১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শান্তির দূতের জন্য সশস্ত্র প্রহরা

  • আবু সুফিয়ান কবির

মালালা ইউসুফজাই গত চার বছর ধরে একটি আলোচিত নাম। গত বছর নোবেলে শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর তার পরিচিতি ও খ্যাতি দুটিই। এতে তালেবানরা তার ওপর আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। কেননা এই কিশোরী যখন পাকিস্তানে তালেবান রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সে দেশের শিক্ষাবঞ্চিত নারীদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছিলেন বঞ্চনার শিকল, তখন তার ওপর নেমে আসে চরম আঘাত। ফতোয়া অগ্রাহ্য করে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার অপরাধে তালেবানদের নিষ্ঠুর হামলার শিকার হন এই কিশোরী। কিন্তু সে যাত্রায় তিনি বেঁচে যান। মাত্র ১৪ বছর বয়সে যখন তিনি গুলির আঘাতে জর্জরিত হয়েছিলেন, তখন সারাবিশ্ব চিনেছিল তাকে। তার চিকিৎসা হয় লন্ডনে। তার পর থেকে সেখানেই তিনি অবস্থান করছেন এবং বার্মিংহামের একটি স্কুলে পড়ালেখা করছেন। গত বছর সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ায় অতি বিরল কৃতিত্ব তার ঝুলিতে উঠেছে। বিষয়টি তালেবানরা খুব একটা ভাল চোখে দেখছে না। গোয়েন্দারা ভাবছে, তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকি বেড়েছে। তার ওপর যে কোন সময় আক্রমণ হতে পারে এই আশঙ্কায় সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দিতে দুই সশস্ত্র রক্ষী দিয়েছে ব্রিটিশ পুলিশ। এ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শুধু মন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্যই নেয়া হয়।

২০০৯ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে মালালা বিবিসি ব্লগে তালেবানদের বিরুদ্ধে লেখা শুরু করেন। তালেবানি ফতোয়া উপেক্ষা করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, শিক্ষা প্রসারের মাশুল হিসেবে তালেবানি জঙ্গীদের রোষের মুখে পড়তে হয় কিশোরীকে। বারবার হুমকি আসার পরও মালালা পাকিস্তানের সোয়াত এলাকায় তালেবানিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পড়ালেখা চালিয়ে গেছেন। সেই সঙ্গে ব্লগে লেখলেখি করেছেন। মালালাদের বহনকারী স্কুলবাসে উঠে তালেবানিরা মালালাসহ তার দুই সহপাঠীকে লক্ষ্য করে গুলি করে। ২০১২ সালের ১২ অক্টোবর পাকিস্তানে ফতোয়ার একটি বিষয় নিয়ে ৫০ জন ইসলামী আলেমদের একটি দল তাকে এভাবে হত্যা চেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ জানায়। কিন্তু তালেবান সদস্যরা তাকে ও তার বাবা জিয়াউদ্দিন উইসুফজাইকে হত্যা করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। এ হত্যাচেষ্টা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মালালার পক্ষে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করে। ডয়চে ভেলে ২০১৩ সালে মালালাকে ‘দ্য মোস্ট ফেমাস টিনেজার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ নির্বাচন করে। জাতিসংঘের গ্লোবাল শিক্ষাকার্যক্রমের দূত গর্ডন ব্রাউন আইএম মালালা নামে একটি জাতিসংঘের পিটিশন চালু করে এবং এতে দাবি করা হয়, সারাবিশ্বের সকল শিশু ২০১৫ সালের মধ্যে বিদ্যালয়ে যাবে। এ পিটিশন পাকিস্তানের রাইট টু এডুকেশন বিল তৈরিতে বেশ সহায়তা করে। ২০১৩ সালের ২৯ এপ্রিল টাইম ম্যাগাজিন ১০০ সেরা ইনফ্লুয়েনিয়াল পিপল ইন দ্য ওয়ার্ল্ড তালিকায় মালালাকে নির্বাচিত করে। ২০১৩ সালে ১২ জুলাই মালালা জাতিংঘের প্রধান কার্যালয়ে শিক্ষা সম্প্রসারণ বিষয়ে বক্তব্য দেন এবং একই বছরের সেপ্টেম্বরে অফিসিয়াল রিমিংহাম চালু করেন। ২০১৩ সালে মালালা শাখারভ পুরস্কার জিতেন। একই বছর ১৬ অক্টোবর মালালাকে কানাডায় সম্মানিত নাগরিক হিসেবে মনোনীত করা হয় এবং বিষয়টি সংসদে পাস হয়। ২০১৪ সালের ফিব্রুয়ারিতে তিনি সুইডেনের ওয়ার্ল্ড চিলড্রেন প্রাইজের জন্য নির্বাচিত হন। একই বছরের ১৫ মে মালালা ইউনিভার্সিটি অব কিংস কলেজ থেকে সম্মানিত ডক্টরেট ফেলোশিপ পান।

মালালা একজন কিশোরী হিসেবে শুধু পড়ালেখা চালিয়ে যেতে চাননি। একাধারে তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা, সাহসী ও কঠিন মনোবলের অধিকারী। তালেবানরা তাকে হত্যা করতে পারেনি, বরং মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা গুলিবিদ্ধ মালালা আরও অনুপ্রাণীত হয়েছেন। বন্দুকের নলের সামনেও যিনি মাথা নোওয়াতে শেখেননি, বরং মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেও লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন শিক্ষার অধিকার সকলের জন্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। পাকিস্তানের খাইবার পাকতুনখোলয়া প্রদেশের সোয়াত জেলার ছোট শহর সিঙ্গোরা। সেখানেই মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার ওপর এক সময় ফতোয়া জারি করেছিল তালেবানরা। সেখানেই ২০০৯ সালে গর্জে ওঠেন ১১ বছর বয়সী মালালা ইউসুফজাই। বিবিসিতে ছদ্মনামে তার লেখা প্রচারিত হয়। ব্লগে উঠে আসে সোয়াত উপত্যকায় তালেবানের প্রভাব বিস্তারের খুঁটিনাটি। সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছিল নারীশিক্ষার বিষয়টি। সেই অল্প বয়সে কিভাবে সেটা মালালা ধারণ করেছিলেন বা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, সেটাই ভাবিয়ে তুলেছিল সর্বমহলকে। ২০১২ সালে ৯ অক্টোবর তার ওপর চালানো হয় তালেবানি বর্বর হামলা। হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মালালা প্রসঙ্গে ১৭ অক্টোবর নিন্দা জানান অভিনেত্রী এ্যাঞ্জেলিনা জোলি। তিনি ওই সময় মন্তব্য করেন, মালালাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া উচিত। অন্যদিকে পপ সম্রাজ্ঞী ম্যাডোনা তার হিউম্যান নেচার গানটি মালালাকে উৎসর্গ করেন। এছাড়া ১০ নবেম্বর ‘মালালা দিবস’ ঘোষণা করা হয়।

লন্ডনে চিকিৎসা শেষে মালালা বার্মিংহাম প্যালেসে নিমন্ত্রণ পান ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের। রানীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতেই থেমে থাকেনি সোয়াতের মেয়েটি। সেখানেও নিজের মতো করে তুলে ধরেছেন পড়াশোনা জানাটা কতা জরুরী। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিটি ঘরে এখনও জ্বলে না আলো। ওর সোয়াতের স্কুলবেলা। তালেবানদের গুলি। পরে রানীকে নিজের লেখা বই ‘আই এ্যাম মালালা’ উপহার দেন। ২০১৪ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর গোটাবিশ্ব তাকে চিনেছে। সাংস্কৃতিক জগত, খোলোয়াড়, রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের সেলিব্রেটিদের কাছ থেকে শুছেচ্ছাবার্তা পেয়েছেন এই শান্তির দূত। বর্তমানে তিনি শিক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন কর্মসূচী চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পাড়ালেখাও চালিয়ে যাচ্ছেন সাফল্যের সঙ্গে। কেননা তিনি বিশ্বাস করেন, নারীদের যে শিকলে আবব্ধ করে রাখা হয়েছে তার নাম অশিক্ষা। এই অশিক্ষার বেড়াজাল থেকে তাকে বেরিয়ে আসতেই হবে। বেরিয়ে আসতে হবে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তরের নারী ও শিশুদের। শান্তির এই দূতের শান্তি যেন বিঘ্নিত না হয়, সেটাই সবার কামনা।