২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পৃথিবীতে আর কতদিন টিকবে প্রাণ

  • এনামুল হক

আমাদের এই পৃথিবী গ্রহটিতে আর কতদিন প্রাণের অস্তিত্ব থাকবে? শেষ পর্যন্ত একটা সময় তো আসবেই যখন প্রাণ এই গ্রহ থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কিন্তু তার জন্য লাগবে কতদিন?

জীবাশ্মর রেকর্ড থেকে আমরা জানি, পৃথিবীতে প্রাণ কমপক্ষে ৩৫০ কোটি বছর ধরে টিকে আছে। এই সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে প্রাণ বরফ জমাট অবস্থায় টিকে থেকেছে। মহাকাশ থেকে ছুটে আসা গ্রহাণু বা উল্কার আঘাত থেকে টিকেছে। ব্যাপক বিষক্রিয়া ও প্রাণঘাতী বিকীরণ থেকেও টিকেছে। সোজা কথায়, পৃথিবীকে সম্পূর্ণরূপে প্রাণমুক্ত করা কঠিন। জীবাণুও তো প্রাণ। তাই জীবাণুমুক্ত করা সহজ কথা নয়। তারপর নির্ঘাত একদিন সমস্ত প্রাণ নিশ্চিহ্ন হবে পৃথিবী থেকে। পৃথিবী হবে প্রাণহীন। অলৌকিক কোন মহাদুর্যোগের সম্ভাবনারও অভাব নেই। সেগুলোর কোনটি এই পৃথিবীকে প্রাণহীন, বন্ধ্যা ও ঊষর করে তুলবে?

আগ্নেয়গিরির উদ্গিরণ

২৫ কোটি বছর আগে পামিয়ান যুগের শেষপ্রান্তে পৃথিবী থেকে প্রাণ প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে বসেছিল। স্থলভাগের বাসিন্দা যাবতীয় প্রজাতির শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ ও ৯৫ ভাগ সামুদ্রিক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। সেটা হয়েছিল সাইবেরিয়ায় ব্যাপক পরিসরে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎদ্গিরণে। যুক্তরাজ্যের মতো দেশের আটগুণ বড় এলাকা লাভায় ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। সে এক মহাপ্রলয়ের মতো ব্যাপার। এমন ঘটনা আগামীতে কখন ঘটবে কেউ জানে না। ২০ কোটি, ১৮ কোটি, সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে ঘটেছিল। তার মানে অত নিয়মিত বিরতিতে নয়। তবে ঘটবে যে তা নিশ্চিত বলে মনে করেন হেনরিক সভেনসেন; যদিও তা কখন কোথায় হবে, তা কেউ বলতে পারে না।

এমনিতে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে এত প্রাণ নিশ্চিহ্ন হওয়ার কথা নয়। এখানে ঘাতকের ভূমিকায় ছিল লবণ। অগ্ন্যুৎপাতটি ঘটেছিল সাইবেরিয়ায়। সাইবেরিয়া হলো লবণের সমৃদ্ধ আধার। অগ্ন্যুৎদ্গিরণে ওজনস্তর ধ্বংসকারী এই রাসায়নিক দ্রব্যটি বিপুল পরিমাণে বায়ুম-লে মিশে ওজনস্তর ধ্বংস করে দেয়। এতে মহাকাশ থেকে ব্যাপক তেজষ্ক্রিয় বিকীরণ ঘটে। এই বিকীরণের ধকল সইতে না পেরে বেশির ভাগ প্রাণী মরে যায়, তবে এতে এককোষী প্রাণীদের কোন ক্ষতি হয়নি। এমন ঘটনা ১০ কোটি বছরের মধ্যে ঘটতে পারে।

গ্রহাণুর আঘাত

পৃথিবীতে গ্রহাণুর আঘাত যে ডাইনোসরদের বিলুপ্তির কারণ, তা মোটামুটি অনেকেরই জানা। বড় গ্রহাণুর পতনে যদি ডাইনোসরের মতো বৃহৎ প্রাণী নিশ্চিহ্ন হয়, তবে আরও বড় গ্রহাণুর পতনে তো সব প্রাণী নিশ্চিহ্ন হতে পারে। তবে এ জাতীয় গ্রহাণুর পতন খুবই বিরল ঘটনা। সাড়ে ২১ কোটি বছরে গ্রহাণু পতনে কানাডায় পৃথিবীর বৃহত্তম গর্ত ম্যানিকুয়াগান জ্বালামুখ তৈরি হয়েছিল। এতে প্রাণিকুলের অত বড় ধ্বংসষজ্ঞ ঘটেনি। কারণ ওটা স্ফটিক শিলায় পড়েছিল বলে জলবায়ু বদলে দেয়া গ্যাস বায়ুম-লে মিশতে পারেনি।

সুসংবাদটা হলো ডাইনোসর নিশ্চিহ্ন করার মতো গ্রহাণু পতনের ঘটনা অতি বিরল। এতবড় গ্রহাণু প্রতি ৫০ কোটি বছরে পৃথিবীতে আঘাত হানতে পারে। তেমনটা ঘটলেও প্রাণিজগতের সিংহভাগই হয়ত বিলুপ্ত হবে।

কিন্তু প্রাণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না। প্রাণ নিশ্চিহ্ন হতে হলে গ্রহাণুর চেয়ে অনেক বড় কোন গ্রহের সঙ্গে সঙ্ঘাত হতে হবে পৃথিবীর। যেমনটি হয়েছিল পৃথিবীর জন্মের অল্প সময় পর পথভ্রষ্ট অপর কোন গ্রহের সঙ্গে সংঘর্ষে, যার ধ্বংসাবশেষ থেকে চাঁদের জন্ম।

কেন্দ্র ভাগ শীতল জমাট বেঁধে

পৃথিবীর কেন্দ্রভাগ শীতল জমাট বেঁধে প্রাণের বিলুপ্তি ঘটাতে পারে। কিছু বিজ্ঞানীর ধারণা পৃথিবীর চৌম্বকীয় বলয় সূর্য থেকে ছুটে আসা আয়নিত বস্তুকণার প্রবাহকে ভিন্নদিকে সরিয়ে দেয়। এই চৌম্বকক্ষেত্র না থাকলে পৃথিবীর বায়ুম-ল এবং সেই সঙ্গে সমস্ত প্রাণও ধ্বংস হয়ে যাবে। বিজ্ঞানীদের কাজে প্রমাণ আছেÑ এ ধরনের কিছু খুব সম্ভব মঙ্গলের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। অর্থাৎ মঙ্গলের এক সময় ম্যাগনেটোস্ফিয়ার ছিল এবং এখনকার তুলনায় মঙ্গল গ্রহ প্রাণের জন্য অনেক বেশি বাসযোগ্য ছিল। প্রায় ৩৭০ কোটি বছর আগে চৌম্বকীয় বলয় ধ্বংস হয়ে গ্রহটি হিমশীতল অবস্থায় পরিণত হয়।

পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র দুর্বল হয়ে পড়ছে। শেষ পর্যন্ত কি এটা অদৃশ্য হয়ে বা মুছে যাবে? সেটা হতে গেলে এর কেন্দ্রভাগকে সম্পূর্ণ শক্ত বা নিরেট অবস্থা ধারণ করতে হবে। বর্তমানে এর অন্তর্কেন্দ্রটাই শুধু কঠিন। কিন্তু বহির্কেন্দ্রটা তরল। অন্তর্কেন্দ্রটি বছরে প্রায় ১ মিলিমিটার করে বাড়ে। এর গলিত বহির্কেন্দ্রটি ২৩০০ কিলোমিটার পুরু। এই বহিকের্ন্দ্রটি কঠিন আকার ধারণ করতে ৩ থেকে ৪শ’ কোটি বছর লেগে যাবে। তখনই তা একেবারে হিমশীতল জমাট হয়ে উঠবে।

গামা রে’র প্রচ- বিচ্ছুরণ

গামা রে’র প্রচ- বিচ্ছুরণ নামে তেজষ্ক্রিয় বিকীরণের সুতীব্র তরঙ্গপ্রবাহ পৃথিবীতে প্রাণের বিলুপ্তি ঘটাতে পারে। আমাদের কাছাকাছি একটি যমজ তারা আছে, যার নাম ডব্লিউ আর ১০৪। এই নক্ষত্র থেকে ৫ লাখ বছরের মধ্যে গামা রশ্মীর বিচ্ছুরণ ঘটতে পারে। এ ধরনের বিচ্ছুরণের কারণে মহাশূন্যের অনেক অঞ্চল হয়ত প্রাণের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। মহাশূন্যে প্রচ- বিস্ফোরণ থেকে গামা রশ্মীর বিচ্ছুরণ ঘটে থাকে। যেমন বিশাল কোন নক্ষত্র বিস্ফোরিত হলে কিংবা দু’টি নক্ষত্রের মধ্যে সংঘর্ষ হলে এমন বিস্ফোরণ ঘটে থাকে। আর সেই বিস্ফোরণ থেকে গামা রশ্মীর বিচ্ছুরণ। এই বিচ্ছুরণ সেকেন্ডের সামান্য অংশ থেকে বেশ কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়। বেশিক্ষণ থাকলে এর ফলে পৃথিবীর ওজনস্তর মুছে যাবে। পৃথিবীর প্রাণিকুল মারাত্মক অতিবেগুনি রশ্মীর সংস্পর্শে এসে শেষ পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

গামা রশ্মীর বিচ্ছুরণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নীহারিকার কেন্দ্রের কাছে কিংবা যেখানে নক্ষত্রগুলো ঘনসংবদ্ধ, সেখানে ঘটে। সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো, এই দুটো থেকে পৃথিবী বেশ দূরে এবং তাই অপেক্ষাকৃত নিরাপদও। জীবাশ্ম রেকর্ড থেকে বোঝা যায় যে, প্রায় ৪৪ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে গামা রশ্মীর বিচ্ছুরণে বহু প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটেছিল। আগামীতে এমন বিচ্ছুরণে মানবজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তবে অন্যান্য প্রাণ থাকবে। প্রতি এক শ’ কোটি বছরে গড় নীহারিকায় ৫ থেকে ৫০টি গামা রশ্মীর বিচ্ছুরণ ঘটবে। মিল্কিওয়ে নীহারিকাটি এতবড় যে সেই রশ্মীর প্রবাহ পৃথিবীর কাছে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

অন্য নক্ষত্রের সঙ্গে সংঘর্ষ

অন্য নক্ষত্রের সঙ্গে আমাদের সূর্যের সংঘর্ষ হলে সৌরজগৎ ধ্বংস হবে এবং সেই সঙ্গে প্রাণও হবে নিশ্চিহ্ন। এমন ধরনের ভবঘুরে নক্ষত্রের এদিকে ছুটে আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। মাত্র ৭০ হাজার বছর আগে স্কোলজ নামে একটি লাল বামন তারা আমাদের সৌরজগতের কাছ দিয়ে ছুটে চলে গিয়েছিল। আগামী কয়েক লাখ বছরে অন্যান্য তারাও আমাদের কাছ দিয়ে যেতে পারে। এগুলোর কোন কোনটি আমাদের ধ্বংসেরও কারণ ঘটাতে পারে।

সূর্য যখন খুব উত্তপ্ত হবে

সূর্যের যত বয়স বাড়ছে তত বেশি উত্তপ্ত হচ্ছে। তার ফলে পৃথিবীরও উষ্ণতা বাড়ছে। এতে শিলারাশি ও বায়ুম-লের কার্বন-ডাই অক্সাইডের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে। একটা সময় আসবে যখন এই প্রক্রিয়ায় বায়ুম-ল থেকে প্রচুর কার্বন-ডাই অক্সাইড সরে যাবে। তখন আলোক সংশ্লেষ করতে না পেরে সমস্ত উদ্ভিদ মরে যাবে। এরপর প্রাণিজগতেরও নিশ্চিহ্ন হতে আর সময় লাগবে না। তবে সেটা ৫০ কোটি বছরের মধ্যে ঘটতে পারে।

সূর্য পৃথিবীকে গ্রাস করবে

সূর্যের উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত তা এতই উত্তপ্ত হবে যে, পৃথিবীর তাবত সমুদ্রের পানি শুকিয়ে যাবে এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে সকল প্রাণ এমনকি মাইক্রোবও মরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এই প্রক্রিয়া শুরু হতে প্রায় এক শ’ কোটি বছর লাগবে। এখানেই শেষ নয়, এখন থেকে ৫শ’ কোটি বছর পর থেকে সূর্য প্রসারিত হতে হতে এক দানব তারায় পরিণত হয়ে পৃথিবীকে গ্রাস করে নেবে।

সূত্র : সায়েন্স ডেইলি, বিবিসি