১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লেখক হিসেবে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে চেয়েছি

  • অনুবাদ : নাজিব ওয়াদুদ;###;-নাগিব মাহফুজ

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পীদের একজন নাগিব মাহফুজ। তাঁর জন্ম ১১ ডিসেম্বর ১৯১১, মিসরের কায়রো মহানগরীর প্রাচীন এলাকা গামালিয়ায়। ১৯৭১ সালে অবসর নেয়ার আগপর্যন্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ সরকারী পদ অলঙ্কৃত করেন। লেখালেখির শুরু কৈশোরে। প্রথম বই খুফুজ উইজ্ডম, একটি উপন্যাস, বের হয় ১৯৩৯ সালে। তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা ৩৪ এবং ছোটগল্পের বই ১৫টি। এছাড়া রয়েছে একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ, আর অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ। তিনি ২৫টি চিত্রনাট্যও লিখেছেন। তাঁর উপন্যাস এবং গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে ৩০টিরও অধিক। ১৯৭১ সাল থেকে মৃত্যুর কিছুদিন আগপর্যন্ত নিয়মিত সাপ্তাহিক কলাম লিখেছেন যা একইসঙ্গে আরবিতে আল-আহরাম এবং ইংরেজীতে আল-আহরাম উইকলিতে প্রকাশিত হয়েছে। এসব কলাম নিয়ে একটি বই বের হয় ২০০১ সালে। সাহিত্যকৃতির জন্য তাঁকে দু-দুবার ইজিপ্সিয়ান স্টেট প্রাইজ দেয়া হয়। ১৯৮৮ সালে তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট তিনি কায়রোতে মৃত্যুবরণ করেন।

এই মহান কথাশিল্পীর প্রতি সম্মান জানাতে তাঁর একটি সাক্ষাতকারের নির্বাচিত অংশ এখানে উপস্থাপন করা হলো। ১৯৯২ সালে দ্য প্যারিস রিভিউতে এই সাক্ষাতকারটি প্রকাশিত হয়। Ñঅনুবাদক

প্রশ্ন : আপনার লেখালেখির শুরু কখন?

মাহফুজ : ১৯২৯ সালে। আমার সবগুলো গল্প প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। মাজাল্লার সম্পাদক সালামা মুসা বলতেন : তোমার মধ্যে প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু এখনও মানোত্তীর্ণ হতে পারনি। ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরের কথা আমার মনে পড়ে, কারণ সেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু, হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করলেন। আমার গল্প ‘আবাছ আল-আকদার’ ছাপা হলো, সেটা মাজাল্লা প্রকাশকদের পক্ষ থেকে এক ধরনের অপ্রত্যাশিত উপহার। সেটা আমার জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

প্রশ্ন : রাজনৈতিক পরিবেশ আপনার জীবনে কী ভূমিকা রেখেছিল?

মাহফুজ : ১৯১৯ সালের বিপ্লব যখন ঘটে তখন আমার বয়স সাত। এর দ্বারা আমি খুব প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। আমি এখনও মনে করি যে আমি আমার জীবনে যা কিছু করেছি তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে এই রাজনীতি-সংশ্লিষ্টতা। তবে আমি কখনও রাজনীতির সক্রিয়কর্মী ছিলাম না, বা কোন রাজনৈতিক দলের বা আনুষ্ঠানিক কমিটির সদস্য ছিলাম না। আমি কখনও দলীয় সদস্য হিসেবে পরিচিত হতে চাইনি। একজন লেখক হিসেবে আমি পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে চেয়েছি যা কখনও কোন দলীয় সদস্যের থাকতে পারে না।

প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন একজন লেখকের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা উচিত?

মাহফুজ : আমি সত্যিকারভাবে যা ভাবি তা হলো : প্রত্যেক সমাজের নিজস্ব ঐতিহ্য, আইন, এবং ধর্মীয় বিশ্বাস আছে, যেগুলোকে তারা সংরক্ষণ করার চেষ্টা করে। আমি বিশ্বাস করি যে সমাজের অধিকার রয়েছে তার নিজস্বতাকে রক্ষা করার, ঠিক যেমন একজন ব্যক্তির অধিকার রয়েছে যা সে পছন্দ করে না তাকে আক্রমণ করার। একজন লেখক যদি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে তার সমাজের আইন বা বিশ্বাসগুলো আর উপযোগী নয়, বা বরং ক্ষতিকর, তাহলে তার বিরুদ্ধে কথা বলা তার দায়িত্ব। কিন্তু তাকে তার এই স্পষ্টবাদিতার জন্য মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে। যদি সে এই মূল্য প্রদানে প্রস্তুত না থাকে তাহলে তার জন্য চুপ থাকাই বাঞ্ছনীয়। নিজস্ব নীতি ও ধারণা প্রচারের কারণে জেলে যেতে হয়েছে বা পুড়ে মরতে হয়েছে এমন ব্যক্তির সংখ্যা ইতিহাসে প্রচুর। সমাজ সব সময় নিজেকে রক্ষা করেছে। আজকাল এটা করে পুলিশ এবং আদালতের সাহায্যে। আমি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে যেমন সমর্থন করি, তেমনই সমর্থন করি এর মোকাবেলায় সমাজের অধিকারকেও। মতভিন্নতার মূল্য আমাকে দিতেই হবে। এটা প্রাকৃতিক নিয়ম।

প্রশ্ন : আপনি কি নিয়মিত শিডিউল মেনে লেখেন?

মাহফুজ : আমি সব সময় বাধ্য হই সেটা করতে। আটটা থেকে দু’টো পর্যন্ত আমি কাজে থাকি। চারটা থেকে সাতটা পর্যন্ত লিখি। তারপর সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত পড়ি। শুক্রবার ব্যতীত এটা আমার নিয়মিত রুটিন। যা-ইচ্ছা-তাই করার সময় পাই না আমি।

প্রশ্ন : আপনি আপনার গল্পের চরিত্র এবং আইডিয়াগুলোকে কীভাবে নিয়ে আসেন?

মাহফুজ : আমাকে এইভাবে বলতে দাওÑ তুমি যখন তোমার বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাও তখন কী নিয়ে কথা বলো? সেইসব জিনিস সেই দিন, সেই সপ্তাহে, আপনার ওপর একটা দাগ ফেলে যায়... আমি গল্প লিখি এই একই পদ্ধতিতে। ঘটনা ঘটে বাড়িতে, স্কুলে, রাস্তায়, এগুলো হচ্ছে গল্পের ভিত্তি। কিছু কিছু অভিজ্ঞতা এমন গভীর দাগ কেটে যায় যে, সেগুলো নিয়ে ক্লাবে কথা বলার চেয়ে আমি উপন্যাসের মধ্যে নিয়ে কাজ করি। ধর, উদাহরণস্বরূপ, একজন অপরাধী সম্প্রতি তিনজন লোককে খুন করেছে। এই মূল গল্প থেকে শুরু করে এটাকে কীভাবে লিখব তার কয়েকটা উপায় নির্ধারণ করি। উদাহরণস্বরূপ, আমি পছন্দ করব গল্পটা কার পরিপ্রেক্ষিত থেকে লিখবÑ স্বামী, স্ত্রী, চাকর, নাকি খুনীর? পছন্দের এই হেরফেরের কারণে একেকটা গল্প আলাদা হয়ে যায়।

প্রশ্ন : যখন আপনি লিখতে শুরু করেন তখন শব্দগুলোকে কি আপনা আপনি চলে আসতে দেন, নাকি প্রথমে নোট তৈরি করেন? আপনি মনের মধ্যে নির্দিষ্ট থিম ঠিক করে নিয়ে লিখতে বসেন?

মাহফুজ : আমার ছোটগল্পগুলো আসে সরাসরি হৃদয় থেকে। অন্য রচনার ক্ষেত্রে আমি প্রথমে গবেষণা করি। দ্য কায়রো ট্রিলজি শুরু করার আগে, উদাহরণস্বরূপ, আমি বিস্তারিত গবেষণা করেছিলাম। প্রত্যেকটা চরিত্র সম্পর্কে আমি আলাদা ফাইল তৈরি করেছিলাম। সেটা যদি না করতাম তাহলে খেই হারিয়ে ফেলতাম, অনেক কিছু ভুলে যেতাম। কখনও কখনও থিম আসে আপনাপনি, গল্পের ঘটনাবলীর মধ্যে দিয়ে, আর কখনও কখনও শুরু করার আগে থেকেই মনের মধ্যে থিম ঠিক করা থাকে। আমার যদি আগে থেকেই জানা থাকে যে আমি এমন একজন মানুষের ছবি আঁকতে চাই যে সকল বিপদাপদ অতিক্রম করে বিজয়ী হতে চায়, তাহলে আমি সেই রকম ক্ষমতাসম্পন্ন নায়ক তৈরি করি। তবে আমি একটা চরিত্রের আচরণের দীর্ঘ বর্ণনা দানের মাধ্যমেও গল্প লিখি, সেক্ষেত্রে থিম আপনা আপনি বেরিয়ে আসে।

প্রশ্ন : একটা গল্পকে চূড়ান্ত করার আগে আপনি কী রকম সংশোধন ও পুনর্লিখন করেন?

মাহফুজ : আমি ঘন ঘন সংশোধন করি, অনেক কেটে ফেলি, গোটা পৃষ্ঠাজুড়ে লিখি, এমনকি পেছনেও। প্রায়ই আমার সংশোধনী হয় মোটা দাগের। সংশোধনীর পর আমি গল্পটা পুনরায় লিখি এবং তারপর প্রকাশকের কাছে পাঠাই। তখন আমি পুরনো সব কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলে দেই।

প্রশ্ন : ছোটগল্প এবং উপন্যাস কোনটাই আরবি-সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের অংশ নয়। তা সত্ত্বেও এ দুটি প্রকরণ নিয়ে আপনার যে সাফল্য তাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করেন?

মাহফুজ : আমরা আরব লেখকরা ছোটগল্প এবং উপন্যাসের ধারণা পশ্চিম থেকে ধার করেছি, কিন্তু এতদিনে সেটা আমাদের নিজেদের সাহিত্যে আত্মীকৃত হয়ে গেছে। চল্লিশ এবং পঞ্চাশের দশকে অনেক অনুবাদ হয়েছে; আমরা স্রেফ গল্প লেখার পদ্ধতি এবং স্টাইলটা গ্রহণ করেছি। কিন্তু ভুলবে না যে আমাদের উত্তরাধিকারের ভাঁড়ারে রয়েছে আইয়াম আল-আরাব, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ‘আন্তার’ এবং ‘কায়েস ও লাইলা’, আর অবশ্যই দ্য থাউজ্যান্ড এ্যান্ড ওয়ান নাইটস।

প্রশ্ন : আপনার নায়িকাদের অধিকাংশই কেন নীচু শ্রেণীর নারী? আপনি কি তাদের দিয়ে কোন বড় কিছুকে প্রতিবিম্বিত করতে চান? যেমন মিসর, উদাহরণ হিসেবে?

মাহফুজ : না। নীচু শ্রেণীর নারীদের সম্পর্কে লিখে আমি স্রেফ এটাই দেখাতে চাই যে, এসব উপন্যাস যে-কালের পটভূমিতে লেখা সে সময় নারীদের কোন অধিকার ছিল না। একজন মহিলা যদি ভাল স্বামী খুঁজতে না পারে বা খারাপ স্বামীকে ত্যাগ করতে না পারে, তাহলে তার কোন ভবিষ্যত থাকে না। কখনও কখনও তার একমাত্র গন্তব্য হচ্ছে, দুর্ভাগ্যক্রমে, অবৈধ পন্থা। এই নিকট অতীতেও, নারীরা অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল... এমনকি বিয়েতে পছন্দের স্বাধীনতা, তালাক, এবং শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও। এখন মেয়েরা শিক্ষা লাভ করছে, অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে, কারণ যে মেয়ে শিক্ষা লাভ করছে সে একটা হাতিয়ার লাভ করছে। কোন কোন সমালোচক মিদাক এ্যালির হামিদাকে মিসরের প্রতিরূপ বলে গণ্য করেছেন, কিন্তু আমার সে রকম কোন ইচ্ছা ছিল না।

প্রশ্ন : আপনার গল্পে, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন কোন মিসরীয় লেখকের গল্পেই নায়কের অস্তিত্ব দেখা যায় না। কেন?

মাহফুজ : এটা সত্যি যে আমার অধিকাংশ গল্পে নায়ক নেইÑ কেবল চরিত্র রয়েছে। কেন? কারণ আমি আমাদের সমাজকে সমালোচকের দৃষ্টিতে দেখি এবং যেসব লোককে দেখি তাদের মধ্যে অসাধারণ কিছু লক্ষ্য করি না। আমার আগের প্রজন্ম ১৯১৯ সালের অভ্যুত্থান দ্বারা প্রভাবিত ছিল, তারা নায়কোচিত আচরণ প্রত্যক্ষ করেছেÑ অস্বাভাবিক বাধা অতিক্রম করতে সক্ষমকর্মী, সেই রকম নায়ক। অন্য লেখকরাÑ তওফিক আল-হাকিম, মুহাম্মাদ হুসাইন হায়কল, ইব্রাহীম আবদ আল-ক্কাদির আল-মাজিনিÑ নায়কোচিত লেখা লিখেছেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে, আমাদের প্রজন্ম খুব উদাসীন এবং নায়ক একটা দুর্লভ জিনিস; একালে ফ্যান্টাসি না হলে কোন উপন্যাসে তুমি নায়ক সৃষ্টি করতে পার না।

প্রশ্ন : নায়ককে আপনি কীভাবে চিত্রায়িত করবেন?

মাহফুজ : প্রাচীন আরবি-সাহিত্যে অনেক নায়ক আছে, তারা সবাই অশ্বারোহী, উপাধিধারী সম্ভ্রান্ত যোদ্ধা। কিন্তু বর্তমানে, আমার দৃষ্টিতে, একজন নায়ক হবে সে, যে একটি বিশেষ নীতিমালার প্রতি অঙ্গীকারা বদ্ধ এবং বাধার মুখেও তার ওপর অটল রয়েছে। সে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে, সুবিধাবাদী নয়, এবং তার একটা শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি আছে।

প্রশ্ন : তাহলে আপনি নিজেকে কীভাবে চিত্রিত করবেন?

মাহফুজ : আমি এমন একজন মানুষ যে সাহিত্য ভালবাসে। যে কাজে বিশ্বাসী এবং কাজের ব্যাপারে আন্তরিক। এমন একজন মানুষ যে কাজকে অর্থ এবং খ্যাতির চেয়েও বেশি ভালবাসে। অবশ্য অর্থ এবং খ্যাতি যদি আসে, স্বাগত! কিন্তু সেটা কখনওই আমার লক্ষ্য হয়নি। কেন? কারণ আমি যে কোন কিছুর চাইতে লেখাকে বেশি ভালবাসি। এটা খারাপ শোনাতে পারে, কিন্তু আমি অনুভব করি যে, সাহিত্য ছাড়া আমার জীবনের কোন অর্থ থাকবে না। আমার ভাল বন্ধু, ভ্রমণ, বিলাসিতা, সবই থাকতে পারে, কিন্তু সাহিত্য ছাড়া আমার জীবন করুণ হয়ে উঠবে। তার মানে এই নয় যে লেখা ছাড়া আমি জীবনে আর কিছু করিনি। আমি বিবাহিত, আমার ছেলেমেয়ে আছে। ১৯৩৫ সাল থেকে আমার চোখের সমস্যা, যার কারণে গ্রীষ্মকালে আমার লেখা এবং পড়া নিষেধ, সুতরাং এটা আমার জীবনকে সুষমতা দান করেছে- খোদা প্রদত্ত সুষমতা। প্রত্যেক বছর তিনটি মাস আমাকে অবশ্যই জীবনযাপন করতে হয় এমন একজন মানুষ হিসেবে যে লেখক নয়। সেই তিন মাস আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত করি এবং ভোর পর্যন্ত বাইরে থাকি। তার মানে আমি তো বেঁচে আছি, না কি বল?