২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কোথায় যাবে সুমনা

  • এলিজা নুসরাত

বাবার মৃত্যুর পর সুমনা তার বড় বোনের সঙ্গে খুলনা চলে আসে। বড় বোন শারমিন তাকে নিজের সংসারে নিয়ে আসে বোনকে লেখাপড়া শিখিয়ে সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে। দুলাভাই সরকারী চাকরিজীবী। লেখাপড়াটা ঠিকঠাক চালিয়ে যেতে পারলে সুমনাকে ভাল চাকরি নিয়ে দেবে এই তার বড় বোনের স্বপ্ন। দুলাভাইও এ কথায় একমত। সুমনার আর দুঃখ নেই- কত ভাল বোন আর দুলাভাই পেয়েছে সে। শুধু চাকরি নয় আউটসোর্সিংয়ে কাজ করেও বেশ টাকা রোজগার করে দুলাভাই। বেশ সৌখিন আর রসিক প্রকৃতির লোক। সঙ্গীত আর নৃত্যে পারদর্শী। চৌকস লোক বটে। যে গুণটির কথা এখনও বলা হয়নি তা হলো, সে একজন সুকুমার। তার স্ত্রীও কম সুন্দরী নয়। তার পাশে বেশ মানানসই অবস্থান নিয়ে স্ত্রীর ভূমিকা রেখে চলেছে বিয়ের পর থেকে। এ সংসারে আরও একজন রয়েছে, বোনের একমাত্র ছেলে সবার চোখের মনি, মাহিন। মাহিন সবে স্কুলে যেতে শুরু করেছে।

সুমনা রোজ ভোরে ঘুম থেকে জেগে সকালের নাস্তা তৈরি করে রেখেই মাহিনকে নিয়ে স্কুলে চলে যায়। স্কুল থেকে বাসায় ফিরে দেখে তার বড় আপা এখনও সাধের ঘুমটাকে ঝেড়ে ফেলে বিছানা ছেড়ে উঠতে কষ্ট অনুভব হওয়ার ভয়ে বিছানায় শুয়েই টিভির দিকে তাকিয়ে রিমোর্টকন্ট্রোল টিপছে। এ দৃশ্য তার কাছে নতুন কিংবা অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। এ এক নিত্য নৈমিত্তিক বাস্তব চিত্র। স্কুল থেকে ফিরে মাহিনের গোসল, খাওয়া শেষ করে কাছে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ওদিকে মাহিনের মা তো সিনেমা, নাটক নিয়েই পড়ে থাকে। মাহিন তার মায়ের বুকের ভালবাসার উত্তাপটুকু অনুভবের সুযোগ খুব একটা পায় না। খালার স্নেহ, ভালবাসাতেই একটু একটু করে বড় হয়ে উঠে মাহিন।

সুমনা বড় বোনের সংসার ও সন্তান এই দুটোর ভারই গ্রহণ করেছে হাসি মুখে। বাবা নেই, অন্যের সংসারে থাকা, খাওয়া চলছে এ কারণে নয়, বড় বোনের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ আর সংসার প্রেমই তাকে এই প্রেরণাটুকু দিয়ে থাকে। বোনের সংসারকে সে ভালবাসে। এই গুণগুলোই তার শেষ নয়। বাঙালী নারীর চিরাচরিত স্বভাব সংসারের ঘানি টেনে নিজের যোগ্যতা অর্জনের সুবর্ণ সময়টাকে হেলায় হারাবার ঐতিহ্যটাকেও ভেঙ্গে ফেলে সে এখন রীতিমতো দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। যেভাবেই হোক দু-তিনটা সার্টিফিকেট তাকে অর্জন করতেই হবে। তা না হলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অন্তত টিকে থাকার ঠাঁইটুকুও সফলভাবে অর্জন করতে ব্যর্থ হবে, এ সত্য তার জানা। নবম শ্রেণী থেকে উত্তীর্ণ হয়েই সে বোন দুলাভাইয়ের কাছে চলে আসে। প্রতিদিন সুযোগ না পেলেও প্রায়ই সুমনাকে মাহিনকে পড়াতে দেখেছে দুলাভাই। লেখাপড়ার প্রতি সুমনার আগ্রহ দেখে দুলাভাই তাকে দশম শ্রেণীতে ভর্তি করিয়ে দেয়। ডিগ্রীটা পাস করলেই সুমনাকে চাকরি নিয়ে দেবে বলে আশ্বাস দেয়। সুমনাও তাতে সন্তুষ্ট, তার দুলাভাই যেন অভিভাবকের মতোই তাকে ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছে। কোন এক ছুটির দিন সুমনা দুপুরের কড়া রোদের উত্তাপটা সরে যেতেই রান্নাঘরে ঢুকে রাতের রান্নার জন্য কাটা-কুটি করছিল। এমন সময় তার দুলাভাই এসে পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে। সুমনা বড় ভাইয়ের মতো যাকে ভয় আর শ্রদ্ধা করে, তাকে এতটা সহজে তার কাছে আসাটা প্রত্যাশা করেনি। ইতোমধ্যে তার দুলাভাই তাকে প্রশ্ন করে বলে, কিরে তোর আপা ঘুমিয়ে, মাহিনও ঘুমায় অথচ তুই এত কাজ করছিস যে? তুই একটু বিশ্রাম নিতে পারিস না। দুলাভাই কখনও সুমনাকে এমনটা বলেনি। হঠাৎ আজ তাকে অন্যরকম মনে হলো সুমনার নিকট। অবাক হলেও সুমনার মনে হলো এতদিন হয়ত সেভাবে খেয়াল করেনি। ছেলে মানুষ বাইরে থাকে সারাক্ষণ। আজ ছুটির দিন বলেই হয়ত চোখে পড়ে গেল হঠাৎ তাই। দুলাভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে গেল তার। সুমনা বোনের ছেলেকে কোলে তুলেই নিজের আবেগকে ভরিয়ে তোলে। কখনও নিজের চাওয়াকে প্রশ্রয় দেয় না মনে। চিন্তা-চেতনায় তাই নিজের প্রত্যাশাগুলো সুপ্তই রয়ে যায় তার ভেতরে। দিনভর কাজ করেও সে সুযোগ পেলেই নামাজটা পড়ে নেয়। সারাদিন পরিশ্রমের পরও সুমনার রোজ যথারীতি ভোরবেলাতেই ঘুম ভাঙ্গে। এরপর ফজরের নামাজ পড়েই সংসারের কাজে লেগে যায়। বোনের সংসারে ভালই প্রক্সি দিচ্ছিল সে। তাতে সুমনার মনে এতটুকুও দুঃখ ছিল না।

এভাবেই তার দিনগুলো কেটে যেতে পারত, কিন্তু সুমনার ব্যক্তিত্ব আর চরিত্রগুণে সৃষ্ট সুখ আর প্রতিদিনের লালন করা স্বপ্ন খুব বেশি দিন স্থায়ী হলো না। সুমনা বেশ ক’দিন হলো লক্ষ্য করছে আপা ঘুমিয়ে পড়লেই দুলাভাই কেন জানি তার সঙ্গে কথা বলতে আসে। লেখাপড়ার বিষয়ে বেশ উপদেশ দেয়। আবার চলে যায়। সুমনার রুমটা তার আপার রুমের সামনে যে বড় বারান্দা তারই এক পাশে। এ রুমের ভেতরে শারমিন আপার রুম থেকে কিছু দেখা যায় না। হয়ত এ কারণেই সুমনার কাছে এসে দুলাভাই কিছুক্ষণ বসলে অস্বস্তি লাগতে শুরু করে তার। সেদিনও দুলাভাই তার রুমে এলো। সুমনা ভেবে রেখেছে মাহিনের দোহাই দিয়ে দুলাভাইকে তাড়াবে। সুমনা তাই বলল। আলো জ্বালিয়ে রাখলে মাহিনের ঘুম ভেঙ্গে যাবে, আর তখনি মাহিন কেঁদে উঠবে। কিন্তু সে কথা তানভীর রহমান কানেও তুলল না। সারাদিনের ক্লান্তিতে সুমনার দুচোখজুড়ে রাজ্যের ঘুম জড়িয়ে এলো। সে বুঝতে পারল না দুলাভাই তাকে ঠিক কি বোঝাতে চাইছে। তবে দুলাভাইয়ের উদ্দেশ্য তার কাছে ভাল লাগছে না। সুমনা খেয়াল করল আজও তার বোন ঘুমিয়ে। অজানা এক আশঙ্কায় তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে এক প্রকার জোর করেই দুলাভাইকে দরজার বাইরে ঠেলে দিয়ে দরজার ছিটকিনি আটকে দিল। পরদিন সুমনা তার আপার কাছে বাড়ি যাওয়ার কথা তুলল। কিন্তু আপা কিছুতেই সম্মত হলো না। বাড়ি যেতে ব্যর্থ হয়ে সুমনা যেন বিপদের আশঙ্কায় অস্থির হয়ে উঠল। তার ইচ্ছার মূল্য না পেয়ে সুমনা যেন ফুঁসতে শুরু করল। তার অবস্থা দেখে শারমিন বার বার জানতে চাইল কেন সে এমন করছে? কিন্তু বড় বোনকে বলার সাহস হলো না তার। যদি দুলাভাইকে বলে বসে। হঠাৎ দুলাভাইয়ের উদ্দেশ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় বোনকে যদি মেরে ফেলে! এই ভয়ে সুমনা কিছুই বলতে পারল না। মনে মনে ফন্দি আটল এই সুন্দর চেহারার ভেতর বাস করা কুপ্রবৃত্তির মানুষটিকে সে শাস্তি দেবে। সে প্রতিদিন শোবার আগে রান্নাঘর থেকে বটি নিয়ে বারান্দা দিয়ে দুলাভাইকে দেখিয়ে নিজের ঘরে রেখে দিত। এর পর ঠিকঠাক করে দরজা বন্ধ করে নিশ্চিতে ঘুমিয়ে পড়ত। এভাবেই কাটছিল দিন। কয়েকদিন যেতে না যেতেই সুমনা আপা ও দুলাভাইয়ের মধ্যে ঝগড়া শুনতে পেল। রাতে খেতে বসে মনে হলো তাদের ঝগড়া মিটে গিয়ে বেশ ভাব-ভালবাসা জন্মেছে। সুমনা রাতের খাওয়া শেষ করে নিজের রুমে ফিরে শুয়ে পড়ল। রুমে ঢোকার সময় ওদের রুমের দিকে চোখ পড়তেই সে দুলাভাইয়ের হাতে একটি দুধের গ্লাস নিয়ে বোনকে সাধতে দেখল। আজ সারা দিনের পুরো ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত লাগল তার। এমন সময় দরজায় শব্দ হলো। দুলাভাইয়ের গলা শুনতে পেল সে। তার মনে হলো যেন দরজাটা ভেঙ্গে ফেলবে। এবার শব্দটা আসছিল জানালা থেকে, সুমনা বটিটা হাতে নিয়ে প্রস্তুত হলো। সত্যিই তাই-ই ঘটল। দুলাভাই জানালা ভেঙ্গে তার রুমে ঢুকল। কিন্তু সুমনার আর অস্ত্র হাতে শত্রু বধ করা হলো না। তার হাত থেকে বটিটা দুলাভাই অত্যন্ত কৌশলে কেড়ে নিল। সুমনা ভয়ে চিৎকার করে তার বোনকে ডাকল। কিন্তু হায়, তার অর্তনাদ চার দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ হয়ে রইল। পৌঁছাতে পারল না কোন সহৃদয় ব্যক্তির কানে। সুমনার কেবলি মনে হচ্ছিল, যে গৃহ মানুষের আশ্রয় সে গৃহই আজ তাকে পঙ্গু করে দিল।

অভিভাবকের মতো যে ব্যক্তিটা এতদিন তাকে ছায়া দিয়ে, সমস্ত উত্তাপ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, যেখানে তার জীবনটা নিশ্চিন্ত ও গতিময়তার সঙ্গে প্রবাহমান ছিল, আজ তারই বিকৃত ভারসাম্যহীন অভিলাষের স্বেচ্ছচারিতায় তা স্তিমিত হয়ে গেল। সুমনা তার বোনের ঘরে যে অপরিচিত ওষুধের প্যাকেট পেয়েছিল তা একটি ফার্মিসিতে দেখিয়ে জানতে পারে সেটি ছিল ঘুমের ওষুধ । সুমনা বুঝল এই ওষুধগুলোই তার বড় বোনকে প্রতিদিন খাওয়ানো হতো। ভাগ্য তাকে এ কোন কঠিন দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিল! সে তো কোন অপরাধ করেনি। তবে কেন এই যন্ত্রণাটুকু তাকে বয়ে বেড়াতে হবে সারাটা জীবন ধরে। সুমনা কি পারবে বাহুবলের অভাবে আর কারও কুপ্রবৃত্তির কাছে নিরস্ত্র হয়ে লাঞ্ছিত হওয়ার অপমানটাকে মুছে ফেলতে? এ সমাজ কাকে ধিক্কার দেবে? সুমনাকে নাকি কৃপ্রবৃত্তি পোষণকারী, লম্পট, ইতর পুরুষটিকে? যে কিনা কর্তা হয়ে এই সমাজ, সংসারকে শাসন করে। আজ তার শাসনের ভার কে নেবে!