২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্যারিসের পথে পথে

ফকির আলমগীর

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অপরূপ স্থাপত্য ও প্রাচীন নিদর্শনসম্পন্ন প্রাসাদ রয়েছে। এর মধ্যে ফ্রান্সের ভার্সাই, রাশিয়ার পের্টার হোফ, তুরস্কের টপকাপি , ব্রিটেনের উইন্ডসর ক্যাসল, অস্ট্রিয়ার শ্যোনব্রুন প্রাসাদ উল্লেখযোগ্য। অনিন্দ্যসুন্দর প্রাসাদগুলো দেখার জন্যে হাজার হাজার পর্যটক প্রতিবছর ছুটে যায় এসব দেশে। আমি নিজে সাংস্কৃতিক দূত হিসেবে যখনই ইউরোপ সফরের সুযোগ পেয়েছি তখনই অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে বেরিয়েছি ইউরোপের পথে প্রান্তরে, প্রাসাদে প্রাসাদে। ইউরোপের স্থাপত্য নিদর্শনের নান্দনিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছি। লুভর মিউজিয়ামে গিয়ে অভিভূত হয়েছি। বিশেষ করে সেখানে রাখা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসার ছবির দিকে তাকিয়ে। মোনালিসার অমলিন হাসি হৃদয়পটে চির জাগরুক।

শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মোনালিসার কথা পৃথিবীর শিল্পরসিক মাত্রই জানে। এই শিল্প কর্মটির কত সহস্র রিপ্রিন্ট হয়েছে তার ইয়ত্তা নাই। তার রহস্যময়ী এই চিত্রকর্ম নিয়ে আজও তর্কবিতর্কের শেষ নেই। সবচেয়ে বড় তর্ক মোনালিসার হাসি নিয়ে। তার হাসি কি সত্যিই রোমাঞ্চকর ও রহস্যময়। লিওনার্দো এই ছবিটি আঁকা শুরু করেন ১৫০৩ সালে। প্রায় চার বছর সময় নিয়ে এই তৈলচিত্রটি তিনি সম্পূর্ণ করেন। ১৫১৯ সালে লিওনার্দোর মৃত্যুর কিছু দিন পূর্বে চিত্রকর্মটি তিনি শেষ করেন। তারপরও অনেকে বলেছেন, এটা লিওনার্দোর অসমাপ্ত চিত্রকর্ম। প্রশ্ন উঠেছে মোনালিসা নারী কিনা। জানা যায়, মোনালিসা আসলে ফ্লোরেন্সের ধনী ব্যবসায়ী ফ্রান্সেস কো দ্য গিয়োকন্দোর স্ত্রী লিসা গিয়োকন্দো। ফ্রান্সেসকো ছিলেন ভিঞ্চির বাবার বন্ধু। ফ্রান্সেসকো তার স্ত্রী লিসার চিত্রকর্ম করার জন্য ভিঞ্চিকে প্রস্তাব করেন। প্রথমে আপত্তি করলেও শেষ পর্যন্ত পিতৃবন্ধুর অনুরোধ এড়াতে পারেননি এবং এই চিত্রকর্মের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয় পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময়ী ও আলোচিত চিত্রকর্ম। ১৫১৯ সালে ভিঞ্চি মারা যাওয়ার পর ছবিটি কোথায় ছিল সে সম্পর্কে পরিষ্কার কিছু জানা যায়নি। তবে এর মধ্যে মোনালিসার খ্যাতি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যায়। ১৫৩০ সালে ফ্রান্সের শাসক ২২ বছরের তরুণ যুবক প্রথম ফ্রান্সিস ৪০০০ গোল্ডাক্রাউনের বিনিময়ের ছবিটির মালিক হন। এবং বংশানুক্রমে তা ফ্রান্সের রাজ প্রাসাদের শোভাবর্ধন করে। নেপোলিয়ান প্রাসাদের দেয়াল থেকে নিজের শয়নকক্ষে রাখেন। ১৯০৫ সালের মাঝামাঝি ল্যুভর মিউজিয়াম থেকে রহস্যজনকভাবে চুরি হয় যায় ভিঞ্চির মোনালিসা। এই চুরির ঘটনায় অভিযুক্ত হন বিখ্যাত ফরাসি শিল্প, সমালোচক ও কবি গিওম অপলিনার। চারদিকে হৈ চৈ পড়ে যায়। জেল থেকে অবশেষে মুক্তিপান তিনি এবং রচনা করেন প্রবন্ধ ‘আমার কয়েদি জীবন’। ১৯০৬ সালে চুরি যাওয়া মোনালিসার ছবিটি উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে ফ্রান্সের ল্যুভর মিউজিয়ামে ছবিটি সংরক্ষিত রয়েছে। বছরে প্রায় ৬০ লাখেরও বেশি দর্শনার্থী ল্যুভর মিউজিয়ামে মোনালিসাকে দেখতে আসেন। প্যারিসের এই ল্যুভর মিউজিয়াম দর্শনের আমার প্রথম সুযোগ হয় ১৯৯২ সালে। দীর্ঘ তেইশ বছর পর এবছরের জুনে আবারও সৌভাগ্য হয় মোনালিসার সেই ছবিটির সামনে দাঁড়াতে।

বহুমাত্রিক লিওনার্দো

অনেক পরিচয় চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির। এককথায় বহুমাত্রিক তিনি। তিনি একাধারে ভাস্কর, স্থাপত্যবিদ, প্রকৌশলী, সঙ্গীতজ্ঞ, উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানী। তাঁর সম্পর্কে ঐতিহাসিক হেলেন জেন্ডার বলেছেন, লিওনার্দোকে অতিমানব বললে মোটেও বেশি বলা হবে না। রহস্যময় চলমান জীবনই পছন্দ ছিল তার। লিওনার্দোকে বলা হয়, ইউরোপের শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নবজাগরণ বা রেনেসাঁর প্রতীক। তিনি ১৪৫২ সালের ১৫ এপ্রিল ফ্রান্সের ভিঞ্চি নামের একটি ছোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা পিয়েরো দ্য ভিঞ্চি নোটারি পেশায় যুক্ত ছিলেন আর মা ক্যাটরিনা ছিলেন গৃহিণী। চিত্রকলার ক্ষেত্রে লিওনার্দো ভেরোচিয়ো স্টুডিওতে পড়াশোনা করেন। পড়াশোনা শেষে তিনি ইতালিতে পাড়ি জমান। তার প্রথম জীবনের সব চিত্রকর্ম মিলানে প্রকাশিত হয়। এখানে তিনি লুডোভিকো ইল মোরো কোম্পানিতে কাজ করতেন। এরপর তিনি চলে আসেন রোম শহরে। এখানে তিনি দীর্ঘদিন অবস্থান করেন। প্রথম জীবনে তাকে সবাই চিত্রশিল্পী হিসেবেই জানত। রোমে থাকাকালীন তিনি বেশকিছু বিখ্যাত চিত্রকর্ম আঁকেন। যার মধ্যে মোনালিসা এবং দ্য লাস্ট সাপার উল্লেখযোগ্য। মোনালিসা ছবিটি নিয়ে আজ পর্যন্ত সৃষ্টিশীল মানুষের মনে কৌতূহল বিদ্যমান। তার চিত্রকর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল জীবন্ত অবয়ব। যেমন মোনালিসার হাসিতে যে অকৃত্রিমতা রয়েছে তা দেখলে একে আঁকা ছবি মনে হয় না। দ্য লাস্ট সাপারে মূলত শীর্ষদের সঙ্গে যীশুখ্রিস্টের শেষবারেরর মতো রাতের খাবারের চিত্র অঙ্কিত হলেও এ ছবিতে প্রতিটি চরিত্রই যেন কথা বলে। জীবনে বহু ছবি এঁকেছেন তিনি। তথাপি ১৫টি ছবিকে শুধু বিষয়ভিত্তিক ছবি বলা যেতে পারে বাকি ছবিগুলো বিচার করেই লিওনার্দোর অন্যান্য প্রতিভার বিষয়টি ধারণা করা যায়। এসব ছবিতে লিওনার্দোকে কখনও মনে হয় বিজ্ঞানী, কখনও উদ্ভাবক, কখনওবা স্থাপত্যবিদ। তার আঁকা চিত্রকর্মের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীকালে আবিষ্কৃত হয় হেলিকপ্টার, যুদ্ধের ট্যাঙ্ক, সৌরশক্তি এমনকি হিসাবের যন্ত্র ক্যালকোলেটর। এছাড়াও সুতার ববিন, অপটিক তন্ত্র আবিষ্কারের ক্ষেত্রে তার আঁকা চিত্রকর্মরে অনুপ্রেরণা রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অসীম সৌন্দর্যের পূজারী হলেও বিয়ের মতো সামাজিক আচারে নিজেকে বাঁধেননি। শেষ জীবনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি কাটিয়েছেন ভ্যাটিকানে। এ সময় তিনি পেনশনের ওপর নির্ভর করেই বেঁচে ছিলেন। ১৫১৯ সালের ২ মে তিনি তার প্রিয় বান্ধবী ফ্রান্সিসের কোলে মাথা রেখে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

‘ভার্র্সাই’ প্রাসাদ

অনিন্দ্যসুন্দর ভার্র্সাই প্রাসাদ পরিদর্শনের সুযোগ ঘটেছিল ১৯৯২ সালে। তখন শীতকাল ছিল, ‘ভার্র্সাই’ প্রাসাদের সামনের উদ্যান, দীঘি তখন প্রচ- ঠা-ায় পানি জমে বরফে সমতল। তার ওপর দিয়ে আমি হেঁটেছিলাম, ভাবলে গা শিউরে ওঠে। আজও ভার্সাইর অনিন্দ্যসুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমার চোখে ভেসে ওঠে। প্যারিসের কাছে অবস্থিত ভার্সাই প্রাসাদে কক্ষের সংখ্যা মোট এক হাজার আট শ’। ইউরোপের বৃহত্তম প্রাসাদগুলোর মধ্যে এটি সুবিশাল। প্রাসাদের পাশেই রয়েছে বিশাল উদ্যান। ১৬৭৭ সালে ফরাসি নৃপতি চতুদর্শ লুই নিজের বাসভবন হিসেবে প্রাসাদটি তৈরি করেন। যদি আপনি মনে করেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাড়িটি দেখবেন তাহলে আপনাকে সম্ভবত ফ্রান্সে যেতে হবে। সম্ভবত বলা হলো এ কারণে যে, পৃথিবীর বড় বাড়ি ঠিক কোনটি এটা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। তবে ফ্রান্সের চ্যাটিউ অব ভার্সাইলেসকে মনে করা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাড়ি হিসেবে। এটি একসময় ফ্রান্সের রাজবাড়ি ছিল। একসময় কিন্তু এটি ছিল সামান্য একটি হান্টিং লজ বা শিকারের জন্য বাড়ি। ফ্রান্সের রাজারা শিকার করার সময় এই বাড়িটিতে এসে থাকতেন। ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লই এই সামান্য হান্টিং লজকে বাড়াতে বাড়াতে ইউরোপের সবচেয়ে বড় বাড়িতে রূপান্তরিত করেন। আর এ কাজ করতে সময় লেগেছিল প্রায় পঞ্চাশ বছর। ১৬৬১ সাল থেকে ১৭১০ সাল পর্যন্ত বাড়িটি কেবল বেড়েই চলেছিল। প্রধান ভবনের মেঝের আয়তন ৫১ হাজার ২১০ বর্গমিটার। ২০ কিলোমিটার দেয়াল। বাড়িটিতে ঘরই আছে ৭০০টি। জানালা আছে ২ হাজার ১৫৩টি আর সিঁড়ি আছে ৫৭টি। আরেকটি বড় বাড়ি ছিল চীনে। বেইজিং শহরে আছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ প্রাসাদ কমপ্লেক্স। ১৩৬৮ সাল থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত এটি সম্রাটের বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সবকিছু ছিল ৭ লাখ ২০ হাজার বর্গমিটারের বাড়িতে। তাহলেই অনুমান করুন কত বড় বাড়ি ছিল সেটা।

অনন্য এক নগরী প্যারিস

প্যারিসকে বলা হয় স্থাপত্যশিল্পের নগরী। এখানে রাস্তার ধারে বড় বড় বাড়িতে, সেইন নদীর ওপর ব্রিজের গায়ে, কনকর্ড স্কোয়ারে, নটরডেম চার্চের গায়ে রয়েছে নানা ভঙ্গিমায় নানা রকম ভাস্কর্য। কেবল মানুষের ভাস্কর্য নয়, পশু-পাখিও নানা ভঙ্গিমায় শোভা পাচ্ছে এবং এগুলো দেখলে মনে হবে যেন প্রত্যেকটি জীবন্ত। স্থাপত্যশিল্পের নগরী এ প্যারিসে ইউরোপের অন্য শহরের তুলনায় অনেক বেশি লোক বাস করে। এখানে গাড়ির সংখ্যাও অনেক বেশি। এজন্য প্যারিসের রাস্তাঘাটে জ্যামও হয় বেশি। জ্যাম হয়েছে তাতে কী, এজন্য কেউ ধৈর্য হারায় না। কেউ কাউকে ওভারটেক করে না, কোন হর্নও বাজে না তখন।

নিঃশব্দে গাড়িগুলো পরস্পরের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে এগিয়ে চলে। প্যারিসে যারা আসেন তারা আইফেল টাওয়ার না দেখে ফেরেন না। এ টাওয়ারটির উচ্চতা এক হাজার তেষট্টি ফুট। এর ওপর উঠে নিচে তাকালে দেখা যায় সেইন নদী। শুধু তাই নয়, প্যারিস শহরও দেখা যায়। টাওয়ারের ওপর থেকে সেইন নদীকে ছোট একটা খালের মতো আর মানুষগুলোকে পিঁপড়ার মতো মনে হবে। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে এই আইফেল টাওয়ার তৈরি হয়। এখানে আইফেল টাওয়ারের মডেলও কিনতে পাওয়া যায়। প্যারিসে রয়েছে ল্যুভর মিউজিয়াম। এতে রয়েছে ৩০ হাজার ছবি। প্রচুর ভাস্কর্যও আছে এখানে। যেমনÑ মাইকেল এ্যাঞ্জেলো, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি প্রমুখ শিল্পীর সৃষ্ট সব ভাস্কর্য দেখলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়। মনে হবে প্রতিটি ভাস্কর্য যেন জীবন্ত।

নির্বাচিত সংবাদ