২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ব্যাংককের সাফারি পার্কে কিছুক্ষণ

  • রাজু মোস্তাফিজ

রবিবার খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেছি। কারণ যেতে হবে ‘সাফারি ওর্য়াল্ডে’। নাস্তা সেরে হোটেলের বাইরে অপেক্ষা করছিলাম কখন গাড়ি আসবে। নিয়ে যাবে সাফারি ওর্য়াল্ডে। ঠিক নয়টায় গাড়ি চলে আসল। আমাদের তুলে নিয়ে ছুটে চলছে শহর থেকে প্রায় ঘণ্টাখানেক পথ দূরত্বের সাফারি ওর্য়াল্ডে। নীল আকাশ। সূর্যের আলোয় পুরো ব্যাংকক শহর ঢেকে গেছে। যেদিকেই চোখ যায়, শুধু বড় বড় হাইরাইজ বিল্ডিং। রাস্তায় কোথাও কোন ট্রাফিক পুলিশ নেই। সবই কম্পিউটার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। রাস্তায় কোন ধুলোবালি নেই। নেই কোন যানযট। সবাই ব্যস্ত নিজ নিজ কাজে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম মেরিন সাফারি পার্কে। এই পার্কে প্রবেশের টিকেট লাগে একশ বাথ। বাংলাদেশী টাকায় প্রায় আড়াইশ টাকা। এছাড়া বানর, পাখি, হাতি আর শীল মাছের খেলা দেখতে আলাদা আলাদা টিকেট কাটতে হয়। ঘন জঙ্গলের বাহারি ফল এবং বিভিন্ন ফুলগাছ দিয়ে সাজিয়েছে। পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য বিভিন্ন জায়গায় বেঞ্চ পাতা আছে। সারা পৃথিবীর মানুষ এখানে এসে মুগ্ধ হয়ে যায়। পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য সব ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। আমরা প্রথমে ঢুকলাম শিম্পাঞ্জীর খেলা দেখতে। প্রায় মিনিট পঁিচশেক রেসলিং দেখালো শিম্পাঞ্জীগুলো। এরপর গেলাম শীল মাছের খেলা দেখতে। বিশ্বাস হচ্ছিল না মানুষ কিভাবে মাছগুলোকে এত প্রশিক্ষিত করতে পারে। শীল মাছগুলো একের পর এক বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় খেলা দেখাচ্ছিল। আমাদের সঙ্গে ছোট শিশুরাও খুব মজা পাচ্ছিল এই শীল মাছের খেলা দেখে। কখন যে মধ্যদুপুর হয়ে গেছে টেরই পাইনি। এরপর শূটিং দেখতে ঢুকলাম। এখানে একটি ফিল্ড ড্রামা দেখলাম। কিভাবে শূটিং করে তার একটি মজার অভিজ্ঞতা হলো। কখনও হয়ত কাজেও লেগে যেতে পারে।

প্রচন্ড ক্ষুধার্ত আমরা। ‘জঙ্গল ক্রুইস রেস্টুরেন্ট’-এ খাবারের জন্য ঢুকলাম। এখানে সবই ভারতীয় খাবার। বিরানি, লুচি, তরকারি, কলা, ফিরনিসহ নানা খাবার। আমাদের অভ্যস্ত আর সুস্বাদু খাবার পেয়ে সবাই মজা করে খেলাম। এখানে ভারতের মুম্বাই শহরের আজমান নামের এক সুদর্শন যুবকের সঙ্গে পরিচয় হলো। সে দুবাইতে কাজ করে। বেড়াতে এসেছে ব্যাংককে। সে আমার পরিচয়ও জানতে চাইল। আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি অথচ তার সঙ্গে হিন্দিতে কথা বললাম। খুব আশ্চর্য হলো আমার কথা শুনে। বললাম, তোমাদের দেশের হিন্দি চলচ্চিত্র দেখে এই কথা শেখা। খুব খুশি আজমান। তাকে আমার দেশে আসার অনুরোধ করলাম। প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে গেল। এর আগে এক আফ্রিকান দম্পতির সঙ্গে আমার কথা হয়। নতুন বিয়ে হয়েছে তাদের। বেড়াতে এসেছে থাইল্যান্ডে। এশিয়ায় এসেছে এই প্রথম। তাদের খুব কষ্ট হচ্ছে এখানকার খাবার খেতে। তাদের সঙ্গে কথা বলে খাবার পর আবারও শো দেখতে বের হলাম। একেকটি খেলা দেখার জায়গা বেশ দূরে। অনেক দূরের পথ হেঁটে যেতে হয় বনের মধ্য দিয়ে। বনের মধ্যে সুন্দর সুন্দর দোকান রয়েছে। সবাই এখানে হালকা খাবার কিনে খায়। শিশুদের বিভিন্ন খেলনা রয়েছে। অনেক শিশু খেলছে এখানে। এবার আমরা গেলাম ডলফিন শো দেখতে। প্রায় ৭টি ডলফিন একের পর এক খেলা দেখালো। অবাক বিস্ময়ে খেলা দেখলাম।

এখান থেকে যখন বের হলাম তখন বিকেল তিনটা। এরপর আমরা ‘সাফারি ওয়ার্ল্ড পার্কে’ গেলাম। বিশাল এ পার্ক। এখানে বাস থেকে কোন পর্যটকের নামার অনুমতি নেই। সবাই বাস থেকে দেখছে ছেড়ে দেয়া হাজার হাজার নাম না জানা পাখি অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ তাদের বিরক্ত করছে না। একের পর এক বাস, মাইক্রো, কার চলে যাচ্ছে। এরপর আমরা দেখলাম জিরাফ, হরিণ, বাঘসহ বিভিন্ন প্রজাতির পশু-পাখি ঘুরে বেড়াচ্ছে। কী তাদের আনন্দ! কেউ তাদের বিরক্ত করে না। মহা আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেকগুলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাখিদের জন্য বিশাল জলাশয়। বক, সারস আর নাম না জানা হাজার হাজার পাখি। না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না থাইবাসীদের পশুপ্রেম যে কোন পর্যটককে বিমোহিত করে। পুরো পার্কটিতে আমরা ঘুরে বেড়ালাম গাড়িতে চড়ে। দেখা শেষ হলে পার্ক থেকে বেরিয়ে রওয়ানা দেই শহরের দিকে। প্রায় আধা ঘণ্টা পর ব্যাংকক শহরের ইন্দিরা মার্কেটে ঢুকলাম। কিছু কেনাকাটা করলাম আমি, দুলাল ভাই আর হোসেন মুন্সী। ইন্দিরা মার্কেটে প্রচুর ভারতীয় ও নেপালীদের দোকান আছে। বাসন্তী রানী, নেপালের কাঠমান্ডু শহরের শম্ভুনাথ মন্দিরের পাশে তার বাড়ি। থাই এক যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল এক দশক আগে। সেই সূত্রে ব্যাংককে আসা। স্বামীর সঙ্গে বসবাস। এরপর ব্যবসা আর ঘর সামলানো। তার দু’সন্তান রয়েছে। তাকে যখন বললাম তোমার দেশে গিয়েছিলাম এবং শম্ভুনাথ মন্দিরেও গিয়েছিলাম। ভীষণ খুশী সে। আমার সঙ্গে অনেক কথা হলো। একটু পরেই বৃষ্টি শুরু হলো। এখানে রাস্তার উপরের এক ফলের দোকানে এক ক্যান ফলের জুস খেতে বলল আমাদের বাংলাদেশী গাইড ইসাহাক। খুব সুন্দর তাজা এই ফলের জুস। কেনাকাটা করতে করতে রাত আটটা বেজে গেল। এরপর আমাদের গাইড খুকি আমাদের খুব তাড়া দিচ্ছিল তাড়াতাড়ি হোটেলে ফেরার জন্য। তার কথামতো আমরা বাসে উঠে দ্রুত হোটেলে ফিরলাম।

হোটেলে এসে ফ্রেস হয়ে রাতের খাবারের জন্য সুকমভীত ১৩নং সড়কের বাঙালী হোটেল মেজবানে রাতের খাবারের জন্য গেলাম। বাংলাদেশের চট্টগ্রামের এক দম্পতি কয়েক বছর আগে এই হোটেল খুলেছেন। ব্যবসাও জমে উঠছে তাদের। প্রতিদিন তাদের দোকানে ৪০ থকে ৫০ জন বাংলাদেশী মানুষ খেতে আসেন। বেশ ভালই চলে তাদের। রাতের খাবার সেরে হোটেলে ফিরলাম। রাত প্রায় ১০টা। খুকি আমাদের নিয়ে যাবে ব্যাংককের এক বিখ্যাত ডিস্কো ক্লাবে। সারা পৃথিবীর মানুষ এখানে আসে। আমি কোনদিন এসব ক্লাবে যাইনি। আমি আমার অভিজ্ঞতা বাড়ানোর জন্য দুলাল ভাইসহ আরও কয়েকজন গেলাম ডিস্কো ক্লাবে। ১৫ মিনিটের মধ্যে আমাদের বাস পৌঁছে গেল। একেকজনের টিকেট তিন শ’ বাথ। রাত প্রায় ১১টা। আলো-আঁধারি ঘর। ফুল ভলিউমে মিউজিক বাজছে। পুরুষ আর মহিলারা স্টেজে নাচছে ব্যান্ডের তালে তালে। হলরুমের টেবিলগুলোতে বসা নানান দেশের নারী-পুরুষ তৃপ্তির সঙ্গে পান করছে রঙিন পানীয়। একদম অন্য রকম পরিবেশ। এ পরিবেশে আমি আর দুলাল ভাই যেন নীরব দর্শক। চড়া সাউন্ডে আমার খুব বিরক্ত লাগছিল। কিন্তু একদম উপায় নেই। বেরোবার ইচ্ছা থাকলেও অন্যদের জন্য বের হতে পারছি না। প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা এভাবেই অতিক্রম করলাম আমরা। এক সময় বের হয়ে পড়লাম।