্বপ্নের আদর্শ সমাজতন্ত্র বিষয়ে আলাপকালে একটু আফসোস করেন। নব্বই দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে গ্লাস্তনস্ত ও প্রেস্ত্রোইকার মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের ধস নামলে তিনি আহত হন। সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। আদর্শ থেকে দৃশ্যত সরে এলেও কার্যত নয়। সমাজতন্ত্রের অন্যতম লক্ষ্য ছিল কৃষক ও নারীমুক্তি। বৃদ্ধদের সামাজিক নিরাপত্তা। এসবের ব্যাপারে বর্তমান সরকার কল্যাণকর উদ্যোগ নিয়েছে। তাহলে কেন সরকারের কর্মকা-কে সমর্থন করব না? এমনটাই আশাবাদ ব্যক্ত করেন কবি। তবে একটু হতাশা ব্যক্ত করেন সমাজের নিম্নস্তরে এখনও অর্থনৈতিক সাম্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে। কর্মসংস্থানের জন্য গ্রামের দরিদ্র যুবকটি জীবন বিপন্ন করে, অবৈধভাবে নৌপথে বিদেশে পাড়ি জমাবে কেন? কাজ খুঁজতে জীবন হারাতে হচ্ছে। সমাজের শিকড় পর্যায়ে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে না পারলে অর্থনৈতিক সাম্যতা বজায় থাকবে না বলে কবি মনে করেন।

কথায় কথায় ভাদ্রের সন্ধ্যা পেরিয়ে শাহবাগের কবি সুফিয়া কামাল গণগ্রন্থাগার চত্বর ছেয়ে যায় রাত্রির প্রথম প্রহর। ভাদ্রের আকাশেও বর্ষার পোয়াতি মেঘ। দু’এক ফোঁটা ঝরল বুঝি। ফিরে আসার তাড়া। ৭০ বছরের যুবক নির্মলেন্দু গুণও একটু ক্লান্ত বুঝিবা। বর্ষা পেরোলো সপ্তাহ হয়নি। শরতের শুরু। গুণের একটি কবিতা বর্ষা ও শরতের সেতুবন্ধ হয়ে আছে। চকিতে মনে পড়ে গেল ‘বর্ষার সঙ্গে আমার সম্পর্ক’ সেই কবিতাটি। বিদায়ের ক্ষণ আর কবিতার শেষ তিনটি পঙ্ক্তির কী চমৎকার মিল!

...‘উন্মুক্ত সঙ্গম হেতু আমার ঔরসে, ঐ বর্ষা-গর্ভে/ সম্প্রতি একটি মেঘবর্ণ পুংলিঙ্গের জন্ম হয়েছে;/ ভালোবেসে আমরা তাহার নাম রেখেছি, শরৎ’।