১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঘোড়া আটকে ক্ষোভ থেকে আরাকান আর্মি হামলা চালাতে পারে ॥ বিজিবি মহাপরিচালক

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঘোড়া আটক ও সম্প্রতি অপহৃত মিয়ানমারের দুই সেনা সদস্যকে উদ্ধারের পর দ্রুত ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষোভ থেকে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি বিজিবির ওপর হামলা চালাতে পারে। এছাড়া মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বা অন্যকোন সরকারী বাহিনীর অভিযানের মুখে পালানোর সময় বিজিবিকে প্রতিপক্ষ ভেবে আরাকান আর্মির গুলি চালানোর ঘটনা ঘটাও বিচিত্র নয়। মিয়ানমার দীর্ঘ দিন ধরেই সে দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশ আশ্রয়প্রশয় দিচ্ছে বলে অভিযোগ করে আসছিল। এমন ঘটনার পর মিয়ানমারের সেই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত। হামলার ঘটনাটি ছিল খুবই অপ্রত্যাশিত। আচমকা এ ধরনের হামলার বিষয়ে আগাম কোন ধারণা বা তথ্য ছিল না। হামলার বিষয়ে গভীর তদন্ত চলছে।

ঘটনাস্থলসহ আশপাশের এলাকায় টহল বাড়ানো হয়েছে। পুরো এলাকায় সেনাবাহিনী ও বিজিবি যৌথভাবে কম্বিং অপারেশন চালাচ্ছে। অভিযানে ঘটনাস্থল থেকে প্রচুর মর্টারের খালি শেল, তাজা বুলেট, বুলেটের খোসা, বুলেটের বেল্ট, তাজা গ্রেনেড, গ্রেনেডের স্পিøন্টার, দুটি ঘোড়াসহ এক হাত বিচ্ছিন্ন হওয়া একজন ছাড়াও নানা আলামত উদ্ধার হয়েছে। আটক ব্যক্তির হাতটি মাইনে উড়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় অভিযান চলতে পারে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিত এড়াতে ওসব এলাকায় আরও বিওপি (বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট বা নিরাপত্তা চৌকি) স্থাপন করা হবে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন করতে মিয়ানমার সরকার ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছে।

বৃহস্পতিবার রাতে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ পিলখানা বিজিবি সদর দফতরে এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে আরও জানান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ২৭১ কিমি আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৮ কিমি পাহাড়ী এলাকা, যা স্বাধীনতার পর থেকেই অরক্ষিত ছিল। বর্তমানে ১১০ কিমির অনেকটাই নিরাপত্তার মধ্যে আনা সম্ভব হয়েছে। বান্দরবানের থানচির বড়মদকের দুর্গম সীমান্তে গত বুধবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ঘটনার সময় বিজিবির ৪৫ সদস্য চারটি নৌকায় করে টহল দিচ্ছিলেন। টহলের সময় প্রথম দুটি নৌকা থেকে অপর দুটি নৌকার দূরত্ব ছিল প্রায় দেড় কিমি।

প্রথম আক্রমণটি হয় ভেতরের দিকে থাকা দুটি নৌকা টহলরত বিজিবির ২০ সদস্যের ওপর। আচমকা আক্রমণে হতভম্ব বিজিবি সদস্যরা। তারাও সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা আক্রমণ চালায়। গুলির শব্দ পেয়ে দূরে থাকা ওই দুই নৌকার ২৫ বিজিবি সদস্যরাও সেখানে হাজির হয়ে পাল্টা আক্রমণ চালায়। আরাকান আর্মি পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি চালাচ্ছিল। এজন্য স্বাভাবিক কারণেই নিচুতে থাকা বিজিবি সদস্যরা বেকায়দায় ছিলেন। তারা বিভিন্ন পাহাড়ের গায়ে কৌশলগত অবস্থান নিয়ে পাল্টা হামলা চালাতে থাকেন। উঁচু-নিচুতে গোলাগুলি হওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেনি। ন্যূনতম সমতল জায়গায় গোলাগুলি হলে দুই পক্ষেরই অনেক হতাহতের আশঙ্কা ছিল। এক পর্যায়ে বিজিবি মর্টারশেল নিক্ষেপ শুরু করে। ঘটনাস্থলটি খুবই দুর্গম। এ ধরনের জায়গায় সাধারণত রাইফেল বা মেশিনগানের গুলি তেমন কার্যকর হয় না। এসব ক্ষেত্রে গ্রেনেড, মর্টারশেল ও রকেটলঞ্চার খুবই কার্যকর। বিজিবি সদস্যরা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মর্টারশেল নিক্ষেপ করে পাল্টা হামলা চালাতে থাকে।

খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামে অন্য কাজে নিয়োজিত থাকা দুইটি হেলিকপ্টারযোগে সেনা ও বিজিবি সদস্যদের ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়। হেলিপ্যাড না থাকায় এবং কৌশলগত কারণে দূরে নামতে হয় সেনা ও বিজিবি সদস্যদের। প্রথম দলটিকে হেলিকপ্টার থেকে অন্তত ৬ থেকে ৭ কিমি দূরে নামাতে হয়। প্রথম দলটির ঘটনাস্থলে পৌঁছতে সাড়ে ৮ ঘণ্টা সময় লাগে। তাদের হেঁটে সেখানে পৌঁছতে হয়। এদিকে বিমান বাহিনীর এফ-৭ নামের ফাইটার বিমান দিয়ে ঘটনাস্থলের ওপর দিয়ে টহল শুরু করা হয়। বিমান টহলের এক পর্যায়ে গোলাগুলি বন্ধ করে দেয় আরাকান আর্মি। বিমান বাহিনীর টহল বেশ কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। বিজিবি, সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সমন্বিত অভিযানে আরাকান আর্মি এক পর্যায়ে সরে যেতে বাধ্য হয়। ঘটনাস্থলে বিজিবির ১০ থেকে ১২ প্লাটুন এবং সেনাবাহিনীর ৪ থেকে ৫ প্লাটুন ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। সেখানে যৌথ অভিযান চলছে। মিয়ানমার সরকার ও সেদেশের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন করতে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছেন।

বিজিবির ডিজি আরও জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ৮ থেকে ১০ আরাকান আর্মিকে আহত অবস্থায় নিয়ে যেতে দেখা গেছে। গোলাগুলিতে আরাকান আর্মির কারো কারো মৃত্যুও হতে পারে। অন্তত ৫০ আরাকান আর্মি হামলায় অংশ নিয়েছিল বলে দেখা গেছে। হামলায় অংশ নেয়া অনেককেই পাহাড়ের কারণে দেখা যায়নি। বা দেখার মতো কোন পরিস্থিতি ছিল না। ধারণা করা হচ্ছে, হামলাকারী আরাকান আর্মির সংখ্যা কমপক্ষে শতাধিক ছিল। এমন ঘটনার পর সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে। ওসব দুর্গম সীমান্তে স্থায়ী নিরাপত্তা চৌকিস্থাপনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা চৌকি স্থাপনের প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া যাচ্ছে না। জমির মালিকরা নানা অজুহাতে জমি দিতে নারাজ। এমনকি বিক্রি করতেও রাজি নন। এমন পরিস্থিতিতে বিওপি স্থাপন বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থায়ী নিরাপত্তা চৌকি না থাকায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অনেক সীমান্তই অনেকটাই অনিরাপদ। যদিও গত বছর ১১০ কিমি সীমান্ত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে ২৫ নিরাপত্তা চৌকি রয়েছে। আরও অন্তÍত ২০ থেকে ৩০ স্থায়ী চৌকি স্থাপন জরুরী। পাশাপাশি নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকা সদস্যদের খাবার ও ওষুধসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র দ্রুত পৌঁছে দেয়া খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে হেলিকপ্টার ছাড়া এসব নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দেয়া প্রায় অসম্ভব। এজন্য বিজিবির এয়ার উইং স্থাপনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায়ও রয়েছে।

বিজিবি মহাপরিচালক আরও জানান, মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরেই সেদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশ আশ্রয়প্রশয় দিচ্ছে বলে অভিযোগ করে আসছিল, এমন ঘটনার পর মিয়ানমারের সে ভুল ভেঙ্গেছে। সম্প্রতি দুই দফায় বিজিবি দশটি ঘোড়া আটক করে। হামলাকারীরা আরাকান আর্মি বলে মিয়ানমার ও বিভিন্ন মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঘোড়াগুলো দিয়ে আরাকান আর্মিরা দুর্গম পাহাড়ে যাতায়াতসহ তাদের প্রয়োজনীয় মাল বহনের কাজে লাগাত বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘোড়া আটকের পর ক্ষিপ্ত হয়ে আরাকান আর্মি হামলা করতে পারে। এছাড়া বিজিবির নিয়মিত অভিযানে সম্প্রতি বাংলাদেশের গহিন জঙ্গল থেকে আহত অবস্থায় মিয়ানমারের দুই সেনা উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। পরে তাদের দ্রুত মিয়ানমার সরকারের কাছে ফেরত দেয়া হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়েও আরাকান আর্মিরা হামলার ঘটনাটি ঘটাতে পারে। হামলার ঘটনাটি পরিকল্পিত কিনা এবং এর পেছনে আরও কোন গভীর ষড়যন্ত্র বা উদ্দেশ্য আছে কিনা সে বিষয়ে গভীর তদন্ত চলছে।

প্রসঙ্গত, গত ৫ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত টানা ১০ দিন বান্দরবানের বলিপাড়া ও আলীকদমে অভিযান চালায় সেনাবাহিনীর পাঁচটি ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাসহ মোট ১৬ দল। অভিযানকালে বান্দরবানের গভীর জঙ্গল থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দুই সদস্য আহত অবস্থায় উদ্ধার হয়। পরবর্তীতে এক সংবাদ সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক জানান, উদ্ধারকৃতরা কোন সন্ত্রাসী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলেন।

বিজিবি প্রধান গোয়েন্দা, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানান, মিয়ানমার সীমান্তে প্রায়ই সেদেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী অস্ত্রধারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়ে থাকে। সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী দলের ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারকে বাংলাদেশ সরকার ও বিজিবির তরফ ছাড়াও কূটনৈতিকভাবে সহায়তা দেয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে বিজিবির উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।