২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ আজিজুর রহমান

  • আন্তর্জাতিক সিডও দিবস

বিশ্বে মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। সভ্যতার ক্রম বিকাশে নারীর অবদান কম নয়। আধুনিক বিশ্বে তারা এখন উদ্যেক্তা, ব্যবস্থাপক ও বিনিয়োগকারী। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে কয়েক দশকের উন্নয়নচিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এ সাফল্যের এক বিরাট অংশে রয়েছে নারীর অংশীদারিত্ব। ব্যবসা-প্রশাসন, শিল্প সাহিত্য, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, আইন ও বিচার ব্যবস্থা এবং রাজনীতিসহ সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্তরে দক্ষতার সাথে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন পুরুষের সাথে সমান তালে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘পরুষের জীবনের ৪ আশ্রমের ৪ দেবতা বাল্যকালে মা, যৌবনে স্ত্রী, প্রৌঢ়ে কন্যা –পত্রবধূ এবং বার্ধক্যে নাতনি-নাতবৌ।’ অর্থাৎ জন্ম থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নারী পুরুষের জীবনের সঙ্গে কোনো না কোনো ভাবে জড়িয়ে আছেই।

তারপরও বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক নারীই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৈষম্য, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার অতীতে হয়েছেন, বর্তমানেও হচ্ছেন। পরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার চক্রজালে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী পুরুষ কর্তৃক আবহমানকাল থেকেই বঞ্চনার শিকার হতে হচ্ছে নারীকে। বঞ্চিত নারীজনতির পক্ষে ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য খুব বেশি সোর্চ্চার হয়ে উঠতে সবসময় সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। নারীও যে মানুষ, এই বিষয়টি অনেকের চিন্তাতেই নেই। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীর যুক্তিসঙ্গত ইচ্ছা, স্বপ্ন ও মত প্রকাশের স্বীকৃতি পদদলিত হয়।সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিধিনিষেধ নারী পুরুষের গভীর ব্যবধান তৈরি করেছে, তৈরি করেছে বৈষম্য। নারীর প্রতি বৈষম্য বলতে নারী পুরুষ নির্বিশেষে যে কোনো পার্থক্য, বঞ্চনা অথবা বিধিনিষেধকে বোঝায়। এর ফলে নারীকে পরুষের তুলনায় অধস্তন বা ছোট করে দেখা হয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাস্কৃতিক, নাগরিক, পারিবারিক সব ক্ষেত্রে নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়। অথচ মানব সভ্যতার বিকাশ ও উন্নয়নে যুগে যুগে নারী যে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে আসছে, তার যথাযথ স্বীকৃতি দিতেও নারাজ আমাদের পরুষতান্ত্রিক সমাজ। সমাজ, রাষ্ট্র তথা সমগ্র বিশ্বের শান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা স্থাপন করা এবং মানুষ হিসেবে নিজের উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করতে দরকার আইন প্রণয়ণ, প্রচলিত আইনের সংষ্কার এবং আইন প্রয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্রে সৃষ্টি তথা প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরি করা।

নারীর অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার মাধ্যমে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ রোধ একই সাথে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বর্তমানে বিভিন্ন দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ কিছু প্রচেষ্টা ও উদ্যেগ নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে সিডও (ঈঊউঅড) সনদ। এই সনদকে নারীর অধিকার আদায়ের একটি কার্যকরি হাতিয়ার বলা হয়ে থাকে। নারীর জন্যে ইন্টারন্যাশনাল বিল অব রাইটস’ হিসেবে স্বীকৃত এই দলিল সিডও, নারীর প্রতি সকল ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (ঈড়হাবহঃরড়হ ড়হ ঊষরসরহধঃরড়হ ড়ং ধষষ ঋড়ৎসং ড়ভ উরংপৎরসরহধঃরড়হ ধমধরহংঃ ড়িসবহ –ঈঊউঅড), যা নারী অধিকার সংরক্ষণের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মানদন্ড। রাষ্ট্র, অর্থনীতি, পরিবার ও সমাজ জীবনের সকল পর্যায়ে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ এই সনদ -সিডও। ৩০ ধারার এ সনদ বা দলিল নারী নির্যাতনের রক্ষাকবচ এবং নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপাদান হিসেবে বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ২০টি রাষ্ট্রের অনুমোদন লাভের পর এই সনদটি কার্যকর বলে ঘোষিত হয়। এটি জাতিসংঘের ৬টি মৌলিক অধিকার সনদের মধ্যে অন্যতম। জাতিসংঘের পরিভাষায় একে ‘উইমেনস কনভেনশন’ বলা হয়। লিঙ্গ, বর্ণ, ধর্ম, সংস্কৃতি বা বয়স নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রে অধিকার যে একটি মৌলিক মূল্যবোধ –সিডও সনদ এ প্রেক্ষিতে নারীর অধিকারকে ব্যাখ্যা করেছে। এই সনদে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতিকে পরিবর্তনের মতো নির্দিষ্ট ইস্যুগুলোকে মোকাবেলা করার কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় দায়-দায়িত্বের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়েছে। সিডও সনদের মূল লক্ষ্য হলো, মানুসের মৌলিক অধিকার, মর্যাদা ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমতার নিশ্চয়তা বিধানের আবশ্যকীয়তা তুলে ধরা এবং নারীর অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। এই সনদ অনুমোদনকারী রাষ্ট্রসমূহ এই প্রথম কোনো সনদে জনজীবন ও মুক্তজীবনে নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসনের ওপর সমান গুরুত্ব আরোপ করেছে।

নারীর মানবাধিকারের বিশ্ব স্বীকৃত এই সনদে বাংলাদেশ ১৯৮৮ সালের ৬ নভেম্বর ৩টি ধারায় ২, ১৩ (ক) এবং ১৬.১ (গ) ও ১৬.১ (চ) আপত্তিসহ অনুস্বাক্ষর করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রসমূহের সংবিধান ও আইনে নারী –পুরুষের অধিকারে সমতার নীতি অনুসরণ করবে।’ অপরদিকে ১৩ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, পারিবারিক কল্যাণের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

এছাড়া ১৬.১ (গ) ধারায় বলা হয়েছে ‘বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার একই অধিকার’ এবং ১৬.১ (চ) ধারায় বলা হয়েছে,‘ অভিভাবকত্ব, দত্তক গ্রহণ, ট্রাস্টশিপ ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী পুরুষের অধিকার ও দায়িত্ব সমান। তবে এসব ব্যাপারে শিশুর স্বার্থই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ এরপর ১৯৯৭ সালের ২০ জুলাই ধারা ১৩ (ক) ও ১৬.১ (চ) এর থেকে আপত্তি প্রত্যাহার করে নেয় সরকার। তবে ধারা ২ ও ১৬.১ (গ) এর ওপর থেকে এখওন আপত্তি প্রত্যাহার করা হয়নি। আপত্তি করা সিডও সনদের এই ধারা দু’টি বাংলাদেশের সংবিধানের নারী –পুরুষের সমতার যে বিধান রয়েছে তার সাথে কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক নয়। বরং সিডও সনদের ধারা ২ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৬,২৭,২৮,২৯ নম্বর ধারা- উপধারার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। তারপরও যদি সিডও’এর সনদের কোনো ধারা দেশের প্রচলিত আইনের সাথে সঙ্গতি পূর্ণ না হয়, তাহলে প্রথা অনুযায়ী স্বাক্ষরকারী দেশগুলো প্রয়োজনে প্রাসঙ্গিক আইন প্রণয়ন করে সনদের ধারাগুলোকে দেশের প্রচলিত আইনের অন্তর্ভূক্ত করে এর সক্রিয় বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। কোনো কনভেনশন বা সনদ বাস্তবায়ন উপযোগী করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো প্রয়োজনে নিজ দেশে আইন কানুন ও নীতিমালা প্রণয়ন করে থাকে। সিডও নিয়েও অনেক দেশ এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ইউগান্ডা ও দক্ষিণ আফ্রিকা-সিডও সনদের প্রেক্ষিতে তাদের সংবিধান সংশোধন করে নারী-পুরুষ সমতা স্থাপনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মিশর, লেবানন ও জর্ডানে পুলিশ প্রশাসনের জন্যে সিডও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে নারী পুরুষের বৈষম্য কমে আসছে। রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক সমতা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম বা ওর্য়াল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউ ই এফ)-এর সাম্প্রতিকালের প্রতিবেদনে এমন তথ্য দেওয়া হয়েছে।

লিঙ্গ সমতা সৃষ্টিতে বাংলাদেশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে- সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটির ‘লিঙ্গ বৈষম্য সূচকে’ ২০১৪ সালে বিশ্বের ১৪২টি দেশের মধ্যে ৬৮ তম হয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৩ সালে এ সূচকে ১৩৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭৫ তম এবং ২০০৭ সালে ছিল ১০০ তম। গত ৮ বছরে ৩২ ধাপ এগিয়ে ৬৮তম অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাসে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ তার পার্শ্চবর্তী দেশ বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এবং বিশ্বের মসুলিম প্রধান দেশগুলোর মধ্যেও অনেক এগিয়ে আছে। মানব উন্নয়নের প্রতিটি সূচকেই বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন। এর পেছনে কারন হিসেবে লিঙ্গ বৈষম্য না থাকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। বিশ্ববরেণ্য এই অর্থনীতিবিদ ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মুম্বাই ক্যাম্পাসে এক বক্তৃতায় বলেন, মানব উন্নয়নে লৈঙ্গিক বা জেন্ডার সমতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এবং এই ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে আছে। বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যেখানে স্কুলে ছেলের চেয়ে মেয়েদের সংখ্যা বেশি। দেশটিতে গড় আয়ু বেশি, মৃত্যুহার কম এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেশি। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও লৈঙ্গিক সমতার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে বলে মনে করেন এই বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ।

বাংলাদেশের নারীচিত্র ক্রমেই বদলে যাচ্ছে। পরিবার, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবেও। নারীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার চিত্র ক্রমেই অন্য নারীদের অনুপ্রাণিত করছে। নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে নারী আজ জেগে উঠতে শুরু করেছে। শুরু করেছে সচেতন হতে। পুরুষের পাশাপাশি নারী নিজের পারদর্শিতা, দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তা অর্জনের কৌশল আয়ত্ত্ব করতে শিখছে। শিখেছে সর্বোচ্চ ক্ষমতার দিকে এগিয়ে যেতে।

এগিয়ে যাওয়ার এই অদম্য স্পৃহা নারীকে পৌঁছে দিচ্ছে সাফল্যের পথে। যে পথে নারীর সহযোগিতায় রয়েছে রাষ্ট্রীয় আইন, নীতি ও দিক নির্দেশনা।