১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমসাময়িকদের চোখে নজরুল

সমসাময়িক বিখ্যাতজনেরা বিভিন্নভাবে দেখেছেন কাজী নজরুল ইসলামকে। তাদেরই কয়েকজনের মন্তব্য তুলে ধরা হলো

কাজীদা

শচীন দেববর্মণ

কাজীদা, শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত কাজী নজরুল ইসলাম যে কত বড় গুণী, জ্ঞানী, কত বড় স্রষ্টা, কবি ও শিল্পী, তাঁর ব্যক্তিত্ব যে কত মহান, তাঁর বৈশিষ্ট্য যে কতখানি এবং তাঁর স্থান যে কত উঁচুতে তা দেশে বিদেশে কারো অজানা নেই।

তবে পুরনো দিনে কাজীদার সঙ্গলাভ করার যথেষ্ট সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাঁর ওই সদাহাস্যময় মুখ, দিলখোলা হাসি, মধুর ব্যবহার, সরলতা ও আপন-হারা ভাব কোনোদিনই ভুলতে পারবো না। ছোটখাটো হাসির কথা নিয়ে তিনি হাসির রোল তুললেন-সেইসঙ্গে তাঁর ভেতরের গভীর ভাবও প্রকাশ পেত।

একদিন রাত্রে তিনি আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। কী যেন একটা প্রসঙ্গে আমাদের বেশ গল্প জমে গেল। হঠাৎ দেখি কাজীদার মনটি আর যেন এ-জগতে নেই- আপন আনন্দে আপনি বিভোর হয়ে গেছেন।

তারপর দেখি কি, ঘরের এক দেয়ালে একটু অন্ধকারে একটা জোনাকি পোকা জ্বলছে- নিভছে, আমরা কেউ সেদিকে খেয়ালই করিনি। কিন্তু কাজীদার দৃষ্টি সেদিকে চলে গেছে আর তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাই দেখে প্রাণভরে উপভোগ করছেন ও ‘আহা-আহা’ বলছেন।

অনেকক্ষণ এভাবে কাটালো।

আমিও মুগ্ধ হয়ে কাজীদার ওই আনন্দ আস্বাদন করতে লাগলাম।

সেদিন কিন্তু আগের প্রসঙ্গে আর ফিরে যাওয়া হ’লো না।

এ রকম অনেকবার তাঁর সান্নিধ্যে যা-যা ছোটখাটো ঘটনা হয়েছে তার মাধ্যমে কাজীদাকে আরো বেশি করে পেয়েছি ও জেনেছি। তাঁর যে ক’খানা গান আমি রেকর্ড করেছি- তার প্রতিটিতেই কাজীদার স্নেহের স্পর্শে আমার গান সকলের প্রিয় হয়ে উঠেছে।

তাঁর গান গেয়ে যে আনন্দ ও তৃপ্তি পেয়েছি তা আমার মনে সর্বদাই গেঁথে আছে ও থাকবে।

তাঁর গান গেয়ে আমি ধন্য হয়েছি।

আমার জীবনে নজরুল

বেগম সুফিয়া কামাল

আমার জীবনে ‘অগ্নিবীণা’র বিদ্রোহী কবি নজরুল এসেছিলেন অনাবিল আনন্দ- আলোকের মতো, তাঁর মমতামধুর স্নেহোজ্জ্বল দৃষ্টি আমার দিকে পড়েছিল বলে আমি সকলের কাছে পরিচিতা হতে পেরেছি; নয়তো সেই পর্দানশীন খান্দানী ঘরের অন্তরাল হতে বাইরে আসার পথ আমি বুঝি পেতাম না।

ঢাকা থেকে তখন ‘অভিযান’ নামে একটি পত্রিকা বের হতো। আমার ছোটমামা নওয়াবজাদা সৈয়দ ফজলের রবি সাহেব তখন ঢাকায় পড়তেন। তিনি জানতেন আমার বাল্যের লেখা-খেলার কথা। ছুটিতে বাড়ি গিয়ে আমার লেখা থেকে তিনি দু’তিনটি কবিতা নিয়ে আসেন। সে কবিতাগুলো ‘অভিযানে’ প্রকাশিত হয়। তখন নজরুল ঢাকায় মুকুটহীন সম্রাট, ছাত্রমহলে তিনি প্রিয় হতে প্রিয়তমা। আমার লেখা তাঁর চোখে পড়ে। হঠাৎ বরিশালে বসে আমার অচেনা হাতের লেখা একখানা চিঠি পাই। লেখকের নাম দেখে আমার দাদু-ভাই। দাদুকে লিখে দিলাম কলকাতা যাচ্ছি। তিনি লিখলেন, এবার নিশ্চয় দেখা হবে। হয়েও ছিল। মাসিক পত্রিকায় তখন প্রথম প্রথম আমার লেখা বের হতে শুরু করেছে। দাদু এসেছেন এক পত্রিকা অফিসে, শুনে লোক পাঠালাম; আমার চিঠি পেয়ে তিনি চলে এলেন। আমরা তখন সারেং লেনে থাকি। তখনও পর্দার বাঁধন যায়নি, একটু শিথিল হয়েছে মাত্র। আমি গিয়ে তাঁর কদমবুসি করলাম। কী আনন্দে যে তিনি আমাকে দেখে চিৎকার করে উঠলেন; বললেন, ‘তোমাকে আগে দেখিনি-তুমি এতটুকু! তোমাকে আমি লুফব।’ ঘরসুদ্ধ সবাই হেসে উঠলেন। দাদু অনর্গল আমাকে বলে চলেছেন, ‘এতটুকু কেন, বেগম সাহেবা। -আরে মিসেস-টিসেস হয়েছ, একটু ওজনে তো ভারি হবে, আগে জানলে একটা দোলনা আনতাম!’ আমি প্রথম এই এক্কেবারে বাইরের লোকের সামনে এসেছি যদিও, তবুও তাঁকে পর বলে মনে হ’লো না, কোনো কুণ্ঠা বা লজ্জাবোধ করতে পারলাম না। তিনি কাছে বসিয়ে মাথায় হাত দিয়ে আদর ও দোয়া করলেন। আমি ধন্য হলাম।

এরপর তিনি প্রায়ই আসতে লাগলেন। একদিন- তখন শীতের দিন, আমি ও আমার বড় ভাই সন্ধ্যায় বসে দাবা খেলছি। দড়াম করে দরজা খুলে একটা কম্বল গায়ে দাদু এসে পড়লেন। দেখলেন, আমরা উঠে দাঁড়িয়েছি। ভাইয়াকে বললেন, ‘দাবা খেলছিলে সুফিয়ার সঙ্গে? ও জানে দাবা খেলা?’ ভাইয়া ও আমি বললুম, ‘এই একটু একটু।’ দাদু যেন একটু অবাক হয়েই বললেন, ‘মেয়েরা দাবা খেলা?’ আমি তো দেখিনি। আমি খেলবো তোমার সাথে নিয়ে- নিয়ে এসো পান।’ দাদু দাবা খেলবেন আমার সঙ্গে-শুনেই তো আমার বুক শুকিয়ে গেছিল- পান আনতে গিয়ে পালিয়ে বাঁচলাম। পান দিয়ে চায়ের যোগাড় করে এসে দেখি, দাদু ও ভাইয়া দাবা পাতছেন। ভাইয়া খুব ভালো খেলতে পারেন। দাদু বললেন, ‘তুমি ভাবছো তোমাকে ছেড়ে দেবো? এক বাজি খেলে নেই, ততক্ষণ তোমরা নামাজ সেরে এসো, খেলতেই হবে।’ কিন্তু মাগরিব গেল, এশা গেল; পেয়ালার পর পেয়ালা চা, বাটার পর বাটা পান যুগিয়ে চললাম। বাজি আর শেষ হয় না।

রাত ১২টা বেজে গেল, অত রাত্রে কে ভাত খায়! রুটি; গরম পরোটা তৈরি করে ভাইয়া ও দাদুকে মুখে তুলে খাইয়ে দিলাম। কিন্তু তাঁরা পরোটা-গোশত খেলেন না, কাগজ খেলেন, বোঝা গেল না। সারা রাত কেটে গেল। পরদিন সকাল ৭টার সময় দেখি দাবার ছক উল্টে দিচ্ছেন আর হো-হো করে হেসে ভাইয়ার হাত ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে দাদু বলছেন, ‘না খেলে সুখ পাওয়া গেলে, জিততেও পারলাম না, হারলামও না, ড্র হয়ে গেল- সত্যি খেলতে জানো, আমাকে আর এতক্ষণ কেউ বসাতে পারেনি এক কাজী মোতাহার হোসেন ছাড়া- বসে আমার কৃশাঙ্গ ভাইয়ার হাতে ‘যে ঝাঁকি দিলেন সেই আনন্দিত ঝাঁকুনির ব্যথা বেশ কয়েকদিন ছিল।

দুপুর বেলায় খেতে খেতে দাদু বললেন, ‘সুফু, তোমার রান্নার তারিফ করবো, না কবিতার তারিফ করবো?’

আমি বললাম, ‘দুটোরই।’

দাদু বললেন, ‘তা না করলে তো মিথ্যে বলে কাজীর বিচারে দুর্নাম হবে।’ বলেই বললেন, ‘রাত্রে তুমি তোমার মনে আছে?’

বললেন, ‘মনে পড়েছে। তোমার মতো বোন যার নেই, সে সত্যিই দুর্ভাগা।’ আমাদের কাছে রোজ আসাটা পুলিশের চোখে পড়ে। তাঁরা দাদুর পিছু নিলেন। একদিন দাদু বসে আছেন- এক ভদ্রলোক এসে বসলেন। আমাদের কাছে আছেন কবি, তাঁকে দেখতে পাড়ার অনেক লোকই আসতো। দাদু তাঁকে দেখে বলে উঠলেন, ‘তুমি টিকটিকি জানি ঠিকঠিকই’-আরও একটা লাইন কী বলেছিলেন তা আমার মনে নেই। লোকটি মুখ লাল করে উঠে চলে যেতেই আমি এসে বললাম, ‘কী করে তুমি চিনলে দাদু?’

দাদু বললেন, ‘গায়ের গন্ধে। বড় কুটুম্ব যে। তাঁর এমনি হাজারো পরিহাসের খুঁটিনাটি আজও মনে পড়ে। হাসিতে খুশিতে আনন্দে উজ্জ্বল জীবন আজ কী হয়ে আছে, ভাবলে মন ব্যথায় ভরে ওঠে।

কাজীদার স্মৃতিকথা

সরযূবালা দেবী

কাজী নজরুলের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় তাঁর কবিতা, গান, বিশেষ করে দেশাত্মবোধক গানের মাধ্যমে। তখন কবির ‘ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’ গানটি আমাদের বয়সী ছেলে-মেয়েদের মুখে মুখে। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তো দেশপ্রেমের উন্মাদনায় ছোটবড় সকলকেই পাগল করে দিয়েছিল। এছাড়া তাঁর ‘এতো জল ও কাজল চোখে,’ ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়,’ ‘রুমঝুম ঝুমঝুম’ এই সব গান নিজের মনে মনে গুনগুন করে গায়নি এমনি কউ সে যুগে ছিল না বললেই হয়।

নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘রক্তকমল’ নাটকটি মঞ্চস্থ হবার সময় কবি নজরুল ইসলামের কাছাকাছি আসার সুযোগ ঘটলো আমার। স্বরচিত কবিতা পড়ে যাঁকে খুব গম্ভীর ভারিক্কী বিরাট মানুষ বলে মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম, কাছে এসে মুগ্ধ হয়ে গেলাম তাঁর সহজ সরল অন্তরঙ্গ ব্যবহারে। দেখা হওয়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কখন যে ওই দেশজোড়া বিখ্যাত মানুষটি আমার ‘কাজীদা’ হয়ে উঠলেন, তা জানতেই পারলাম না।

কাজীদার কথা মনে হলেই আজও কানে ভাসে তাঁর প্রাণখোলা উদাস হাসি-যে হাসিতে এক মুহূর্তেই অপরিচিত জনকে নিজের নাম ও খ্যাতির বড় ভেঙ্গে একেবারে যেন হৃদয়ের অন্তঃপুরে স্থান করে দিতেন। কাজীদা ছিলেন যেমন আনন্দময়, তেমনি স্নেহপ্রবণ। যেখানে যেখানে থাকতেন হাসিতে আনন্দে একেবারে আসর সরগরম করে রাখতেন।

প্রবোধ গৃহ ও অনাদি বসুর মনোমোহন থিয়েটারে তখন ‘রক্তকমল’ মঞ্চস্থ হবার কথা হ’লো এই নাটকের জন্য কাজী নজরুলের কাছে আমার গান শিখতে হবে শুনে আমি তো ভয়ে লজ্জায় প্রায় কেঁদে ফেলি আর কি! ভাবলাম, আমি গানের কি জানি যে, এতবড় একজন মানুষের কাছে গান শিখতে যাবো। সে-কথা থিয়েটারের কর্তৃপক্ষকেও জানালাম। ওঁরা আমাকে অভয় দিয়ে বললেন, ‘কিছু ভয় নেই তুমি কবির কাছে গিয়েই দেখ না-’

বাল্যস্মৃতির এক পাতা

কাজী সব্যসাচী

আজও স্পষ্ট মনে আছে, যেদিন গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে ‘বিদ্যাপতি’র নতুন রেকর্ডগুলো বাবা বাড়িতে নিয়ে এলেন, সেদিন সমস্ত পালাটা শুনেছিলাম। আমি আর নিনি (ছোট ভাই কাজী অনিরুদ্ধ) স্কুলের ছুটির পর খেলতে যাইনি, আর কেন জানি না, গান শুনে, খালি কেঁদেছিলাম।

আজ বাবার লেখা সেই ‘বিদ্যাপতি’ পালা আমাদের কাছে নেই। থাকলে, আজও বার বার শুনতাম আর কাঁদতাম। কী অপূর্ব গান, কী অপূর্ব দরদী অভিনয়! অদ্ভুত সঙ্গীত-পরিচালনা! দারুণ ভালো হয়েছিল সাউন্ড এফেক্ট।

ভুলব নাÑ কিছুতেই ভুলব না।

‘বিদ্যাপতি’ পালাতে বিদ্যাপতি হয়েছিলেন ধীরেন দাস, গানে ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র দে। রানী লছমীÑ প্রভা দেবী, গানেÑহরিমতী দেবী। রাজা শিব সিংহÑরবি রায়, ধনঞ্জয়Ñরঞ্জিত রায় এবং ‘অনুরাধা’ হয়েছিলেন সরযূবালা দেবী, তাঁর কণ্ঠের গানগুলোও গেয়েছিলেন হরিমতী দেবী। বিজয়া কে হয়েছিলেন তা এখন আর মনে করতে পারছি না।

একমাত্র সরযূবালা দেবী ছাড়া এঁদের কেউই আজ আর নেইÑ কিন্তু যতদিন আমি বেঁচে থাকব, সেই গান, সেই অভিনয় আমার হৃদয়ে বারবার ঝঙ্কৃত হতে থাকবে। যাঁরা নেই তাঁরা আমার কাছে আবার ফিরে আসবেন।

আমার ঠাকুরদা

কাজী অনির্বাণ

তখন আমার সবে জ্ঞান হয়েছে, থাকি পাকপাড়ার বাড়িতে। দেখতাম একজন মানুষকে চুপচাপ খাটে বসে থাকতে, আবার কখনও বা সারা বাড়িতে ঘুরে বেড়াতে। কোনো সময় দেখতাম এক টুকরো কাগজ নিয়ে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সেটিকে ছিঁড়ে ফেলতে। আবার এই তাঁকেই দেখতাম কোনো সময়ে জানলার গরাদ ধরে দূর নীলিমার দিকে তাকিয়ে থাকতে। তখনও তাঁকে ভাল করে জানবার বা বোঝবার মতো বুদ্ধি আমার হয়নি। আমি জানতাম এই আমার দাদু কাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু তখনও বুঝতে পারতাম না দলে দলে লোকেরা কেন এসে আমার দাদুকে ফুলের মালা পরিয়ে দিতেন বা রজনীগন্ধার গুচ্ছ তাঁর হাতে তুলে দিয়ে তাঁর পায়ের ধুলো নিয়ে ধন্য হতেন। তারপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করলাম যে বিরাট এক প্রতিভার ছত্রছায়ায় আমার জন্ম হয়েছে।

ক্রমশ দাদুর লেখা কবিতাগুলো পড়তে শুরু করলাম। কী যে ভালো লাগত আবৃত্তি করতেÑ ‘ঘুম জাগানো পাখী’, ‘দেখবো এবার জগৎটাকে’, ‘লিচুচোর’ প্রভৃতি কবিতা। আরও যখন বড় হলাম, পড়লাম দাদুর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা, পড়লাম ‘ধামার কৈফিয়ৎ’, ‘সাম্যবাদী’ প্রভৃতি কবিতা। কবিতাগুলো পড়ার সময় ভেতরে এক অদ্ভুত উত্তেজনা বোধ করতাম। এইভাবে দাদুর কবিতার ভেতর দিয়েই দাদুর সঙ্গে আমার উত্তেজনা বোধ করতাম। এইভাবে দাদুর কবিতার ভেতর দিয়েই দাদুর সঙ্গে আমার রক্তের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও আমি তাঁর আশীর্বাদ, ভালোবাসার উত্তাপ উপলব্ধি করতে পারলাম না। এখন বেশ বড় হয়েছি, দাদুকে কাছে রাখার তাগিদ প্রায়ই অনুভব করতাম, কিন্তু দাদু যে এইভাবে হঠাৎ আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন এবং তাঁকে যে শেষবারের মতো চোখের দেখাও দেখতে পাব নাÑ এ ছিল আমার ধারণার অতীত। তিনি যে লোকেই থাকুন, আমাদের যেন আশীর্বাদ করেন। আমরা যেন তাঁর বংশধর হিসেবে বংশের মর্যাদা রক্ষা করতে পারি। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, তাঁর আত্ম শান্তি লাভ করুক!

নজরুলের অনুবাদচর্চা

সৈয়দ মুজতবা আলী

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, রাজমহল, শ্রীরামপুর, হুগলী এবং পরবর্তী যুগে কলতাতায় অনেকখানি আরবি-ফার্সি চর্চা বটে, কিন্তু গ্রামাঞ্চলে এ চর্চা খুব ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। তার প্রধান কারণ অতি সরল- ইসলাম পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চল পূর্ব বাংলার মতো ছড়িয়ে পড়েনি, কাজেই অতি সহজেই অনুমান করা যায় চুরুলিয়া অঞ্চলে পীর দরবেশের কিঞ্চিৎ সমাগম হয়ে থাকলেও মৌলবী-মৌলানারা সেখানে আরবি-ফার্সির বড় কেন্দ্র স্থাপন করতে পারেননি।

তদুপরি নজরুল ইসলাম স্কুলে খুব বেশি আরবি-ফার্সি চর্চা করেছিলেন তা মনে হয় না। স্কুলে তিনি আদৌ (আরবি সম্ভাবনা নগণ্য) অধ্যয়ন করেছিলেন কি-না তা সম্বন্ধেও আমরা বিশেষ জানি না।

তারও পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয়ার ফলে তিনি যেসব ভাষায় খুব বেশি এগিয়ে গিয়েছিলেন তাও তো মনে হয় না। তবু নজরুল মুসলিম ভদ্রঘরের সন্তান। ছেলেবেলায় নিশ্চয়ই কিঞ্চিৎ আলিফ বে তে করেছেন। দোয়া-দরুদ (মন্ত্র-তন্ত্র) মুখস্থ করেছেন, কুরআন পড়াটা রপ্ত করেছেন। পরবর্তী যুগ তিনি কুরআনের শেষ অনুচ্ছেদে ‘আমপারা’ বাংলা ছন্দে অনুবাদ করেনÑ হালে সেটি প্রকাশিত হয়েছে। সে পুস্তিকাতে তাঁর গভীর আরবি-জ্ঞান ধরা পড়ে তাঁর কবিনোচিত অন্তর্দৃষ্টি এবং ‘আমপারা’র সঙ্গে তাঁর আবাল্য পরিচয়ে। বিশেষ করে ধরা পড়ে দরদ দিয়ে সৃষ্টিকর্তার বাণী (আল্লাহর ‘কালাম’) হৃদয়ঙ্গম করার তীক্ষè এবং সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা।

এরই উপর আমি বিশেষ করে জোর দিতে চাই। ফার্সি তিনি বহু মোল্লা মৌলবীর চেয়ে কম জানতেন কিন্ত ফার্সি কাব্যের রসাস্বাদন তিনি করেছেন তাঁদের চেয়ে অনেকে বেশি।

কাজী রোমান্টিক কবি। বাংলা দেশের জল-বাতাস, বাঁশ-ঘাস যে রকম তাঁকে বাস্তব থেকে বহুলোকে নিয়ে যেতো, ঠিক তেমনি ইরান-তুরানের স্বপ্নভূমিকে তিনি বাস্তবে রূপান্তরিত করতে চেয়েছিলেন বাংলা কাব্য। ইরানে তিনি কখনো যাননি, সুযোগ পেলেই যে যেতেন সে-কথাও নিঃসংশয়ে বলা যায় না, কিন্তু ইরানের গুল বুলবুল, শিরাজী-সাকী, তাঁর চতুর্দিকে ক্রমশই এমন এক জানা-অজানার ভুবন সৃষ্টি করে রেখেছিল যে গাইড-বুক টাইম টেবিল ছাড়াও তিনি তার সর্বত্র অনায়াসে বিচরণ করতে পারতেন।

আরব ভূমির সঙ্গে কাজী সাহেবের যেটুকু পরিচয়, সেটুকু প্রধানত ইরানের মারফতেই। কুরআন শরীফের হারানো ‘ইউসুফের’ যে করুণ কাহিনী বহু মুসলিম-অমুসলিমের চোখের জল টেনে এনেছে তিনি কবিরূপে তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন ফার্সি কাব্যের মারফতে।

দুঃখ ক’রো না, হারানো ইউসুফ

কাননে আবার আসিবে ফিরে।

দলিত শুষ্ক এমর পুণঃ

হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে।

ইউসুফে গুম্গুশ্তে ব’জ আয়দ রকিনান্

গম্-ম্-খুর!

কুলবয়ে ইহাজন্ শওদ্ রুজি গুলিস্তান্

গম্-ম্-খুর।

কাজী সাহেবের প্রথম যৌবনের রচনা এই ফার্সি কবিতাটির বাংলা অনুবাদ অনেকেরই মনে থাকতে পারে। ‘মেবার পাহাড় মেবার পাহাড়, এর অনুকরণের ‘শাতিল আরব, শাতিল আরব’ ওই যুগেরই অনুবাদ।

কোনো কোনো মুসলমান তখন মনে মনে উল্লসিত হয়েছেন এই ভেবে যে কাজী ‘বিদ্রোহী’ লিখুন আর যাই-ই করুন, ভিতরে ভিতরে তিনি খাঁটি মুসলমান। কোনো কোনো হিন্দুর মনেও ভয় হয়েছিল (যাঁরা তাঁকে অন্তরঙ্গভাবে চিনতেন তাঁদের কথা হচ্ছে না) যে, কাজীর হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি বোধ হয় বাংলার জন্য নয়-তাঁর দরদ বুঝি ইরান-তুরানের জন্য।

পরবর্তী যুগে কেন, ওই সময়েই, কবিকে যাঁরা ভালো করে চিনতেন, তাঁরাই জানতেন, ইরানী সাকীর গলায় কবি যে বার বার শিউলির মালা পরিয়ে দিচ্ছেন তার কারণ সে সুন্দরী ইরানের বিদ্রোহী কবিদের নর্ম-সহচরী ব’লে ইরানের বিদ্রোহী আত্মা কাব্যরূপে, মধুরূপে তার চরম প্রকাশ পেয়েছে সাকীর কল্পনায়। (শেষ)